Barta24

বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

কে হচ্ছেন ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী?

কে হচ্ছেন ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী?
মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার (অব.), ছবি: বার্তা২৪.কম
মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার (অব.)


  • Font increase
  • Font Decrease

ভারতের নির্বাচনী যুদ্ধ শুরু হয়েছে গত ১১ এপ্রিল প্রথম দফা ভোট গ্রহণের মধ্য দিয়ে। এটি ভারতের ১৭তম লোকসভা নির্বাচন। আপাত দৃষ্টিতে এই নির্বাচনী লড়াইটা ত্রিমুখী মনে হচ্ছে। যদিও এখনো মনে হচ্ছে মূলত সিটিং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাহুল গান্ধীর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর লড়াই হচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হিসেব এমন নাও থাকতে পারে। কী হবে সেটা দেখার জন্য ফল প্রকাশের দিন ২৩ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

মোদি ও রাহুলের কথা সামনে থাকলেও ফল প্রকাশের পর যদি দেখা যায় বিজেপি দল হিসেবে এককভাবে ম্যাজিক সংখ্যা ২৭২ আসন পায়নি তখন তৃতীয়পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর দাবি উত্থাপিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তখন মোদির এনডিএ জোটের ভেতর থেকে বিহারের নাভিল পাটনায়েক, ওডিশার জগমোহন রেড্ডি এবং তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্র প্রদেশ থেকে অন্য মিত্র দলগুলোও মোদিকে প্রধানমন্ত্রী চাইবে না এমন একটা আওয়াজ ইতিমধ্যেই উঠেছে।

সমীকরণের অন্যদিকে দিদি মমতা ব্যানর্জি এবং দলিত রানী মায়াবতি জোটবদ্ধ হতে পারেন যাতে রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হতে না পারেন। তাতে মোদি-রাহুলের বাইরে অন্য কেউ প্রধানমন্ত্রী হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।

এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে পাঁচ শতাধিক রাজনৈতিক দলের প্রায় ১১ হাজার প্রার্থী। আছে ১০ লাখ ভোট কেন্দ্র এবং ২৩ লাখ ৩০ হাজার বুথ। নির্বাচন পরিচালনার জন্য নিয়োজিত আছে প্রায় এক কোটি দশ লাখ কর্মী ও কর্মকর্তা। এত বড় বিশাল কর্মযজ্ঞ কেমনভাবে সম্পন্ন হয় সেটিও দেখার একটি বিষয়। সে জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভারতে আসছেন কয়েক হাজার পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৫ হাজার ফুট ওপরে হিমালয়েও ভোট কেন্দ্র খোলা হচ্ছে। একেই বলা হয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। যত দূরে ও যত কঠিন জায়গাই হোক না কেন প্রতিটি নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

এই বিশাল ভোটযজ্ঞের মধ্যদিয়ে কোন দল বা জোট জয়ী হয়ে দিল্লির মসনদে বসছে তার বহুমাত্রিক হিসাব-নিকাশ এখন তুঙ্গে। তবে একটা বিষয় স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে, হিসাব-কিতাব দল ও জোটকে কেন্দ্র করে করা হলেও বড় হয়ে সামনে আসছে এই নির্বাচনে জয়ী হয়ে উদীয়মান পরাশক্তি ভারতের নেতৃত্ব আগামী পাঁচ বছর কার হাতে থাকবে। সেখানে আঞ্চলিক নেতা-নেতৃদের মধ্যেও বাংলার মমতা ব্যানার্জি এবং উত্তর প্রদেশের দলিত রানী মায়াবতি দিল্লি যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এক-আধবার প্রকাশ করলেও সব জরিপকারী প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টি আবর্তিত হচ্ছে সিটিং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও সর্ব ভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধীকে ঘিরে।

পাল্লার দুই দিকে দুইজনকে বসিয়ে ওজন করা হচ্ছে কার পাল্লা কতখানি ভারি। সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে নেতৃত্বের কারিশমা। সব জরিপ বলছে এই জায়গায় নরেন্দ্র মোদি অনেক বেশি এগিয়ে আছেন। তবে ২০১৪ সালের মতো রাহুল গান্ধীকে কেউ আর অপরিপক্ব ভাবছেন না। রাহুলের রাজনৈতিক কৌশল, কথা-বার্তা ও বক্তৃতায় যথেষ্ট পরিপক্বতা এবং প্রজ্ঞাময়তার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। ক্যারিশার ঘাটতি পূরণে মাঠে নেমেছেন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতিচ্ছবি রাহুলের বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী।

১৩০ কোটি মানুষের দেশে ধর্ম, বর্ণ, জাতপাত ও প্রকৃতির বহুমাত্রিকতার বাস্তবতায় এত বড় নির্বাচনের ফলাফলের পূর্বাভাস করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। এমন উদাহরণ রয়েছে যখন সব জরিপকারীদের পূর্বাভাস ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ২০০৪ সালে ১৪তম লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে সব মানুষের ধারণা ও জরিপকারীদের অপ্রতিরোধ্য পূর্বাভাস ছিল শাইনিং ইন্ডিয়া স্লোগানকে অবলম্বন করে পুনরায় ক্ষমতায় আসছে বিজেপি এবং তার সিটিং প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি।

কিন্তু ফল প্রকাশের পর দেখা গেল সব পূর্বাভাস মুখ থুবড়ে পড়েছে। সেবার ক্ষমতায় এলো কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট এবং প্রধানমন্ত্রী হলেন মনমোহন সিংহ। তারা পরপর দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকলেন। তবে একথাও ঠিক ব্যক্তিগত বিচার বিশ্লেষণের চাইতে জরিপকারী প্রতিষ্ঠানের মতামতকে সঙ্গত কারণেই প্রাধান্য দিতে হয়। তাই লেখার এ পর্যায়ে দু'একটি জরিপকারী প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস উল্লেখ করতে চাই।

সেন্টার ফর ভোটার অপিনিয়ন অ্যান্ড ট্রেন্ডস ইন ইলেকশন রিসার্চ (সিভোটার) তাদের একটা জরিপের ফল প্রকাশ করছে। তাতে দেখা যায় বিজেপি এককভাবে ২২২টি এবং এনডিএ জোগতভাবে ২৬৭টি আসন পেতে পারে, যেটি সরকার গঠনের জন্য ম্যাজিক সংখ্যা ২৭২ আসনের চেয়ে কম। অর্থাৎ ২০১৪ সালের তুলনায় এককভাবে বিজেপির ৬০টি ও জোটগতভাবে ৬৯টি আসন কমে যেতে পারে। ওই একই জরিপের ফলে দেখা যায়, রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস জোট ইউপিএ জোটে না থাকলেও ঘোর মোদি বিরোধী পশ্চিম বঙ্গের মমতা ব্যানার্জি, উত্তর প্রদেশের দুই হেভিওয়েট অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি ও মায়াবতির বহুজন সমাজবাদী পার্টি এবং দিল্লির আম আদমি পার্টি মিলে পেতে পারে ১৩৪টি আসন।

মোদিবিরোধী এই আঞ্চলিক দলগুলো যদি নির্বাচনের পর কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে পারে তাহলে চিত্র ভিন্ন হবে। তবে এই মিলনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হবে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন সেই প্রশ্নের মীমাংসা। যেকোনো হিসেবেই মোদিবিরোধী পক্ষগুলোর মধ্যে এককভাবে সর্বোচ্চ আসন পাবে কংগ্রেস এবং সর্ব ভারতীয় দল হিসেবে কংগ্রেস প্রধান রাহুল গান্ধীই হবেন প্রধানমন্ত্রীর জন্য মুখ্য দাবিদার। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি ও মায়াবতি- দুইজনই দিল্লির মসনদে বসার স্বপ্নের কথা প্রকাশ করে ফেলেছেন। রাহুল গান্ধীকে তারা এখনো কচি খোকা ভাবছেন। আবার একটু জরিপের কথায় ফিরে আসি।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার টাইমস মেগাপোলের সমীক্ষা মতে, বিজেপি এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও এবার পুনরায় সরকার গঠন করতে পারে মোদির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট। তবে বিজেপির আশায় জল ঢেলে দিয়েছে অন্য একটি জরিপ সংগঠন- অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস (এডিআর)। এই সংস্থার মতে শহুরে ভোটাররা বিজেপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ভোটারদের কাছে এই সংস্থাটি ২৪টি প্রশ্ন রাখে এবং তার উত্তরে শহুরে ভোটাররা ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেছে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে। এই জরিপে উত্তর দাতাদের মতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও পরিষেবা- সব কিছুতেই পিছিয়ে বিজেপি।

দুই প্রধান দল কংগ্রেস ও বিজেপির নির্বাচনী মেনিফেস্টোর দিকে নজর দিলে দেখা যায় কংগ্রেসের মূল কথা সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা কেন্দ্রিক, আর বিজেপির কেন্দ্রবিন্দুতে আছে কট্টর জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্ববাদের কথা। বিজেপির এমন কট্টর সাম্প্রদায়িক ও জাতীয়তাবাদী মনোভাবে শঙ্কা প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন লেখক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কয়েকশ’ প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গ। বিবৃতিতে তারা বলেছেন, ভারতের মৌলিক আদর্শ অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক সংবিধান রক্ষায় ভারতীয় ভোটাররা যেন মোদিকে প্রত্যাখ্যান করেন।

২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি এককভাবে ২৮২টি আসন পেয়ে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ২৭২টি ম্যাজিক সংখ্যা পেরিয়ে যায়। সেবার জোটগতভাবে এনডিএ পায় ৩৩৬টি আসন। তবে গত পাঁচ বছরে সরকারবিরোধী মনোভাব যেমন চাঙ্গা হয়েছে, তার সঙ্গে আঞ্চলিক রাজনীতির মেরুকরণে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে- যার সবকিছুই মোদির প্রতিকূলে যাচ্ছে এই নির্বাচনে। প্রথমেই ধরা যাক, সরকার গঠনের অনুঘটক উত্তর প্রদেশের কথা, যেখানে রয়েছে ৮০টি আসন।

২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি এই রাজ্যে ৭২টি আসন পেয়ে সরকার গঠনের পথে বহু দূর এগিয়ে যায়। কিন্তু উত্তর প্রদেশে এবার অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি শক্ত জোটে আবদ্ধ হয়েছে। গত কয়েক বছরে এই রাজ্যে যতগুলো উপনির্বাচন হয়েছে তাতে এই দুই দলিত নেতার জোটের কাছে বিজেপি প্রার্থী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন। অখিলেশ ও মায়াবতীর জোটে কংগ্রেসে নেই। যদি থাকত তাহলে উত্তর প্রদেশ থেকে বিজেপিকে দুয়েকটি আসন বাদে প্রায় শূন্য হাতে ফিরতে হতো। তারপরেও দুই দলিত নেতার জোট হওয়ায় এবার উত্তর প্রদেশে বিজেপির আসন গত নির্বাচনের থেকে দুই তৃতীয়াংশ কমে ২৪টি বা তারও নীচে নেমে আসতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনের মধ্যে বিজেপি গত নির্বাচনে মাত্র ২টি আসন পায়।দিদির প্রতি বাংলার মানুষ কিছুটা ক্ষিপ্ত হলেও এবার টেনেটুনে ৬-৭টি আসনের বেশি বিজেপির ভাগ্যে জুটবে না বলে মনে করছেন কলকাতার সব বড় বিশ্লেষকরা। বিন্ধ্যাচল পর্বতমালা কর্তৃক উত্তর ভারত থেকে ভৌগোলিকভাবে বিভাজিত দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক, কেরালা, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা- এই পাঁচ রাজ্যের ১২৯টি আসনের মধ্যে তামিলনাড়ুর ৩৯টি আসনে বিজেপির মিত্র এআইএডিএমকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও বাকি ৯০টি আসনের প্রায় সবগুলোই চলে যাবে মোদিবিরোধী আঞ্চলিক দলও কংগ্রেসের পক্ষে। অন্যদিকে বিহার (৪০), গুজরাট (২৬), হরিয়ানা (১০), ঝড়খণ্ড (১৪), মহারাষ্ট্র (৪৮), ওডিশা (২১), উত্তরখণ্ড (৫), হিমাচল (৪)- এই ৮টি হিন্দিবলয়ের রাজ্যে মোট ১৬৮টি আসনে বিজেপি ও তাদের স্থানীয় মিত্র দলগুলো অনেক ভাল করছে।

যদিও মহারাষ্ট্রের ৪৮টি আসনে কংগ্রেসের মিত্র প্রবীণ হেভিওয়েট নেতা শারদ পাওয়ারের ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি এবার বড় ভাগ বসাবেন বলে অনেকে মনে করছেন। দিল্লির ৭টি আসন বাদে বাকি ছয় ইউনিয়ন টেরিটোরির ৬টি আসনই বিজেপির মিত্র পক্ষের কাছে থাকবে। সিকিমসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ২৫টি আসনের ওপর এবার বিশেষ নজর দিচ্ছে দুই পক্ষই। এখানে বিজেপির স্থানীয় মিত্র দলগুলো এগিয়ে থাকলেও কংগ্রেস একেবারে শূন্য হাতে ফিরবে, তেমনটি কেউ মনে করছে না।

উত্তর পূর্বাঞ্চলের ২৫টি আসনে বিজেপির অনুকূলে ধরলেও মধ্য ভারতের হিন্দিবলয় এবং অন্যান্য মিলে দেখা যাচ্ছে বিজেপি জোটের অনুকূলে রয়েছে ১৯৯টি আসন। বিপরীতে পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর প্রদেশ ও অন্যান্য মোদিবিরোধীদের অনুকূলে রয়েছে ২১২টি আসন। এই সমীকরণের দুই দিকে যোগফল হয় ৪১১টি আসন। বাকি থাকে ১৩২টি আসন, যার মধ্যে ছত্রিশগড় (১১) ও মধ্য প্রদেশ (২৯)-৪০টি আসনের এই দুই রাজ্যে কিছু দিন আগেই রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে কংগ্রেস। তামিলনাড়ুর ৩৯টি আসনের মধ্যে বিজেপির মিত্র আঞ্চলিক দল এআইএডিএমকে এগিয়ে থাকবে। জম্মু ও কাশ্মীরের ৬টি আসনের কথা কেউ অনুমান করতে পারছেন না।

উপসংহারে এসে বলা যায়, আসন সংখ্যার বিশ্লেষণে মোদিবিরোধী পক্ষের পাল্লাই এখন পর্যন্ত ভারী বলে মনে হয়। তবে, বাহুবল, অর্থবল, কট্টর ক্যাডার বাহিনী, সাংগঠনিক শক্তির বিবেচনায় এবং নেতৃত্বের ক্যারিশমায় মোদি ও তার জোট এনডিএ এগিয়ে আছে।

বহুমাত্রিক দিক বিবেচনায় এত বড় নির্বাচনে সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া ব্যক্তি পর্যায়ে তো নয়ই, কোনো সংস্থার পক্ষেও সেটা অনেক কঠিন কাজ। এ পর্যন্ত যতটুকু দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হয় ২৩ মে ফল প্রকাশের পর ভারতবাসী একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্ট পাবে। তখন সেটি আরও আগ্রহোদ্দিপক বিষয় হবে। শুরু হবে সরকার গঠনের দৌড়ঝাঁপ এবং দরকষাকষি। তাতে মমতা ব্যানার্জি, অখিলেশ যাদব, মায়াবতি এবং বিহার ও দক্ষিণ ভারতের আঞ্চলিক দলগুলো সরকার গঠনের বেলায় মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। তাতে কার ভাগ্য খুলবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে এখনো মোদি এবং তারপর রাহুলের পাল্লাই ভারী।

মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার (অব.): কলামিস্ট এবং ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

আপনার মতামত লিখুন :

শিক্ষায় শিশুশিক্ষা ও মনোবিজ্ঞান

শিক্ষায় শিশুশিক্ষা ও মনোবিজ্ঞান
মুত্তাকিন হাসান/ ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

সাধারণ অর্থে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা। ব্যাপক অর্থে ব্যক্তির গুণাবলীর পূর্ণ বিকাশের লক্ষ্যে পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞান লাভের প্রক্রিয়াকে শিক্ষা বলে। বাংলায় শিক্ষা শব্দটি এসেছে ‘শাস’ ধাতু থেকে যার অর্থ শাসন করা বা উপদেশ দেওয়া। শিক্ষার ইংরেজি প্রতিশব্দ education; যা এসেছে ল্যাটিন শব্দ educare বা educatum যার অর্থ হলো to lead out অর্থাৎ ভেতরের সম্ভাবনাকে বাহিরে বের করে আনা বা বিকশিত করা।

শিক্ষা মানুষের মনকে আলোকিত করে, উম্মোচিত করে নতুন নতুন জানালা। আর তাই শিক্ষার কোনো শেষ নেই। শিক্ষা শুরুর পথটা শিশুশিক্ষা দিয়েই, আর তাই বলা হয় আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এই ভবিষৎকে শুরু থেকেই সঠিকভাবে লালন-পালন না করলে কোনো কিছুই প্রত্যাশা করা যায় না।

শিশুশিক্ষার হাতেখড়ি পারিবারিকভাবে পিতামাতার মাধ্যমে হলেও প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাপ্তবয়স্কদের যে পদ্ধতিতে শিক্ষা দেওয়া হয়, তা শিশুদের বেলায় বাঞ্ছনীয় নয়। শিশুদের জন্য দরকার শিশুবান্ধব মানসম্মত শিক্ষা।

মানসম্মত শিশুশিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন শিশুর মনোজগত বোঝা। একটি বেসরকারি জরিপে দেখা গেছে, আমাদের দেশের শতকরা ৭০ ভাগের বেশি বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের শিশুমনোবিজ্ঞান সম্পর্কে কোনো ধারণা বা জ্ঞান নেই। শিশুর মন না বুঝে ভয়ভীতি দিয়ে শিক্ষাদান করা শুধু তোতা পাখি বানানো ছাড়া আর কিছু নয়। শিশুশিক্ষা বা প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষকদের অবশ্যই শিক্ষকদের মনোজগত সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমাদের বর্তমান বেশিরভাগ শিক্ষকরা শিক্ষার্থীর প্রতি আন্তরিক না হয়ে, নিজেরা শিক্ষা বাণিজ্যে মত্ত থাকেন। ক্ষণে ক্ষণে শিক্ষার্থীর বাবা-মার সাথে শিক্ষকদের পরম আলাপচারিতা মানেই মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা নয়। শিশুশিক্ষায় শিশুদের মনের বিকাশে মনোবিজ্ঞানের ক্ষীণ প্রভাবের কারণেই শিশুরা জীবনের শুরুতেই শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

বিদ্যমান শিক্ষার পরিবেশ তাদের মেধা বিকাশের অন্তরায়। শিক্ষক আর অভিভাবকের কড়া নিয়মশাসনে ভালো পড়তে বা লিখতে পারছে ঠিকই তবে চিন্তাশীল বা উদ্ভাবনী হয়ে উঠতে ব্যর্থ হচ্ছে। আসলে তাদের এ শিক্ষা মানব বিকাশে সহায়ক নয়। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো- পরিপূর্ণ মানবিক গুণে মানুষ হয়ে উঠা। পিতামাতা তার সন্তানকে দিয়ে ভালো রেজাল্ট করাচ্ছে ঠিকই কিন্তু সত্যিকারের শিক্ষিত হয়ে উঠছে না। শিশুর সৃজনশীলতা বিকাশের যথোপযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় তারা বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এতে করে টালমাটাল হচ্ছে পুরো সমাজ।

বিখ্যাত কবি মিল্টন বলেছেন- Education is the harmonious development of body, mind and soul…শিক্ষকরা যেহেতু প্রকৃত অভিভাবক এবং শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান প্রদান করে থাকেন, তাই শিক্ষকদের হতে হবে প্রকৃত মানুষ। শিক্ষদের নিজেদের মধ্যেই যদি মানবিক গুণাবলীর ঘাটতি থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীর মনে কখনোই মানবিক গুণাবলী জাগ্রত হবে না।

শিক্ষাদানের জন্য বিদ্যালয়ের বাহ্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও যত উপকরণই ব্যবহার করা হোক না কেন শিক্ষকরা নিজেরাই সবচেয়ে বড় উপকরণ। শিক্ষাকে পেশার পাশাপাশি সেবা হিসেবে গ্রহণ করতে পারলেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে গড়ে উঠবে নিবিড়, সৌহার্দ ও স্নেহপূর্ণ সম্পর্ক। কোমলমতি শিশুদের বকাঝকা না করে সকল শিক্ষকদের উচিত সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি করা। হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা যেন প্রত্যেক শিক্ষার্থীই প্রথম স্থান অর্জন করবে। শিশুদের পাশাপাশি যেন পিতামাতারাও এমন প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। অথচ প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে জ্ঞান বিকাশের প্রথম স্তর মাত্র। তাদের জন্য আরও বহু পথ বাকি।

শিক্ষক আর পিতামাতার চাপে শিশুরা যেন দিশেহারা। ভোরবেলায় চোখ কচলাতে কচলাতে ঘুম থেকে উঠা, বিদ্যালয় থেকে ফিরে যতটুকু সময় তাতে তাদের ব্যস্ত থাকতে হয় শ্রেণীতে দেওয়া পড়ালেখা নিয়ে। শিশুরা তাদের চিন্তা চেতনা প্রকাশ করার কোন সুযোগই পাচ্ছে না। গ্রামের শিশুদের চেয়ে শহরের শিশুদের বেলায় এ অবস্থা বেশি পরিলক্ষিত হয়। কারণ শহরের বিদ্যালয়ে নেই খেলার উন্মুক্ত মাঠ। অথচ খোলামেলা মাঠ শিশুদের মনোবিকাশের অন্যতম উপাদান। শিশুরা দুরন্ত হরিণের মতো খেলাধুলা করবে এটাই স্বাভাবিক।

বিখ্যাত সাহিত্যিক আবুল ফজল বলেছেন ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতির প্রাণশক্তি তৈরির কারখানা আর রাষ্ট্র ও সমাজ সব চাহিদার সরবরাহ কেন্দ্র। এখানে ত্রুটি ঘটলে দুর্বল আর পঙ্গু না করে ছাড়বে না।’ যে স্থানেই হোক না কেন আমাদের উচিত শিক্ষার সঠিক সংজ্ঞার প্রতি খেয়াল রাখা। নচেৎ পুরো সমাজকে ভোগান্তিতে পড়তে হবে এবং যার প্রভাব সুদূরপ্রসারি। শিশুশিক্ষার বর্তমান ধারা সংশোধন করে মনোবিজ্ঞান ভিত্তিক পড়ালেখা অত্যন্ত জরুরি।

প্রত্যেক শিক্ষকের জন্য শিশু-মনোবিজ্ঞান বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষকদের পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। যেহেতু ভালো পড়ালেখার আশায় পিতামাতারা তাদের শিশু সন্তানদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে ইচ্ছুক বেশি, তাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে শিক্ষকদের বড় একটি অংশ উচ্চ-মাধ্যমিকের বেশি পড়ালেখা করেননি এবং তাদের বেশিরভাগের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। যাদের প্রশিক্ষণ আছে তা আবার স্বল্পকালীন। সঠিক প্রশিক্ষণের অভাবে শিক্ষকদের মনেও নেই কোনো আনন্দ, তারা যেন কোনোমতে নিজেদেরকে ঠেলা দিয়ে চালাচ্ছে। শিক্ষকরা নিজেরাই নিজেদের মনোবিকাশে ব্যর্থ। শিশু শিক্ষার্থীর মনোবিকাশ এখানে বাতুলতা ছাড়া আর কিছু নয়।

মুত্তাকিন হাসান: কবি, প্রাবন্ধিক ও মানব সম্পদ পেশাজীবী

রাজনীতির ‘দুষ্টু বালক’ ও আমাদের ‘এরশাদ সিনড্রোম’

রাজনীতির ‘দুষ্টু বালক’ ও আমাদের ‘এরশাদ সিনড্রোম’
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, পুরনো ছবি

৮৯ বছরের এক বিশাল কর্মজীবন পেছনে ফেলে সব আলোচনা-সমালোচনার ওপারে চলে গেছেন এরশাদ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এরশাদ একাই একটি অধ্যায়। এরশাদের জাতীয় পার্টি (জাপা) হয়তো আরও বহুদিন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়েই থাকবে, তবে এরশাদবিহীন জাপা ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক গুরুত্ব হারাবে বলেই মনে হয়।

তার দীর্ঘ পেশাগত ও রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য তিনি দলকেও ছাড়িয়ে গেছেন বহুমাত্রায়। তার অনুপস্থিতিতে জাপা হয়তো এখন সেটিই অনুভব করবে। ক্ষমতার সিঁড়ির কাছাকাছি যেতে এরশাদের বিকল্প এখনও তৈরি হয়নি। এছাড়া রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিপরীতে একটি শক্ত প্রতিরক্ষা ঢাল হিসেবেও তার জুড়ি নেই। তাই জাপার মতো একটি সমর্থক শক্তি রাজনীতিতে প্রয়োজন ছিল বৈকি। অপর দলের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় এরশাদবিহীন জাপা আগামীতে কতটা শক্তি জোগাতে পারে সেটিই এখন দেখার বিষয়।

তবে পার্টির গুরুত্ব থাকা না থাকা নির্ভর করে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ওপর। দলের ভেতরে সামরিক বেসামরিক ক্যারিয়ারিস্ট নির্বিশেষে এরশাদের মতো হাই-প্রোফাইল রাজনীতিক আর নেই। এক সময় জাপা করেছেন দেশের অনেক হাই প্রোফাইল রাজনীতিক। মিজানুর রহমান চৌধুরী, কাজী জাফর, শাহ মোয়াজ্জেম, মওদুদ আহমেদসহ দেশের প্রথিতযশা অনেক রাজনীতিকরা এরশাদের জাপাকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা বামপন্থী রাজনীতি থেকে এসেছেন। ডিগবাজীর এই রাজনীতি শুরু হয় জিয়ার আমলে। সামরিক, বেসামরিক আমলা ও পেশাজীবীদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করেন জিয়া।

এরশাদও একই কায়দায় সামরিক-বেসামরিক আমলা, পেশাজীবীদের দলে ভেড়ান। কিন্তু ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ার পর ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তাদের বেশির ভাগই আজ আর জাপায় নেই। যেমন নেই বিএনপিতে। সময় বুঝে আজ জিয়ার উপদেষ্টা, কাল এরশাদের উপদেষ্টা বা মন্ত্রী হয়েছেন অনেকে। নগদ ইনামের আশায় এরকম রাজপন্ডিতের (উপদেষ্টা) নজির আজও বিরল নয়। ক্ষমতার লোভে যারা ডিগবাজী দিয়ে জাপায় এসেছিলেন, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে তারাই সবার আগে উল্টো ডিগবাজী দিয়েছেন। কেউ বা মৃত্যৃ বরণ করেছেন, অবসর নিয়েছেন। ফলে জাপায় আজ ক্যারিয়ার পলিটিশিয়ান যাকে বলে সে রকম কেউ নেই বললেই চলে। ক্যারিশম্যার কথা বাদই দিলাম। ফলে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বই জাপার জন্য আজ বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষমতার রাজনীতিতে একইভাবে দলের গুরুত্ব বহাল রাখা।

Ershad
১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিচ্ছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ/ ছবি: সংগৃহীত

 

এরশাদকে নিয়ে আলোচনা আছে, আছে সমালোচনা। কোনোটাই ভিত্তিহীন নয়। তিনি একটি নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করেছেন। বিদ্যমান দলগুলোর অদূরদর্শীতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে নিজেই ৯ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকেছেন। সব সামরিক শাসক যা করেন এরশাদও তাই করেছেন। জিয়াউর রহমান বিএনপি করেছেন, এরশাদ করেছেন জাতীয় পার্টি। নয় বছর ক্ষমতায় থেকে বিদায় নিয়েছেন সত্য, কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিতে এরশাদের গুরুত্ব কমেনি মোটেও। বরং ক্ষমতার রাজনীতিতে নিজের পাল্লা ভারি করতে এরশাদের বিকল্প শুধুই এরশাদ। আগামী দিনের ক্ষমতার রাজনীতিতে জাপা একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ থাকতে পারবে কিনা জাপা’র জন্য আপাতত এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য অন্তত আগামী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে ‘ক্ষমতা’, ‘রাজনীতি’ ও ‘কৌশলের’ সঙ্গে ভোটের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর বিষয়টি অনেকাংশেই নির্ভর করে। এ সম্পর্ক যেভাবে শিথীলতার দিকে যাচ্ছে তাতে তৃতীয় কোনো সহায়ক শক্তির রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতাও হয়তো ফুরিয়ে যাবে। তবে সে রাজনীতি আমাদের হিসাবের বাইরে। আমরা শুধু এটুকুই বলতে পারি, এরশাদ জাপায় যেমন অপরিহার্য ছিলেন, ক্ষমতার রাজনীতিতেও ছিলেন একই রকম অপরিহার্য।

Ershad
একাদশ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নিচ্ছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ/ ছবি: সংগৃহীত

 

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য। এই উপমহাদেশে ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলই বেশি বিকাশ লাভ করেছে। ভারতে যেমন কংগ্রেস, পাকিস্তানে মুসলিম লীগ, পিপলস পার্টি, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাপা। ভারতের বিজেপি অথবা বাংলাদেশের জামায়াত একটি ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ চর্চা করে। কাজেই প্রচলিত রাজনীতি থেকে তাদের রাজনীতি ভিন্ন, নেতৃত্বের বিষয়টিও ব্যক্তি বা পরিবার নির্ভর নয়। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ যদিও ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে বিকাশ লাভ করেছে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দলের প্রয়োজনেই বঙ্গবন্ধু কন্যার হাতেই দলের দায়িত্ব তুলে দেয়া হয়। সেই থেকে প্রায় চার দশক আওয়ামী লীগও ব্যক্তি কেন্দ্রিক দলীয় রাজনীতির মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

দলের ভবিষ্যৎ পারিবারিক সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। আর বিএনপি ও জাপার শুরুই হয়েছে একজন ব্যক্তি বিশেষের রাজনৈতিক খায়েস মেটানোর জন্য। জিয়া ও এরশাদ যদি ধরেও নিই যে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ক্ষমতা দখল করেছেন (ডকট্রিন অব নেসিসিটি), না হলে দেশ গোল্লায় যেতো ইত্যাদি, ইত্যাদি... তারপরও বাস্তবতা হলো তারা কেউ দেশের সেই কথিত ক্রান্তিলগ্ন পার হওয়ার পর ব্যারাকে ফিরে যাননি। গদি আঁকড়ে ধরে থেকেছেন। জিয়া নিহত হওয়ার পর বিচারপতি সাত্তার ও পরে খালেদা জিয়া বিএনপির হাল ধরেন। সেই থেকে আজও ব্যক্তি ও পারিবারিক দখলমুক্ত হতে পারেনি বিএনপি।

একই কায়দায় এরশাদ নয় বছর ক্ষমতায় থাকার পরও জাপা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যক্তি এরশাদ থেকে জাতীয় পার্টি মুক্ত হতে পারেনি চার দশকেও। পতিত সামরিক ও স্বৈরশাসকরা ‘মরিবার পূর্বে মরিতে চান না’। তাই নিরাপদ ও স্বাভাবিক মৃত্যু নিশ্চিত করতেই তারা দলের সভাপতি বা উপদেষ্টার পদ আজীবন আঁকড়ে থাকেন। এরশাদের হয়তো এক্সিটওয়ে ছিল, কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিতে তার প্রয়োজন ছিল এবং তিনিও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা উপভোগ করে গেছেন। ক্ষমতার প্রতিটি কোনায়ই তিনি বিচরণ করেছেন।

সেনাপ্রধান, সিএমএলএ, রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রীর মর্যাদা সম্পন্ন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, বিরোধী দলের নেতা সব ক্ষেত্রেই তার সরব উপস্থিতি আমরা দেখি। সবকিছু যে তার প্রয়োজন ও ইচ্ছায় হয়েছে হয়তো সেরকমটি নয়। অনেকটা রাজনীতি ও ‘ক্ষমতা’র প্রয়োজনেই তার এই এদিক ওদিক, কখনো নিজের কখনো অপরের প্রয়োজনে। এখানেই এরশাদের অপরিহার্যতা। আর এজন্যই আমরা তাকে বলি ‘রাজনীতির দুষ্টু বালক’।

Ershad

সংসদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে বক্তব্য দিচ্ছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ/ ছবি: সংসদ টিভি 

 

স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের তিনটি বড় দলের মধ্যে জাপা আপাত একজন ব্যক্তির নেতৃত্ব থেকে মুক্ত হলো বটে। কিন্তু ব্যক্তি কেন্দ্রিকতা থেকে বের হয়ে নতুন করে পরিবারভূক্ত হলো বলেই মনে হচ্ছে। এতে আপতত হয়তো জাপা প্রাথমিক ধাক্কাটি সামলাতে পারবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে পার্টির নিয়তি নির্ধারণে তা কতটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে তা সময়ই বলবে।

এরশাদের সমালোচনা আছে অনেক। কিন্তু নির্মোহ দৃষ্টিতে বললে এ সমালোচনা থেকে সবাই-ই কি মুক্ত? রাজনীতিতে এরশাদ একটি সিনড্রোম। এ সিনড্রোমে সব রাজনৈতিক দলই আক্রান্ত। এমনকি নাগরিক হিসেবে আমরাও কি সুবিধাবাদী নই? এরশাদ আমাদের সুযোগসন্ধানী, সুবিধাবাদী, ভোগবিলাসী ও ডিগবাজীর রাজনীতির আইকন। কিন্তু এরশাদ সিনড্রোম কি আমাদের মাঝেও নেই? এরশাদকে গালি দেওয়া সহজ, কারণ তিনি ক্ষমতাহীন এক ‘দুষ্টু বালক’। এরশাদের বিদায়ের পর রাজনীতিতে হয়তো সহসা সমালোচনা করার মতো লোকটি বিদায় নিলেন। কিন্তু তাতে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে কি? এরশাদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ভাড়ামি হয়তো কিছুটা কমবে, কিন্তু রাজনৈতিক দুষ্টামি বন্ধ হবে কি?

এরশাদুল আলম প্রিন্স: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র