Barta24

শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

এ কেমন কৌশল

এ কেমন কৌশল
ফরিদুল আলম, ছবি: বার্তা২৪
ফরিদুল আলম


  • Font increase
  • Font Decrease

অনেক জল ঘোলা করে অবশেষে বিএনপি থেকে নির্বাচিত পাঁচজন শপথ গ্রহণ করে সংসদ অধিবেশনে যোগ দিলেন। অধিবেশনে যোগ দিয়েই বিএনপি সাংসদ হারুনুর রশীদ তার প্রথম বক্তব্যে, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিনে মুক্তির ব্যাপারে সরকারের আইন কর্মকর্তারা যেন বাধা না দেন, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তার বক্তব্য থেকে এমনটা মনে হতে পারে যে, বেগম জিয়ার দ্রুত মুক্তির তাগিদ থেকেই দলের নির্বাচিতরা কৌশলগত কারণে সংসদে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতি বলে ভিন্ন কথা। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি এটাও বলে ফেললেন যে, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে দলকে রাজি করিয়ে তাদের সংসদে আসতে হয়েছে।

বিএনপি যে সংসদে যোগ দেবে না, এই বিষয়টি দলের চারজন সাংসদ গত ২৯ এপ্রিল শপথ গ্রহণের আগের দিনও দৃঢ়তার সাথে ব্যক্ত করা হয় এবং দলের নির্বাচিতদের সংসদে অধিবেশনে যোগদান থেকে বিরত রাখতে ইতোপূর্বে গত ২৫ এপ্রিল শপথ নেওয়া জাহিদুর রহমানকে দল থেকে বহিষ্কার কর হয়। বাকিরা যেন শপথ না নেন সেজন্য দলের প্ক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হতে থাকে। অবস্থা বেগতিক দেখে দলের নেতা রুহুল কবির রিজভী আগাম জানিয়ে দেন যে সরকারের পক্ষ থেকে নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে নির্বাচিতদের শপথ নেওয়ার ব্যাপারে। এটাও জানা যায় যে, লন্ডন প্রবাসী দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাদের প্রত্যেকের সাথে আলাদাভাবে কথা বলে তাদের নিবৃত রাখার চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হলেন, তখন তাদের সংসদে যোগদানের বিষয়ে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়। যেদিন তারা শপথ নিলেন সেদিন রাতে মহাসচিব মির্জা ফখরুল আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দেন যে, কৌশলগত কারণে তাদের দলের নির্বাচিতদের শপথ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

তিনি নিজে কেন শপথ নিলেন না, এই প্রশ্নের জবাবে পরদিন সাংবাদিকদের মির্জা ফখরুল জানান, এটাও একটা কৌশল। তবে কী ধরণের কৌশল, সেটা তিনি ব্যাখ্যা করলেন না। তিনি ব্যাখ্যা না করলেও রাজনীতি সচেতন মানুষের বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হবার কথ নয় যে, তাদের কৌশলের ধরনটা আসলে কী। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলকে বর্জন করে বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে যখন সংসদে না যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়, বিপত্তির শুরু আসলে তখন থেকেই। বিভিন্ন মাধ্যমে একথা চাউর হতে থাকে যে, নির্বাচিতরা অনেক কষ্টে নির্বাচিত হয়েছেন সংসদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন অথচ দলের এই সিদ্ধান্ত তাদের ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়ার সাথে সাংঘার্ষিক, বিধায় এই সিদ্ধান্ত নাও টিকতে পারে।

এর আগে যখন ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক গণফোরাম থেকে নির্বাচিত দু’জন সাংসদ মোকাব্বির খান এবং সুলতান মোহাম্মদ মনসুর যথাক্রমে ২ মার্চ এবং ২ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করেন, তখন তারা দলের অনুমতি নিয়ে শপথ নিয়েছেন জানালেও পরবর্তিতে গণফোরামের পক্ষ থেকে তা অস্বীকার করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানানো হয়। অথচ সর্বশেষ সপ্তাহখানেক আগেও তাদের কাউন্সিলে দলের সাংসদ মোকাব্বির খানকে ড. কামাল হোসেনের পাশে বসতে দেখে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি হয়। গণফোরামের সাংসদরা যে শপথ নেবেন, তা নির্বাচনের পরপরই দলের সাংসদদের প্রতিক্রিয়ায় বোঝা গিয়েছিল। দলের পক্ষ থেকে এটাও জানানো হয়েছিল যে, এ বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পরে এতে বাধ সাধে বিএনপি। আমরা একটু লক্ষ্য করলে দেখতে পাব যে, সেসময় সংসদে না যাওয়ার দাবিতে অনড় বিএনপির চাপেই গণফোরাম নেতা ঐক্যফ্রন্টে তার নেতৃত্ব বহাল রাখতে তারা কেউই সংসদে যাচ্ছেন না বলে ঘোষণা দেন।

ইতোপূর্বে বিএনপি’র শীর্ষস্থানীয় নেতারা সকলেই বলে আসছিলেন যে, কোনও অবস্থাতেই তারা সংসদে যোগ দেবেন না। তাদের সকলের বক্তব্যে এবং দলের নির্বাচিতদের অবস্থানের সার্বিক বিশ্লেষণে যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে- দলের নেতৃত্ব চরমভাবে ভেঙে পড়েছে এবং সর্বত্রই এক ধরনের সমন্বয়হীনতা বিরাজ করছে। দল আসলে কে চালাচ্ছেন, কোথা থেকে পরিচালিত হচ্ছে, এটা আসলে কেউই জানেন না। কিছুদিন আগ পর্যন্ত সকলেই জানত, লন্ডন থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় দল পরিচালিত হচ্ছে। মির্জা ফখরুল এটা সংশোধন করে জানিয়ে দেন, যৌথ নেতৃত্বে দল পরিচালিত হচ্ছে। এই যৌথ নেতৃত্ব বলতে বোঝায় দলের স্থায়ী কমিটি। অথচ স্থায়ী কমিটি দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে শপথ নেওয়ায় জাহিদুর রহমানকে বহিষ্কারের দুই দিনের মধ্যে অপর চারজন সংসদে যোগ দিয়েই জানান যে, তারা তারেক রহমানের নির্দেশে শপথ নিয়েছেন; যা পরবর্তীতে মির্জা ফখরুল নিজেও সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন।

এখন মির্জা ফখরুল যে কৌশলের অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্তের কথা জানালেন, দলের স্থায়ী কমিটির নেতারা যদি সেই কৌশলের অংশ না হন, তাহলে দল কীভাবে পরিচালিত হবে, তা পরিষ্কার নয়। এটা এখন জলের মত পরিষ্কার যে, দলের সাংসদদের শপথ নেওয়ার বিষয়ে স্থায়ী কমিটিতে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এমনকি স্থায়ী কমিটির অনেক সদস্যও এ বিষয়ে জানতেন না। সেই সাথে মির্জা ফখরুল নিজে শপথ না নিয়ে কি এটা প্রমাণ করলেন না যে- তিনি স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য হয়ে অপরাপর সদস্যদের মত সংসদে না যাওয়ার বিষয়ে একমত এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তকে তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন?

মির্জা ফখরুল শপথ না নেওয়াতে স্বাভাবিকভাবেই সংসদের প্রথম কার্যদিবস থেকে ৯০ দিন অতিক্রান্ত হওয়ায় তার আসন শূন্য ঘোষিত হয়ে গেল। এই আসনটি পেতে ইতোমধ্যে সরকারি দলের একাধিক নেতা মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তিনি (মির্জা ফখরুল) নিজে শপথ বর্জন করার অর্থ হচ্ছে তিনি উপ-নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন না। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি’র ভেতর আবারও নির্বাচন বর্জনের সংস্কৃতি চালু হওয়াতে আসন্ন উপ-নির্বাচনে কোনো প্রার্থী মনোনয়ন দেবে না, এটা ধরেই নেওয়া যায়। সুতরাং বিগত একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে বর্জন করে এবং এই সরকারের অধীনে পরবর্তী যেকোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণার পর তাদের দলের সাংসদদের শপথ নেওয়া এবং এটিকে কৌশল হিসেবে (অব্যাখ্যাত) চালিয়ে দেওয়া আসলে দলের বর্তমান রুগ্ন দশাকে চেপে রাখার কৌশল ভিন্ন আর কিছু না।

কিছুটা ব্যাখ্যা অবশ্য দিয়েছেন মির্জা ফখরুল। তার নিজের শপথ না নেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছেন, দলের মহাসচিব হিসেবে দলকে সংগঠিত করতে এবং দলের চেয়ারপারসনকে মুক্ত করতে তাকে বাইরে থেকে কাজ করতে হবে বিধায় তিনি সংসদে যাননি এবং যারা গিয়েছেন তারা সংসদে থেকে দলের পক্ষে কাজ করবেন। তিনি এটিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, “গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে সীমিত সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্যই বিএনপি সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”

আবার ফিরে আসি তাদের কৌশলের বিষয়ে। যে কৌশলটি তিনি মুখে ব্যাখ্যা না করলেও এখন সকলের মুখে মুখে তা হচ্ছে বিএনপি না চাইলেও তাদের নির্বাচিতদের সংসদে যাওয়া ঠেকানো যেতো না বলেই বাধ্য হয়ে তারেক রহমান এই সিদ্ধান্ত দিলেন। এখানে এই সিদ্ধান্তের ফলে শেষ সময়ে শপথ নেওয়া চারজন দলের সমর্থন পেলেও প্রথম শপথ নেওয়া জাহিদুর রহমান যেহেতু দলের সিদ্ধান্ত ভঙ্গ করেছেন, তাই তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তটি বহাল রয়েছে। আবার মির্জা ফখরুল দলের সিদ্ধান্ত (যদিও তারেক রহমানের একক সিদ্ধান্ত) অনুযায়ী শপথ না নিলেও সেটিকেও দল মেনে নিয়েছে। এক্ষেত্রে তারা যত কৌশল অবলম্বনের কথাই জানান দিক না কেন, এটা বরং আরও স্পষ্ট হল যে, দলের ভেতর চরম নেতৃত্ব সংকট বিরাট করছে।

আসলে বিএনপির এই সংসদে যোগদানটি আরও সম্মানজনক হতে পারত যদি তাদের নেতৃত্বের মধ্যে সামান্যতম দূরদর্শিতা থাকত। তাদের এটা আগেই বোঝা উচিৎ ছিল যে, সংসদে না যাওয়ার ব্যাপারে দলীয় সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সাংসদরা মানবেন না। এটা আগে বুঝলে তারা দলগতভাবে সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সংসদে গিয়ে তাদের সমর্থকদের মধ্যে দলের প্রতি আস্থাহীনতার সংকটকে অনেকটা দূর করতে পারতেন। সেই সাথে এই ইস্যুটিকে নিয়ে পরবর্তী সব নির্বাচন (সাম্প্রতিক উপজেলা পরিষদ নির্বাচনসহ) বর্জন না করে এগুলোতে অংশ নিয়ে তারা রাজপথে থেকে তাদের কৌশলকে আরও শাণিত করতে পারত। সর্বশেষ শপথ নিয়ে যা হলো, এর মাধ্যমে তারা তাদের দেউলিয়াত্বকেই আরও বেশি করে সবার সামনে উন্মোচন করে দিল।

ফরিদুল আলম: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মতামত লিখুন :

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের একটি মন্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন 'সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না'। এ কথাটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকতাদের দুর্নীতি আজ নতুন নয়। তবে সব কর্মকর্তাও এক নয়। সংখ্যায় সীমিত হলেও  অনেক অফিসার আছেন যারা সততার সাথে অনেক কষ্টে  জীবনযাপন করেন। তাই সকলকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুদক নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অনেক আগে, তবে কিছু দিন পূর্বে ছোটখাটো দুর্নীতি ধরতে সোচ্চার দেখে আমরা কিছুটা হলেও খুশি হয়েছি। এ জন্য যে এবার অন্তত দুদক চেয়ারম্যান নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হয় কিনা বা সকল শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসছেন কিনা তা যাচাই করতে। 

আমরা মনে করেছি, তিনি একবার যেহেতু ঘর থেকে বেরিয়েছেন, বাংলাদেশের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে, বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছেন, সরকারি কর্মকতা, রাজনীতিবিদের দুর্নীতি থামানো অসম্ভব। তার কাছে তো অনেক উদাহরণ আছে।

যাক সেসব কথা। এবার আলোচনা করা যাক, তিনি কেন বলেছেন যে সরকারি কর্মকরা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না। তিনি কি আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেয়েছেন?  নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

কারণ ব্যাখ্যার আগে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে দুই-চার কথা না বললেই নয়। ওনারা সরকারিভাবে সে বৃটিশ আমল থেকে সুরক্ষিত। ওনারা সমাজের উপরে থাকেন। ওনাদের পল্লীর নাম ভদ্রপল্লী। ওনাদের সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগ। সব কিছুই ওনারা নির্মাণ ও পরিচালনা করেন। সকল সুযোগ-সুবিধা ওনাদের জন্য। এ কারণে ওনাদের আচরণে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ জন্য তাদের সঙ্গে জনগণের একটা দুরত্ব কাজ করে। ফলে তাদের সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্যের পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, তা জানার আগেই পত্র-পত্রিকা,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। আসলে দুদক চেয়ারম্যান কী বোঝাতে চেয়েছেন বা জনগণ কী বুঝেছে তা পরিষ্কার নয়।

আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, এখানে দুদক চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে বুঝাননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের অনিচ্ছায় বা ভালো  উদ্দেশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে কারো ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য ঐ কর্মকতাকে দুর্নীতি পরায়ণ বলা যাবে না। এটাকে দুদক চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাস' বলেছেন। যদি ঐ কর্মকর্তা  ইচ্ছাকৃত ভুল করেন বা টাকার বিনিময়ে করেন বা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেন, তা সরল বিশ্বাস নয়। এখানে অসততা আছে। এটাই দুর্নীতি।

আমার  হয়তো বুঝতে ভুল হতে পারে আর যদি হয়ও তা কিন্তু সরল বিশ্বাসে। আমি এ বিষয়টি এ জন্যই উপস্থাপন করলাম, কারণ দুদক চেয়ারম্যানের কথার অর্থ যদি সরকারি কর্মকর্তারা ভুল বোঝেন, তাহলে তো সর্বনাশ! তারা তো সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা শুরু করবেন। অবস্থা তখন হবে, ‘একদিকে নাচুনি বুড়ি অন্য দিকে ঢোলের বাড়ি’-র মতো। আমার এ লেখা শুধু ওইসব দুর্নীতি পরায়ণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য।

অতএব, দয়া করে সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন: সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি অপরাধ নয়: দুদক চেয়ারম্যান

জিএম কাদের কি পারবেন?

জিএম কাদের কি পারবেন?
এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান থেকে দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেলেন এরশাদের ছোট ভাই জিএম কাদের। দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা জিএম কাদেরের উপস্থিতিতেই বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) এ ঘোষণা দেন। এখন অপেক্ষা, জাপা জিএম কাদেরের নেতৃত্বকে কতটা সহজভাবে মেনে নেয়, সেটি দেখার।

জিএম কাদের প্রাথমিক ধাক্কাটি সামলাতে পারলে সেটা তার নিজের ও দলের পক্ষে একটি ইতিবাচক ফল বয়ে নিয়ে আসবে বলেই মনে হয়। তবে জিএম কাদের আপাতত সফল হোন বা না হোন, জাপার জন্য আগামী দিনের রাজনীতিতে একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বহাল থাকার লড়াইটা খুব সহজ হবে না। নিশ্চিতভাবেই দলের ভেতর ও বাইরে থেকে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব আসবেই। তবে, সামগ্রীকভাবে দেশের রাজনীতির চালচিত্র কেমন যাবে, তার ওপর এটি অনেকটাই নির্ভর করে।

জাপায় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময়েই দলের নেতাদের মধ্যে ক্ষমতার টানাপোড়েন দেখা গেছে। এমন টানাপোড়েন শুধু জাপায় নয়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতেও ছিল, এখনও আছে। যেকোনো বড় দলেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ‘পন্থী’রা শক্তিশালী থাকে। শক্তিহীনরা হয় টিকে থাকার চেষ্টা করেন, ধৈর্য ধরেন, না হয় এক সময় ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে ধীরে ধীরে ঝড়ে পড়েন। আওয়ামী লীগের অনেক বড় বড় নেতা আজ দলে নেই। অনেকে ফিরে আসার চেষ্টা করেছেন। কেউ পেরেছেন, কেউ পারেননি। বের হয়ে নতুন দল বা জোটে যোগ দিয়েছেন। বিএনপিতেও এমন নজিরের অভাব নেই। বড় দলে নেতৃত্ব ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে দলের ঐক্য ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। এতে দল ও নেতা উভয়ই লাভবান হয়। তা না হলে দলতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ই, দলের নেতারাও একসময় হারিয়ে যান। ১/১১ এর বিরাজনীতিকরণের রাজনীতিতে অনেকেই তথাকথিত সংস্কারপন্থী হয়েছেন। এতে না দলের, না নিজের লাভ হয়েছে। দুঃসময়ে লড়াইটা চালিয়ে যাওয়াই রাজনীতিকের আসল পরীক্ষা। সুসময়ে সবাই মিছিলের সামনেই থাকে।

স্বাধীনতার পরে দেশের বড় তিনটি দলের ভাঙা-গড়াই আমরা দেখেছি। এর মধ্যে বিএনপি, ও জাপার জন্মই স্বাধীনতার পরে। তবে স্বাধীনতার পরে দলের ভাঙা-গড়ার সবচেয়ে বড় নজির জাসদের। এক সময় দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের একটি শ্রেণী বিশেষ করে ছাত্র সমাজের একটি অংশের কাছে কয়েকটি শব্দ খুব পরিচিত ছিল-পুঁজিবাদ, বিপ্লব, সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, সর্বহারা, বিচ্যুতি, বুর্জোয়া, পেটি বুর্জোয়া, হঠকারিতা, বস্তুবাদ, লুটেরা, দ্বন্দ্ব, ধনিক-শ্রেণি, কায়েমী-স্বার্থবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলেতো কথাই নেই। মুখে মুখে এসব বুলি। বিশেষ করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এ শব্দগুলো জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই দেশের মেধাবী ছাত্রদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বামপন্থী হয়ে যায়। এরা রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদের ছাতার নীচে আশ্রয় নেয়। এদের মধ্যে আবার মস্কো, পিকিং আরো নানা পন্থী ছিল। জাসদ শুরুর সে ইতিহাসও অর্ন্তদ্বন্দ্বেরই ইতিহাস, ছাত্রলীগের মধ্যে মেরুকরণের ইতিহাস। এরই মধ্যে নতুন আরেকটি শব্দ চালু হলো রাজনীতিতে। সেটি হলো বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। এই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্বপ্নেই ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ জাসদ গঠন করে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর নানা ঘটনার পরম্পরায় জাসদ উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যায়। এরপর জিয়া ও এরশাদ আমলে জাসদের ভাঙ্গনের খতিয়ান আরও দীর্ঘ। মেজর জলীল, কাজী আরেফ আহমদ, মনিরুল ইসলাম, শরীফ নূরুল আম্বিয়া, ইনু, রব হয়ে জাসদ এখন বর্তমান সুরতে বহাল আছে। বর্তমানে এক দল এক নেতার দল জাসদ। এর মাঝে আছে একাধিক পন্থী। দলের মাঝে ঐক্য ধরে রাখার জন্য জাসদ নেতারা কম চেষ্টা করেননি। কিন্তু পারেননি। কারণ তারা নিজেরাই স্বার্থের দ্বন্দ্বে মরিয়া ছিলেন।

ছোট দলের জন্য দলের ঐক্য ধরে রাখা সব সময়ই কঠিন। সেটা জাসদ হোক বা জাপা। কারণ, রাজনীতিতে ঐক্যের মূল শক্তি ক্ষমতা অথবা আদর্শ। কিন্তু আমাদের এখানে আদর্শের ভীত বড় নড়বড়ে। আর নিজ শক্তিবলে এসব দলের ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপটও রচনা হয়নি। ফলে, দলের নেতারা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য ক্ষমতায় দৌড়ে অধিকতর কাছাকাকাছি থাকা দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য করেছেন। এখানেই ছোট দলের ভাঙনের মূল কারণ নিহিত। এছাড়া অপরের নেতৃত্ব মেনে না নেয়ার সহজাত প্রবণতা মানুষের থাকেই। সেই সাথে আরেকটি বিষয় হলো এসব দলের বড় নেতা ও পরবর্তী ধাপের নেতাদের পলিটিক্যাল ক্যারিয়ারের মাঝে দৃশ্যমান তেমন বড় কোনো পার্থক্য নেই। ফলের ঐক্যের মূল ভিত্তি খুবই দূর্বল থাকে। রাজনৈতিক আদর্শ বাদ দিলেও, আওয়ামীর লীগের ঐক্যের ভিত্তি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার একথা অস্বীকার করা যাবে না। এখানে ঐক্যের একটি ‘পারিবারিক’ ভিত্তিও আছে।

জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের
জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের

 

বিএনপির ক্ষেত্রেও নেতাদের ঐক্যের মূল ভিত্তি কখনো ক্ষমতায়া যাওয়ার আশা, সেই সাথে জিয়া পরিবার। এর বাইরে একটি রাজনৈতিক আদর্শতো কাজ করেই। এটি শুধু আওয়ামী লীগ, বিএনপির ক্ষেত্রে নয়, নয় শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। ভারতের কংগ্রেসের বর্তমান হাল হকিকত দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। রাহুল গান্ধী পদত্যাগ করেছেন দুই সপ্তাহ, কিন্তু দল এখনও নতুন নেতা নির্ধারণ করতে পারেনি। ব্যক্তি ও পারিবারিক গণ্ডির বাইরে গিয়ে দলে পরবর্তী নেতৃত্বের পথ রচনা করার কাজটি এখনও শুরু হয়নি।

জাতীয় পার্টিতে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে যারা বের হয়ে গেছেন তারা নিজেরাই নেতা হয়ে একনেতা নির্ভর দল গঠন করেছেন। জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) (জেপি) ইত্যাদি নানা উপদলে ভাগ হয়েছে। আসলে এসব বিভক্তি ও ভাঙনের পেছনে কোনো আদর্শ কাজ করেনি। কাজ করেছে ক্ষমতা ও নগদ প্রাপ্তি।

গত এক দশকে জাপা বহুবার ভাঙনের মুখে পড়েছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে জাপায় কোন্দল চরমে পৌঁছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে বিরাজ করে তীব্র ক্ষোভ ও দ্বন্দ্ব। একপক্ষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছে আরেক পক্ষ চায়নি। এ নিয়ে তুলকালাম কাণ্ডও হয়ে গেছে বহুবার। এর পেছনে শুধু দলের অর্ন্তকোন্দলই ছিল নাকি এর পেছনে আরও কারণ ছিল তা নিয়ে কথা হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের ভেতরের দ্বন্দ্ব বাইরে আসেনি, মানে দলে ভাঙন হয়নি।

তারপরও দলে আপাতত দুইটি গ্রুপ আছে। রওশন ও জিএম কাদেরপন্থী এ দু’টো গ্রুপ দলে বহুদিন ধরেই দৃশ্যমান। এনিয়ে এরশাদ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নির্দেশনা ও আদেশ জারি করেছেন। পরে আবার সেই আদেশ প্রত্যাখ্যানও করেছেন, করতে বাধ্য হয়েছেন।

গত নির্বাচনের আগে থেকেই এরশাদ অসুস্থ। বিদেশে চিকিৎসার জন্য গিয়েছেন। দলের ঐক্য বজায় রাখতে বা তার অবর্তমানে দল টিকিয়ে রাখতে কে হবেন জাপার পরবর্তী কর্ণধার, তা নিয়েও তার শঙ্কা ছিল। দলের একটি পক্ষ চেয়েছে রওশনকে সামনে নিয়ে আসতে, আরেক পক্ষ চেয়েছে জিএম কাদেরকে। এছাড়া আগে পরে অন্য পক্ষও সক্রিয় ছিল। তবে সর্বশেষ এই দুটি গ্রপই দৃশ্যমান ছিল। এরশাদ জানতেন হয়তো এ বিরোধ সহজে মিটবে না। তাই তিনি নিজের সম্পত্তি ওসিয়ত করে যাওয়ার পাশাপাশি দলের নেতৃত্বের বিষয়টিও ওসিয়তও করে গেছেন। এরশাদ জাপার গঠনতন্ত্রের ক্ষমতাবলে তার অবর্তমানে বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিদেশে থাকাকালে ছোট ভাই দলের কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।

এর আগে তিনি কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান করেছেন আবার সে আদেশ বাতিলও করেছেন। গত ১৪ জুন তার মৃত্যুর পাঁচদিনের মাথায় তার সেই ওসিয়তই পুরণ হলো। কারণ এরশাদ আজ অবর্তমান। তার অবর্তমানে আপাতত জিএম কাদের বর্তমান। দেখা যাক, এই বর্তমানকে জিএম কাদের ভবিষ্যতের কাছে নিয়ে যেতে পারেন কি-না। এই দিনকে তিনি সেই দিনের কাছে তিনি নিয়ে যেতে পারেন কিনা এটাই তার জন্য বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় তিনি পাস করলে ফেল করার হাত থেকে হয়তো বেঁচে যেতে পারে জাপা।

এরশাদুল আলম প্রিন্স: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম।

আরও পড়ুন: রাজনীতির ‘দুষ্টু বালক’ ও আমাদের ‘এরশাদ সিনড্রোম’

আরও পড়ুন: জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র