Barta24

বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

জাপায় অনলাইন নিষিদ্ধ, এরশাদ-কাদের ও কিছু কথা

জাপায় অনলাইন নিষিদ্ধ, এরশাদ-কাদের ও কিছু কথা
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও জিএম কাদের, ছবি: সংগৃহীত
সেরাজুল ইসলাম সিরাজ


  • Font increase
  • Font Decrease

সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের চিন্তাধারা আবারও হোঁচট খেলো। খোদ জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের সাম্প্রতিক কার্যক্রমে এই বাস্তবতা প্রকাশ পেয়েছে।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অনেক সমালোচনা থাকতে পারে, কিন্তু তিনি কখনও সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলতেন না। এমনকি তিনি অনলাইন গণমাধ্যমকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। এরশাদের সেই চিরায়ত চিন্তাকে জলঞ্জলি দিয়ে কূটনৈতিকদের সম্মানে জাতীয় পার্টির ইফতারে অনলাইনকে অনেকটা অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ করে দেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের।

কথিত রয়েছে শুধুমাত্র খরচ বাঁচাতে কূটনৈতিকদের সম্মানে আয়োজিত ইফতার অনলাইন নিউজ পোর্টালের সাংবাদিকদের দাওয়াত প্রদান থেকে বিরত থাকা হয়। আবার সিলেক্টিভ কিছু পত্রিকা ও টিভিতে দাওয়াত পাঠানো হয়। বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও তার কাছের নেতাদের নামে যারা সমালোচনামূলক রিপোর্ট করেন তাদেরকেও দাওয়াত প্রদান থেকে বিরত থাকা হয়।

কিন্তু জাতীয় পার্টি কিংবা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কখনই এমন ছিলেন না। তার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারী থেকে শুরু করে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে অনেক রিপোর্ট হয়েছে। কিন্তু এরশাদ কি কখনও সেই পথে হেঁটেছেন? ইতিহাস ঘাটলে উত্তর পাওয়া যাবে, না।

এখানে একটি ঘটনা উদাহরণ হতে পারে। ফেনী নদী লংমার্চে ফেনীতে বসেই এরশাদের সমালোচনামূলক একটি লেখা আপলোড করা হয় অনলাইনে। ফেনী সার্কিট হাউসে অবস্থানকারি এরশাদের সঙ্গে রাতে সামনাসামনি দেখা হয়ে গেলে একজন অতি উৎসাহী নেতা বলে বসেন, ‘সিরাজতো আপনার বিরুদ্ধে নিউজ করেছে স্যার। সঙ্গে সঙ্গে এরশাদ বলেন, সমালোচনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি আমি।’

এরশাদ যখন শিক্ষা গ্রহণের কথা বলছেন, তার উত্তরসূরি জিএম কাদের কি করতে চাচ্ছেন, কি বার্তা দিতে চাচ্ছেন সমালোচকদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করে! জাপার সিনিয়র নেতারা মনে করছেন এটা খারাপ উদাহরণ তৈরি হলো। এটা জাপা ও জিএম কাদেরের রাজনীতির জন্য সুখকর কিছু বয়ে আনবে না।

সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হচ্ছে অনলাইনকে আমন্ত্রণ না জানানোর কারণে। জাপা কিন্তু কখনই এমন ছিলো না। বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অনেক আগে থেকেই অনলাইনের প্রতি ঝুঁকে ছিলেন। বরং পত্রিকার থেকেও বেশি।

কিছু ঘটনা তুলে ধরলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ২০১৩ সালে ৫ দিনের সফরে যাবেন সাতক্ষীরা। সঙ্গে শুধু অনলাইন নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, আর একটি টিভি। যুক্তি ছিলো, পত্রিকাতো অনলাইন থেকেই কপি করে। তাই অনলাইন গেলেই সব কভার হয়ে যাবে। এখানে একটি ঘটনা এরশাদকে প্রভাবিত করেছিলো বলে ধারণা করা হয়।

সেটি হচ্ছে এরশাদ একটি সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দিয়েছিলেন। একটি অনলাইন তার বক্তব্য কিছুটা বিকৃতভাবে প্রচার করে। পরদিন দেখা যায় বেশিরভাগ পত্রিকাও বিকৃতভাবেই প্রচার করেছে। তখন পত্রিকায় ফোন করে কারণ জানতে চাইলে প্রভাবশালী ওই দৈনিকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো, তারা অনলাইন থেকে কপি করেছেন।

এরপর ২০১৪ সালের উত্তাল দিনগুলোতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একাধিক দিনে ফোনে করে বলতেন, তোমার হাতে কাগজ কলম আছে, লিখতে পারবা। হ্যাঁ সূচক জবাব দিলে চলমান ঘটনায় প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন। এরপর বলতেন কি লিখলা পড়ো, পড়ে শোনানোর পর বলতেন, আপলোড করে দাও।

এতে কিছুটা বিড়ম্বনা তৈরি হয়। সিনিয়র অনেক সাংবাদিক তার এসব বিবৃতি খুঁজতে গেলে বলেছিলেন, প্রেস রিলিজ করা হয়নি। অনলাইন থেকে নিয়ে নাও। কেউ এটাকে অসম্মানের মনে করতেন। আরও এ রকম অসংখ্য ঘটনার উদাহরণ দেওয়া যাবে।

কিন্তু তার আপন ছোট ভাই, ভারপ্রাপ্ত হওয়ার পর প্রথম দাওয়াতে অনলাইনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। মিডিয়াকে দাওয়াত কার্ড সমেত হাজির থাকতে বললেন। যার কারণে অনেকে হাজির হলেন না।

আপনার বাসায় ঈদের দাওয়াত কাকে দেবেন, না দেবেন- এটা একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু যখন খবরের বিষয় তখন আপনি কিছু সাংবাদিকের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারেন না। এটা মিডিয়ার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিদেশ গেলে তার সফরসঙ্গীর তালিকায় যারা রয়েছেন তারা ৪ জনেই (বিএসএস, ইউএনবি, বিডিনিউজ ও বাংলানিউজ) কিন্তু অনলাইনের।

বিশ্বে এখন অনলাইনের জয়জয়কার। অনেক বড়বড় জায়ান্ট পত্রিকা তাদের প্রিন্ট ভার্সন বন্ধ করে অনলাইনে যাচ্ছে। বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোও প্রিন্টের পাশাপাশি অনলাইনে ঝুঁকছে। আপনি নিজেই অনলাইনে পেজ খুলে নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছেন।

আপনাকে একটি বিষয়ে বলতে চাই, কোনো একদিন অনুষ্ঠানে গুনে দেখবেন। পত্রিকা, টিভি নাকি অনলাইনের সাংবাদিক আপনার বক্তব্য তুলে ধরার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে। আর কতোজন শ্রোতা আপনার বক্তব্য শোনার জন্য হাজির থাকেন। তাহলেই বুঝতে পারবেন বর্তমান সময়ের বাস্তবতা।

কোন গণমাধ্যমে জানছে আপনার বক্তব্যগুলো। কতজন মোবাইলে অনলাইনের খবর দেখছে, আর কতজন টিভিতে দেখছে। আর কতজন পরদিনে সেই সংবাদটি পত্রিকায় পড়ছে।

আর হ্যাঁ, আপনি কাউকে খাওয়াতে না চাইলে তাতে আপত্তি নেই। সাংবাদিকরা না খেয়ে সকালে ঘর থেকে বের হন না। এখানে সুপারিশ হচ্ছে প্রথমে রিপোর্ট দিয়ে দ্বিতীয় সেশনে ভূঁড়িভোজ সারতে পারবেন। তাতে কেউ আপনাকে বাঁধা দেবে বলে মনে হয় না।

আপনার বড় ভাইয়ের তৈরি করা একটি ধারা রয়েছে। জনসভা ছিলো মুন্সীগঞ্জে (২০১২ সালে)। দুপুর ২টায় জনসভা শুরুর কথা ছিলো। সিডিউল ছিলো ঢাকা থেকে গিয়ে প্রথমে সার্কিট হাউসে মধ্যাহ্নভোজ। এরপর জনসভায় যোগদান।

প্রথম ব্যাচে চেয়ার সংকটের (কিছুটা ভিড়) কারণে ৪ জন সাংবাদিক বাদ পড়ে যাই। নিজের খাওয়া শেষে সাংবাদিকদের খোঁজ নিয়ে যখন জানতে পারেন চারজনের খাওয়া হয়নি। তখন দ্রুত খাবার দিতে বলে ডাইনিং টেবিলেই বসে থাকেন এরশাদ।

কয়েক মিনিট গেলে আবার তাগাদা দেন। তখন প্রেসিডিয়াম সদস্য সালমা ইসলাম এসে বলেন, স্যার আপনি চলেন ওদের খাবার দিচ্ছে। তখন এরশাদ বলেছিলেন, ওরা খাবে তারপর আমি উঠবো। সেদিন সালমা ইসলাম বলেছিলেন, স্যার খাবার ঘাটতি পড়েছে, কয়েক মিনিট সময় লাগবে। আপনি চলেন জনসভা দেরি হলে লোকজন চলে যাবে। সেদিন আপনার ভাই বলেছিলো, তাহলে জনসভা বাতিল করে দাও। সাংবাদিকদের খাওয়া শেষ না হওয়া পর‌্যন্ত টেবিলে বসেছিলেন।

আপনি সৎ মানুষ, আপনার আর্থিক সংকট রয়েছে। মন্ত্রী থাকাকালেও অন্যদের মতো ধান্ধা-ফিকির করেননি এটা আমরাও কিছুটা অবগত। তাই কথা দিচ্ছি, আর কোনোদিন আপনার পার্টির সৌজন্যে সরবারহকৃত কোনো খাবারে আমার জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে না, তাও অন্তত নিউজ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবেন না।

সেরাজুল ইসলাম সিরাজ: স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম

আপনার মতামত লিখুন :

উচ্চমাধ্যমিকের ফল ও কিছু কথা

উচ্চমাধ্যমিকের ফল ও কিছু কথা
মাছুম বিল্লাহ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

১৭ জুলাই প্রকাশিত হলো ২০১৯ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল। গতবারের চেয়ে এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা বেশি এবং মেয়ে শিক্ষার্থীদের পাসের হার ছেলেদের চেয়ে বেশি। এই তিনটি বৈশিষ্ট্যই এবারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলে লক্ষণীয়।

এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পরীক্ষার্থী ছিল ১৩ লাখ ৫৮ হাজার ৫০৫ জন। এর মধ্যে আটটি সাধারণ শিক্ষাবোর্ডের অধীনে এইচএসসিতে পরীক্ষার্থী ছিল ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৫৫০ জন ও মাদরাসা থেকে আলিমের শিক্ষার্থী ছিল ৮৮ হাজার ৪৫১ জন ও কারিগরিতে ছিল ১ লাখ ২৪ হাজার ২৬৪ জন পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে ৬ লাখ ৬৪ হাজার ৪৯৬ জন ছাত্র ও ৬ লাখ ৮৭ হাজার ৯ জন ছাত্রী। মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৯ হাজার ৮১ শিক্ষা।

এবারের এইচএসসির ফল প্রকাশিত হলো ৫৫ দিনের মধ্যে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশিত হয়েছে বলে এটিকে পজিটিভ বলা যায়। এখন পাবলিক পরীক্ষার ফল দু’মাসে দেওয়া হয়, যা আগে তিনমাসে দেওয়া হতো। এবার দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশের কারণে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান এবং তিনি এতে খুশিও হয়েছেন। তবে, পরীক্ষার ফল তাড়াহুড়ো করে দেওয়া মানে প্রচুর ভুল-ত্রুটি থেকে যেতে পারে।

আর একটি বিষয় তো আমরা খেয়ালই করছি না। সেটি হচ্ছে, একজন শিক্ষার্থীর সারাজীবনের বিচার করছেন একজন শিক্ষক। তিনি অভিজ্ঞ হোক, অনভিজ্ঞ হোক, নতুন হোক, পুরান হোক, খাতা মূল্যায়ন করতে জানুক আর না জানুক, একজন শিক্ষকের কয়েক মিনিটের বিচার এবং রায় হচ্ছে একজন শিক্ষার্থীর ১২ বছরের সাধনার ফল এবং ভবিষ্যতের পথচলার নির্দেশক। এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

একটি উত্তরপত্র বিশেষ করে এই ধরনের পাবলিক পরীক্ষার খাতা কমপক্ষে দু’জন পরীক্ষকের পরীক্ষণ করা উচিৎ, তা না হলে সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হয় না। এরপর হাজার হাজার ভুল ত্রুটি ধরা পড়বে, সেখানে বোর্ড কিছু অর্থ উপার্জন করবে কিন্তু কাজের কাজ খুব একটা কিছু হবে না কারণ খাতা তো পুনর্মূল্যায়ন হয় না। শুধু ওপরের নম্বর দ্বিতীয়বার গণনা করা হয়। আমরা একটি পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে এর ধরনের খেলা খেলতে পারি না।

এবার ৪১টি প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করেনি। এদের মধ্যে ৩৩টি কলেজ ও আটটি মাদরাসা রয়েছে। কিছু কিছু কলেজ দেখলাম মাত্র একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছিল, ওই একজনই অকৃতকার্য হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান নিয়ে শিক্ষা প্রশাসন তথা সরকারের সিদ্ধান্ত কী? কেনইবা একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারে না আবার একটি প্রতিষ্ঠান থেকে মাত্র একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেয়, এটিই বা কেমন প্রতিষ্ঠান?

কুমিল্লা বোর্ডে এবার এইচএসসিতে পাসের হার সবচেয়ে বেশি ৭৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ অথচ এই শিক্ষার্থীরা ২০১৭ সালে যখন এসএসসি পাস করে তখন তাদের পাসের হার ছিল সর্বনিম্ন ৪৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। হঠাৎ করে এই পরিবর্তন কীভাবে হলো? শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, তারা হয়তো বিশেষ কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন, তাই এরকম হয়েছে।

আমরা জানি শিক্ষাবোর্ড একমাত্র পরীক্ষা গ্রহণ করা ছাড়া কীভাবে শিক্ষকরা পড়াবেন, কীভাবে শিক্ষার মান উন্নয়ন ঘটানো যায় ইত্যাদি নিয়ে তাদের তৎপরতা খুব একটা কখনও দেখা যায় না। একটি বোর্ডের অধীনে কয়েকটি জেলায় কয়েক হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকে। সেগুলোর শিক্ষাদান, শিক্ষক উন্নয়ন ও শিক্ষার্থী উন্নয়ন নিয়ে বোর্ডের কোনো তৎপরতা বা কাজ আমরা দেখি না। কিন্তু পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর বোর্ডগুলোর মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। কোন বোর্ডে কত বেশি শিক্ষার্থী পাস করেছে; বোর্ড যেন এক ধরনের কৃতিত্ব দেখাতে চায়।

আসলে আমাদের দেশে শিক্ষাবোর্ডগুলো একমাত্র শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন আর খাতা মূল্যায়ন ছাড়া তেমন কোনো কাজ করে না। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা একটি জেলার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরীক্ষায় ভালো করলে তা ওই প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারীদের এবং একই জেলার কিছু প্রতিষ্ঠান ভালো করলে শিক্ষা প্রশাসন কিছুটা কৃতিত্ব নিতে পারে। বোর্ড কেন? বোর্ড কি শিক্ষকদের কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়? বোর্ড কি শিক্ষকদের ক্লাস পর্যবেক্ষণ করে? বোর্ড কি শিক্ষার্থীদের মানসম্মত পড়ালেখা করার জন্য কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে? এর কোনোটিই করে না। তাহলে তারা কৃতিত্ব দেখাতে চায় কেন, বিষয়টি আমার কাছে বোধগম্য নয়।

পত্রিকায় দেখলাম যশোর বোর্ডে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে আছে। বোর্ডের ১৮টি কলেজের পাসের হার শতভাগ। এ বোর্ডে সামগ্রিক পাসের হার ৭৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ, আর মেয়েদের পাসের হার ৭৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ছেলেদের পাসের হার ৭২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। দিনাজপুর বোর্ডেও ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে আছে। এ দু’টো বোর্ডে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা কি বেশি পড়াশোনা করেছে? নাকি অন্য কোনো কারণ আছে যেটি গবেষণার মাধ্যমে জানা প্রয়োজন।

ফলাফলের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ২০১৫ সাল থেকে পাঁচ বছর যাবত ছাত্রীরা ধারাবাহিকভাবে ছাত্রদের চেয়ে বেশি পাস করে আসছে। এ বছর ছাত্রীদের পাসের হার ৭৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ আর ছাত্রদের ৭১ দশমিক ৬৭ শতাংশ অর্থাৎ ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের পাসের হার ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেশি। এটি যদিও আনন্দের সংবাদ কিন্তু এর সঠিক কারণ জানা প্রয়োজন।

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক। বর্তমানে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিকে কর্মরত সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক।

শিক্ষায় শিশুশিক্ষা ও মনোবিজ্ঞান

শিক্ষায় শিশুশিক্ষা ও মনোবিজ্ঞান
মুত্তাকিন হাসান/ ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

সাধারণ অর্থে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা। ব্যাপক অর্থে ব্যক্তির গুণাবলীর পূর্ণ বিকাশের লক্ষ্যে পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞান লাভের প্রক্রিয়াকে শিক্ষা বলে। বাংলায় শিক্ষা শব্দটি এসেছে ‘শাস’ ধাতু থেকে যার অর্থ শাসন করা বা উপদেশ দেওয়া। শিক্ষার ইংরেজি প্রতিশব্দ education; যা এসেছে ল্যাটিন শব্দ educare বা educatum যার অর্থ হলো to lead out অর্থাৎ ভেতরের সম্ভাবনাকে বাহিরে বের করে আনা বা বিকশিত করা।

শিক্ষা মানুষের মনকে আলোকিত করে, উম্মোচিত করে নতুন নতুন জানালা। আর তাই শিক্ষার কোনো শেষ নেই। শিক্ষা শুরুর পথটা শিশুশিক্ষা দিয়েই, আর তাই বলা হয় আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এই ভবিষৎকে শুরু থেকেই সঠিকভাবে লালন-পালন না করলে কোনো কিছুই প্রত্যাশা করা যায় না।

শিশুশিক্ষার হাতেখড়ি পারিবারিকভাবে পিতামাতার মাধ্যমে হলেও প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাপ্তবয়স্কদের যে পদ্ধতিতে শিক্ষা দেওয়া হয়, তা শিশুদের বেলায় বাঞ্ছনীয় নয়। শিশুদের জন্য দরকার শিশুবান্ধব মানসম্মত শিক্ষা।

মানসম্মত শিশুশিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন শিশুর মনোজগত বোঝা। একটি বেসরকারি জরিপে দেখা গেছে, আমাদের দেশের শতকরা ৭০ ভাগের বেশি বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের শিশুমনোবিজ্ঞান সম্পর্কে কোনো ধারণা বা জ্ঞান নেই। শিশুর মন না বুঝে ভয়ভীতি দিয়ে শিক্ষাদান করা শুধু তোতা পাখি বানানো ছাড়া আর কিছু নয়। শিশুশিক্ষা বা প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষকদের অবশ্যই শিক্ষকদের মনোজগত সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমাদের বর্তমান বেশিরভাগ শিক্ষকরা শিক্ষার্থীর প্রতি আন্তরিক না হয়ে, নিজেরা শিক্ষা বাণিজ্যে মত্ত থাকেন। ক্ষণে ক্ষণে শিক্ষার্থীর বাবা-মার সাথে শিক্ষকদের পরম আলাপচারিতা মানেই মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা নয়। শিশুশিক্ষায় শিশুদের মনের বিকাশে মনোবিজ্ঞানের ক্ষীণ প্রভাবের কারণেই শিশুরা জীবনের শুরুতেই শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

বিদ্যমান শিক্ষার পরিবেশ তাদের মেধা বিকাশের অন্তরায়। শিক্ষক আর অভিভাবকের কড়া নিয়মশাসনে ভালো পড়তে বা লিখতে পারছে ঠিকই তবে চিন্তাশীল বা উদ্ভাবনী হয়ে উঠতে ব্যর্থ হচ্ছে। আসলে তাদের এ শিক্ষা মানব বিকাশে সহায়ক নয়। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো- পরিপূর্ণ মানবিক গুণে মানুষ হয়ে উঠা। পিতামাতা তার সন্তানকে দিয়ে ভালো রেজাল্ট করাচ্ছে ঠিকই কিন্তু সত্যিকারের শিক্ষিত হয়ে উঠছে না। শিশুর সৃজনশীলতা বিকাশের যথোপযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় তারা বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এতে করে টালমাটাল হচ্ছে পুরো সমাজ।

বিখ্যাত কবি মিল্টন বলেছেন- Education is the harmonious development of body, mind and soul…শিক্ষকরা যেহেতু প্রকৃত অভিভাবক এবং শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান প্রদান করে থাকেন, তাই শিক্ষকদের হতে হবে প্রকৃত মানুষ। শিক্ষদের নিজেদের মধ্যেই যদি মানবিক গুণাবলীর ঘাটতি থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীর মনে কখনোই মানবিক গুণাবলী জাগ্রত হবে না।

শিক্ষাদানের জন্য বিদ্যালয়ের বাহ্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও যত উপকরণই ব্যবহার করা হোক না কেন শিক্ষকরা নিজেরাই সবচেয়ে বড় উপকরণ। শিক্ষাকে পেশার পাশাপাশি সেবা হিসেবে গ্রহণ করতে পারলেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে গড়ে উঠবে নিবিড়, সৌহার্দ ও স্নেহপূর্ণ সম্পর্ক। কোমলমতি শিশুদের বকাঝকা না করে সকল শিক্ষকদের উচিত সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি করা। হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা যেন প্রত্যেক শিক্ষার্থীই প্রথম স্থান অর্জন করবে। শিশুদের পাশাপাশি যেন পিতামাতারাও এমন প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। অথচ প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে জ্ঞান বিকাশের প্রথম স্তর মাত্র। তাদের জন্য আরও বহু পথ বাকি।

শিক্ষক আর পিতামাতার চাপে শিশুরা যেন দিশেহারা। ভোরবেলায় চোখ কচলাতে কচলাতে ঘুম থেকে উঠা, বিদ্যালয় থেকে ফিরে যতটুকু সময় তাতে তাদের ব্যস্ত থাকতে হয় শ্রেণীতে দেওয়া পড়ালেখা নিয়ে। শিশুরা তাদের চিন্তা চেতনা প্রকাশ করার কোন সুযোগই পাচ্ছে না। গ্রামের শিশুদের চেয়ে শহরের শিশুদের বেলায় এ অবস্থা বেশি পরিলক্ষিত হয়। কারণ শহরের বিদ্যালয়ে নেই খেলার উন্মুক্ত মাঠ। অথচ খোলামেলা মাঠ শিশুদের মনোবিকাশের অন্যতম উপাদান। শিশুরা দুরন্ত হরিণের মতো খেলাধুলা করবে এটাই স্বাভাবিক।

বিখ্যাত সাহিত্যিক আবুল ফজল বলেছেন ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতির প্রাণশক্তি তৈরির কারখানা আর রাষ্ট্র ও সমাজ সব চাহিদার সরবরাহ কেন্দ্র। এখানে ত্রুটি ঘটলে দুর্বল আর পঙ্গু না করে ছাড়বে না।’ যে স্থানেই হোক না কেন আমাদের উচিত শিক্ষার সঠিক সংজ্ঞার প্রতি খেয়াল রাখা। নচেৎ পুরো সমাজকে ভোগান্তিতে পড়তে হবে এবং যার প্রভাব সুদূরপ্রসারি। শিশুশিক্ষার বর্তমান ধারা সংশোধন করে মনোবিজ্ঞান ভিত্তিক পড়ালেখা অত্যন্ত জরুরি।

প্রত্যেক শিক্ষকের জন্য শিশু-মনোবিজ্ঞান বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষকদের পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। যেহেতু ভালো পড়ালেখার আশায় পিতামাতারা তাদের শিশু সন্তানদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে ইচ্ছুক বেশি, তাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে শিক্ষকদের বড় একটি অংশ উচ্চ-মাধ্যমিকের বেশি পড়ালেখা করেননি এবং তাদের বেশিরভাগের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। যাদের প্রশিক্ষণ আছে তা আবার স্বল্পকালীন। সঠিক প্রশিক্ষণের অভাবে শিক্ষকদের মনেও নেই কোনো আনন্দ, তারা যেন কোনোমতে নিজেদেরকে ঠেলা দিয়ে চালাচ্ছে। শিক্ষকরা নিজেরাই নিজেদের মনোবিকাশে ব্যর্থ। শিশু শিক্ষার্থীর মনোবিকাশ এখানে বাতুলতা ছাড়া আর কিছু নয়।

মুত্তাকিন হাসান: কবি, প্রাবন্ধিক ও মানব সম্পদ পেশাজীবী

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র