Alexa

শ্রীলঙ্কা: তোমার পাশে সারা বিশ্ব

শ্রীলঙ্কা: তোমার পাশে সারা বিশ্ব

ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তা২৪.কম

দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোর একাধিক গির্জা এবং হোটেলে সন্ত্রাসীদের সিরিজ বোমা হামলার খবর পেয়েই ফোন করি রবীন্দ্র পাথারানাকে। ফোনের অপর প্রান্তে তার কম্পিত কণ্ঠস্বর জানান দিচ্ছিল যে, সেখানে চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা চলছে।

সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও আমরা উদ্বিগ্ন চিত্তে লক্ষ্য করছিলাম, দ্রুতবেগে হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। রবীন্দ্রের সঙ্গে ফোনে বেশিক্ষণ কথা বলা সম্ভব হয়নি। তিনি সেদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্বে আছেন। সন্ত্রাসী হামলার মতো চরম ক্রাইসিসের সময় তিনি ব্যস্ত থাকবেন, এটাই স্বাভাবিক। তারপরেও ফোনে তিনি সংক্ষিপ্ত ভাবে জানান যে, তিনি ভালো ও নিরাপদ আছেন। তবে এ ঘটনায় তিনি 'হতবাক ও বিমূঢ়'। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, 'আমাদের মতো শান্ত প্রকৃতির নির্বিরোধী দেশে এমন জঘন্য ও ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হামলা হবে বলে কেউ কল্পনাও করেনি।'

সাধারণ মানুষের ভাবনার মধ্যে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী আক্রমণের আশঙ্কার বিষয়টি স্থান না পেলেও বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, গত ১১ এপ্রিল শ্রীলঙ্কার পুলিশ প্রধান দেশের সর্বত্র পাঠানো একটি অভ্যন্তরীণ ‘গোয়েন্দা সতর্কবাণী’তে দেশের উল্লেখযোগ্য গির্জাগুলোতে আত্মঘাতী বোমা হামলার আশঙ্কা করেছিলেন।

ধারণা করতে অসুবিধা হয় না যে, জনমনে আতঙ্ক ও ভীতি যাতে সৃষ্টি না হয়, সেজন্য পুলিশ প্রধানের বার্তাটি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বাদে অন্যদের কাছে গোপন ছিল। এ ধরনের সেনসিটিভ বার্তা সরকারের বিশেষ বিভাগগুলোর বাইরে সাধারণত গোপনই রাখা হয়। কিন্তু আগাম তথ্য ও বার্তা পাওয়ার পরেও প্রতিরোধমূলক কোনও ব্যবস্থা নিতে না পারার ব্যর্থতা দুঃখজনক।

একই রকমের কথা হামলার পর শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী রানিল ভিক্রামাসিংহে বলেছেন। তার ভাষায়, 'সরকারের কাছে এই ধরনের হামলার আগাম তথ্য ছিল। কিন্তু সরকার এই বিষয়ে নিবারক (প্রিভেন্টিভ) কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি।' লঙ্কান প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, 'তার কাছে যে তথ্য ছিল তাতে হামলাকারীরা স্থানীয় বলে বলা হয়েছিল।' শ্রীলঙ্কা সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে প্রাপ্ত বক্তব্যগুলোর নিরিখে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠে, 'জানা থাকা সত্ত্বেও কেন নিবারক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?'

সন্ত্রাসীদের প্রতি তীব্র নিন্দা জানানোর পাশাপাশি শ্রীলঙ্কা ও বিশ্বের মানুষ এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করবে এবং শ্রীলঙ্কার রক্তাক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে দক্ষিণ এশিয়া উন্নয়নশীল দেশসমূহের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলোকেও স্পষ্টভাবে দেখতে পাবে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, বৈশ্বিক চালচিত্রে দক্ষিণ এশিয়া রয়েছে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের চরম ঝুঁকির মধ্যে। প্রতিনিয়ত এই ঝুঁকি বাড়লেও সন্ত্রাসবাদ দমন ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা অর্জনের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিশেষ অগ্রসর হতে পারে নি।

শ্রীলঙ্কার দুঃখজনক ঘটনাটি থেকে সন্ত্রাসী হামলা প্রতিহতের দক্ষিণ এশিয়ান সক্ষমতার একটি পর্যালোচনাও পাওয়া যাচ্ছে। কারণ গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা এটি। কেবল হতাহতের সংখ্যা বিবেচনায়ই নয়, বরং এর ব্যাপকতার বিচারেও এই হামলাটিকে গত এক দশকের, এবং সম্ভবত গত কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলা বলে মানতে হবে।

একসঙ্গে ছয়টি হামলা চালানোর ঘটনাতে স্পষ্ট যে এটি একটি একক গোষ্ঠীর হামলা এবং অত্যন্ত পরিকল্পিত। হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল ধর্মস্থান এবং বিদেশি পর্যটকেরা। হামলার দিন হিসেবে এমন দিন বেছে নেওয়া হয়েছে যার ব্যাপক ধর্মীয় তাৎপর্য আছে।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, এমন সব হোটেলে হামলা হয়েছে যাতে দেশটির ইমেজ ও অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সিরিজ হামলার পর আরও দুটি বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। যার একটি হামলাকারীদের সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে অভিযানের সময়ে। পুলিশের ভাষ্য, এসব হামলার অন্তত একটি আত্মঘাতী হামলা। হামলার ধরন, লক্ষ্যবস্তু এবং পরিকল্পনার মাত্রা একটি ছোট গোষ্ঠীর কাজ বলে ইঙ্গিত দেয় না। বিশ্ব সন্ত্রাসবাদের একটি অংশ বলেই প্রতীয়মান হয়।

এই ধরনের একটি বড় ও সুপরিকল্পিত আকারের সন্ত্রাসী হামলার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন বলেই অনুমান করা যায়। কিন্তু শ্রীলঙ্কার গোয়েন্দারা তা আঁচ করতে পারলেন না এবং প্রতিরোধের ব্যবস্থাও নিতে পারেন নি, যা তাদের ব্যর্থতারই প্রমাণ।

'পার্ল অব ইন্ডিয়ান ওশান' বা 'ভারত মহাসাগরের মুক্তা' নামে পরিচিত অনিন্দ্য সুন্দর দেশ শ্রীলঙ্কার রয়েছে ভয়ঙ্কর ও রক্তাক্ত জাতিগত সংঘাতের ক্ষত। মূল সিংহলী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংখ্যালঘু তামিলদের দীর্ঘ মেয়াদী সশস্ত্র সংঘাত দেশটিকে নাজুক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছিল। শ্রীলঙ্কা সরকার চরম বলপ্রয়োগ করে তামিল বিদ্রোহীদের দমন কালে তামিল জনগোষ্ঠী চরম নিপীড়নের শিকার হয়।

শেষ পর্যন্ত শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শ্রীলঙ্কা স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অব্যাহত রাখে। চীন ও ভারতের মতো দুই শক্তিশালী প্রতিবেশীকে সামলে শ্রীলঙ্কা আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজেকে নিরাপদ রাখতেও সফল হয়েছিল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনিয়োগে দক্ষিণ এশিয়ার মানদণ্ডে দেশটির অগ্রগতি সত্যিই প্রশংসনীয়।

চরম সন্ত্রাসী হামলায় শ্রীলঙ্কার স্থিতি ও গতি ব্যাহত হবে, সন্দেহ নেই। হামলার প্রতিক্রিয়া ও প্রভাবকে ছোট করে দেখা যায় না। শ্রীলঙ্কান সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো হামলার ক্ষত মুছে সর্বাত্মক শান্তি সমুন্নত রাখা। সন্ত্রাসের প্রতিক্রিয়ায় আরও সন্ত্রাস ও অশান্তির উদ্ভব হলে দেশটির জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ ঘটবে। দেশের স্থিতি বিনষ্ট হয়ে অগ্রযাত্রার সচল চাকা অচল হয়ে যাবে। এমন কি, তামিল সংঘাতের সময়কালের ভয়াবহ দিনগুলোর পদধ্বনির পুনঃপ্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে দেশটি আরও পিছিয়ে যেতে পারে, যা মোটেও কাম্য নয়।

শান্তিপূর্ণ বিশ্ব তথা দক্ষিণ এশিয়া গড়তে শ্রীলঙ্কার সন্ত্রাসী ঘটনার বিরুদ্ধে সবাইকে একজোটে প্রতিবাদমুখর হতে হবে। জঙ্গিবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসের উৎসমুখ বন্ধে নিতে হবে সম্মিলিত প্রয়াস। আঞ্চলিক রাজনীতিকেও আরও সতর্ক হয়ে চলতে হবে, যাতে ক্ষমতার রাজনীতির ছত্রছায়ায় জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও মৌলবাদ কোনও জায়গা না পায়।

নিউজিল্যান্ডের ন্যক্কারজনক সন্ত্রাসী হামলার পর সারা বিশ্ব যেভাবে দেশটির শান্তিকামী মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও তেমনই নজিরবিহীন বিশ্ব ঐক্য দেখা গেছে। সারা বিশ্ব এসে দাঁড়িয়েছে শ্রীলঙ্কার পাশে। সন্ত্রাসের নিন্দা ও প্রতিবাদে মুখর মানবিক কণ্ঠস্বর প্রত্যাশা করছে, যেন কোনও অবস্থাতেই দেশটির নাগরিক নিরাপত্তা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্ট না হয়। তা হলে, সন্ত্রাসীদের চক্রান্তই সফল হবে।

অস্থিতিশীলতা ও অশান্তির যে আগুন সন্ত্রাসের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কায় লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে, তা যদি আরও অশান্তি ও সংঘাতের পথে চলে, তবে সন্ত্রাসীরাই বিজয়ী হবে এবং শ্রীলঙ্কা ক্রমে ক্রমে সংঘাতের আগুনে পুড়ে যাবে। একদা তামিল সংঘাতে ছারখার শ্রীলঙ্কা ধ্বংস ও অগ্নিকুণ্ডের ছাইভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতো নবজন্ম লাভ করেছে। আরেকটি অশান্তির আগুন যদি আবার প্রজ্বলিত হয়, তবে দেশটির অস্তিত্বই ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সন্ত্রাসীদের দুরাশা সফল হবে।

ফলে এই চরম সঙ্কুল পরিস্থিতিতে শান্তিকামী মানুষ ও আশাবাদী বিশ্ব শান্তির বার্তা নিয়ে একযোগে শ্রীলঙ্কার পাশে দাঁড়ানো কর্তব্য। বিশ্বের সকলের দায়িত্ব হলো সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের শেকড় নির্মূল করা এবং সন্ত্রাসীদের জ্বালানো হিংসার আগুনের প্রতিক্রিয়ায় নিরীহ ও নিরপরাধী মানুষ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তার কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

আপনার মতামত লিখুন :