Barta24

শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

শ্রীলঙ্কার জন্য বিশ্ব কাঁদছে!

শ্রীলঙ্কার জন্য বিশ্ব কাঁদছে!
চিররঞ্জন সরকার, ছবি: বার্তা২৪.কম
চিররঞ্জন সরকার


  • Font increase
  • Font Decrease

মাত্র ৩৫ দিন আগে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুইটি মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় প্রায় ৫০জন মুসল্লির মৃত্যুর ঘটনায় গোটা বিশ্ব কেঁদেছিল। সেই রক্ত আর অশ্রু শুকাতে না শুকাতেই রোববার (২১ এপ্রিল) অন্তত ৮টি শক্তিশালী বোমা হামলায় রক্তাক্ত হয়েছে শ্রীলঙ্কা। এসব হামলায় নিহত হয়েছেন দুই শতাধিক মানুষ। আহত হয়েছেন আরও কয়েকশ জন।

পুরো শ্রীলঙ্কায় জুড়ে নেমে এসেছে শোক আর আতঙ্ক! এই শত শত নিরীহ মানুষের জন্য এখন বিশ্ব আবারও কাঁদছে। আজ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে কেবলই মনে হচ্ছে, মানুষের জীবন এত সস্তা? কেন, কার পাপে আজ এভাবে নিরীহ মানুষকে বার বার আত্মাহুতি দিতে হবে? আর কতবার পৃথিবীর নানা প্রান্তের বিভিন্ন দেশকে ভাসতে হবে রক্ত-গঙ্গায়?

শ্রীলঙ্কায় যা ঘটেছে, তা সত্যিই অকল্পনীয়। ইস্টারের সকালে গির্জাগুলোতে প্রার্থনার জন্য ভিড় জমিয়েছিলেন ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টানরা। সকাল ৮.‌৪৫ মিনিট নাগাদ কলম্বোর সেন্ট অ্যান্টনিস গির্জায় প্রথম বিস্ফোরণ হয়। আতঙ্কিত মানুষজনের আর্তনাদ এবং পুলিশের হতচকিত অবস্থার মধ্যেই পরপর বিস্ফোরণ হয় কলম্বোর উত্তরাংশে নেগোম্বো শহরতলির কাটুওয়াপিটিয়ায় সেন্ট সেবাস্টিন গির্জা, বাট্টিকালোয়ার গির্জায়। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ছিল সেন্ট সেবাস্টিন গির্জার ছাদ সম্পূর্ণ উড়ে যায়।

গির্জায় হামলার পর একে একে কলম্বোর শাঙ্গরি-লা, কিংসবারি, সিনেমন গ্র্যান্ড এবং দেহিওয়ালা চিড়িয়াখানার সামনে আর একটি বিলাসবহুল হোটেলে বিস্ফোরণ ঘটে। তাতে কমপক্ষে ৩৫ জন বিদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়। নিহতরা জাপান, হল্যান্ড, ব্রিটেন, আমেরিকা,পর্তুগাল, চীন এবং তুরস্ক থেকে আসা পর্যটক বলে জানা গিয়েছে।

ডেমাটা গোড়ার মহাবিলা গার্ডেন্সের একটি বাড়িতে অষ্টম বিস্ফোরণটি ঘটে। বিস্ফোরণের সময় সেখানে তল্লাশি চালাতে গিয়েছিল স্থানীয় পুলিশ। বিস্ফোরণের তীব্রতায় বাড়িটির একটি অংশ হুড়মুড় করে ভেঙে পড়লে তার নিচে চাপা পড়ে তিন পুলিশ কর্মীর মৃত্যু হয়।

এই ধারাবাহিক হামলায় পুরো শ্রীলঙ্কা এক আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়েছে। ইতিমধ্যে শ্রীলঙ্কান সরকার বেশ কিছু জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশ জুড়ে কার্ফু জারি করা হয়েছে। ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়া রুখতে সাময়িক ভাবে ব্লক করে দেওয়া হয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে। নিরাপত্তা আঁটসাঁট করা হয় বন্দরনায়েক আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরেও। সেনা ও আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী সংস্থাগুলিকে পরিস্থিতি বুঝে উপযুক্ত পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিচ্ছিন্নতাবাদী তামিল টাইগারদের দমনের পর অনেকটা শান্তির জনপদ হয়ে ওঠা শ্রীলঙ্কা এই বোমা বিস্ফোরণে যেন স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে। ১৯৮৩ সালের ২৩ জুলাই শ্রীলঙ্কার তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদীরা উত্তরাঞ্চলে ১৩ জন সৈন্যকে হত্যার মাধ্যমে শুরু করে দেশটির রক্তাক্ত ইতিহাস। দীর্ঘ ২৬ বছর চলে এই গৃহযুদ্ধ। যার অবসান ঘটে ২০০৯ সালে। এই দীর্ঘ সময় জুড়ে চলা গৃহযুদ্ধ শুধু শ্রীলঙ্কাতেই নয়, এর প্রভাব পড়েছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। একসময় সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন বিশ্বনেতারাও। বিদ্রোহী তামিল টাইগার নেতা প্রভাকরণের মৃত্যু যবনিকা টানে এই গৃহযুদ্ধের।

এরপর এই দ্বীপ-রাষ্ট্রটি শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলছিল। শিক্ষা, প্রযুক্তি, জাতীয় মাথা পিছু আয় ইত্যাদি ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। এই দেশটিতে এমন নারকীয় হামলা গোটা বিশ্ব বিবেককে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এই ভয়াবহ আক্রমণের পেছনে কারা রয়েছে, তাদের উদ্দেশ্যই বা কী? এত বড় একটি নারকীয় ঘটনার পেছনের সন্ত্রাসীরা কীভাবে অধরা থেকে গেল-এসব প্রশ্ন উঠছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির এক খবর শ্রীলঙ্কা সরকারের ভূমিকাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। রোববার সকালে শ্রীলংকার বিভিন্ন গির্জা ও হোটেলে ধারাবাহিক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠার ঠিক দশ দিন আগে এই হামলা নিয়ে দেশকে সতর্ক করেছিলেন সে দেশের পুলিশ প্রধান। এমনটাই জানাচ্ছে সংবাদ সংস্থা এএফপি। দশ দিন আগের সেই সতর্কবার্তা তাদের হাতেও নাকি এসেছিল।

এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১১ এপ্রিল এই ধারাবাহিক বিস্ফোরণের ষড়যন্ত্রের খবর এসে পৌঁছেছিল শ্রীলঙ্কার গোয়েন্দাদের হাতে। সেই মতো দেশের শীর্ষ পুলিশ কর্তাদের কাছে সতর্কবার্তাও পাঠিয়েছিলেন শ্রীলঙ্কা পুলিশের প্রধান পুজুথ জয়সুন্দর। পুলিশ প্রধানের পাঠানো সেই সতর্কবার্তায় বলা হয়েছিল, 'একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে আমরা জানতে পেরেছি, ন্যাশনাল তৌহিদ জামাত নামের একটি সংগঠন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আত্মঘাতী জঙ্গি হামলার ষড়যন্ত্র করছে। হামলা চালানো হতে পারে কলম্বোর ভারতীয় হাইকমিশনেও।'

শ্রীলঙ্কার কট্টরপন্থী মুসলিম মৌলবাদীদের সংগঠন হল এই ন্যাশনাল তৌহিদ জামাত। গত বছর বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ মূর্তিতে ভাঙচুর করার পর প্রথম নজরে আসে এই সংগঠন। এএফপির এই প্রতিবেদন যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে শ্রীলঙ্কার পুলিশ এবং প্রশাসন কেন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি, সে প্রশ্ন উঠছে। এমন একটি জনবহুল এবং বিশ্বমানের সামরিক বাহিনীর দেশে একের পর এক আত্মঘাতী হামলার ঘটনা ঘটল, অথচ পুলিশ-গোয়েন্দারা কোনো কিছুই টের পেল না, কাউকে ধরতে পারল না-এটা দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। গোটা বিশ্বই যেখানে সন্ত্রাসবাদী হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে, সেখানে শ্রীলঙ্কার মতো একটি আধুনিক দেশের নিরাপত্তা নিয়ে এমন উদাসীনতা বিস্ময়কর বইকি!

কারা হামলা করেছে তা এখনো স্পষ্ট না হলেও, শ্রীলঙ্কা প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলছেন, একটি ধর্মীয় জঙ্গি গোষ্ঠী এ হামলা চালিয়েছে। ইতিমধ্যে এই ভয়াবহ হামলায় জড়িত সন্দেহে ২৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, শ্রীলঙ্কান সরকার সংকট মোকাবেলায় কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে?

রোববার ঘটনাটির পেছনে যে কোনো সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন যুক্ত আছে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। হয়তো তাদের চোখেও কোনো আদর্শের ঠুলি পরানো হয়ে গেছে, করা হয়েছে মগজ ধোলাই। হতে পারে, এর পেছনে আছে রাজনৈতিক কোনো স্বার্থ হাসিলের অভিপ্রায়ও।

কারণটা যা-ই হোক না কেন, এর বলি হলো শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষই। খুব সাধারণ একজন গৃহবধূ, একজন বাবা কিংবা মা, একজন ভাই কিংবা বোন; রাজনীতি শব্দের মানে না বোঝা শিশু। শ্রীলঙ্কাকে যারাই রক্তাক্ত করুক না কেন, একে হালকা করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। ধর্মীয় মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের শিকড় উপড়ে ফেলতে সবাইকে, সব দেশকে একাট্টা হতে হবে।

শ্রীলঙ্কার হামলা শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, বিশ্ববাসীর জন্যই বিপদ-সংকেত। মৌলবাদ নিয়ে অনেকেই খেলতে পছন্দ করেন। কিন্তু কাল সাপ কারও পোষ মানে না। তালেবানদের এক সময় সিআইএ ও পেন্টাগন সাহায্য-সহযোগিতা ও অস্ত্র-প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলেছিল। সেই তালেবানরা সুযোগ বুঝে ঠিকই আমেরিকার ওপর মরণ-কামড় বসিয়েছে। আইএস জঙ্গিদের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ, তা যে নামে, যে পরিচয়ে, যে দেশেই থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই রুখে দাঁড়াতে হবে। মৌলবাদীদের ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা ও কার্যকর করতে হবে আমাদের অস্তিত্বের স্বার্থেই। তা না হলে সবাইকেই মূল্য দিতে হবে।

মৌলবাদী সন্ত্রাস নিয়ে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক উদ্যোগ-আয়োজন ও গবেষণার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। ধর্মীয় মৌলবাদ সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত বিশ্বাস, ডিসকোর্স, রাষ্ট্রীয় নীতি সব কিছু নিয়ে নতুন করে ভেবে দেখার সময় এসেছে।

শ্রীলঙ্কার জন্য আজ বিশ্ব কাঁদছে। আমরাও কাঁদছি। একই সঙ্গে এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে নির্মূল করণের পথ পদ্ধতি অনুসন্ধানের বিশ্ব বিবেকর কাছে জোর দাবি তুলছি। ধর্মের নামে নিরীহ মানুষকে খুন করা বন্ধ হোক, বন্ধ হোক রক্তের হোলি-খেলা!

চিররঞ্জন সরকার: কলামিস্ট

আপনার মতামত লিখুন :

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের একটি মন্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন 'সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না'। এ কথাটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকতাদের দুর্নীতি আজ নতুন নয়। তবে সব কর্মকর্তাও এক নয়। সংখ্যায় সীমিত হলেও  অনেক অফিসার আছেন যারা সততার সাথে অনেক কষ্টে  জীবনযাপন করেন। তাই সকলকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুদক নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অনেক আগে, তবে কিছু দিন পূর্বে ছোটখাটো দুর্নীতি ধরতে সোচ্চার দেখে আমরা কিছুটা হলেও খুশি হয়েছি। এ জন্য যে এবার অন্তত দুদক চেয়ারম্যান নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হয় কিনা বা সকল শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসছেন কিনা তা যাচাই করতে। 

আমরা মনে করেছি, তিনি একবার যেহেতু ঘর থেকে বেরিয়েছেন, বাংলাদেশের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে, বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছেন, সরকারি কর্মকতা, রাজনীতিবিদের দুর্নীতি থামানো অসম্ভব। তার কাছে তো অনেক উদাহরণ আছে।

যাক সেসব কথা। এবার আলোচনা করা যাক, তিনি কেন বলেছেন যে সরকারি কর্মকরা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না। তিনি কি আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেয়েছেন?  নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

কারণ ব্যাখ্যার আগে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে দুই-চার কথা না বললেই নয়। ওনারা সরকারিভাবে সে বৃটিশ আমল থেকে সুরক্ষিত। ওনারা সমাজের উপরে থাকেন। ওনাদের পল্লীর নাম ভদ্রপল্লী। ওনাদের সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগ। সব কিছুই ওনারা নির্মাণ ও পরিচালনা করেন। সকল সুযোগ-সুবিধা ওনাদের জন্য। এ কারণে ওনাদের আচরণে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ জন্য তাদের সঙ্গে জনগণের একটা দুরত্ব কাজ করে। ফলে তাদের সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্যের পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, তা জানার আগেই পত্র-পত্রিকা,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। আসলে দুদক চেয়ারম্যান কী বোঝাতে চেয়েছেন বা জনগণ কী বুঝেছে তা পরিষ্কার নয়।

আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, এখানে দুদক চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে বুঝাননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের অনিচ্ছায় বা ভালো  উদ্দেশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে কারো ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য ঐ কর্মকতাকে দুর্নীতি পরায়ণ বলা যাবে না। এটাকে দুদক চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাস' বলেছেন। যদি ঐ কর্মকর্তা  ইচ্ছাকৃত ভুল করেন বা টাকার বিনিময়ে করেন বা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেন, তা সরল বিশ্বাস নয়। এখানে অসততা আছে। এটাই দুর্নীতি।

আমার  হয়তো বুঝতে ভুল হতে পারে আর যদি হয়ও তা কিন্তু সরল বিশ্বাসে। আমি এ বিষয়টি এ জন্যই উপস্থাপন করলাম, কারণ দুদক চেয়ারম্যানের কথার অর্থ যদি সরকারি কর্মকর্তারা ভুল বোঝেন, তাহলে তো সর্বনাশ! তারা তো সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা শুরু করবেন। অবস্থা তখন হবে, ‘একদিকে নাচুনি বুড়ি অন্য দিকে ঢোলের বাড়ি’-র মতো। আমার এ লেখা শুধু ওইসব দুর্নীতি পরায়ণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য।

অতএব, দয়া করে সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন: সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি অপরাধ নয়: দুদক চেয়ারম্যান

জিএম কাদের কি পারবেন?

জিএম কাদের কি পারবেন?
এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান থেকে দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেলেন এরশাদের ছোট ভাই জিএম কাদের। দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা জিএম কাদেরের উপস্থিতিতেই বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) এ ঘোষণা দেন। এখন অপেক্ষা, জাপা জিএম কাদেরের নেতৃত্বকে কতটা সহজভাবে মেনে নেয়, সেটি দেখার।

জিএম কাদের প্রাথমিক ধাক্কাটি সামলাতে পারলে সেটা তার নিজের ও দলের পক্ষে একটি ইতিবাচক ফল বয়ে নিয়ে আসবে বলেই মনে হয়। তবে জিএম কাদের আপাতত সফল হোন বা না হোন, জাপার জন্য আগামী দিনের রাজনীতিতে একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বহাল থাকার লড়াইটা খুব সহজ হবে না। নিশ্চিতভাবেই দলের ভেতর ও বাইরে থেকে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব আসবেই। তবে, সামগ্রীকভাবে দেশের রাজনীতির চালচিত্র কেমন যাবে, তার ওপর এটি অনেকটাই নির্ভর করে।

জাপায় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময়েই দলের নেতাদের মধ্যে ক্ষমতার টানাপোড়েন দেখা গেছে। এমন টানাপোড়েন শুধু জাপায় নয়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতেও ছিল, এখনও আছে। যেকোনো বড় দলেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ‘পন্থী’রা শক্তিশালী থাকে। শক্তিহীনরা হয় টিকে থাকার চেষ্টা করেন, ধৈর্য ধরেন, না হয় এক সময় ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে ধীরে ধীরে ঝড়ে পড়েন। আওয়ামী লীগের অনেক বড় বড় নেতা আজ দলে নেই। অনেকে ফিরে আসার চেষ্টা করেছেন। কেউ পেরেছেন, কেউ পারেননি। বের হয়ে নতুন দল বা জোটে যোগ দিয়েছেন। বিএনপিতেও এমন নজিরের অভাব নেই। বড় দলে নেতৃত্ব ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে দলের ঐক্য ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। এতে দল ও নেতা উভয়ই লাভবান হয়। তা না হলে দলতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ই, দলের নেতারাও একসময় হারিয়ে যান। ১/১১ এর বিরাজনীতিকরণের রাজনীতিতে অনেকেই তথাকথিত সংস্কারপন্থী হয়েছেন। এতে না দলের, না নিজের লাভ হয়েছে। দুঃসময়ে লড়াইটা চালিয়ে যাওয়াই রাজনীতিকের আসল পরীক্ষা। সুসময়ে সবাই মিছিলের সামনেই থাকে।

স্বাধীনতার পরে দেশের বড় তিনটি দলের ভাঙা-গড়াই আমরা দেখেছি। এর মধ্যে বিএনপি, ও জাপার জন্মই স্বাধীনতার পরে। তবে স্বাধীনতার পরে দলের ভাঙা-গড়ার সবচেয়ে বড় নজির জাসদের। এক সময় দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের একটি শ্রেণী বিশেষ করে ছাত্র সমাজের একটি অংশের কাছে কয়েকটি শব্দ খুব পরিচিত ছিল-পুঁজিবাদ, বিপ্লব, সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, সর্বহারা, বিচ্যুতি, বুর্জোয়া, পেটি বুর্জোয়া, হঠকারিতা, বস্তুবাদ, লুটেরা, দ্বন্দ্ব, ধনিক-শ্রেণি, কায়েমী-স্বার্থবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলেতো কথাই নেই। মুখে মুখে এসব বুলি। বিশেষ করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এ শব্দগুলো জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই দেশের মেধাবী ছাত্রদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বামপন্থী হয়ে যায়। এরা রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদের ছাতার নীচে আশ্রয় নেয়। এদের মধ্যে আবার মস্কো, পিকিং আরো নানা পন্থী ছিল। জাসদ শুরুর সে ইতিহাসও অর্ন্তদ্বন্দ্বেরই ইতিহাস, ছাত্রলীগের মধ্যে মেরুকরণের ইতিহাস। এরই মধ্যে নতুন আরেকটি শব্দ চালু হলো রাজনীতিতে। সেটি হলো বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। এই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্বপ্নেই ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ জাসদ গঠন করে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর নানা ঘটনার পরম্পরায় জাসদ উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যায়। এরপর জিয়া ও এরশাদ আমলে জাসদের ভাঙ্গনের খতিয়ান আরও দীর্ঘ। মেজর জলীল, কাজী আরেফ আহমদ, মনিরুল ইসলাম, শরীফ নূরুল আম্বিয়া, ইনু, রব হয়ে জাসদ এখন বর্তমান সুরতে বহাল আছে। বর্তমানে এক দল এক নেতার দল জাসদ। এর মাঝে আছে একাধিক পন্থী। দলের মাঝে ঐক্য ধরে রাখার জন্য জাসদ নেতারা কম চেষ্টা করেননি। কিন্তু পারেননি। কারণ তারা নিজেরাই স্বার্থের দ্বন্দ্বে মরিয়া ছিলেন।

ছোট দলের জন্য দলের ঐক্য ধরে রাখা সব সময়ই কঠিন। সেটা জাসদ হোক বা জাপা। কারণ, রাজনীতিতে ঐক্যের মূল শক্তি ক্ষমতা অথবা আদর্শ। কিন্তু আমাদের এখানে আদর্শের ভীত বড় নড়বড়ে। আর নিজ শক্তিবলে এসব দলের ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপটও রচনা হয়নি। ফলে, দলের নেতারা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য ক্ষমতায় দৌড়ে অধিকতর কাছাকাকাছি থাকা দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য করেছেন। এখানেই ছোট দলের ভাঙনের মূল কারণ নিহিত। এছাড়া অপরের নেতৃত্ব মেনে না নেয়ার সহজাত প্রবণতা মানুষের থাকেই। সেই সাথে আরেকটি বিষয় হলো এসব দলের বড় নেতা ও পরবর্তী ধাপের নেতাদের পলিটিক্যাল ক্যারিয়ারের মাঝে দৃশ্যমান তেমন বড় কোনো পার্থক্য নেই। ফলের ঐক্যের মূল ভিত্তি খুবই দূর্বল থাকে। রাজনৈতিক আদর্শ বাদ দিলেও, আওয়ামীর লীগের ঐক্যের ভিত্তি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার একথা অস্বীকার করা যাবে না। এখানে ঐক্যের একটি ‘পারিবারিক’ ভিত্তিও আছে।

জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের
জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের

 

বিএনপির ক্ষেত্রেও নেতাদের ঐক্যের মূল ভিত্তি কখনো ক্ষমতায়া যাওয়ার আশা, সেই সাথে জিয়া পরিবার। এর বাইরে একটি রাজনৈতিক আদর্শতো কাজ করেই। এটি শুধু আওয়ামী লীগ, বিএনপির ক্ষেত্রে নয়, নয় শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। ভারতের কংগ্রেসের বর্তমান হাল হকিকত দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। রাহুল গান্ধী পদত্যাগ করেছেন দুই সপ্তাহ, কিন্তু দল এখনও নতুন নেতা নির্ধারণ করতে পারেনি। ব্যক্তি ও পারিবারিক গণ্ডির বাইরে গিয়ে দলে পরবর্তী নেতৃত্বের পথ রচনা করার কাজটি এখনও শুরু হয়নি।

জাতীয় পার্টিতে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে যারা বের হয়ে গেছেন তারা নিজেরাই নেতা হয়ে একনেতা নির্ভর দল গঠন করেছেন। জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) (জেপি) ইত্যাদি নানা উপদলে ভাগ হয়েছে। আসলে এসব বিভক্তি ও ভাঙনের পেছনে কোনো আদর্শ কাজ করেনি। কাজ করেছে ক্ষমতা ও নগদ প্রাপ্তি।

গত এক দশকে জাপা বহুবার ভাঙনের মুখে পড়েছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে জাপায় কোন্দল চরমে পৌঁছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে বিরাজ করে তীব্র ক্ষোভ ও দ্বন্দ্ব। একপক্ষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছে আরেক পক্ষ চায়নি। এ নিয়ে তুলকালাম কাণ্ডও হয়ে গেছে বহুবার। এর পেছনে শুধু দলের অর্ন্তকোন্দলই ছিল নাকি এর পেছনে আরও কারণ ছিল তা নিয়ে কথা হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের ভেতরের দ্বন্দ্ব বাইরে আসেনি, মানে দলে ভাঙন হয়নি।

তারপরও দলে আপাতত দুইটি গ্রুপ আছে। রওশন ও জিএম কাদেরপন্থী এ দু’টো গ্রুপ দলে বহুদিন ধরেই দৃশ্যমান। এনিয়ে এরশাদ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নির্দেশনা ও আদেশ জারি করেছেন। পরে আবার সেই আদেশ প্রত্যাখ্যানও করেছেন, করতে বাধ্য হয়েছেন।

গত নির্বাচনের আগে থেকেই এরশাদ অসুস্থ। বিদেশে চিকিৎসার জন্য গিয়েছেন। দলের ঐক্য বজায় রাখতে বা তার অবর্তমানে দল টিকিয়ে রাখতে কে হবেন জাপার পরবর্তী কর্ণধার, তা নিয়েও তার শঙ্কা ছিল। দলের একটি পক্ষ চেয়েছে রওশনকে সামনে নিয়ে আসতে, আরেক পক্ষ চেয়েছে জিএম কাদেরকে। এছাড়া আগে পরে অন্য পক্ষও সক্রিয় ছিল। তবে সর্বশেষ এই দুটি গ্রপই দৃশ্যমান ছিল। এরশাদ জানতেন হয়তো এ বিরোধ সহজে মিটবে না। তাই তিনি নিজের সম্পত্তি ওসিয়ত করে যাওয়ার পাশাপাশি দলের নেতৃত্বের বিষয়টিও ওসিয়তও করে গেছেন। এরশাদ জাপার গঠনতন্ত্রের ক্ষমতাবলে তার অবর্তমানে বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিদেশে থাকাকালে ছোট ভাই দলের কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।

এর আগে তিনি কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান করেছেন আবার সে আদেশ বাতিলও করেছেন। গত ১৪ জুন তার মৃত্যুর পাঁচদিনের মাথায় তার সেই ওসিয়তই পুরণ হলো। কারণ এরশাদ আজ অবর্তমান। তার অবর্তমানে আপাতত জিএম কাদের বর্তমান। দেখা যাক, এই বর্তমানকে জিএম কাদের ভবিষ্যতের কাছে নিয়ে যেতে পারেন কি-না। এই দিনকে তিনি সেই দিনের কাছে তিনি নিয়ে যেতে পারেন কিনা এটাই তার জন্য বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় তিনি পাস করলে ফেল করার হাত থেকে হয়তো বেঁচে যেতে পারে জাপা।

এরশাদুল আলম প্রিন্স: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম।

আরও পড়ুন: রাজনীতির ‘দুষ্টু বালক’ ও আমাদের ‘এরশাদ সিনড্রোম’

আরও পড়ুন: জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র