Barta24

মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯, ১ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

রাহুল, এরপর কী

রাহুল, এরপর কী
এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তা২৪
এরশাদুল আলম প্রিন্স


  • Font increase
  • Font Decrease

কংগ্রেস আরো একটি শোচনীয় পরাজয়ের মুখোমুখি হলো। পরাজয়টা তারা নিশ্চিত জেনেই গিয়েছিল। দলের ভেতরে ও বাইরে তাদের পরাজয় নিয়ে তেমন কোনো সন্দেহ ছিল বলে মনে হয় না। কিন্তু পরাজয়ের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো রাহুল গান্ধী এখন কী করবেন? তিনি যে যুদ্ধে নেমেছেন সেই যুদ্ধে আপাতত তিনি পরাজিত একথা সত্য। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, তার হাতে অনেক ব্রহ্মাস্ত্র থাকার পরেও তিনি কুরুক্ষেত্রে তা ব্যবহার করতে পারেননি। নির্বাচনে পরাজয় এক জিনিস।

নির্বাচনে পরাজয় হতেই পারে। কিন্তু ব্রহ্মাস্ত্র ব্যবহারই করতে জানেন না-এটাতো তার চেয়েও বড় পরাজয়, আসল পরাজয়। রাফাল কেলেঙ্কারি, উর্ধ্বমূখী বেকারত্ব থেকে শুরু করে সর্ববিস্তৃত কৃষক অসন্তোষ-কোনোটিই রাহুল নির্বাচনের মাঠে কাজে লাগাতে পারেননি। নির্বাচনের চেয়েও এটিকে বড় পরাজয় হিসেবেই দেখছেন অনেকে।

এদিকে মোদি এক ঝানু রাজনীতিক, পাকা খেলোয়াড়। নির্বাচনে মোদির ধারাবাহিক বিজয় তার রাজনৈতিক পেশাদারিত্বেরই এক নমুনা। ক্লাসিক্যাল রাজনীতি বলতে যা বোঝায় ভারতবর্ষে বুঝি তার দিন শেষ। শুধু ভারত কেন, বাংলাদেশেও সেই রাজনীতির দিন শেষ। এখন কন্টেম্পোরারি রাজনীতির দিন চলছে। পৃথিবীর দেশে দেশে এখন এই কন্টেম্পোরারি রাজনীতির জয় জয়কার।

ক্লাসিক্যাল রাজনীতির উত্তরসূরি হিসেবে রাহুল হয়তো তার পূর্বপুরুষের রাজনীতির ধারাটিই আবার ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তিনি যে রাজনীতির উত্তরাধিকার বহন করছেন সে রাজনীতির জনক গত হয়েছেন অন্তত আরও চার পুরুষ আগে। নেহেরু-ইন্দিরা-রাজীব (মাঝে সোনিয়া গান্ধী)- ভারতবাসী এই তিন পুরুষ আগের রাজনৈতিক ব্যাকরণ মানবে কেন? কিন্তু মূল প্রশ্নটি রাজনীতির পারিবারিক তত্ত্ব নিয়ে না। আসলে সময় বদলেছে, ভারতও বদলেছে। ফলে রাজনীতির মেরুকরণ শুধু ভারতেই নয়, সমগ্র বিশ্বেই এক নতুন দিকে ধাবিত হচ্ছে। রাহুল এই রাজনীতি বুঝতে পারলেও হয়তো এতো তাড়াতাড়ি সেই জুতা পড়তে চাননি। পুরনো জুতা পায়ে দিয়েই হয়তো তিনি নতুন পথে হাটতে চেয়েছেন। কিন্তু রাহুল জী-এ পথ যে বড়ই কঠিন, বড়ই গরম। এই পথে হাটাতো পরের কথা- পুরান জুতা পুরে ছাড়খাড় হয়ে যাবে। মোদি বিষয়টা বুঝতে পেরে আগেই নিজস্ব ঢঙের জুতা পরেন। পরেন পাঞ্জাবি, ধুতি। শুধু তাই নয়, রয়েছে তার নিজস্ব রংও- গেরুয়া।

নরেন্দ্র মোদি গেরুয়ার মর্তবা বুঝতে পেরেছেন। ভারতবর্ষ এখন ধর্ম ও বর্ণে বিশ্বাসী। শুধু ভারত কেন? এটাই বৈশ্বিক বাস্তবতা। নেহেরুর কথিত অসাম্প্রদায়িক ভারতবর্ষের রং তাই এখন গেরুয়া। ভারতবাসী জেনে গেছে যে খালি হাতের আশীর্বাদে চিড়া ভিজবে না। যজ্ঞ সাধনায় দেবতার চরণেও যে কিছু দিতে হয়। আর কিছু না হোক, একটা পদ্ম ফুল-তাই বা কম কিসে? ভারতমাতার প্রিয় রং তাই গেরুয়া, প্রিয় ফুল পদ্ম।

রাহুলকে বুঝতে হবে আসলে রাজনীতি শুধু কাজের না, কথারও। আর শুধু কথায় যে চিড়ে ভিজে না, সেটাওতো মনে রাখা চাই। রাহুল মোদির দুর্নীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বললেন, ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’। আসলে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, মোদি চৌকিদার হয়ে নিজেই চুরি করছেন, দেশের বারোটা বাজাচ্ছেন। কিন্তু মোদি রাজনীতি জানেন, জানেন কথার মারপ্যাঁচ। রাহুলের সে কথার জবাবে মোদি পাল্টা রাজনীতি করলেন। তিনি দেশের প্রায় ২৫ লাখ চৌকিদারের সঙ্গে এক ভিডিও কনফারেন্সের আয়োজন করলেন।

মোদি তাঁদের বলেন, ‘কিছু মানুষ নিজেদের স্বার্থে দেশের সব চৌকিদারকে চোর বলে গালি দিচ্ছে, অপমান করছে। দেশের সব চৌকিদারদের সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আমি আপনাদের কাছে বিচার দিলাম”। ব্যাস, ২৫ লাখ চৌকিদার-ভোটার হাতের কব্জির বদলে পদ্মফুল বনে গেলেন। এটাই হলো রাজনীতি। এটাকেই বলে ওস্তাদের মাইর শেষ রাতে।

এই যুদ্ধ শুধু কংগ্রেস বা বিজেপির ছিল না, ছিল না এনডিএ আর ইউপিএ’র মাঝে। এটা প্রকাশ্য যে, এ লড়াইটি ছিল এর বাইরেও রাহুল ও মোদির লড়াই। এ লড়াইয়ে দু’জনেই রামের দাবিদার। কিন্তু দিল্লি জয়ের রাজনীতিতে একে অপরকে রাবণ বলে গালি দিচ্ছেন। তা দিক। কিন্তু এর মাঝে ভারতবাসীকে মনে রাখতে হবে যে আসল ক্ষমতাটি যেন দুর্যোধনের হাতে না যায়। কারণ ব্রাহ্মণ পন্ডিতরা মনে করতেন, দুর্যোধনই কুরু বংশের ধ্বংসের কারণ।

কুরুক্ষেত্রে আপাত দৃষ্টিতে মোদি জয়ী। কিন্তু পরাজিত শুধু রাহুল একাই নন। এ লড়াইয়ে তিনি বোন প্রিয়ঙ্কা গান্ধীকে নিয়ে পরাজিত হয়েছেন। বলা হতো, প্রিয়ঙ্কা গান্ধী জনগণের সাথে সম্পৃক্ত নেত্রী। ভোটের মাঠে তার ব্যাপক চাহিদা। কিন্তু ভোটের মাঠে ভাই-বোন মিলেও ভোটের হাওয়া নিজেদের দিকে ফেরাতে পারেননি। সোনিয়া গান্ধীতো আগেই গিয়েছেন। তাহলে কংগ্রেসের শেষ ভরসা কোথায়?

আসলে ৭০-৮০ দশকের ভারত আর ২০১৯ সালের ভারত এক নয়। তবে কি ভারতীয় রাজনীতির নতুন মেরুকরণ হচ্ছে? একদলীয় রাজনৈতিক প্রভাব বলয় কি সেখানে আরও শক্তিশালী হচ্ছে? উদারপন্থী রাজনীতির জায়গায় কি স্থায়ীভাবে স্থান করে নিচ্ছে অন্য কিছু? এ প্রশ্নটি শুধু ভারতের জন্যই প্রাসঙ্গিক নয়। বিশ্বের অনেক দেশের জন্যই এটি আজ এক বড় প্রশ্ন। কাজেই এ পরাজয়কে রাহুলের একার পরাজয় হিসেবে দেখা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে মেনে নেওয়া যায়।

মোদি দিল্লি জয় করেছেন। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, রাবণ লঙ্কা জয় করে বিভীষণকে দিয়েছিলেন। এর পরের ইতিহাস আমাদের সবারই জানা। ভারতবর্ষে সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে না এটাই কাম্য। এ লড়াইয়ে ভারতবাসীর জয় হয়েছে। জনগণের জয়ই বড় জয়। ভারতীয় রাজনীতিতে এ নির্বাচনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা- ‘জনগণমন’। তারাই ভারতের ভাগ্যবিধাতা।

এরশাদুল আলম প্রিন্স: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম।

আপনার মতামত লিখুন :

‘সেই এরশাদ’, ‘এই এরশাদ’

‘সেই এরশাদ’, ‘এই এরশাদ’
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পুরনো ও সাম্প্রতিক ছবি

সাবেক রাষ্ট্রপতি, জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, যিনি এক সময়ের সেনাপ্রধান আর বর্তমানে 'প্রধান বিরোধী দলের নেতা', তার জীবন ও কর্মের মূল্যায়ন করা একই সঙ্গে সহজ এবং কঠিন।

সহজ এ কারণে যে, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতায় এরশাদের স্বৈরতান্ত্রিক অবস্থান স্পষ্ট। এরশাদের ক্ষমতা দখল ও দশ বছরের স্বৈরশাসনের 'সেই' সময় সবার কাছেই প্রতিভাত। এ ব্যাপারে বিতর্ক বা তাকে বৈধতা বা ন্যায্যতা দেওয়া অসম্ভব।

কিন্তু 'এই' সময়ের এরশাদ বিশ্লেষকদের কাছে সহজে ব্যাখ্যা করার ব্যক্তি নন। তার কারাভোগ, রাজনীতিতে লেগে থাকার আগ্রহ এবং ক্রমশ প্রকাশিত বিভিন্ন মানবিক গুণাবলীর কারণে এক অন্য মাত্রার এরশাদকে দেখতে পাওয়া যায়।

এরশাদের মৃত্যুতে সবচেয়ে বিপদে যারা

অবশ্য এ কথাও পরিষ্কারভাবে বলা দরকার যে, এরশাদের ভালো কিছু কাজ থাকলেও তার খারাপ কাজগুলো জায়েজ হয়ে যায় না। ব্যক্তিগতভাবে আমি তা মনে করি না এবং লিখিতভাবেই তা উল্লেখ করেছি।

তারপরও বিস্ময় জাগে। নানা প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। বিশেষত আমরা যারা রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যয়ন ও চর্চায় ব্যাপৃত আছি, তাদেরকে রাজনৈতিক প্রপঞ্চ ও ব্যক্তিত্বের গতিশীলতার ওপর লক্ষ্য রাখতে হয়। তরুণ মার্কস আর পরিণত মার্কসের মধ্যে পার্থক্য রেখা টানতে হয়। একদার কট্টর সাম্প্রদায়িক নেতার জাতীয়তাবাদী-মানবতাবাদীতে রূপান্তরের কার্যকারণ নিরূপণ করতে হয়। আবার বাম, প্রগতিশীল, কমিউনিস্ট নেতার মৌলবাদী স্খলনের ব্যাখ্যাও দাঁড় করাতে হয়।

এরশাদকে এমন তুলনায় আনা হলে আমরা কেমন চিত্র পাব? স্বৈরাচার হয়েও তার কঠোরতার পাশাপাশি মানবিক উন্নয়নমূলক কিছু পদক্ষেপও আড়ালে থাকে না। সমালোচনার পরেও ওষুধ নীতি, ভূমি সংস্কার, বিকেন্দ্রীকরণ, ধর্মীয় বিষয়ের গুরুত্ব তাকে অনেক মানুষের প্রিয়ভাজন করেছে।

যদিও এরশাদের রাজনীতির ৪০ বছরের পুরো সময়ই ব্যক্তিস্বার্থ ও ক্ষমতাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ আর বিএনপির অনৈক্যের সুযোগ নিয়ে তিনি দশ বছর ক্ষমতায় থাকতে পেরেছিলেন এবং এখনও বিএনপির রাজনৈতিক ভুলের সুযোগ নিয়ে সামনে চলে আসতে পেরেছেন। দ্বিদলীয় রাজনীতির প্রকৃত বিকাশ হলে তার রাজনৈতিক জীবন এতদূর প্রলম্বিত হয়ে আসতে পারতো কি-না, সন্দেহ।

একজন এরশাদ

যেভাবেই হোক তিনি ক্ষমতার দশ বছর পর আরও তিরিশ বছর রাজনীতিতে থেকেছেন। এ সময়কালে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সাথেই ছিলেন। ধর্মীয় অধিকারের পক্ষে ছিলেন। এবং সংসদীয় রাজনীতির কাঠামোর মধ্যেই থেকেছেন, যদিও সেই সংসদ ও নির্বাচন নিয়ে বিএনপির আপত্তি রয়েছে।

আপত্তি বা সমালোচনা যাই থাকুক, 'স্বৈরাচারী' এরশাদ গণতান্ত্রিক নির্বাচন, সংসদীয় ব্যবস্থা ইত্যাদিকে পাশ কাটিয়ে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করছেন, এমন দৃষ্টান্ত কেউ দেখাতে পারবে না। নিজের এবং দলের স্বার্থে তিনি রাজনীতি করেছেন, এমনটি সবাই করে। ফলে এ বিষয়ে সমালোচনার কিছু থাকতে পারে না। তিনি তার ও তার দলের স্বার্থে রাজনীতি করে মহাভারত অশুদ্ধ করেননি।

আর যে কাজটি তিনি সন্তর্পণে করেছেন, তা হলো মানব কল্যাণ ও মানবসেবা। বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম এবং অন্যান্য গণমাধ্যমেও খবরগুলো প্রকাশ পেয়েছে, যাতে দান, সাহায্য ছাড়াও সম্পত্তি বিলি-বণ্টনের কথা প্রকাশ পেয়েছে। এরশাদ ব্যক্তিস্বার্থ সামনে রেখে রাজনীতি করলেও ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড়ের স্তূপ করেননি। ক্ষমতালোভী স্বৈরাচারের মধ্যে তাকে দেখা যাচ্ছে বিরল ব্যতিক্রম স্বরূপ।

এরশাদ আমলে আমরা যখন কিছুটা লেখালেখি ও সাংবাদিকতা করেছি, তখন তার কাছের লোকদের বরাতে জেনেছি, তিনি পারতপক্ষে কাউকে না করতে বা ফিরিয়ে দিতে পারেন না। তার কাছ পর্যন্ত পৌঁছে গেলে কার্যোদ্ধার সম্ভব, এমন একটি ভাষ্যও তখন ঢাকায় প্রচলিত ছিল। এ সুযোগে বহুজন চাকরি-বাকরি, প্লট, প্রমোশন নিয়েছেন। অনেক নারীও এরশাদের এই নমনীয়তার সুযোগ নিয়েছেন।

এরশাদ: জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ পেরিয়ে

শাসক হিসেবে এসব পক্ষপাত অবশ্যই মানবীয় দুর্বলতা ও নৈব্যক্তিকতার অভাব হিসেবে বিবেচনার যোগ্য। রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক বিষয় ব্যক্তিগত তোষামোদির মাধ্যমে বিলি-বণ্টন করা ঘোরতর অন্যায় এবং সুশাসনের বিপরীত ও স্বৈরমানসিকতার পরিচায়ক।

কিন্তু এরশাদ যখন ক্ষমতায় নেই, তখন নিজের সম্পত্তি বিলিয়ে দিলে তাকে কেউ সমালোচনা করতে পারে না। তিনি যে দিতে জানেন, দিতে চান, তা আগে ও বর্তমানে তিনি প্রমাণ করেছেন। এই এরশাদকে মানুষ অস্বীকার করবে কেমন করে?

ব্যক্তিগতভাবে এরশাদের সঙ্গে ক্ষমতাকালে ও ক্ষমতার পরে একাধিকবার আমার সাক্ষাত হয়েছে। সেটা রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, বঙ্গভবন, ধানমণ্ডির কবিতা কেন্দ্র, কারও বাসা, অফিস বা কোনও বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানে হলেও আমি তার নিপাট ভদ্রতা, সৌজন্যবোধ ও সম্মানজনক আচরণের চাক্ষুষ সাক্ষী। পরে যখন তিনি জানলেন, ‘সাপ্তাহিক রোববার’ -এ তাকে স্বৈরাচার বলে আমি স্বনামে নিয়মিত লিখেছি, তখনও তার আচরণের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি।

বিশ্ব বেহায়া
এরশাদকে নিয়ে কামরুল হাসানের ব্যাঙ্গচিত্র/ সংগৃহীত

 

এরশাদকে স্বৈরাচার বলে আমরা আন্দোলন করেছি, তার বিরুদ্ধে লিখেছি, পটুয়া কামরুল হাসানের বিখ্যাত ব্যাঙ্গচিত্র 'বিশ্ব বেহায়া'র পোস্টার সেঁটেছি ক্যাম্পাসের দেওয়ালে দেওয়ালে। তার মৃত্যুর পর চট করে তার সম্পর্কে বিদ্যমান ধারণা ভেঙে যায় না।

শুধু মনের মধ্যে অলক্ষ্যে একটি প্রশ্ন উঁকি দেয়, 'সেই এরশাদ’ আর 'এই এরশাদ’ কি একজনই? ক্ষমতা দখলকারী এরশাদ আর রাজনীতি শেষে চিরবিদায় নিয়ে চিরদিনের মতো চলে যাওয়া এরশাদ কি একজনই? সহজেই এসব প্রশ্নের উত্তর মেলে না।

ব্যক্তি ও রাজনীতিক এরশাদের প্রকৃত তুলনামূলক মূল্যায়ন করতে পারবে ইতিহাস। ইতিহাসের সেই রায় জানার জন্য আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে মহাকালের দিকে।

ড. মাহফুজ পারভেজ: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম।

এরশাদ বললেন, তিনিতো অসুস্থ, সিএমএইচের বেডে শুয়ে আছেন

এরশাদ বললেন, তিনিতো অসুস্থ, সিএমএইচের বেডে শুয়ে আছেন
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, ছবি: সংগৃহীত

১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর মাসে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন। স্বাধীনতার পরবর্তী এক দশক বাংলাদেশের রাজনীতি অনেক উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে আমাদের রাজনীতিতে হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্রের রাজনীতির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। কিন্তু এ হত্যা, ক্যু আর ষড়যন্ত্র সেখানেই থেমে থাকেনি। রাষ্ট্রপতি জিয়াকেও একই ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে। বিরাজনীতিকরণ অথবা রাজনীতিতে অরাজনৈতিক শক্তির অনুপ্রবেশের সেই ধারাবাহিকতাতেই আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে এরশাদের উত্থান।

এরশাদ প্রায়ই বলতেন যে তিনি রক্তাক্ত পথে ক্ষমতায় আসেননি। এ নিয়ে তার এক ধরনের অহংবোধ ছিল। ইতিহাস পাঠে তার এ দাবিকে পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু পুরোপুরি স্বীকার করে নেওয়াও কঠিন। কারণ, জিয়া ও মঞ্জুর হত্যা কাণ্ডের পেছনের মূল কুশীলব অন্য কেউ ছিল কিনা, সেটি নির্ণয় না হওয়া পর্যন্ত এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।

তবে, আপাত দৃষ্টিতে মনে হয়, তিনি রক্তপাতহীন পথেই ক্ষমতায় এসেছেন। এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো, সব সামরিক শাসকরাই দাবি করেন যে তারা বাধ্য হয়েই রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েছেন। এরশাদও সে দাবি করেছেন। যদি ধরেও নিই যে তিনি রক্তাক্ত পথে ক্ষমতায় আসেননি, তারপরও তিনি যে জোর জবরদস্তির পথে ক্ষমতায় এসেছেন এ নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। যদি তিনি তার লেখা ‘আমার কর্ম আমার জীবন’ বইয়ের ভূমিকাংশে তার ক্ষমতা গ্রহণের বিষয়টি সচেতনভাবেই এড়িয়ে গিয়েছেন।

এরশাদ বললেন, তিনিতো অসুস্থ, সিএমএইচের বেডে শুয়ে আছেন
রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম (মাঝখানে), তৎকালীন উপ-সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ(বামে), ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু বিভিন্ন লেখকদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পরে তিনি নিছক বাধ্য হয়েই ক্ষমতায় আসেননি। বরং এ সুযোগটি তিনি কাজে লাগিয়েছেন এবং সে জন্য যা যা করার তা তিনি করেছেন। এ বর্ণনায় পাওয়া যায়, 'জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পরে তিনি তৎকালীন চিফ অফ জেনারেল স্টাফ জেনারেল নূরুদ্দিনকে বললেন, এখন করণীয় কী? সিজিএস একটু ভেবে উত্তর দিলেন সংবিধান অনুযায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট (আবদুস সাত্তার) এ সময় দেশের শাসনভার গ্রহণ করবেন। কিন্তু এমন জবাবের জন্য এরশাদ প্রস্তুত ছিলেন না। এরশাদ বললেন, কিন্তু তিনিতো অসুস্থ, সিএমএইচ বেডে শুয়ে আছেন। পরে তিনি তৎকালীন সংস্থাপন সচিব কেরামত আলীকে ডেকে পাঠালেন। তিনিও একই মতামত দিলেন। পরে এরশাদ কেরামত আলীকে নিয়ে সিএমএইচ-এ যান। সেদিন এম্বুলেন্সে করেই অসুস্থ সাত্তারকে বঙ্গভবনে নিয়ে আসেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট সাত্তারের দেশবাসীর উদ্দেশে একটি ভাষণ রেকর্ড করে পাঠিয়ে দেয়া হলো রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচারের জন্য'। এর পরের ঘটনাপ্রবাহ এরশাদই নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তিনি 'অপারেশন নিয়ন্ত্রণ কক্ষ'র মাধ্যমেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন।

১৯৮২ সালের ২৪ এপ্রিল এরশাদ রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে সরিয়ে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন। এর তিনদিন পরে তিনি বিচারপতি এএফএম আহসান উদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করেন এবং যথারীতি সংবিধান স্থগিত করেন। পরে ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তাকেও সরিয়ে দিয়ে তিনি নিজেই রাষ্ট্রপতি হন। এর আগে সেনাপ্রধান থাকাকালেই তিনি নিজের ক্ষমতাকে নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এর পরের ইতিহাস সবারই জানা। রাজনীতিতে অধিষ্ঠিত হতে থাকেন এরশাদ। হয়ে ওঠেন শাসক।

সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার/ছবি: সংগৃহীত
সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার, ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু ক্ষমতা চিরদিনের নয়। আজ আছে, কাল নেই। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ২৬টিরও বেশি মামলা হয়েছে। কিন্তু আফসোস, খুব কম মামলারই তদন্ত ও বিচার হয়েছে। এটি আমাদের রাজনৈতিক দেওলিয়াত্ব। ২৬ মামলার মধ্যে দুটি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন ও বাকি মামলায় খালাস পান এরশাদ। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই সরকারের আমলেই এ মামলাগুলো থেকে তিনি রেহাই পান। কিন্তু জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলা ও একটি দুর্নীতির মামলা আজও চলমান। এরশাদ চলে গেছেন, জানি এ মামলাগুলোও হারিয়েছে তার রাজনৈতিক গুরুত্ব।

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিএনপির প্রথম মেয়াদে এরশাদ পুরো সময়টিই কারাগারে কাটিয়েছেন। যে মামলার জন্য তিনি কারাগারে ছিলেন সে মামলার কোনো অগ্রগতি হয়নি। ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ সালেও মামলার তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। এভাবেই সবকিছু অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। হয়তো একদিন এরশাদও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবেন। ইতিহাস কাউকে মনে রাখে না। যে ইতিহাস নির্মাণ করে ইতিহাস শুধু তাকেই মনে রাখে। এরশাদ ইতিহাস নির্মাণ করেছেন কিনা সে প্রশ্নও ইতিহাসের কাছেই থাক।

আমরা আম মানুষ শুধু জানি, সবাইকেই যেতে হয় আজ অথবা কাল। সেদিন এই সিএমএইচ বেডে শুয়ে ছিলেন অসুস্থ আবদুস সাত্তার। তার কাছে ক্ষমতা ছিল না, ক্ষমতা ছিল এরশাদের। ক্ষমতার পালাবদলে সেই সিএমএইচ-এই এরশাদকে যেতে হয়েছে কতবার- কারণে অকারণে। শেষবারের মতো সেখান থেকেই তার মহাযাত্রা। সে যাত্রায় তিনি শুধুই একা। যেমন গিয়েছে সবাই। পেছনে পড়ে থাকে শুধু ইতিহাস।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র