Alexa

‘আর করব না ধান চাষ, দেখব তোরা কী খাস?’

‘আর করব না ধান চাষ, দেখব তোরা কী খাস?’

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান, ছবি: বার্তা২৪

একজন শ্রমিকের একদিনের মজুরি দুই মণ ধান! আবার টাকা দিলেও মিলছে না ধান কাটার জন্য উপযুক্ত শ্রমিক। টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার পাইকড়া ইউনিয়নের বানকিনা গ্রামের আব্দুল মালেক সিকদার কিছুদিন আগে ধানের মূল্য কম ও দিনমজুর না পেয়ে নিজের ৫৬ শতাংশ ধানের ক্ষেতে আগুন ধরিয়ে দেন। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেছেন, ধান পোড়ানোর ঘটনা পরিকল্পিত। তার মত একজন দীর্ঘদিনের ধান ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদের মুখে একথা শুনতে কৃষক, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষেরই খারাপ লেগেছে।

যেখানে বীজ কেনা থেকে শুরু করে ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত একজন কৃষককে গুনতে হয় ৭০০-৮০০ টাকা, সেখানে ধানের মূল্য মণ প্রতি ৫০০-৬০০ টাকা (বিবিসি, ১৪ মে ২০১৯) হওয়ায় কৃষকের মাথায় হাত। ঘূর্নিঝড় ফণী কৃষকদের তেমন কোনো ক্ষতি না করলেও ধানের এমন অপ্রত্যাশিত নিম্নগামী মূল্য ঝড়ের চেয়ে কম ক্ষতি করেনি। খাদ্যমন্ত্রীর উচিৎ, এর পেছনে কারো কোনো কারসাজি আছে কি-না, তা খুঁজে বের করে কৃষকের ধানের নায্য মূল্য নির্ধারণ করা।

একটি কৃষি প্রধান দেশে কৃষক হচ্ছেন অর্থনীতির মূল নিয়ামক শক্তি। কৃষক বাঁচলে দেশের অর্থনীতি বাঁচবে। সরকারের উচিৎ ভর্তুকি দিয়ে হলেও কৃষকের মুখের হাসি ধরে রাখা। আপাদমস্তক পরিশ্রমী এই খেটে খাওয়া মানুষগুলো শ্রমের সাথে বঞ্চনা করেন না, খুব বেশি লাভের প্রত্যাশা করেন না। তাই, কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে কৃষকের মুখের হাসির মূল্য দিতে হবে।

এখানে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা যেতে পারে। যেমন: (১) প্রতিবছর সরকার ধানের বাজার মূল্য নির্ধারণ করতে দেরি করে; (২) যে কারণে সেই সুযোগটি গ্রহণ করে বাজারের ফড়িয়া, আড়তদাররা ইচ্ছামত ধানের দাম নির্ধারণ করে; (৩) প্রতিবছর সরকার যে পরিমাণ ধান ক্রয় করে, তা খুবই সীমিত; (৪) সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ধান ক্রয় না করে চাতাল মালিক, ফড়িয়া, আড়তদার, মৌসুমি ধান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ক্রয় করে। যে কারণে ধানের বাজার ঐ সব ব্যবসায়ীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে; (৫) বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে, এমন পরিমাণে সরকার ধান ক্রয় করে না; (৬) সরকারের ক্রয়সীমার তুলনায় বহুগুণে চাতাল মালিক, ফড়িয়া, আড়তদার, মৌসুমি ধান ব্যবসায়ীরা (বছরে ৩ কোটি টন) ধান-চাল ক্রয় করে বলে এই বাজারের সাথে সরকার তাল মেলাতে অনেকটা ব্যর্থ; (৭) এই সুযোগে চাতাল মালিক, ফড়িয়া, আড়তদার, মৌসুমি ধান ব্যবসায়ীরা কৃষকের সাথে কারসাজি করার সুযোগ পায়; (৮) যে কারণে ভরা মৌসুমের সময় ধানের মূল্য কমিয়ে দিলে এবং অন্য সময় চালের মূল্য বাড়িয়ে দিলে সরকার ও কৃষককে অসহায়ত্ব বরণ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না; (৯) পরবর্তিতে যে কৃষকের কাছ থেকে কম মূল্যে ধান ক্রয় করে, তাদের কাছেই পরে বেশি মূল্যে চাল বিক্রয় করে; (১০) সরকারের ক্রয়সীমা ও মজুদসীমার কারণেই অন্য পক্ষ কৃষককে ঠকানোর যাবতীয় সুযোগ গ্রহণ করে; (১১) আউশ ও আমনের ফলন অনেক ভালো হওয়ার পাশাপাশি বোরো ধানের বাম্পার ফলন (এক কোটি ৯০ লাখ টনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে -বিবিসি ১৪ মে ২০১৯।) হওয়ায় কৃষককে ঠকানোর যাবতীয় উপায় খুঁজে পেয়েছে এক শ্রেণির অসাধু বাজার নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবসায়ী; (১২) ধারণক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সরকার এ বছর ১২ লাখ টন চাল ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অথচ দেশে চালের বাজারে বাৎসরিক চাহিদা রয়েছে সাড়ে তিন কোটি টন। কাজেই এই বাজারে ধান-চালের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব না। যে কারণে কৃষক প্রত্যক্ষভাবে উপযুক্ত মূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়; (১৩) ধান-চালের বাজারে সরকারের সন্তোষজনক নজরদারি আছে বলে মনে হয় না; (১৪) চাতালের স্থানে অটো রাইস মিলের উত্থান; (১৫) কৃষকের ফলন ধরে রাখার নিজেদের ব্যবস্থা নেই। ফলে ক্ষুদ্র এবং মাঝারি কৃষককে ধান কেটেই বিক্রি করতে হয় বলে তারা ধানের মূল্য তুলনামূলক কম পান (বিবিসি ১৪ মে ২০১৯)।

দেশের ব্যাংকিং খাত ও শেয়ার বাজার নিয়ে চিন্তার শেষ নেই। ঋণ খেলাপিরা অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ক্রমাগত সুবিধা আদায় করে নিচ্ছেন। অন্যদিকে, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প দেশের ঋণের টাকার অপব্যবহার ও দুর্নীতি কাকে বলে তা জনগণকে দেখিয়ে দিয়েছে। সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতে হবে সরকারকে। ধানের এমন দুর্মূল্যের বাজারে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত হবে দেশের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া। বরং চাল রপ্তানি করে কীভাবে কৃষককে ধানের নায্য মূল্য প্রদানের ব্যবস্থা করা যায়, সেটি ভাবতে হবে। ধানের মূল্য বাজারে কম, অথচ চালের মূল্য পরিবর্তনে তেমন কোনো গতি নেই। কাজেই সরকারকে প্রকৃত অবস্থা বুঝতে হবে।

কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক সরকারের তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার কথা বলেছেন। এই দুই পরিকল্পনার পাশাপাশি মৌসুম শুরুর সাথে সাথে ফসল ও বাজার মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী ‘কৃষক ও ভোক্তাবান্ধব নীতি’ নির্ধারণ করতে হবে। ভালো ফলনের সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হয়, এ অবস্থা থেকে বের হওয়ার উপায় খুঁজতে হবে।

সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে সরকারকে কৃষকের মনের কথা শুনতে হবে। তাহলে সমস্যা পুঞ্জিভূত হওয়ার আগেই সমাধান হতে পারে। প্রতি বিঘা জমিতে হাজার হাজার টাকা লোকসান গুনে পরবর্তিতে কৃষক আর ধান চাষে আগ্রহী হবেন না। তার কাছে লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার অন্য কোনো উপায় বা খাত নেই। প্রয়োজনে সরকার ভর্তুকি বাড়িয়ে কৃষকের এই দুর্দিনে মাথার উপর আকাশসম ছায়া হয়ে দাঁড়াবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। অন্যথায় বর্তমানে উচ্চারিত স্লোগান “আর করব না ধান চাষ, দেখব তোরা কী খাস” ভবিষ্যতে বাস্তবায়ন হলে দেশ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ভেবেছেন কি?

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: পি.এইচ.ডি. গবেষক, ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন এবং শিক্ষক ও সাবেক চেয়ারম্যান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ।

আপনার মতামত লিখুন :