Barta24

শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

মুজিবনগর সরকার, ইন্দিরা গান্ধী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা

মুজিবনগর সরকার, ইন্দিরা গান্ধী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা
মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান ছবি: বার্তা২৪
মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান


  • Font increase
  • Font Decrease

১০ এপ্রিল, ১৯৭১ মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলা গ্রামে মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। চরম ক্রান্তিকালে দেশের অভ্যন্তরে সরকার গঠনের এ ঘটনা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সরকারের অধিকাংশ কর্মকাণ্ড দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হতো বলে এ সরকারকে প্রবাসী মুজিবনগর সরকার বলে অভিহিত করা হতো। ১৯৭১ সালের এই দিনে ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে।

দুই.

মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখার জন্য বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয় (২৫ জুলাই, ২০১১) । তাঁর পুত্রবধূ সোনিয়া গান্ধী সেই সম্মাননা গ্রহণ করেন। পাশাপাশি ভারত সরকারকে ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ প্রদান করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য প্রবল আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি; মুক্তিযুদ্ধের সময় আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন স্থানের সীমান্ত খুলে দেয়া; প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয়; কলকাতায় প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী কার্যালয় স্থাপনে সহায়তা; বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে সব ধরণের সহায়তা প্রদান; বিশ্বব্যাপী জনমত গড়ে তোলা; মুক্তিবাহিনীকে প্রশিক্ষণ প্রদান; অস্ত্র-গোলাবারুদ জোগান এবং সর্বোপরি মুক্তিবাহিনীর সাথে যৌথ অভিযানে অংশ নিয়ে মাত্র নয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জনে ইন্দিরা গান্ধী, তাঁর সরকার এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী যে ভূমিকা রেখেছিলেন, সেই অবদানকে বাংলাদেশের জনগণ অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।

তিন.

২৫ মার্চ, ১৯৭১ পাকিস্তানের সামরিক সরকার ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর মাধ্যমে ঢাকাসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জাতিসংঘের যুদ্ধনীতি তোয়াক্কা না করে ইতিহাসের নির্মমতম গণহত্যা পরিচালনা করে এবং বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের করাচি নিয়ে যায়। তারপর অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে মিয়াওয়ালি লয়ালপুর জেলে (বর্তমানে ফায়সালাবাদ কেন্দ্রীয় কারাগার) দীর্ঘ প্রায় ১০ মাস আটক করে রাখে। গ্রেফতার হওয়ার প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা টেলিগ্রাফের মাধ্যমে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নানের কাছে পাঠাতে সক্ষম হন এবং এম এ হান্নান ২৬ মার্চ, ১৯৭১ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পাঠানো স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।

গণহত্যার সুবিধার্থে পাক সামরিক বাহিনী বেতার ও টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ করে দেয় এবং ঢাকায় কারফিউ জারি করে। বাংলাদেশের এমন দু:সময়ে ২৭ মার্চ, ১৯৭১ ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে বাংলাদেশের পাশে থেকে সকল সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দেন।

চার.

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব এবং চিফ অব স্টাফ জেনারেল শ্যাম মানেকশকে সমূহ যুদ্ধের জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করতে বলেন। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি সহায়তা অব্যাহত রাখলেও বেশ কিছু কারণে ভারত সরকার একটু দেরিতে বাংলাদেশ সরকারকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়।

কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল: (১) পূর্ব পাকিস্তানের উপর পশ্চিম পাকিস্তানের জুলুম, নির্যাতন ও বঞ্চনার ব্যাপারে বিশ্ববাসীকে বুঝতে সময় দেয়া; (২) বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ও তাঁর জীবনের ঝুঁকি থাকা; (৩) বাংলাদেশের নদী, হাওড়-বাওড়, জলাভূমির প্রাচুর্যতা ও বিস্তৃতি যুদ্ধের অনুকূলে না থাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনী শীতকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাওয়া; (৪) বিশ্বের গণমাধ্যমকে পাকিস্তানের প্রকৃত অবস্থা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে সময় দেয়া; (৫) সামান্য ভুলে যাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সমূহ সম্ভাবনা নষ্ট না হয়ে যায়; (৬) ৩য় বিশ্বযুদ্ধের কোনো সম্ভাবনা যেন তৈরি না হয়; (৭) ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাংলাদেশের মানুষের ন্যায়সঙ্গত চাওয়া, ভারতের কোনো নিজস্ব স্বার্থ এখানে জড়িত নেই’- বিষয়টি বিশ্ববাসীকে বুঝতে সময় দেয়া; (৮) ‘সৃষ্ট মুক্তিযুদ্ধ পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা বিদ্রোহ নয়’ বিষয়টি স্পষ্ট হতে সময় নেয়া প্রভৃতি।

পাঁচ.

১০ এপ্রিল, ১৯৭১ বাংলাদেশের অস্থায়ী মুজিবনগর সরকার গঠিত হয় এবং ১৭ এপ্রিল, ১৯৭১ অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাংবাদিকদেরকে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান, বন্দী বঙ্গবন্ধুর নি:শর্ত মুক্তি, পাকিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি ও বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ অনুরোধ করেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Apr/17/1555491313725.jpg

পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ২ আগস্ট, ১৯৭১ দেশদ্রোহিতার অভিযোগে কারাগারে আটক বঙ্গবন্ধুর বিচারের ঘোষণা দিলে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ভারতের প্রধান প্রধান শহর যেমন, কলকাতা, দিল্লী, বোম্বেতে মিথ্যা ও প্রহসনের বিচারের উদ্যোগের প্রতিবাদ জানায় এবং ইন্দিরা গান্ধী স্পষ্ট ভাষায় বিচার বন্ধের আহবান জানান ।

প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং তাঁর প্রশাসনকে বোঝাবার জন্য নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ইন্দিরা গান্ধী যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান এবং ৪ নভেম্বর, ১৯৭১ প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সঙ্গে ওয়াশিংটনে তাঁর বৈঠক হয়। আলোচনার সময় বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গটি উত্থাপন করা হলে নিক্সন তা উপেক্ষা করেন। নিক্সনের সাথে নৈশভোজে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মানুষের পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর রক্তক্ষয়ী লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছিল।

অবশেষে ৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করে।

ছয়.

শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করে পরাজিত পাক বাহিনী ৮ জানুয়ারি, ১৯৭২ বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি দেয়। স্বদেশের পথে ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ তিনি দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে (বর্তমানে ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট) যাত্রা বিরতি করেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, তাঁর মন্ত্রিসভার সব সদস্য এবং পদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাগণ বঙ্গবন্ধুকে বিনম্র শ্রদ্ধা ও উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।

দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজিয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জনককে রাষ্ট্রীয় অভিবাদন জানানো হয়। বঙ্গবন্ধুর সম্মানে আয়োজিত দিল্লীর প্যারেড গ্রাউন্ডের জনসভায় ইন্দিরা গান্ধী বক্তব্য শেষ করলে বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তব্য ইংরেজিতে শুরু করেন। কিন্তু, জনতার পক্ষ থেকে বাংলায় বক্তব্য প্রদানের প্রবল দাবি উঠে।

হৃদয়ে কৃতজ্ঞতা ও মুখে হাসির ঝলকানি নিয়ে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমার ভাই ও বোনেরা…আপনাদের প্রধানমন্ত্রী, আপনাদের সরকার, আপনাদের সৈন্যবাহিনী, আপনাদের জনসাধারণ যে সাহায্য এবং সহানুভূতি আমার দু:খি মানুষকে দেখিয়েছেন চিরদিন বাংলার মানুষ তা ভুলতে পারবে না…’৷

২০০৯ সালে বর্তমান সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে (২০০৯-২০১৪) ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অকুণ্ঠ সমর্থন ও অবর্ণনীয় আত্মত্যাগের মাধ্যমে নৈতিক, সাংস্কৃতিক, কূটনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক প্রভৃতিভাবে যারা সহায়তা করেছিলেন এমন ৫৬১ জন বিশ্বনেতা, ব্যক্তি ও সংগঠনের তালিকা তৈরি করেছিল। তখন পর্যায়ক্রমে সকলকে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। বর্তমান সরকারকে তার ৪র্থ মেয়াদে (২০১৯-২০২৪) সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা উচিত বলে আমরা মনে করি।

মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: পি.এইচ.ডি গবেষক, ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন এবং সাবেক সভাপতি, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ।

আপনার মতামত লিখুন :

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন

যমুনার পেটে জমি, পাহাড়ের পাদদেশে প্লাবন
প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

সারা দেশে আষাঢ়ের কান্না যেন থামতেই চাইছে না। অতিবৃষ্টিতে চারদিকে বন্যা শুরু হয়েছে; শুরু হয়েছে শ্রাবণ। শ্রাবণের কালো মেঘ কী বার্তা নিয়ে আসবে, জানি না!

আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে এসে হঠাৎ করে প্রৃকতি বিরূপ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি ঢল, নদীভাঙন ও বন্যা একসঙ্গে শুরু হয়েছে। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার, বান্দরবানে অতিবৃষ্টিতে বহু পাহাড় ধসে নিচে নেমে গিয়েছে। প্রৃকতি এতে ক্ষান্ত হয়নি। পাহাড়ি ঢল বার বার ধেয়ে আসছে।

রাস্তা, বাড়ি-ঘর ভূমিধসের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে। ধান-পাট, শাক-সবজি ডুবে যাচ্ছে। মাছের খামারের মাছ ভেসে গিয়ে মাছ চাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। বৃষ্টি ও সাগরের নিম্নচাপ মিলে মানুষের এক চরম ভোগান্তি শুরু হয়েছে।

পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ এই প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ এখন আতঙ্ক। তাই ভুক্তভোগীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বারবার মূল শহরের রাস্তায় থৈ থৈ পানি সবাইকে প্রহসন করছে। কৌতুক করে বলা হচ্ছে- ‘কী সুন্দুইজ্যা চাঁটগা নগর’, ‘ডুবে থাকা’ চট্টগ্রাম নগরীর সৌন্দর্য্য এই বর্ষায় আরো কয়েকবার দেখা যাবে সন্দেহ নেই’ ইত্যাদি।

উত্তরের জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, শেরপুর থেকে ভারত ও ভুটানের পাহাড়-পর্বতশ্রেণি বেশি দূরে নয়। ওপরে বেশি বৃষ্টি হলেই ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে অকাল বন্যা দেখা দেয়। পূর্বে সিলেটে নেমে আসে আসাম ও শিলংয়ের পাহাড়ি ঢল। আগে প্রাকৃতিকভাবে এই ঢলের পানি নদী দিয়ে সাগরে চলে যেত। হাওড়ের মানুষ কৃত্রিমভাবে ধান বা মাছের চাষও করতো না। তাই ঢলের পানির ক্ষতিকর দিকের কথা তেমন শোনাও যেত না।

এখন চারদিকে নানা প্রকার উন্নয়ন শুরু হয়েছে। অপরিকল্পিত ও অযাচিত উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর মানুষের নির্দয় হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। মানুষ প্রয়োজন পূরণের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চলেছে। তাই প্রকৃতিও মানুষের প্রতি নির্দয় হয়ে নিষ্ঠুর আচরণ শুরু করেছে। ধরলা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি বেড়ে গিয়ে বন্যার সাথে প্রচণ্ড নদীভাঙন শরু হয়েছে। তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। আশঙ্কার কথা হলো- নদীভাঙনে বাস্তহারাদের চাপে পুরো উন্নয়ন প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্থ হতে পারে।

পরিবেশ কারো একার সম্পত্তি নয়। পরিবেশ সারা পৃথিবীর সব মানুষের সম্পত্তি। তাই পরিবেশ সংরক্ষণে নীতি নির্ধারণে সবার কথা শোনা উচিৎ।

আমাদের চারদিকে আরো অনেক সমস্যা বিরাজমান। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ (হ্যাজার্ডস যেমন-সাইক্লোন, বন্যা) ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় (যেমন- ফসলহানি, প্রাণহানি) এত বেশি ক্ষতিকর যে, প্রতিবছর আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে অনেক পেছনে ঠেলে দেয়। এগুলোকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখা উচিৎ নয়। মনুষ্যসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় (ক্যালামিটিস/ হ্যাজার্ডস্) ঠেকাতে সব মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে আমাদের নিজেদের চেষ্টার মধ্যে একাই করব, একাই খাব নীতি পরিহার করা উচিৎ। অন্যথায়, একজন তৈরি করবে অন্যজন নষ্ট করার পাঁয়তারা করতে পারে- তারা দেশি হোক বা বিদেশি লবিস্ট হোক।

উন্নয়নের নামে পাহাড় কাটা, অবাধে গাছ নিধন করা, কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, নদী দখল ও ভরাট করে স্থাপনা বানিয়ে স্বাভাবিক পানি চলাচলের পথ রুদ্ধ করা- এসব আজকাল যেন কোনো অপরাধই নয়! পাহাড়ে প্রয়োজনীয় গাছ নেই- তাই সামান্য বৃষ্টিতে মাটি গলে ধসে মানুষের মাথার ওপর পড়ছে। ওই কাদামাটি নিকটস্থ নদীতে গিয়ে নদীকে ভরাট করে নাব্যতা নষ্ট করে দিচ্ছে।

উন্নয়নের নামে পাহাড়-সমতলের সব বড় বড় গাছ কেটে উজাড় করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সরকারি রাস্তার পাশের তাল- নারকেলসহ ছায়াদানকারী বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করায় সারাদেশে বজ্রপাত বেড়ে গেছে এবং ভয়ংকরভাবে মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এখন বজ্রপাতে মৃত্যুর ভয়ে কৃষকরা মাঠে কাজ করতে যেতে ভয় পায়।

এছাড়া উত্তরাঞ্চলে ক্রমাগতভাবে ধরলা-তিস্তা-যমুনার পেটে ফসলি জমি বিলীন হয়ে বাস্তহারা মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং চট্টগ্রামে পাহাড়ের পাদদেশে পুনঃপুনঃ প্লাবনপানি ও মাটিধসের দুর্যোগ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়েই যাচ্ছে। এতে কারো যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে সেটা দেশের পুরো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ভণ্ডুল করে দিতে পারে। এসব মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি কি আমাদের আছে?

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের একটি মন্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন 'সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না'। এ কথাটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকতাদের দুর্নীতি আজ নতুন নয়। তবে সব কর্মকর্তাও এক নয়। সংখ্যায় সীমিত হলেও  অনেক অফিসার আছেন যারা সততার সাথে অনেক কষ্টে  জীবনযাপন করেন। তাই সকলকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুদক নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অনেক আগে, তবে কিছু দিন পূর্বে ছোটখাটো দুর্নীতি ধরতে সোচ্চার দেখে আমরা কিছুটা হলেও খুশি হয়েছি। এ জন্য যে এবার অন্তত দুদক চেয়ারম্যান নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হয় কিনা বা সকল শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসছেন কিনা তা যাচাই করতে। 

আমরা মনে করেছি, তিনি একবার যেহেতু ঘর থেকে বেরিয়েছেন, বাংলাদেশের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে, বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছেন, সরকারি কর্মকতা, রাজনীতিবিদের দুর্নীতি থামানো অসম্ভব। তার কাছে তো অনেক উদাহরণ আছে।

যাক সেসব কথা। এবার আলোচনা করা যাক, তিনি কেন বলেছেন যে সরকারি কর্মকরা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না। তিনি কি আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেয়েছেন?  নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

কারণ ব্যাখ্যার আগে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে দুই-চার কথা না বললেই নয়। ওনারা সরকারিভাবে সে বৃটিশ আমল থেকে সুরক্ষিত। ওনারা সমাজের উপরে থাকেন। ওনাদের পল্লীর নাম ভদ্রপল্লী। ওনাদের সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগ। সব কিছুই ওনারা নির্মাণ ও পরিচালনা করেন। সকল সুযোগ-সুবিধা ওনাদের জন্য। এ কারণে ওনাদের আচরণে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ জন্য তাদের সঙ্গে জনগণের একটা দুরত্ব কাজ করে। ফলে তাদের সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্যের পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, তা জানার আগেই পত্র-পত্রিকা,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। আসলে দুদক চেয়ারম্যান কী বোঝাতে চেয়েছেন বা জনগণ কী বুঝেছে তা পরিষ্কার নয়।

আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, এখানে দুদক চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে বুঝাননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের অনিচ্ছায় বা ভালো  উদ্দেশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে কারো ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য ঐ কর্মকতাকে দুর্নীতি পরায়ণ বলা যাবে না। এটাকে দুদক চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাস' বলেছেন। যদি ঐ কর্মকর্তা  ইচ্ছাকৃত ভুল করেন বা টাকার বিনিময়ে করেন বা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেন, তা সরল বিশ্বাস নয়। এখানে অসততা আছে। এটাই দুর্নীতি।

আমার  হয়তো বুঝতে ভুল হতে পারে আর যদি হয়ও তা কিন্তু সরল বিশ্বাসে। আমি এ বিষয়টি এ জন্যই উপস্থাপন করলাম, কারণ দুদক চেয়ারম্যানের কথার অর্থ যদি সরকারি কর্মকর্তারা ভুল বোঝেন, তাহলে তো সর্বনাশ! তারা তো সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা শুরু করবেন। অবস্থা তখন হবে, ‘একদিকে নাচুনি বুড়ি অন্য দিকে ঢোলের বাড়ি’-র মতো। আমার এ লেখা শুধু ওইসব দুর্নীতি পরায়ণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য।

অতএব, দয়া করে সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন: সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি অপরাধ নয়: দুদক চেয়ারম্যান

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র