Barta24

রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

“বিরোধীদের আক্রমণ ভুলে গিয়েছি, আজ থেকে নতুন দিন”

“বিরোধীদের আক্রমণ ভুলে গিয়েছি, আজ থেকে নতুন দিন”
মাছুম বিল্লাহ, ছবি: বার্তা২৪
মাছুম বিল্লাহ


  • Font increase
  • Font Decrease

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল যে, কৃষকদের সংকট, বেকার সমস্যা ও সর্বোপরি অর্থনৈতিক দুরবস্থা মোদির দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় যাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনা, অনুমান, আলোচনা ও পূর্বাভাসকে উড়িয়ে দিয়ে হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপিই ধর্মনিরপেক্ষ ও বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশের ক্ষমতায় পুনরায় বসছে। ভারতের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন শুরু হয়েছিল ১১ এপ্রিল, সাতদফা ভোটাভুটির শেষ দফা ছিল ১৯ মে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছেন, ভারতের ৯০ কোটি ভোটারের মধ্যে ৬০ কোটিই এবার ভোট দিয়েছে।

আমরা জানি, লোকসভার ৫৪৫টি আসনের মধ্যে সংবিধান অনুযায়ী ভোট অনুষ্ঠিত হয় ৫৪৩টিতে, বাকি দুটি আসনে মনোনয়ন দেন রাষ্ট্রপতি। এবার ভোট হয়েছে ৫৪২টিতে। ভোট হয়নি শুধুমাত্র তামিলনাড়ু রাজ্যের ভেলর আসনে। আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে আসনটিতে ভোট স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। লোকসভার ৫৪২টি আসনের মধ্যে ৩৪৯টিতেই বিজেপির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স বিজয়ী হয়েছে। কোনো দল বা জোটকে সরকার গঠন করতে হলে প্রয়োজন ২৭২টি আসন। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স বা ইউপিএ পেয়েছে ৯২টি এবং অন্যান্য দল ১০১টি আসন।

হিন্দিবলয় গুজরাটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই এই ’মোদি ঝড়’। এই ঝড় বিস্তৃত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, মহারাষ্ট্র এবং কর্ণাটকেও। পরাজয় মেনে নিয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী এবং অভিনন্দন জানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি ও এনডিএ জোটকে। একইভাবে রাহুলের বোন প্রিয়াঙ্কাও দেশবাসী ও নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, দেশবাসী মোদিকে পছন্দ করে ভোট দিয়েছেন। ভারতের নির্বাচনে এবার সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে। আর এতে এগিয়ে ছিলেন মোদি। সব রাজনৈতিক দলই মিডিয়ার দিকে নজর রেখেছিল। সাত দফা নির্বাচনে শুধু ভোট গ্রহণের দিনগুলোকে নিয়ে একটি সমীক্ষা করে নয়াদিল্লির ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি। তাতে দেখা যায় শুধু ভোটের দিনগুলোতেই মোট ১৭ লাখ ৪০ হাজার টুইট করা হয়েছে।

গত লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে মোদি ঝড় আটকাতে পেরেছিলেন মমতা বন্দোপাধ্যায়। সেই আত্মবিশ্বাসে এবারও তেনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে রাজ্যের ৪২টি আসনেই তৃণমূল বিজয়ী হবে। কিন্তু হিসাব পাল্টে গেছে। এ রজ্যের মোট আসনের মধ্যে ১৮টিই পেয়েছে বিজেপি, গত নির্বাচনে পেয়েছিল মাত্র দুটো। কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র দু’টি আসন, গতবার পেয়েছিল চারটি, আর মমতার তৃণমূল পেয়েছে ২২টি আসন যা গতবারের চেয়ে ১২টি কম। এতে প্রমাণিত হয় যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে মুছে যাওয়া বামদের ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে।

একটু পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯৮৪ সালে বিজেপি মোট দুটি আসন পেয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যার পর ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস পেয়েছিল চার শতাধিক আসন। এবার সেই দল ৫০টি আসনের আশপাশ দিয়ে চলছে। কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী পার্টির এই পরিস্থিতির কারণে সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। আসলে তার পদত্যাগের প্রয়োজন নেই। রাজনীতি এটিই। তার নিজের ভুলের কারণে বা তার ব্যক্তিগত কোনো কারণে যে নির্বাচনের এই ফল এই দাঁড়িয়েছে তা কিন্তু নয়। একজন মানুষের পক্ষে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মন জয় করা যে সব সময়ই সম্ভব হবে তা কিন্তু নয়। রাজনীতি এক ধরনের আবেগ। জনগণের সেই আবেগ কখন যে কোনদিকে যায় তা বলা কঠিন। নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে রাজনীতির এই খেলায়।

ভারতবর্ষ বিভক্তির পর রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ আরএসএস নামক সাম্প্রদায়িক সংগঠনটিই জনসংঘ নামে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করে। কালের পরিক্রমায় সেটিই এখন বিজেপি। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ভারতের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার হাওয় লাগতে শুরু করে। এ সময় ভারতের রাজনীতিতে একাধিপত্য ছিল ইন্দিরা গান্ধীর। তার আধিপত্য খর্ব করতেই এক সময় বাকি সবাই এক জোট হয়েছিল যদিও তাদের মধ্যে রাজনৈতিক আদর্শিক পার্থক্য ছিল অনেক।

ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলো তখন দল বা গ্রুপ ভারি করতে জনসংঘকেও সঙ্গে নিয়েছিল আর সেই থেকেই ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি রাজনৈতিক অঙ্গন দখল করতে শুরু করে। যার চূড়ান্ত পরিণতি ধর্ম নিরপেক্ষ ভারতে দ্বিতীয়বারের মতো বিজেপির ক্ষমতা দখল।

এটা ঠিক যে, মোদির মতো ব্যক্তিগত ক্যারিশমা অন্য নেতাদের মধ্যে খুঁজে পায়নি ভারত। এ ধরনের নেতা আছেন আমেরিকায়, রাশিয়ায়, হাঙ্গেরিতে, তুরস্কে। এ ধরনের নেতারা অনেক কিছুই বলেন। অন্যদিকে যে যাই বলুক তাতে তাদের কিছু আসে যায় না। তারা ক্ষমতায় ঠিকই ফিরে আসেন। কেউ কি ভেবেছিল যে ট্রাম্প হবেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট?

এটিতো সবাই জানেন যে ২০১৪ সালের নির্বাচনে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো মোদি রাখতে পারেননি, তারপরেও জনগণ তাকেই ভোট দিয়েছে। গণতন্ত্রের এটি আর এক রহস্য, আর এক ধরনের ম্যাজিক। জনগণ কখন কী চান, বলা কঠিন। জনগণ বোধহয় জাতীয়তাবদী ও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতেই আস্থা রেখেছেন মোদির ওপর। কিন্তু সেখানেই বা মোদি অতিরিক্ত কী করেছেন? বরং পাকিস্তানের কূটনীতির কাছে হেরে গিয়েছিলেন যখন বিমান বাহিনীর পাইলটকে হাতের মধ্যে পেয়েও সসম্মানে ভারতে পাঠিয়ে দিলেন ইমরান খান। তারপরেও মোদিকেই জনগণ ভোট দিলেন! এটিই গণতন্ত্রের মোড়!

শতাব্দীর প্রাচীনতম দল কংগ্রেস ২০১৪ সালের নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। তারপর গত পাঁচ বছরে কোন কিছুতেই যেন কিছু করতে পারছিলেন না। তবে এবার লোকসভা নির্বাচনের মাত্র কয়েকমাস আগে ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হলে জাতীয় নির্বাচনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। এর সাথে যুক্ত হয় প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর কংগ্রেসে যোগদান, উত্তর প্রদেশে সমাজবাদী পাটির ও বহুজন সমাজবাদী পার্টিসহ বিভিন্ন দলের মহাঘটবন্ধন বা মহাজোট গঠন।

রাহুল গান্ধী বলেছেন, ”কোনটা ভুল হয়েছে, আজ এ নিয়ে আলোচনার দিন নয়। জনগণ নরেন্দ্র মোদিকে স্বতঃস্ফূর্ত রায় দিয়েছে। জনতার রায়কে সম্মান জানাচ্ছি।’ এটি ম্যাচিউর রাজনীতিকের মতোই কথা। গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধার কথা। আমেথিতে ঐতিহাসিক হার মেনে নিয়ে বলেছেন, ”আশা করছি ওই আসনের মানুষকে স্মৃতি ইরানি ভালোবাসা দিয়ে রাখবেন।’চমৎকার মন্তব্য। মোদিও চমৎকার করে বলেছেন, ”বিরোধীদের আক্রমণ ভুলে গিয়েছি। আজ থেকে নতুন দিন। কোটি কোটি নাগরিক এই ফকিরের ঝুলি ভর্তি করে দিয়েছে। বিশ্বের ইতিহাসে সফলতম জয়।’

আমরা চাই বিজেপির নেতৃত্ব ভারতে এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই নিরাপদে বসবাস করবে। সত্যিই আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতে মোদির নেতৃত্বে নতুন দিন আসবে।

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক; বর্তমানে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত।

আপনার মতামত লিখুন :

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

সারা দেশে আষাঢ়ের কান্না যেন থামতেই চাইছে না। অতিবৃষ্টিতে চারদিকে বন্যা শুরু হয়েছে; শুরু হয়েছে শ্রাবণ। শ্রাবণের কালো মেঘ কী বার্তা নিয়ে আসবে, জানি না!

আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে এসে হঠাৎ করে প্রৃকতি বিরূপ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন ও বন্যা একসঙ্গে শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার, বান্দরবানে অতিবৃষ্টিতে বহু পাহাড় ধসে নিচে নেমে গিয়েছে। প্রৃকতি এতে ক্ষান্ত হয়নি। পাহাড়ি ঢল বার বার ধেয়ে আসছে।

রাস্তা, বাড়ি-ঘর ভূমিধসের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। ধান-পাট, শাক-সবজি ডুবে যাচ্ছে। মাছের খামারের মাছ ভেসে গিয়ে মাছ চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। বৃষ্টি ও সাগরের নিম্নচাপ মিলে মানুষের এক চরম ভোগান্তি শুরু হয়েছে।

পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ এই প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ এখন আতঙ্ক। তাই ভুক্তভোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বারবার মূল শহরের রাস্তায় থৈ থৈ পানি সবাইকে প্রহসন করছে। কৌতুক করে বলা হচ্ছে- ‘কী সুন্দুইজ্যা চাঁটগা নগর’, ‘ডুবে থাকা’ চট্টগ্রাম নগরীর সৌন্দর্য্য এই বর্ষায় আরো কয়েকবার দেখা যাবে সন্দেহ নেই’ ইত্যাদি।

উত্তরের জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, শেরপুর থেকে ভারত ও ভুটানের পাহাড়-পর্বতশ্রেণি বেশি দূরে নয়। ওপরে বেশি বৃষ্টি হলেই ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে অকাল বন্যা দেখা দেয়। পূর্বে সিলেটে নেমে আসে আসাম ও শিলংয়ের পাহাড়ি ঢল। আগে প্রাকৃতিকভাবে এই ঢলের পানি নদী দিয়ে সাগরে চলে যেত। হাওড়ের মানুষ কৃত্রিমভাবে ধান বা মাছের চাষও করতো না। তাই ঢলের পানির ক্ষতিকর দিকের কথা তেমন শোনাও যেত না।

এখন চারদিকে নানা প্রকার উন্নয়ন শুরু হয়েছে। অপরিকল্পিত ও অযাচিত উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্দয় হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। মানুষ প্রয়োজন পূরণের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চলেছে। তাই প্রকৃতিও মানুষের প্রতি নির্দয় হয়ে নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করেছে। ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে বন্যার সাথে প্রচণ্ড নদীভাঙন শরু হয়েছে। তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। আশঙ্কার কথা হলো- নদীভাঙনে বাস্তহারাদের চাপে পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্থ হতে পারে।

পরিবেশ কারো একার সম্পত্তি নয়। পরিবেশ সারা পৃথিবীর সব মানুষের সম্পত্তি। তাই পরিবেশ সংরক্ষণে নীতি নির্ধারণে সবার কথা শোনা উচিৎ।

আমাদের চারদিকে আরো অনেক সমস্যা বিরাজমান। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (হ্যাজার্ডস যেমন-সাইক্লোন, বন্যা) ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় (যেমন- ফসলহানি, প্রাণহানি) এত বেশি ক্ষতিকর যে, প্রতিবছর আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে অনেক পেছনে ঠেলে দেয়। এগুলোকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা উচিৎ নয়। মনুষ্যসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় (ক্যালামিটিস/ হ্যাজার্ডস্) ঠেকাতে সব মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে আমাদের নিজেদের চেষ্টার মধ্যে একাই করব, একাই খাব নীতি পরিহার করা উচিৎ। অন্যথায়, একজন তৈরি করবে অন্যজন নষ্ট করার পাঁয়তারা করতে পারে- তারা দেশি হোক বা বিদেশি লবিস্ট হোক।

উন্নয়নের নামে পাহাড় কাটা, অবাধে গাছ নিধন করা, কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, নদী দখল ও ভরাট করে স্থাপনা বানিয়ে স্বাভাবিক পানি চলাচলের পথ রুদ্ধ করা- এসব আজকাল যেন কোনো অপরাধই নয়! পাহাড়ে প্রয়োজনীয় গাছ নেই- তাই সামান্য বৃষ্টিতে মাটি গলে ধসে মানুষের মাথার ওপর পড়ছে। ওই কাদামাটি নিকটস্থ নদীতে গিয়ে নদীকে ভরাট করে নাব্যতা নষ্ট করে দিচ্ছে।

উন্নয়নের নামে পাহাড়-সমতলের সব বড় বড় গাছ কেটে উজাড় করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারি রাস্তার পাশের তাল- নারকেলসহ ছায়াদানকারী বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করায় সারাদেশে বজ্রপাত বেড়ে গেছে এবং ভয়ংকরভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এখন বজ্রপাতে মৃত্যুর ভয়ে কৃষকরা মাঠে কাজ করতে যেতে ভয় পায়।

এছাড়া উত্তরাঞ্চলে ক্রমাগতভাবে ধরলা-তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং চট্টগ্রামে পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়েই যাচ্ছে। এতে কারো যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে সেটা দেশের পুরো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ভণ্ডুল করে দিতে পারে। এসব মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি কি আমাদের আছে?

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের একটি মন্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন 'সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না'। এ কথাটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকতাদের দুর্নীতি আজ নতুন নয়। তবে সব কর্মকর্তাও এক নয়। সংখ্যায় সীমিত হলেও  অনেক অফিসার আছেন যারা সততার সাথে অনেক কষ্টে  জীবনযাপন করেন। তাই সকলকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুদক নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অনেক আগে, তবে কিছু দিন পূর্বে ছোটখাটো দুর্নীতি ধরতে সোচ্চার দেখে আমরা কিছুটা হলেও খুশি হয়েছি। এ জন্য যে এবার অন্তত দুদক চেয়ারম্যান নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হয় কিনা বা সকল শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসছেন কিনা তা যাচাই করতে। 

আমরা মনে করেছি, তিনি একবার যেহেতু ঘর থেকে বেরিয়েছেন, বাংলাদেশের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে, বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছেন, সরকারি কর্মকতা, রাজনীতিবিদের দুর্নীতি থামানো অসম্ভব। তার কাছে তো অনেক উদাহরণ আছে।

যাক সেসব কথা। এবার আলোচনা করা যাক, তিনি কেন বলেছেন যে সরকারি কর্মকরা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না। তিনি কি আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেয়েছেন?  নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

কারণ ব্যাখ্যার আগে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে দুই-চার কথা না বললেই নয়। ওনারা সরকারিভাবে সে বৃটিশ আমল থেকে সুরক্ষিত। ওনারা সমাজের উপরে থাকেন। ওনাদের পল্লীর নাম ভদ্রপল্লী। ওনাদের সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগ। সব কিছুই ওনারা নির্মাণ ও পরিচালনা করেন। সকল সুযোগ-সুবিধা ওনাদের জন্য। এ কারণে ওনাদের আচরণে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ জন্য তাদের সঙ্গে জনগণের একটা দুরত্ব কাজ করে। ফলে তাদের সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্যের পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, তা জানার আগেই পত্র-পত্রিকা,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। আসলে দুদক চেয়ারম্যান কী বোঝাতে চেয়েছেন বা জনগণ কী বুঝেছে তা পরিষ্কার নয়।

আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, এখানে দুদক চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে বুঝাননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের অনিচ্ছায় বা ভালো  উদ্দেশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে কারো ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য ঐ কর্মকতাকে দুর্নীতি পরায়ণ বলা যাবে না। এটাকে দুদক চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাস' বলেছেন। যদি ঐ কর্মকর্তা  ইচ্ছাকৃত ভুল করেন বা টাকার বিনিময়ে করেন বা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেন, তা সরল বিশ্বাস নয়। এখানে অসততা আছে। এটাই দুর্নীতি।

আমার  হয়তো বুঝতে ভুল হতে পারে আর যদি হয়ও তা কিন্তু সরল বিশ্বাসে। আমি এ বিষয়টি এ জন্যই উপস্থাপন করলাম, কারণ দুদক চেয়ারম্যানের কথার অর্থ যদি সরকারি কর্মকর্তারা ভুল বোঝেন, তাহলে তো সর্বনাশ! তারা তো সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা শুরু করবেন। অবস্থা তখন হবে, ‘একদিকে নাচুনি বুড়ি অন্য দিকে ঢোলের বাড়ি’-র মতো। আমার এ লেখা শুধু ওইসব দুর্নীতি পরায়ণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য।

অতএব, দয়া করে সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন: সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি অপরাধ নয়: দুদক চেয়ারম্যান

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র