Barta24

বুধবার, ২৬ জুন ২০১৯, ১২ আষাঢ় ১৪২৬

English Version

গ্রামের ঈদ ও ভালো-মন্দের তফাৎ ভোলার অনুভূতি

গ্রামের ঈদ ও ভালো-মন্দের তফাৎ ভোলার অনুভূতি
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তা২৪.কম
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম


  • Font increase
  • Font Decrease

গ্রামের ছেলেদের হৈ-হুল্লোড় করে সবার সঙ্গে ঈদ করাটা পছন্দনীয় ব্যাপার। আমার বেলাতেও তাই। এবার সব জেলার মানুষ চাঁদ দেখেনি, আমরা দেখেছি। আধুনিক উন্নত প্রযুক্তির যুগেও চাঁদ দেখার বিলম্বিত তথ্য নিয়ে রাত বারোটায় বিড়ম্বনার চাঁদ দেখার ঘোষণা না দিলেও হয়তো আমরা পরদিন ঈদ করতাম। ঢাকাসহ প্রায় সব জেলায় বৃষ্টি হলেও আমরা সূর্যের আলোয় আনন্দ করে উন্মুক্ত ঈদগাহ মাঠে নামায আদায় করতে পেরেছি। চারদিকে মানুষের উৎসাহ, মসজিদ থেকে বারংবার ঈদের জামাতের সময়সূচি ঘোষণা, মাইক বাজিয়ে ঘটা করে বৃহৎ ষাঁড়ের মাংস বিক্রি ইত্যাদি জানান দিচ্ছিল যে গ্রামের ঈদে ভিন্ন আমেজ এসেছে। তাই ঈদের ছুটিতে গ্রামে এসে বেশ খুশিমতোই সময়টা পার হয়েছে।

ঈদের ছুটি শেষ। ক’ দিন গ্রামে থেকে মনটা বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠলেও কিছু নেতিবাচক পরিবর্তন দাগ কেটেছে। এর অনেক কারণ হয়তো আমাদের অজানা। আবার অনেক কারণ জেনেও গুরুত্ব দেয়া হয় না। সব অজানা কারণ উদঘাটন করার সময় এসেছে।

গ্রামের রাস্তায় প্রচুর অটোরিকশা ও মোটর সাইকেল। একরাতে একজন বেকার যুবকের ঘরে দেখলাম তিনটি মোটর সাইকেল। ভাবলাম সে কোন ব্যবসাপাতি করে বেশ অবস্থাসম্পন্ন হয়েছে। পরে জেনেছি ওগুলো তার নিজের নয়। সে ‘মুলি’ (উচ্চহারে সুদ)-র ব্যবসা করে। অর্থাৎ, এক সপ্তাহের জন্য কোন অভাবী লোককে টাকা ‘মুলি’ দেয়। সপ্তাহান্তে কোন কারণে সে টাকা শোধ দিতে অপারগ হলে সেটার সুদ তিন থেকে পাঁচগুণ বেড়ে যায়। এরপর সেই টাকা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শোধ দিতে না পারলে অভাবী লোকটির অটোরিকশা বা ব্যবহৃত মোটর বাইকটি জব্দ করা হয়। এভাবে একদিন সেগুলো মুলিদাতার নিজস্ব সম্পত্তি হয়ে যায়। সামন্তবাদী উচ্চ সুদের এই পদ্ধতিটি গ্রামে-গঞ্জে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠে অভাবী মানুষকে শোষণ ও নি:স্ব করে চলেছে তা দেখে ব্যথিত হলাম। কোন কোন গ্রামে ভিক্ষাবৃত্তির প্রাপ্ত অর্থকে মুলি ব্যবসায় খাটানো হচ্ছে বলে জানা গেল।

এছাড়া দিনের বেলা বটতলা, বাঁশঝাড়, পুকুরঘাট ইত্যাদিতে মানুষের জটলা চোখে পড়লো। মাদুর, চটের বস্তা অথবা খড় বিছিয়ে গোল হয়ে বসে অনেকে দীর্ঘসময় কাটাচ্ছে। সেখানে কোন জটলাতে মোবাইল ফোনে বিভিন্ন হুজুরের ওয়াজ বেজে চলেছে। অথচ তাদের হাতে বিড়ি-সিগারেট ও তাস। সামনে জুয়ার বেটের টাকা ছড়ানো! অর্থাৎ সেখানে মোবাইলে ধর্মীয় ওয়াজ বাজিয়ে জুয়া খেলা চলছে! ওদের পাশে কিছু মুরুব্বী গোছের মানুষ বসে আছেন, শিশুরাও ঘোরাঘুরি করছে সেখানে। কৌতূহল বশত আমরা ওদের খেলা দেখতে গেলে হাতের তাস ও সামনের ছড়ানো টাকাগুলো দ্রুত লুকিয়ে ফেলে কাঁচুমাচু হয়ে সবাই বলে উঠলো- আমরা এখানে বসে ওয়াজ শুনছি। চাচা আসসালামু আলাইকুম, আপনি কেমন আছেন? বাড়িতে কখন আসলেন? গ্রামের বড়দের শ্রদ্ধা জানানোর চিরন্তন ভালো মূল্যবোধগুলো তারা এখনো অনুসরণ করে চললেও নৈতিকতার নেতিবাচক চর্চার দিকগুলো ইতোমধ্যে উন্মোচিত হয়ে পড়েছে এবং সেগুলো সামাজিক ভাঙন ও মানবিক ধস তৈরি করে ফেলছে তা ভেবে খুব আতঙ্কিত হলাম।

আরেক জায়গায় দেখলাম ডাব্বু, মার্বেল, ক্যারমবোর্ড খেলা চলছে। বিদ্যুৎ এর আলোয় এ খেলাগুলো নাকি রাত-দিন চলে। এগুলো শুধু বিনোদনের জন্য হলে ভালই হতো। কিন্তু ভয়ংকর বিষয় হলো- এখানে সব ধরণের খেলাতেই জুয়ার টাকার ছড়াছড়ি। এটাই হলো বর্তমান গ্রামীণ বিনোদনের নেতিবাচক পরিবর্তন।

এক সন্ধ্যায় একজন অভিভাবক এসে জানালো তার সন্তানের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তার দৃঢ় বিশ্বাস, চাহিদা অনুযায়ী দালালকে পর্যাপ্ত টাকা দিতে না পারায় তার ছেলের সরকারি চাকরিটি হয়নি। এই পাশের গ্রামের একজনের ও তার পাশের গ্রামের আরেকজনের ছেলের চাকরি হয়েছে। তিনি তার বিস্তারিত বর্ণনা দিতে থাকলেন। একবছর আগে তিনি এক বিঘা জমি চার লাখ টাকায় বন্ধক রেখেছিলেন ছেলের চাকরি পেতে সে টাকার কাজে লাগাবেন বলে! কিন্তু দুর্ভাগ্য, সেই ছোটখাটো চাকরির দাম উঠে গেছে দশ-বারো লাখ টাকা! হায়রে কপাল। তিনি এখন ছেলেকে নিয়ে কী করবেন তা ভেবে ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। ছেলে তার বি.এ. পড়ে, জমিতে যায় না, কাজ করতে চায় না। তাকে আর পড়ানোর আর্থিক সামর্থ্য তার নেই। ছেলেটা দিনরাত মোবাইল নিয়ে ঘুরে বেড়ায় আর ডাব্বু, ক্যারাম খেলে। সেজন্য বিটের টাকা তার বাবার কাছে নিয়মিত চায়। এছাড়া ঘরে তার বিবাহযোগ্যা মেয়েও আছে।

এরকম পরিস্থিতি আরও বেশকিছু নজরে পড়ল।

এ ধরণের আরও অনেক সমস্যার কথা শুনে, দেখে, বুঝে এক সময় ঈদের ছুটি শেষ হয়ে গেল। গ্রাম ছেড়ে আবার শহরের চিরচেনা কর্মস্থলে চলে এলাম। তবে বাড়ির পুকুরপাড়ে আমার মরহুম প্রিয় আব্বাজানের লাগানো গোলাপজাম গাছের নিচের সুশীতল ছায়ায় পাতানো বাঁশের টং-এ বসে যে সুখানুভূতি হয়েছিল তা মিলিয়ে যাবার পূর্বে অভিজ্ঞতাগুলোকে লিখে প্রকাশ করে ফেললাম।

কারণ, আমাদের বর্তমান সমাজে ঘুষ-জালিয়াতি, চাকরি কেনা-বেচা, অনৈতিকতার দালালী ইত্যাদি নানা ধরণের নেতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে তা যদি ক্রমান্বয়ে চলতেই থাকে তাহলে সামাজিক বিপর্যয় অনিবার্য। রক্তে মিশে যাওয়া দুর্নীতি ও অপরাধ প্রতিনিয়ত আমাদেরকে পাপ-পঙ্কিলতার অতল গহ্বরে তলিয়ে দিয়ে আত্মহননে বাধ্য করছে।

এজন্য এখনই সময়- প্রতিটি সামাজিক নিরাপত্তা সেবা খাতে উপযুক্ত সেবাদান নিশ্চিত করতে সামাজিক গবেষণা শাখাকে জোরদার করে যথার্থ তথ্যের ভিত্তিতে কর্মসূচি হাতে নিয়ে এসব নেতিবাচক ও ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নেবার পথ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনা। অদৃশ্য ও অবৈধ আয়ের মানুষরা কর প্রদান করতে গেলে ধরা পড়তে পারে তাই সঠিক পরিমাণ কর ও যাকাত প্রদানেও বিরত থাকে। তাই এদের দ্বারা রাষ্ট্রের আর্থিক ও বৈশ্বিক কোন মর্যাদাই বাড়ে না।

গ্রাম-শহর সবজায়গায় চারদিকে অনৈতিকতার চর্চা, অদৃশ্য আয় ও কিছু স্বার্থপর মন্দ মানুষের অবৈধ অর্থ ব্যয়ের বাহারি ফুটানি আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দেউলিয়াত্বকে প্রকাশ করে। মানুষ যেন ভাল-মন্দের তফাৎ করা ভুলেই গেছে। তাই আজকের একান্ত কামনা- মানুষের অন্তরাত্মা সৎ ও নির্ভীক হোক এবং এ হীন অবস্থার আশু অবসান হোক।

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান

আপনার মতামত লিখুন :

বিয়ের দিন আইন প্রয়োগ কেন!

বিয়ের দিন আইন প্রয়োগ কেন!
আলম শাইন, ছবি: বার্তা২৪

আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা আঠারো বছরেই ভোটাধিকারের সুযোগ পায়। কিন্তু বিধান অনুযায়ী একই বয়সে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগ হয় না। কারণ বিয়ের জন্যে দেশে আলাদা আইন-কানুন রয়েছে। ছেলে-মেয়েদের বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে সেই আইনে সামান্য হেরফের রয়েছে। যেমন ছেলেদের ক্ষেত্রে একুশ, মেয়েদেরে ক্ষেত্রে আঠারো বছর। এর চেয়ে কমবয়সী কেউ বিয়ে করলে কাবিন রেজিস্ট্রিতে বিঘ্ন ঘটে।

বিধান অমান্য করে কেউ কাবিননামা রেজিস্ট্রি করলে তাকে অবশ্যই আইনের সন্মুখীন হতে হয়। তারপরও আমরা লক্ষ্য করছি, আইনিবাধা উপেক্ষা করে দেশে এ ধরনের বিয়েশাদী প্রায়ই ঘটছে যা কোনমতেই সমর্থনযোগ্য নয়। এর ফলাফলও ভয়ঙ্কর। অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণ করে অনেক কিশোরী মৃত্যুবরণ করছে। এসব বেআইনি ও অনৈতিক ঘটনা বেশি ঘটছে দেশের গ্রামাঞ্চল কিংবা চরাঞ্চালের দরিদ্র ও অশিক্ষিত পরিবারে। মাঝে মধ্যে মফস্বল শহরেও দেখা যায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ হচ্ছে ইভটিজারদের ভয়। যার ফলে বাবা-মা মেয়েকে অপ্রাপ্ত বয়সেই বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ কাজটি যেসব বাবা-মায়েরা করছেন তারা কিন্তু ঘুণাক্ষরেও জানছেন না, আঠারো বছরের কমবয়সী মেয়েকে বিয়ে দেওয়া আইনের পরিপন্থী। বিষয়টা অজানা থাকাতেই দরিদ্র বাবারা অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিয়ের দিনক্ষণ ধার্যকরে সাধ্যানুযায়ী ভোজের আয়োজন করেন। ঠিক এমন সময়েই ঘটে অপ্রত্যাশিত সেই ঘটনাটি; বিয়ের বাড়িতে দারোগা-পুলিশের হানা! যা সত্যিই বেদনাদায়ক। এ বেদনার উপসম ঘটানো সহজসাধ্য নয়।

দুঃখজনক সেই ঘটনায় কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে পর্বতসম ওজনের ভার বহন করতে হয়। বিষয়টা যে কত মর্মন্তুদ তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারো জানার কথাও নয়। একে তো দরিদ্র বাবা, তার ওপর মেয়ের বিয়ের আয়োজন করতে ঋণ নিতে হয়েছে তাকে। সেই ঋণ এনজিও, ব্যাংক কিংবা ব্যক্তি পর্যায়েরও হতে পারে। হতে পারে তিনি জমিজমা বিক্রয় করেও মেয়ের বিয়ের আয়োজন করেছেন। এ অবস্থায় মেয়ের বিয়েটা ভেঙ্গে গেলে ঋণগ্রস্ত পিতার অবস্থাটা কি হতে পারে তা অনুমেয়। কারণ ইতোমধ্যেই অর্থকড়ি যা খরচ করার তা করে ফেলেছেন। আর্থিক দণ্ডের শিকার হয়ে কনের বাবা তখন মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেন। তার সেই মানসিক যন্ত্রণার কথা সচেতন ব্যক্তিমাত্রই বুঝতে সক্ষম হবেন। বিষয়টা বিশ্লেষণ করে বোঝানোর কিছু নেই বোধকরি।

গ্রামাঞ্চলে এভাবে বিয়ে ভেঙ্গে গেলে ওই পাত্রী বা কনের ওপর নেমে আসে মহাদুর্যোগ। পাড়া পড়শীরা অলুক্ষণে অপয়া উপাধি দিয়ে কনের জীবনটাকে অতিষ্ট করে ফেলেন। এতসব কথাবার্তা সহ্য করতে না পেরে অনেকক্ষেত্রে সেই কন্যাটি আত্মহত্যার চিন্তা করেন অথবা বিপদগামী হন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের ঘটনার জন্য কে দায়ী থাকবেন- প্রশাসন না কনের বাবা? আমরা জানি, আইনের দৃষ্টিতে বাবাই দায়ী, প্রশাসন নয়। তারপও জিজ্ঞাসাটা থেকেই যাচ্ছে, কনের বাবাকে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করার আগে স্থানীয় প্রশাসন বাধা দেয়নি কেন! এখানে স্বভাবসুলভ জবাব আসতে পারে যে, বিষয়টা প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হয়নি বিধায় বাধা দেওয়া হয়নি। কিন্তু বিষয়টা তা নয়। যতদুর জানা যায়, এলাকার কিছু বদমানুষ অথবা ইভটিজার জেনেও জানাননি প্রশাসনকে। কনের বাবাকে নাজেহাল করার উদ্দেশে বিয়ের দিন প্রশাসনকে চুপিচুপি জানিয়ে দেন, যা আগে জানালেও পারতেন। তাতে করে কনের বাবা সাবধান হতেন এবং বিয়ের আয়োজন থেকে সরে আসতেন। অথচ সেই কাজটি করছেন না মানুষেরা। প্রায়ই এ ধরনের হীনমন্যতার বলি হচ্ছেন দেশের নিরীহ সাধারণ।

এ থেকে উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছি আমরা। ইচ্ছে করলে স্থানীয় প্রশাসন উত্তরণের জন্য জনসচেনতা বৃদ্ধির প্রয়াসে কিছু প্রদক্ষেপ নিতে পারে। যেমন এলাকায় মাইকিং করে বাল্যবিবাহ যে অপরাধ, তা জানিয়ে দেয়া। এছাড়া হ্যান্ডবিলের ব্যবস্থাও করতে পারেন। অথবা এলাকার মেম্বার, চৌকিদার বা গণ্যমাণ্য ব্যক্তির ওপরে এ দায়িত্ব আরোপ করতে পারেন। যাতে করে কোন অভিভাবক অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করার সাহস না পায়। এ ধরনের বিয়ের কথাবার্তার সংবাদ কানে এলেই তাৎক্ষণিকভাবে তা যেন প্রতিহত করেন তারা। এবং কেন তিনি বাল্যবিবাহের ব্যবস্থা করছেন প্রশাসন সেটিও উদঘাটন করার চেষ্টা করবেন। যদি ইভটিজারদের ভয়ে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন, তাহলে অবশ্যই তার ব্যবস্থা নিবেন।

উল্লেখ্য, এসব বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারেন এলাকার তরুণ সমাজ, মসজিদের ইমাম কিংবা মন্দিরের পুরোহিতও। তাতে করে বাল্যবিবাহ রোধের ব্যাপক সম্ভবনা রয়েছে। রয়েছে দরিদ্র কনের বাবার আর্থিক দণ্ড থেকে মুক্তি মেলার সুযোগও। ফলে বিয়ের দিন আইন প্রয়োগের হাতে থেকে রক্ষা পাবেন মেয়ের বাবা ও পরিবার-পরিজন।

আলম শাইন: কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ।

জামিন হয়ে যাচ্ছে সবার!

জামিন হয়ে যাচ্ছে সবার!
তুষার আবদুল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪.কম

সবার জামিন হয়ে যায়। এই সবাই কারা? শুনে মনে হয় অনেক মানুষ। একটি মহল্লায়, একটি গ্রামে, একটি শহরে কতো মানুষই তো থাকে। তাহলে সবাই বলতে কি মহল্লার সব মানুষের কথা বলা হচ্ছে? গ্রাম-শহরের মানুষও নিশ্চয়ই এই গোনার মধ্যে আছে। সবাই মানে তো অসংখ্য। তাহলে জামিন হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষের।

আচ্ছা জামিন মানে কী? অপরাধের দায় থেকে মুক্তি পাওয়া, নাকি অপরাধ প্রমাণের আগ পর্যন্ত মুক্ত বাতাসে চলাচল করার স্বাধীনতা? এমনও তো হতে পারে জামিন মানে কাউকে পরোয়া না করার দাম্ভিকতা। মহল্লা, গ্রাম, শহরের সবাই কি অপরাধী? কারণ শুরুতেই যে বলা হয়েছে, সবাই জামিন পেয়ে যাচ্ছে। কে দিল এই খবর? টিনে বারি দিয়ে মহল্লা, গ্রাম, শহরে খবর ছড়াচ্ছে কে, সবার যে জামিন হচ্ছে? মানুষ। হুম, মানুষ তার দুঃখের কথা জানাচ্ছে। মানুষ তার অসহায়ত্বের কথা জানাচ্ছে। তাহলে এই যে বলা হলো সবাই, সেখানে কি মানুষ নেই?

সবাই বলতে তো অগণিত, অসংখ্য বোঝায়, সেখানে মানুষ থাকবে না কেন? মানুষেরা নির্বাসনে গেছে? এমন সংবাদই পাওয়া যাচ্ছে। যাবে না কেন? মহল্লার দু’পায়ের যে প্রাণী পাশের বাড়ির শিশুকে জমির লোভে মাটিতে পুঁতে রেখেছিল, সে এখন শীষ বাজিয়ে ঘুরে বেড়ায়। দু’পায়ের দল গ্রামের কিশোরীকে ধর্ষণ করার পরেও হুঙ্কার থামায়নি। নতুন কিশোরী তাদের নজরে। চাকায় মানুষ পিষে ফেলে ছিল যে, তাকে এখনও দেখা যায় রঙিন কাঁচের আড়ালে শীতাতাপ মোটর যানে। আগুনে পুড়ে গেল কতো প্রিয় মুখ। পুড়িয়ে মারলো যে সংঘ, তারা আষাঢ়ে ক্ষমতার রোদ পোহায়।

মানুষ নামে আছে যে বিলুপ্ত প্রায় সম্প্রদায়, তারা ক্রমশ গুহাবাসী হয়ে পড়ছে। কোনোভাবে মুখ বের করে দেখছে- কোথাও কোনো অপরাধ নেই। যেহেতু অপরাধ নেই, তাই সবাই শরতের রোদ্দুর দেখছে। আগাম হৈমন্তী হাওয়া শরীরে মাখিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মহল্লায় তাদের সালিশে ডাকবে কে, গ্রামে সালিশ বসানোর মুরোদ কার, আর শহর? রঙিলা শহরের নকশাকার তো ওই ওরাই। যাদের জামিন হয়ে যায়। সংখ্যায় ওরা লঘিষ্ঠই ছিল। ক্রমশ ওরা নদর্মার কালো জলের মতো বুদঁ বুঁদ ছড়াতে থাকে। সেই ছোট একটি বুঁদ বুঁদের উৎস থেকে তৈরি হয়েছে কালো জলের জলাশয়। সেই জলও নাকি কালো নয়। সেই জলের দুর্গন্ধেরও নাকি সুবাস আছে। মহল্লা, গ্রাম, শহরে সেই গল্পের বয়ান চলছে। কাগজের জাদুর পরশে কালো সাদা হয়ে যাচ্ছে। অপরাধী সুবোধ হয়ে যাচ্ছে। সুবোধকে দেওয়া হচ্ছে অপরাধীর বেশ।

ওদের জামিন হয়ে যাচ্ছে বলে রাতের বাঁদুরও ভয়ে আছে। নেকড়েরা মহল্লা, গ্রাম, শহর ছেড়েছে। কিন্তু গুটিকয় সেই মানুষেরা? ওরা নির্বসানে যাবে কোথায়, গোলকে এমন কোনো ভূখণ্ড আছে, ব-দ্বীপে এমন আছে কোনো শুদ্ধ জমিন? যেখানে মানুষ মিশে যেতে পারবে দোঁ-আশের সঙ্গে? মানুষ এক আশ্চর্য প্রাণ। কি মহাকাশ, মহাকাল সমান ধৈর্য্য তার। আবার তার গরিষ্ঠ হবার সাধ।

জামিন যাদের হচ্ছে হোক না। কতোদূর যাবে ওরা, পোড়াবে, নষ্ট করবে কতোটা? মানুষ জানে সেই দু’পায়ের প্রাণীদের মুরোদ। ওদের আত্মমৃত্যুর উৎসব সন্নিকটে। মহাকার লাখ প্রাণীর মতোই, মহাদানব এই দু’পায়ের অপরাধীরা বিলুপ্ত হবেই। সবাই, অসংখ্য বলতে আসলে মানুষই সত্য। ক্ষুদ্র শুধু জামিন পেয়ে যাওয়ার দল। ওদের আসলে জামিনের সুযোগ নেই।

তুষার আবদুল্লাহ: বার্তা প্রধান, সময় টেলিভিশন

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র