Barta24

রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

বদনাম কেন শুধু বোবা আম-বালিশের?

বদনাম কেন শুধু বোবা আম-বালিশের?
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তা২৪
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম


  • Font increase
  • Font Decrease

গত ২২ মে যাত্রাবাড়ীতে পনের টন আম রাসায়নিকে পাকানোর অভিযোগে ট্রাক দিয়ে পিষে এবং ১৯ মে তারিখে এক হাজার একশ’ মণ আমকে বিষাক্ত হিসেবে অভিযুক্ত করে বুলডোজার দিয়ে পিষে ভর্তা করা হয়েছে। যার বাজার মূল্য কয়েক লক্ষ টাকা।

এছাড়া প্রায়ই সরকারি জমিতে অবৈধভাবে তৈরি দালান, দোকান-পাট, বাড়িঘর, স্থাপনা ইত্যাদি এমনকি ফেনসিডিলের বোতল বুলডোজার দিয়ে পিষে দেওয়া হয়। অধিকন্তু বিভিন্ন অভিযানে উদ্ধারকৃত ইয়াবাকে বুলডোজার দিয়ে পিষে পিষে ফেলা হয়। এইসব জড় পদার্থের আর্তনাদ কারো প্রাণে আঘাত করে না। কারণ এরা সবাই বোবা, এদের কারোরই প্রান নেই, তাই নিজস্ব প্রতিবাদের ভাষাও নেই। তাই এদরকে সাড়ম্বরে জনসন্মুখে মৃত্যুদণ্ড দিলেও এরা মরে না। এসব দ্রব্য নবজীবন নিয়ে বার বার ফিরে আসে!

এ ধরনের অপরাধ মোকাবেলায় এদের সৃষ্টির উৎসমুখে পূর্বাহ্নেই সরকারি প্রতিরোধ কর্মসূচি কার্যকর থাকলে বেচারা ফল, ফেনসিডিল ও ইয়াবাকে বুলডোজার দিয়ে বারবার পিষে ভর্তা করতে হতো না। এগুলো আর্থ-সামাজিক অসুখ। এর সাথে সমাজের বহু মানুষের বিশেষ স্বার্থ জড়িত থাকে বিধায় শুধু বুলডোজার লাগিয়ে প্রতিকার কর্মসূচি দিয়ে এ অসুখ সাময়িকভাবে কমানো গেলেও নির্মূল করা দুরুহ।

ক’দিন ধরে রূপপুর পারমাণবিক প্রজেক্টের কেনাকাটায় অনিয়ম নিয়ে তুলার বালিশকে অতি বেশি দামে অবৈধভাবে বদনাম দিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক প্রজেক্টের কেনাকাটায় বালিশ একটি রূপক মাত্র। দেশে কোন প্রজেক্টে কত টাকায় এরকম কোটি কোটি বালিশের মূল্য সমপরিমাণ টাকার অপচয় করা হয়, তা সংবাদ মাধ্যমে আসে না অথবা সেগুলোর খোঁজ করা এখানে বাতুলতা মাত্র।

দেশে এখন বোরো ধান কাটার মৌসুম। তাই একটি বালিশের দামে এগার মন ধান কিনতে পাওয়া যায়। এক মণ ধান দিয়ে এক কেজি গরুর মাংসও কেনা যায় না। ক’দিন পর হয়তো ধান নিয়ে এই নাজুক অবস্থা থাকবে না। আমরা জানি, পণ্য বিনিময়ের যুগে টাকার অভাব ছিল। তখনকার দিনে কানাকড়িরও অনেক মূল্য ছিল। শায়েস্তা খানের আমলে টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। তবুও সেসময় কিছু অভাবী মানুষ শালুক-গুগলি খেয়ে দিনাতিপাত করেছে।

এখন বাজারে মোটা হাইব্রিড ধানের দাম কিছুটা কম। তার পরেও এই সস্তা ধান কেনার সামর্থ বহু প্রান্তিক মানুষের নেই। দেশে মোট দিনমজুর ও ভিক্ষুকের সংখ্যা ও যাকাত প্রার্থীর সংখ্যার দিকে তাকালে এ অবস্থা সহজে অনুমেয়। আজকাল ভিক্ষুক ও যাকাত প্রার্থীরা শহুরে অনেক বিলাসবহুল বাসা-বাড়ির ফটকের সামনে ভিড়তে পারে না। দারোয়ানরা আগেই তাদেরকে তাড়িয়ে দেবার নির্দেশনা পেয়ে সে দায়িত্বটি ভালভাবে পালন করে। আর যাদের বাসার দরজায় ঘেঁষার সুযোগ পায় প্রতি সকালে তাদের মুহুর্মুহু কলিং বেলের আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে বিরক্ত হওয়ার কথা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করবেন বৈ কি। এর কারণ হলো- সমাজে সমাজে মানুষে মানুষে আয়-বৈষম্য ও ব্যয়ের ফুটানি। যা থেকে উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে কিছু চতুর লোকেরা বোবা বালিশের ওপর বদনাম বা বেচারা অপরিপক্ব আমের ওপর বুলডোজার চাপিয়ে দিয়ে নিষ্পেষণ কবার হঠকারী ঘটনা ঘটানোর মত বিষয়।

হতাশা অপরাধের অন্যতম প্রধান কারণ। মানুষের মনে ক্রমাগত ব্যথা ও হতাশা অপরাধ প্রবণতার জন্ম নেয়। এই অপরাধ প্রবণতার সূতিকাগার সমাজের চেপে রাখা বোবা কান্নাগুলো থেকে দিনরাত উৎসারিত হতে থাকে। তাই মানুষের মনের রোগ না সারিয়ে সারা বছর বুলডোজার দিয়ে পিষে আম-ফল ভর্তা করা হলেও ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়।

এক শ্রেণির মানুষের রক্তে মেশা লাগামহীন দুর্নীতি, জালিয়াতি, মানুষের মৌলিক অধিকার হরণের নীতি, রাতের ভোটের সুফল-কুফল ও জবাবদিহিতাকেও এখানে খাটো করে দেখার উপায় নেই বলে অনেকে মনে করেন। ভারতে এত বড় নির্বাচন হলেও মানুষ ভোট দিতে পেরেছে। ভারতের মানুষ ভোট প্রদানের সিস্টেমকে তেমন দোষারোপ করছেন না। তাই রাহুল গান্ধী নিজ আসন আমিথিতে হেরে গেলেও আক্ষেপ না করে এবং কাল বিলম্ব না করেই নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। আর আমাদের দেশে ভোট শেষ হবার কয়েক মাস গত হয়ে গেলেও বিরোধী পক্ষ থেকে সেরকম সুবাতাস নেই। তফাৎটা এখানেই। এজন্য সমাজের অনেক সাধারণ বিষয়গুলো থেকেই হতাশা ও সেগুলো থেকে অপরাধবোধ জন্ম নেওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

বরং আমাদের সমাজের মধ্যে অস্থিরতা বেড়েছে, সন্দেহ বেড়েছে-বেড়েছে প্রতিহিংসা। যে কোন সমাজে অস্থিরতা, সন্দেহ ও প্রতিহিংসা বিরাজমান থাকলে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। মানুষ নৈতিকতাকে অগ্রাহ্য করে এবং সামাজিক অপরাধগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তাইতো দুর্নীতিকে নীতি মনে করা, দুধে পানি মেশানো, খাদ্যে ফরমালিন মেশানো, অপরের ফলের বাগান কেটে সাবাড় করে দেয়া, অপরিপক্ব ফলে বিষ মাখানো, মাছের পুকুরে বিষ ঢেলে দেওয়া ইত্যাদি কঠিন, নির্মম ও নিষ্ঠুর অপরাধ প্রতিনিয়ত ঘটেই চলেছে। এগুলোর ইন্ধনদাতারাও নিষ্ঠুর প্রকৃতির এবং সমাজের হোমরা-চোমড়া। এদের বিরুদ্ধে সহজে কোনো অভিযোগ করা যায় না। করলেও এরা নিমিষেই ঘুষ ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে আইনের ফাঁক গলিয়ে বের হয়ে এসে আবার নিরীহদের ওপর চড়াও হয়।

আরও পড়ুন: অপরিপক্ব ৫০ মণ ল্যাংড়া আম জব্দ-নষ্ট

তাইতো আজকাল গ্রামের সাধারণ নিম্ন আয়ের মানুষটিও যৎসামান্য সরকারি সেবা পেতে গিয়ে বাধ্য হয়ে বেশি ঘুষ দিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। যারা তা দিতে অপারগ তারা নিরুপায়, সমাজের অসহায় শ্রেণি। সুতরাং সাধারণ নিরীহ অসহায় মানুষ বোবা বালিশের মত গুমরে গুমরে কাঁদে আর অভিশাপ দেয়। তাদের এই অভিশাপগুলোর কোনো স্বাভাবিক সুরাহা না হলে হয়তো সেজন্যই একদিন সেগুলো সামজিক বিপর্যয় হিসেবে সমাজের সকলের উপরে বোঝা হিসেবে নেমে আসে। সেটাকে কেউ বলেন প্রাকৃতিক, কেউ নিয়তি, কেউবা বলেন সামাজিক বিপর্যয়। এর বিপরীতে ঐতিহাসিক, বৈজ্ঞানিক যে কোন ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হোক না কেন, এটাই ঐশী শিক্ষা।

অর্থাৎ, মানুষ অন্তর থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে গেলে অপরাধী হতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। আমাদের সমাজে বড় অপরাধীদের বুক ফুলিয়ে চলার ঔদ্ধ্যত্ব দেখে দেখে ছোট অপরাধীরা উদ্বুদ্ধ হয়। এভাবে আমাদের খাদ্যে ভেজাল, ওষুধ-পথ্যে ভেজাল, পরীক্ষায় নকল, নিয়োগে অনিয়ম, অফিসে স্বাভাবিক পন্থায় কোনো কাজ করার উপায় নেই। এর প্রধান কারণ- রক্তে মেশা অভাবনীয় দুর্নীতি আমাদের বড় থেকে ছোটদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিকড় গেড়েছে।

আরও পড়ুন: আমের আড়তে অভিযান, ৪০০ মণ আম জব্দ

এর নেপথ্যের নায়ক কে বা কারা? তাদের চেহারাটাও তো টিভি অথবা পত্রিকায় দেখতে পাওয়া দুষ্কর। এই ভেজাল কাজে যারা জড়িতদের মানসিকতাকে বুলডোজার দিয়ে পিষে ভর্তা না করে বেচারা ফল, ফেনসিডিল ও ইয়াবাকে বুলডোজার দিয়ে বারবার পিষে ভর্তা করতে হয় কেন?

আমাদের রক্তে মেশা দুর্নীতি বড়দের থেকে শিখে ছোটদের তথা সর্বস্তরের মানুষের ব্যক্তিগত নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণমাধ্যমে বারবার লোকদেখানো জবাবদিহিতা প্রদর্শন করলেও মূল অপরাধীদেরকে স্পর্শ করতে ভয় পায়- এসব দায়িত্বরত ভীরু কারা? এরা এবং এদের নেপথ্যের নায়কদের কি সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নৈতিক জবাবদিহিতা নেই?

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

আপনার মতামত লিখুন :

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

সারা দেশে আষাঢ়ের কান্না যেন থামতেই চাইছে না। অতিবৃষ্টিতে চারদিকে বন্যা শুরু হয়েছে; শুরু হয়েছে শ্রাবণ। শ্রাবণের কালো মেঘ কী বার্তা নিয়ে আসবে, জানি না!

আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে এসে হঠাৎ করে প্রৃকতি বিরূপ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন ও বন্যা একসঙ্গে শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার, বান্দরবানে অতিবৃষ্টিতে বহু পাহাড় ধসে নিচে নেমে গিয়েছে। প্রৃকতি এতে ক্ষান্ত হয়নি। পাহাড়ি ঢল বার বার ধেয়ে আসছে।

রাস্তা, বাড়ি-ঘর ভূমিধসের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। ধান-পাট, শাক-সবজি ডুবে যাচ্ছে। মাছের খামারের মাছ ভেসে গিয়ে মাছ চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। বৃষ্টি ও সাগরের নিম্নচাপ মিলে মানুষের এক চরম ভোগান্তি শুরু হয়েছে।

পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ এই প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ এখন আতঙ্ক। তাই ভুক্তভোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বারবার মূল শহরের রাস্তায় থৈ থৈ পানি সবাইকে প্রহসন করছে। কৌতুক করে বলা হচ্ছে- ‘কী সুন্দুইজ্যা চাঁটগা নগর’, ‘ডুবে থাকা’ চট্টগ্রাম নগরীর সৌন্দর্য্য এই বর্ষায় আরো কয়েকবার দেখা যাবে সন্দেহ নেই’ ইত্যাদি।

উত্তরের জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, শেরপুর থেকে ভারত ও ভুটানের পাহাড়-পর্বতশ্রেণি বেশি দূরে নয়। ওপরে বেশি বৃষ্টি হলেই ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে অকাল বন্যা দেখা দেয়। পূর্বে সিলেটে নেমে আসে আসাম ও শিলংয়ের পাহাড়ি ঢল। আগে প্রাকৃতিকভাবে এই ঢলের পানি নদী দিয়ে সাগরে চলে যেত। হাওড়ের মানুষ কৃত্রিমভাবে ধান বা মাছের চাষও করতো না। তাই ঢলের পানির ক্ষতিকর দিকের কথা তেমন শোনাও যেত না।

এখন চারদিকে নানা প্রকার উন্নয়ন শুরু হয়েছে। অপরিকল্পিত ও অযাচিত উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্দয় হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। মানুষ প্রয়োজন পূরণের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চলেছে। তাই প্রকৃতিও মানুষের প্রতি নির্দয় হয়ে নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করেছে। ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে বন্যার সাথে প্রচণ্ড নদীভাঙন শরু হয়েছে। তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। আশঙ্কার কথা হলো- নদীভাঙনে বাস্তহারাদের চাপে পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্থ হতে পারে।

পরিবেশ কারো একার সম্পত্তি নয়। পরিবেশ সারা পৃথিবীর সব মানুষের সম্পত্তি। তাই পরিবেশ সংরক্ষণে নীতি নির্ধারণে সবার কথা শোনা উচিৎ।

আমাদের চারদিকে আরো অনেক সমস্যা বিরাজমান। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (হ্যাজার্ডস যেমন-সাইক্লোন, বন্যা) ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় (যেমন- ফসলহানি, প্রাণহানি) এত বেশি ক্ষতিকর যে, প্রতিবছর আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে অনেক পেছনে ঠেলে দেয়। এগুলোকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা উচিৎ নয়। মনুষ্যসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় (ক্যালামিটিস/ হ্যাজার্ডস্) ঠেকাতে সব মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে আমাদের নিজেদের চেষ্টার মধ্যে একাই করব, একাই খাব নীতি পরিহার করা উচিৎ। অন্যথায়, একজন তৈরি করবে অন্যজন নষ্ট করার পাঁয়তারা করতে পারে- তারা দেশি হোক বা বিদেশি লবিস্ট হোক।

উন্নয়নের নামে পাহাড় কাটা, অবাধে গাছ নিধন করা, কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, নদী দখল ও ভরাট করে স্থাপনা বানিয়ে স্বাভাবিক পানি চলাচলের পথ রুদ্ধ করা- এসব আজকাল যেন কোনো অপরাধই নয়! পাহাড়ে প্রয়োজনীয় গাছ নেই- তাই সামান্য বৃষ্টিতে মাটি গলে ধসে মানুষের মাথার ওপর পড়ছে। ওই কাদামাটি নিকটস্থ নদীতে গিয়ে নদীকে ভরাট করে নাব্যতা নষ্ট করে দিচ্ছে।

উন্নয়নের নামে পাহাড়-সমতলের সব বড় বড় গাছ কেটে উজাড় করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারি রাস্তার পাশের তাল- নারকেলসহ ছায়াদানকারী বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করায় সারাদেশে বজ্রপাত বেড়ে গেছে এবং ভয়ংকরভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এখন বজ্রপাতে মৃত্যুর ভয়ে কৃষকরা মাঠে কাজ করতে যেতে ভয় পায়।

এছাড়া উত্তরাঞ্চলে ক্রমাগতভাবে ধরলা-তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং চট্টগ্রামে পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়েই যাচ্ছে। এতে কারো যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে সেটা দেশের পুরো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ভণ্ডুল করে দিতে পারে। এসব মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি কি আমাদের আছে?

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের একটি মন্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন 'সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না'। এ কথাটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকতাদের দুর্নীতি আজ নতুন নয়। তবে সব কর্মকর্তাও এক নয়। সংখ্যায় সীমিত হলেও  অনেক অফিসার আছেন যারা সততার সাথে অনেক কষ্টে  জীবনযাপন করেন। তাই সকলকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুদক নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অনেক আগে, তবে কিছু দিন পূর্বে ছোটখাটো দুর্নীতি ধরতে সোচ্চার দেখে আমরা কিছুটা হলেও খুশি হয়েছি। এ জন্য যে এবার অন্তত দুদক চেয়ারম্যান নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হয় কিনা বা সকল শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসছেন কিনা তা যাচাই করতে। 

আমরা মনে করেছি, তিনি একবার যেহেতু ঘর থেকে বেরিয়েছেন, বাংলাদেশের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে, বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছেন, সরকারি কর্মকতা, রাজনীতিবিদের দুর্নীতি থামানো অসম্ভব। তার কাছে তো অনেক উদাহরণ আছে।

যাক সেসব কথা। এবার আলোচনা করা যাক, তিনি কেন বলেছেন যে সরকারি কর্মকরা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না। তিনি কি আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেয়েছেন?  নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

কারণ ব্যাখ্যার আগে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে দুই-চার কথা না বললেই নয়। ওনারা সরকারিভাবে সে বৃটিশ আমল থেকে সুরক্ষিত। ওনারা সমাজের উপরে থাকেন। ওনাদের পল্লীর নাম ভদ্রপল্লী। ওনাদের সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগ। সব কিছুই ওনারা নির্মাণ ও পরিচালনা করেন। সকল সুযোগ-সুবিধা ওনাদের জন্য। এ কারণে ওনাদের আচরণে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ জন্য তাদের সঙ্গে জনগণের একটা দুরত্ব কাজ করে। ফলে তাদের সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্যের পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, তা জানার আগেই পত্র-পত্রিকা,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। আসলে দুদক চেয়ারম্যান কী বোঝাতে চেয়েছেন বা জনগণ কী বুঝেছে তা পরিষ্কার নয়।

আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, এখানে দুদক চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে বুঝাননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের অনিচ্ছায় বা ভালো  উদ্দেশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে কারো ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য ঐ কর্মকতাকে দুর্নীতি পরায়ণ বলা যাবে না। এটাকে দুদক চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাস' বলেছেন। যদি ঐ কর্মকর্তা  ইচ্ছাকৃত ভুল করেন বা টাকার বিনিময়ে করেন বা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেন, তা সরল বিশ্বাস নয়। এখানে অসততা আছে। এটাই দুর্নীতি।

আমার  হয়তো বুঝতে ভুল হতে পারে আর যদি হয়ও তা কিন্তু সরল বিশ্বাসে। আমি এ বিষয়টি এ জন্যই উপস্থাপন করলাম, কারণ দুদক চেয়ারম্যানের কথার অর্থ যদি সরকারি কর্মকর্তারা ভুল বোঝেন, তাহলে তো সর্বনাশ! তারা তো সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা শুরু করবেন। অবস্থা তখন হবে, ‘একদিকে নাচুনি বুড়ি অন্য দিকে ঢোলের বাড়ি’-র মতো। আমার এ লেখা শুধু ওইসব দুর্নীতি পরায়ণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য।

অতএব, দয়া করে সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন: সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি অপরাধ নয়: দুদক চেয়ারম্যান

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র