Barta24

বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ৬ ভাদ্র ১৪২৬

English

বিষন্নতার চাদরে ঢাকা পহেলা বৈশাখ

বিষন্নতার চাদরে ঢাকা পহেলা বৈশাখ
প্রভাষ আমিন/ছবি: বার্তা২৪.কম
প্রভাষ আমিন


  • Font increase
  • Font Decrease

বাংলাদেশে যতগুলো উৎসব আছে, আমার সবচেয়ে প্রিয় বর্ষবরণ। এই একটি উৎসবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ মন খুলে অংশ নিতে পারে। এমনকি আদিবাসীরাও বৈসাবী উৎসব নিয়ে সামিল হয় বাংলা বর্ষবরণে। এই একটি দিনে বাংলার ঘরে ঘরে আনন্দের বান ডাকে যেন।

আমাদের এ অঞ্চলে উৎসবের কমতি নেই। ছেলেবেলায় আমরা সব উৎসবেই সামিল হতাম। মুসলমানদের দুই ঈদের উৎসব তো আছেই। আমরা শবে কদর, শবে মেরাজ, শবে বরাতকেও উৎসব বানিয়ে ফেলতাম। এই তিনটি উৎসবই রাতে। তাই আমরা অবধারিতভাবে রাতে ইচ্ছামতো ঘুরে বেড়ানোর স্বাধীনতা পেয়ে যেতাম।

ছুটিটা পেতাম আসলে মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য। কিন্তু মসজিদে একটু হাজিরা দিয়ে আমরা রাতভর ঘুরে বেড়াতাম। রাতে বাইরে থাকার আনন্দটাই অন্যরকম। এর মধ্যে শবে বরাতে উৎসবটা বেশি হতো। সন্ধ্যার পর গোসল করে ঘরে ঘরে মোমবাতি জ্বালিয়ে আলোকসজ্জ্বা করতাম।

আর হিন্দু সম্প্রদায়ের তো বারো মাসে তেরো পার্বণ। তার অনেকগুলোতে আমরা অংশ নিতাম। আমাদের ছেলেবেলা ছিল উৎসবময়। আমাদের এলাকায় খ্রিস্টান বা বৌদ্ধ ধর্মের কেউ ছিল না বলে বড়দিন বা প্রবারণা পূর্ণিমার আনন্দটা ছেলেবেলায় মিস করেছি। কিন্তু বড় হয়ে দেখেছি, বড়দিনের ক্রিসমাস ট্রি বা সান্তা ক্লজের উপহার আর প্রবারণা পূর্ণিমার ফানুস ওড়ানোও কম আনন্দের নয়।

ধর্মীয় প্রার্থনার অংশটুকু যার যার মতো। এর বাইরে সব ধর্মের সব উৎসবই আনন্দের, আমাদের সবার। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। তবে পহেলা বৈশাখের উৎসবের কোনো তুলনা নেই। সব ধর্মের মানুষ মন খুলে এ উৎসবে মেতে উঠতে পারে। গ্রামে গ্রামে বৈশাখী মেলা, হরেক খাবার, হরেক খেলনা, নাগরদোলা; সত্যিই যেন আনন্দের মেলা বসে। এ উৎসবে ধর্মের কোনো ছোঁয়া নেই। এ হলো সত্যিকারের বাঙালির প্রাণের মেলা।

বাংলাদেশে তিনটি সাল আমরা ব্যবহার করি। আমাদের ধর্ম, জাতীয়তা বা সংস্কৃতির সঙ্গে যার কোনো মিল নেই, সম্পর্ক নেই; সেই খ্রিস্টাব্দ ব্যবহার করি সবচেয়ে বেশি। অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সর্বত্রই খ্রিস্টাব্দের জয়জয়কার। আমরাও ইংরেজি মাসের তারিখ যতটা জানি, বাংলা বা হিজরি মাসের তারিখ ততটা জানি না। খ্রিস্টাব্দে ‘নিউ ইয়ার’ যতটা উদযাপিত হয়, তার চেয়ে বেশি হয় ‘থার্টি ফার্স্ট’। হিজরি সাল বা আরবি ক্যালেন্ডার প্রতিদিন না লাগলেও আমাদের নিয়মিতই লাগে। ইসলাম ধর্মের সব হিসাব-নিকাশ এই চান্দ্র মাস বা হিজরি সাল ধরেই হয়। তবে হিজরি সালে নববর্ষ বা নিউ ইয়ার উদযাপনের রেওয়াজ নেই। বরং হিজরি বর্ষের প্রথম মাস মহররম আসে কারবালার শোকাবহ স্মৃতি নিয়ে। তবে বাংলা বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ আমাদের জীবনে আসে উৎসবের ডালি সাজিয়ে- গানে, মেলায়, উৎসবে, রঙে অনন্য হয়ে। মৌলবাদীদের কেউ কেউ পহেলা বৈশাখকে হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি বলেন, এর বিরোধিতা করেন। কিন্তু বাংলা সনের সঙ্গে কোনো ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। কিছুটা সম্পর্ক থাকতে পারে ইসলাম ধর্মের সঙ্গে। কারণ বাংলা সন গণনা চালু করেছিলেন মোগল সম্রাট আকবর।

বাংলা সনের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই, সম্পর্ক হলো কৃষিকাজের, কৃষকের। শুরুতে এটাকে ফসলি সনও বলা হতো। ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্য শুরুর পর হিজরি সাল অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় হতো। কিন্তু হিজরি সাল চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সঙ্গে মিলতো না। প্রতিবছরই হিজরি সালে দিনের ওলটপালট হয়ে যায়। তাই কৃষকদের ওপর অসময়ে খাজনা দেয়ার চাপ তৈরি হতো। এই ঝামেলা মেটাতেই সম্রাট আকবরের নির্দেশে প্রাচীন বর্ষপঞ্জি সংস্কার করে ফসলি সন বা বাংলা সন চালু করা হয়। আর এই সংস্কারের কাজটি করেছিলেন তখনকার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি। তিনি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম চালু করেন। আকবরের সময় থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সব খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। সব দেনা মিটিয়ে পহেলা বৈশাখ শুরু হতো নতুন আশা নিয়ে। ব্যবসায়ীরা নতুন বছর শুরু করতেন নতুন খাতা দিয়ে, যেটাকে বলা হয় হালখাতা। হালখাতা উৎসবও হয়। ব্যবসায়ীরা পাওনা আদায়ে উৎসব করতেন।

পহেলা বৈশাখের উৎসবটা হিন্দুয়ানি যেমন নয়, ইসলামিকও নয়; পহেলা বৈশাখ খাঁটি বাঙালির সংস্কৃতি, এই মাটির সংস্কৃতি।

আমরা শহুরে লোকজন যতই দেয়ালে ইংরেজি ক্যালেন্ডার ঝুলিয়ে রাখি, গ্রামের মানুষের সব হিসাব কিন্তু বাংলা সনে। তাদের ক্যালেন্ডার লাগে না, আকাশ আর প্রকৃতি দেখেই মাস-ঋতুর হিসাব মেলায়। বাংলা মাসগুলোকে গ্রামের মানুষ ডাকেও নিজেদের মত করে। জ্যৈষ্ঠ মাস তাদের ভাষায় জষ্ঠি, কাতি মানে কার্তিক, অগ্রহায়নকে ডাকে আগুন, ফাল্গুনকে ফাগুন, আর চৈত্র হলো চইত মাস।

বৃষ্টি-বাদলা, ঝড়-বন্যা-খড়ার হিসাব তাদের মুখস্ত। প্রকৃতির দিকে তাকালেই বোঝা যায় কোন ঋতু চলছে। কৃষ্ণচূড়ার মত কড়া রঙের ফুল মানেই গ্রীষ্মকাল, গন্ধরাজের মত সুগন্ধী মানেই বর্ষা, কাশ মানেই শরত, পলাশ মানেই ফাল্গুন।

আগেই বলেছি বাংলা বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ আমাদের জীবনে আসে উৎসবের ডালি সাজিয়ে- গানে, মেলায়, উৎসবে, রঙে অনন্য হয়ে। কিন্তু এবার নতুন বছরটি আসছে বিষাদের চাদর বিছিয়ে। ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাতের নিষ্ঠুর মৃত্যু বিষন্নতায় ঢেকে দিয়েছে বর্ষবরণের সব আয়োজন।

আসলে বর্ষবরণের নানা আয়োজনের প্রস্তুতি চলে দীর্ঘ সময় ধরে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আয়োজন চলছে, তবে তাতে প্রাণ নেই, রঙ নেই। অনেকেই রঙিন পোশাক ফেলে কালো পোশাকে বর্ষবরণ করছেন। আসলেই জীবন থেমে থাকে না। নুসরাত মরে গেছে। তবুও আমাদের জীবনে উৎসব আসবে, নতুন বছর আসবে।

কেঁদে কেটে আমরা নুসরাতকে ফেরাতে পারবো না। তবে জারি রাখতে পারবো প্রতিবাদ। চেষ্টা করতে পারবো নুসরাত হত্যার সুষ্ঠু বিচার, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিত করার। নুসরাতদের জন্য একটা নিরাপদ দেশ গড়ার দায়িত্ব আমাদের সবার। এমন বিষন্ন বৈশাখ যেন আর কখনো না আসে।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

আপনার মতামত লিখুন :

চামড়া কারসাজিতে খর্বিত কোরবানিদাতা ও দুঃস্থ-এতিমের অধিকার

চামড়া কারসাজিতে খর্বিত কোরবানিদাতা ও দুঃস্থ-এতিমের অধিকার
প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

গত আট দিন যাবৎ পত্রিকার পাতা উল্টাতেই কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে কারসাজি ও দুরবস্থার সংবাদগুলো খুব ব্যথিত করছে। কারণ আমাদের অর্থনীতিতে এর প্রভাব যেমন শঙ্কাজনক ও সমাজনীতিতে তেমনই মর্মস্পর্শী। এই দ্বিবিধ শঙ্কার মধ্যে বাংলাদেশ হাইড এন্ড স্কিন মার্চেন্টস এসোসিয়েশন (বিএইচএসএমএ)-এর সভাপতি জানালেন এই সংকট সৃষ্টির জন্য সিংহভাগ দায়ী দেশের ট্যানারিমালিকগণ। এ বিষয়টিকে শুধু দুঃখজনক বললে ভুল হবে। এর পেছনের গভীর বিষয়গুলোকে দেশের স্বার্থে খুবই মনোযোগের সাথে সংশ্লিষ্ট সবার আমলে নেয়া উচিত।

ঈদের শেষে সুনামগঞ্জের সৈয়দপুর গ্রামে এক মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সংগৃহীত চামড়াগুলো দু’দিন পেরিয়ে যাবার পরও বিক্রি না হলে সংরক্ষণের অভাবে ও পরিবেশ দূষণের ভয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছিল। মাদরাসায় গরীব, এতিম শিক্ষার্থীরা প্রতিবছরের মতো এবারও নিজেরা ভ্যান-রিকশা ভাড়া করে ৮০০টি ছাগল ও ১০০টি গরুর চামড়া সংগ্রহ করেছিল। দাম পাবার আশায় নিজেরা কিছু লবণ কিনে সংরক্ষণের চেষ্টা করেছিল। এজন্য তাদের ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে। কিন্তু চামড়ার দাম না থাকায় কোথাও বিক্রি করতে না পেরে প্রতিবাদ জানিয়ে সেগুলো কবরস্থ করেছে। এ সংবাদ শুনে সেখানকার এক টি.এন.ও-র মন্তব্য হলো- ‘মাদরাসার লোকেরা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য’ চামড়াগুলোর কবর দিয়েছে! এমন একটি অর্থনৈতিক ক্রান্তির বিষয়কে নিয়ে সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তি এমন দায়সারা কথা বলতে পারেন তা জাতির জন্য বড়ই দুর্ভাগ্যের বিষয়। বিসিএস পাশ করা একজন কর্মকর্তা যখন এমন অর্বাচীন কথা বলে পার পেতে চান তখন বলার কিছুই থাকে না। চামড়াগুলো যদি এখন পর্যন্ত খোলা জায়গায় থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতো তাহলে তিনি নিজে কী করতেন?

আজকাল সবকিছুকে তাচ্ছিল্য করে দেখা, মন্তব্য করা আমাদের মজ্জাগত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক মন্ত্রী সেদিন ডেঙ্গু নিয়ে বললেন- দেশের উন্নতি হচ্ছে তাই ডেঙ্গু ছড়াচ্ছে। কোনো দেশের উন্নতি হলে ডেঙ্গু ছড়ায় এটাও অবিবেচকের মত বচন বৈ কি? সুষম উন্নতি হলে জনদুর্ভোগ কমে। আর অপরিকল্পিত, অসম উন্নয়ন হলে জনদুর্ভোগ তৈরি হয়। যেমন, ঈদুল আযহার পূর্বে হঠাৎ করে ভঙ্গুর রেল লাইনের মধ্যে কয়েকটি নতুন ঈদ স্পেশাল ট্রেন চালানোর ঘোষণা দেয়া হলো। অর্থাৎ একটি চালু নির্ধারিত ট্রেনের সময়সূচিকে বাধাগ্রস্ত করে আরেকটি উপযাজক ট্রেন উড়ে এসে জুড়ে বসলো। ফলে সব ট্রেনের সময়সূচিতে হট্টগোল বেধে গিয়ে এক মহা বিপর্যয়ের ও বিড়ম্বনার ঈদ যাত্রা দেশবাসী উৎকণ্ঠার সাথে প্রত্যক্ষ করলো। এখানেও সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনার অভাব। এভাবে হঠাৎ ব্যতিক্রমী উন্নয়ন ভাবনা আমাদের স্বাভাবিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে জনদুর্ভোগ তৈরি করছে, যা নি:সন্দেহে তাদের জনপ্রিয়তাকে কমিয়ে দিচ্ছে।

কিছুদিন আগে কিছু আনাড়ি কর্মকর্তাদের দেখা গেছে ধান ক্ষেতের পাশে পাজেরো থামিয়ে দলবল নিয়ে উপযাচক হয়ে কৃষকদের ধান কেটে দিতে। কেউ কেউ হাটে গিয়ে দু’একদিন ধান কিনে পত্রিকার শিরোনামও হয়েছেন। তাতে কি ধানের দাম এক পয়সা বেড়েছে? প্রান্তিক কৃষকরা কি কোন প্রকারে লাভবান হয়েছে? ধান ক্ষেতে আগুন দেয়াকে কেউ কেউ গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। শেয়ার বাজারের ধ্বসকে অদৃশ্য হাতের কারসাজি বলেছেন। ডেঙ্গুর মৃত্যু সংখ্যা নিয়ে এখনও সরকারি ও বেসরকারি সংখ্যার মধ্যে বিরাট অমিল। আগামী সেপ্টেম্বর মাস নাকি ডেঙ্গু জ্বরের পিক সিজন! ২০১৮ সালে আগস্ট মাসে ১৭৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। অথচ এবারের আগস্ট মাসের ১৪ দিন না পেরুতেই ২৬ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। কীটপতঙ্গের জীবাণু নিয়ে গবেষণা করেন এমন একজন সহযোগী অধ্যাপক জানালেন- ডেঙ্গু জীবাণুর ক্যাটাগরি ও চরিত্র বদল হয়েছে। সি এবং ডি ক্যাটাগরিতে সাধারণ ওষুধের বিপরীতে ওদের ক্ষমতা বেড়ে গিয়ে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। তাই ডেঙ্গুরোগ প্রতিকারে আমাদের নিত্যনতুন গবেষণা চালানো প্রয়োজন। এ বিষয়ে শুধু বাক্যবাগিশ না হয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নতুন করে ব্যবহারিক গবেষণায় মনোযোগী হতে বলেছেন তিনি। এজন্য বিশেষ তহবিল গঠনও জরুরী। এই মানবিক বিপর্যয়কে এড়াতে হলে সবাইকে জরুরী ভিত্তিতে কাজে নেমে পড়তে হবে।

ডেঙ্গুরোগ যেমন আমাদের চেতনাকে মানবিক পর্যায়ে নাড়া দিয়েছে ঠিক তেমনি কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে কারসাজি ও দুরবস্থার সাম্প্রতিক চিত্রগুলো আমাদের অর্থনীতি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিকে নাড়া দিয়েছে। একটি পত্রিকা উল্লেখ করেছে- ‘এতিম গরীবদের হক মেরে দিল চামড়া ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট’। ঢাকার মহাখালীর এক মাদ্রাসা শিক্ষক মাওলানা আওলাদ হোসেন জানিয়েছেন, সে এলাকার মানুষ কোরবানির চামড়া মাদরাসার ফান্ডে দেন। চামড়া বিক্রির এই টাকা এতিম ও দরিদ্র শিশুদের পড়াশুনা ও খাবারের খাতে খরচ করা হয়। দেশে সুনামগঞ্জ ও মহাখালীতেই শুধু নয়-এ ধরণের হাজার হাজার বেসরকারি সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এতিম, অসহায়, অবহেলিত শিশু শিক্ষার্থীরা কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে পড়াশুনা ও খাবারের খরচ মিটিয়ে থাকে।

অপরদিকে চট্টগ্রামে একলক্ষ চামড়া রাস্তা থেকে বর্জ্য হিসেবে তুলে নিয়ে গেছে সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা। আমার এক সহকর্মী বলেছেন তিনি তাঁর কোরবানির চামড়াটিকে বরাবরের মত বাসার দারোয়ানকে দান করেছিলেন। কিন্তু দারোয়ান কোথাও সেটার সুব্যবস্থা করতে না পেরে কোন এক পুকুরে নিক্ষেপ করে এসেছে। পত্রিকায় জানা গেল ট্যানারিগুলোতে গতবছরের কোরবানির চামড়া এখনও অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। এর কারণ কী? জুতা, ব্যাগ, পোল্ট্রি ফিড ইত্যাদি বানানো ছাড়া চামড়ার কি আর কোন বিকল্প ব্যবহার নেই? এতদিন বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হলেও এখন কীজন্য সেটা অর্জিত হচ্ছেনা? সেটা ভেবে দেখার বিষয়। বিদেশে পশু শিং ও চামড়ার বহুমুখী ব্যবহার রয়েছে। আমাদের দেশেও সেটার ব্যবহার বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে। জাপানের কুমামোতো জেলার ঐতিহ্যবাহী দামী স্যুপ জাতীয় খাবার তৈরি হয় গরুর ‘নাইজো’ অর্থাৎ ভুঁড়ির কালো খসখসে অংশটা দিয়ে ও ঢাক-ঢোল বানানো হয় চামড়া দিয়ে। আমাদের দেশেও চামড়া দিয়ে নানা বাদ্যযন্ত্র বানানো হয়। দেশের পটুয়াখালীতে বিভিন্ন এলাকায় গরুর মাথার চামড়া দিয়ে এক ধরনের রান্নার প্রচলন রয়েছে যা বিভিন্ন পদের ও স্বাদের। এছাড়া গরুর চামড়া দিয়ে এক ধরনের সুস্বাদু শুকনো আচার তৈরি করা যায় এবং সংরক্ষণ করে বছরব্যাপী খাওয়া যায়। কাঁচা চামড়া রফতানি করলে দেশের নব সম্প্রসারিত ট্যানারি প্রকল্পসহ এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প ধ্বংস হবে এবং ট্যানারি শ্রমিকেরা কর্মহীন হয়ে পড়বে।

এ বছর কোরবানির পশুর চামড়া কেনাবেচা শুরুর আগে আড়তদারদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করেননি ট্যানারি মালিকগণ। বিএইচএসএমএ-সভাপতি জানিয়েছেন ট্যানারি মালিকগণ এ বছর ব্যাংকের নিকট থেকে ৬১০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েও আড়তদারদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করেননি। এজন্য একটি ট্যানারির বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও হয়েছে। ঐ ট্যানারি মালিক আদালতে টাকা প্রদানের অঙ্গীকারনামায় সই প্রদান করলেও এখন পর্যন্ত টাকা পরিশোধ করা হয়নি বলে জানানো হয়েছে। ট্যানারি মালিকদের কারণে গত দু'বছর লোকসানে পড়ে মৌসুমি সৌখিন চামড়া ব্যবসায়ীরা এবার ভয়ে চামড়া কিনতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে মাঠে নামেননি। ফলে ক্রেতা সংকটে চামড়ার দাম শূন্য হয়ে বিড়ম্বনা ও চরম সংকটে রূপ নিয়েছে।

গত বছর ট্যানারি মালিকেরা ঈদের সময় আড়তদারদের বকেয়া ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছিলেন। এবার তারা মাত্র ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা দিয়েছেন। ফলে বাজারে নগদ অর্থ সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

এছাড়া আড়তদাররা ব্যাংকের নিকট থেকে কোনো অর্থ সহায়তা পাননি। এটাও আমাদের অর্থনীতির ওপর কালো থাবা। দেশের জনস্বাস্থ্যের বর্তমানে ক্রান্তিকাল চলছে। তার ওপর পরিবেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়া বিদ্যমান। এমতাবস্থায় দেশের এককালের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি আয়ের উৎস চামড়া শিল্পকে সিন্ডিকেটের কালো থাবা থেকে বাঁচানো জরুরি এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট অসহায়, এতিম শিশু শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা এবং গরীব, দুঃস্থ, দুখী মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সবাইকে এগিয়ে আসা জরুরি। পাহাড় সমান লাভ করার লোভ, প্রতারণার সিন্ডিকেট বানিয়ে কারসাজি করে যারা মানুষকে কষ্ট দেন, দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করার কাজে লিপ্ত থাকেন তাদের ব্যাপারে সরকারকে সচেষ্ট থাকতে হবে ও এতিম, অসহায়, অবহেলিত শিশু শিক্ষার্থীদের দুরবস্থা সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে এসে সহায়তা করতে হবে।


*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।

সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্পের বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে ভাবতে হবে

সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্পের বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে ভাবতে হবে
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

বাংলাদেশের অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও রফতানিমুখী অর্থনৈতিক খাত চামড়াশিল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। চামড়াশিল্পের বিকাশে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অভাব, চামড়া শিল্পনগরীতে সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি, বর্জ্য ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন (সিইটিপি) সমস্যা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ট্যানারি মালিকদের কারসাজি, আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতন, ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তি ও আদায়ে দীর্ঘসূত্রতা প্রভৃতি কারণে চামড়াশিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহল থেকে বলা হচ্ছে।

এর বাইরে একটি বড় বিষয় হলো, বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সেক্টরগুলো সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি। ধান, পাট, শেয়ারবাজার, ঠিকাদারি- সবখানে এক শ্রেণির অসৎ ও দুর্বৃত্তের অবাধ বিচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দ্রব্যমূল্য ও বাজার ওঠা-নামার পেছনেও তাদের কালোহাত সক্রিয়।

চামড়ার ক্ষেত্রে একই পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়। ফলে, আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, কোনো কোনো স্থানে গরুর চামড়া সর্বনিম্ন ৫০ এবং ছাগলের চামড়া মাত্র ২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে! খোদ বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু বিশ্বাসের মতে, চামড়ার দাম অবিশ্বাস্য হারে কমে যাওয়ার পেছনে রয়েছে ব্যবসায়ীদের কারসাজি। জানা দরকার ৫০ বছরের ইতিহাসে এটাই চামড়ার সর্বনিম্ন রেট।

সরকারের পক্ষ থেকে এবার গরুর কাঁচা চামড়ার দাম ঢাকায় নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। আর ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। সারা দেশে খাসির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৩ থেকে ১৫ টাকা। বিগত সাত বছরের মধ্যে সরকার নির্ধারিত এটাই সর্বনিম্ন রেট। ২০১৩ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল সর্বনিম্ন ৮৫ আর সর্বোচ্চ ৯০ টাকা। একইভাবে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়ার দর নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল সর্বনিম্ন ৫০ আর সর্বোচ্চ ৫৫ টাকা। কিন্তু কোনো আড়তদার বা ট্যানারির মালিক এ দামে চামড়া কিনতে সম্মত হননি। বলা বাহুল্য, আমাদের দেশের চেয়ে ভারতের আভ্যন্তরীণ বাজারে চামড়ার মূল্য ছিল বেশি।

ন্যায্য দাম না পেয়ে ঢাকার লালবাগ, কুমিল্লা, সিলেট, মৌলভীবাজার, রাজশাহী, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ কোরবানির চামড়া রাস্তায় রেখে গেছে; ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে অথবা মাটিতে পুঁতে ফেলেছে। সিলেট পৌর কর্তৃপক্ষ ১০ টন চামড়া ভাগাড়ে নিক্ষেপ করেছে। মৌলভীবাজারে এক লাখ চামড়া পচে গেছে। অনেকে চামড়াকে লোমমুক্ত করে রান্না করে খাওয়ার সচিত্র বর্ণনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন।

কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে চট্টগ্রামে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। অস্বাভাবিক দরপতনের কারণে আড়তদারদের কাছে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে নগরীর বিভিন্ন স্থানে এক লাখেরও বেশি কোরবানির পশুর চামড়া বাধ্য হয়ে রাস্তায় ফেলে দেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। রাস্তা থেকে সেই পচা চামড়া ট্রাকে করে দুটি আবর্জনার ভাগাড়ে ফেলেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। এ অবস্থায় মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনও অনেকটা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, 'এ ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও নজিরবিহীন। এর পেছনে কোনো চক্রান্ত আছে কি না, তদন্ত হওয়া উচিত।'

তাই প্রশ্ন উঠেছে, চামড়ার বাজার ধ্বংসের পেছনে সিন্ডিকেট কাদের স্বার্থে কাজ করছে? অপরদিকে, আড়তদারদের বক্তব্য হলো, ট্যানারি মালিকদের কাছে তাদের ৫০ কোটি টাকা বকেয়া পাওনা থাকায় অর্থাভাবে তারা চামড়া কিনতে পারেননি। উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে আড়তদারের সংখ্যা ২৬২। ইতোমধ্যে বেশ কিছু ট্যানারি বন্ধ হয়ে গেছে।

চামড়াশিল্পে বিপর্যয় নেমে আসার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মোসুমি কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন এতিমখানা কর্তৃপক্ষ। ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারিয়ে পথে বসে গেছেন। চামড়া বিক্রি করলে তা অনাথ, এতিম, দরিদ্র ও দুস্থদের দান করাই শরিয়তের বিধান। এই স্বেচ্ছাদানের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মাদরাসা, হিফজখানা ও এতিমখানার লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের শিক্ষার্থীদের খাবার জোগান দেয়া হয়। বিক্রি করতে না পেরে তাদের অনেকে চামড়া পুঁতে ফেলতে বাধ্য হয়েছে। অনেকে লবণ মেখে সংরক্ষণ করেছেন যাতে পরবর্তীকালে কোনো সময় দাম পাওয়া গেলে তখন তা বিক্রির আশায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে চামড়া রফতানি করে বছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকা আয় করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, দেশে বিভিন্ন প্রয়োজনে মাসে ৫০ লাখ বর্গফুট চামড়া বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। অথচ রফতানি করার পরও ১১ কোটি ঘনফুট চামড়া আমাদের দেশে অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। দেশে চামড়াজাত দ্রব্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে ২২ কোটি ঘনফুট চামড়া রফতানি করা যায়। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে ১১৩ কোটি ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে চামড়া খাত থেকে আয় হয় ৮৩ কোটি ৭১ লাখ ডলার। ছয় বছরে ৩০ কোটি টাকা হ্রাস পেয়েছে এই আয়।

বাংলাদেশে সারা বছরই পশু জবাই হয়। শহর, নগর ও গ্রামের বাজারে সর্বত্র গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার গোশত বিক্রি করা হয়। এতে জনগণের দৈনিক পুষ্টির চাহিদা যেমন মিটে, তেমনি চামড়ার উৎপাদনও বাড়ে। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, সারা বছর এ দেশে প্রায় দুই কোটি ৩১ লাখ গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া জবাই হচ্ছে। এর অর্ধেকই হয় কোরবানির ঈদে। গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া মিলিয়ে দেশে এ বছর কোরবানি হয়েছে প্রায় এক কোটি ১৬ লাখ পশু। বাংলাদেশের ২২০টি ট্যানারি থেকে বছরে প্রায় ২৫০ কোটি বর্গফুট কাঁচা চামড়া (হাইড ও স্কিন) প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এর মধ্যে ৬৩ দশমিক ৯৮ শতাংশই গরুর চামড়া। ছাগলের চামড়া ৩২ দশমিক ৭৪ শতাংশ ও মহিষের চামড়া ২ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং ভেড়ার চামড়া রয়েছে ১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। প্রক্রিয়াজাত চামড়ার মধ্যে ৭৬ শতাংশের বেশি রফতানি করা হয়। বাংলাদেশের ৯৩টি বড় নিবন্ধিত জুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বছরে প্রায় ৩৭ কোটি ৮০ লাখের বেশি জোড়া জুতা তৈরি করে থাকে।

চীন বাংলাদেশি চামড়ার অন্যতম প্রধান আমদানিকারক। এটা দিয়ে তারা জুতা, স্যান্ডেল, পার্স, ব্যাগ, বেল্ট তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাঠাত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনে উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীর ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক ধার্যের হুমকি দিলে চীনের আমদানিকারকরা আগের দামে চামড়া কিনতে আগ্রহী নন। ফলে বাংলাদেশের চামড়া রফতানি বাণিজ্যে শুরু হয়েছে ভাটার টান।

দরপতনের কারণে বিপুল পরিমাণ চামড়া চোরাই পথে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পাচার হয়ে যায়। ভারত চামড়ার আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। প্রতি বছর ৫১ মিলিয়ন গরু, ১২৮ মিলিয়ন ছাগল ও ভেড়ার চামড়া উন্নত দেশে রফতানি করে ভারত আয় করে ৬৭৭ মিলিয়ন ডলার। এর আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, হংকং, চীন, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভিয়েতনাম। ভারতীয় চামড়ার বাজার ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে তা।

বাংলাদেশের ট্যানারিগুলো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর না হওয়ায় এবং সিইটিপি সুবিধাসংবলিত পর্যাপ্ত বর্জ্যশোধনাগার গড়ে না ওঠায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য কেনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগলের চামড়ার কদর রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার চাহিদা নেই, ট্যানারিগুলোতে আগের বছরের ৫০ শতাংশ চামড়া অবিক্রিত অবস্থায় রয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমান অবস্থায় এত চামড়ার চাহিদা নেই, চামড়া কেনার জন্য পর্যাপ্ত ব্যাংক ঋণ পাওয়া যায়নি, ইত্যাদি কারণ দেখিয়ে এতদিন ট্যানারি মালিকরাই কাঁচা চামড়া কেনার প্রতি অনাগ্রহ দেখিয়ে এসেছেন। ফলে এ বছর কোরবানির ঈদের পর সারা দেশে কাঁচা চামড়া বিক্রিতে ধস নামে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য গত ১৩ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত মূল্যে কাঁচা চামড়া ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে না। তাই চামড়ার উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে সরকার কাঁচা চামড়া রফতানির অনুমতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে চামড়া শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল হওয়ারও আহ্বান জানানো হয়।

সরকারের কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্তের পর নড়েচড়ে বসেন ট্যানারি মালিকরা। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) এবং বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএলএলএফইএ) ১৪ আগস্ট সংবাদ সম্মেলন করে কাঁচা চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসার দাবি জানায়। এতে দেশীয় ট্যানারিগুলো কাঁচা চামড়ার সঙ্কটে পড়বে বলে তাদের অভিযোগ। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এখনো চামড়া রফতানির সিদ্ধান্তে অটল কূটনৈতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশকে চামড়ার বাজার খুঁজতে হবে। সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চামড়াজাত দ্রব্য রফতানির কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এই সিদ্ধান্তটি আগেভাগে নিলে মাঠ পর্যায়ের মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচতে পারতেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিবর্গের সাথে বসে সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের পথ বের না করলে ঐতিহ্যসমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্প ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা এবং দরিদ্র-এতিমদের কষ্টের মাধ্যমে সামাজিক সমস্যারও উদ্ভব হবে। ফলে বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ স্তরের গভীর মনোযোগ দাবি করে।

লেখক: ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন: বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ইসলামী চিন্তাবিদ।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র