Alexa

বিষন্নতার চাদরে ঢাকা পহেলা বৈশাখ

বিষন্নতার চাদরে ঢাকা পহেলা বৈশাখ

প্রভাষ আমিন/ছবি: বার্তা২৪.কম

বাংলাদেশে যতগুলো উৎসব আছে, আমার সবচেয়ে প্রিয় বর্ষবরণ। এই একটি উৎসবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ মন খুলে অংশ নিতে পারে। এমনকি আদিবাসীরাও বৈসাবী উৎসব নিয়ে সামিল হয় বাংলা বর্ষবরণে। এই একটি দিনে বাংলার ঘরে ঘরে আনন্দের বান ডাকে যেন।

আমাদের এ অঞ্চলে উৎসবের কমতি নেই। ছেলেবেলায় আমরা সব উৎসবেই সামিল হতাম। মুসলমানদের দুই ঈদের উৎসব তো আছেই। আমরা শবে কদর, শবে মেরাজ, শবে বরাতকেও উৎসব বানিয়ে ফেলতাম। এই তিনটি উৎসবই রাতে। তাই আমরা অবধারিতভাবে রাতে ইচ্ছামতো ঘুরে বেড়ানোর স্বাধীনতা পেয়ে যেতাম।

ছুটিটা পেতাম আসলে মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য। কিন্তু মসজিদে একটু হাজিরা দিয়ে আমরা রাতভর ঘুরে বেড়াতাম। রাতে বাইরে থাকার আনন্দটাই অন্যরকম। এর মধ্যে শবে বরাতে উৎসবটা বেশি হতো। সন্ধ্যার পর গোসল করে ঘরে ঘরে মোমবাতি জ্বালিয়ে আলোকসজ্জ্বা করতাম।

আর হিন্দু সম্প্রদায়ের তো বারো মাসে তেরো পার্বণ। তার অনেকগুলোতে আমরা অংশ নিতাম। আমাদের ছেলেবেলা ছিল উৎসবময়। আমাদের এলাকায় খ্রিস্টান বা বৌদ্ধ ধর্মের কেউ ছিল না বলে বড়দিন বা প্রবারণা পূর্ণিমার আনন্দটা ছেলেবেলায় মিস করেছি। কিন্তু বড় হয়ে দেখেছি, বড়দিনের ক্রিসমাস ট্রি বা সান্তা ক্লজের উপহার আর প্রবারণা পূর্ণিমার ফানুস ওড়ানোও কম আনন্দের নয়।

ধর্মীয় প্রার্থনার অংশটুকু যার যার মতো। এর বাইরে সব ধর্মের সব উৎসবই আনন্দের, আমাদের সবার। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। তবে পহেলা বৈশাখের উৎসবের কোনো তুলনা নেই। সব ধর্মের মানুষ মন খুলে এ উৎসবে মেতে উঠতে পারে। গ্রামে গ্রামে বৈশাখী মেলা, হরেক খাবার, হরেক খেলনা, নাগরদোলা; সত্যিই যেন আনন্দের মেলা বসে। এ উৎসবে ধর্মের কোনো ছোঁয়া নেই। এ হলো সত্যিকারের বাঙালির প্রাণের মেলা।

বাংলাদেশে তিনটি সাল আমরা ব্যবহার করি। আমাদের ধর্ম, জাতীয়তা বা সংস্কৃতির সঙ্গে যার কোনো মিল নেই, সম্পর্ক নেই; সেই খ্রিস্টাব্দ ব্যবহার করি সবচেয়ে বেশি। অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সর্বত্রই খ্রিস্টাব্দের জয়জয়কার। আমরাও ইংরেজি মাসের তারিখ যতটা জানি, বাংলা বা হিজরি মাসের তারিখ ততটা জানি না। খ্রিস্টাব্দে ‘নিউ ইয়ার’ যতটা উদযাপিত হয়, তার চেয়ে বেশি হয় ‘থার্টি ফার্স্ট’। হিজরি সাল বা আরবি ক্যালেন্ডার প্রতিদিন না লাগলেও আমাদের নিয়মিতই লাগে। ইসলাম ধর্মের সব হিসাব-নিকাশ এই চান্দ্র মাস বা হিজরি সাল ধরেই হয়। তবে হিজরি সালে নববর্ষ বা নিউ ইয়ার উদযাপনের রেওয়াজ নেই। বরং হিজরি বর্ষের প্রথম মাস মহররম আসে কারবালার শোকাবহ স্মৃতি নিয়ে। তবে বাংলা বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ আমাদের জীবনে আসে উৎসবের ডালি সাজিয়ে- গানে, মেলায়, উৎসবে, রঙে অনন্য হয়ে। মৌলবাদীদের কেউ কেউ পহেলা বৈশাখকে হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি বলেন, এর বিরোধিতা করেন। কিন্তু বাংলা সনের সঙ্গে কোনো ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। কিছুটা সম্পর্ক থাকতে পারে ইসলাম ধর্মের সঙ্গে। কারণ বাংলা সন গণনা চালু করেছিলেন মোগল সম্রাট আকবর।

বাংলা সনের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই, সম্পর্ক হলো কৃষিকাজের, কৃষকের। শুরুতে এটাকে ফসলি সনও বলা হতো। ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্য শুরুর পর হিজরি সাল অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় হতো। কিন্তু হিজরি সাল চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সঙ্গে মিলতো না। প্রতিবছরই হিজরি সালে দিনের ওলটপালট হয়ে যায়। তাই কৃষকদের ওপর অসময়ে খাজনা দেয়ার চাপ তৈরি হতো। এই ঝামেলা মেটাতেই সম্রাট আকবরের নির্দেশে প্রাচীন বর্ষপঞ্জি সংস্কার করে ফসলি সন বা বাংলা সন চালু করা হয়। আর এই সংস্কারের কাজটি করেছিলেন তখনকার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি। তিনি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম চালু করেন। আকবরের সময় থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সব খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। সব দেনা মিটিয়ে পহেলা বৈশাখ শুরু হতো নতুন আশা নিয়ে। ব্যবসায়ীরা নতুন বছর শুরু করতেন নতুন খাতা দিয়ে, যেটাকে বলা হয় হালখাতা। হালখাতা উৎসবও হয়। ব্যবসায়ীরা পাওনা আদায়ে উৎসব করতেন।

পহেলা বৈশাখের উৎসবটা হিন্দুয়ানি যেমন নয়, ইসলামিকও নয়; পহেলা বৈশাখ খাঁটি বাঙালির সংস্কৃতি, এই মাটির সংস্কৃতি।

আমরা শহুরে লোকজন যতই দেয়ালে ইংরেজি ক্যালেন্ডার ঝুলিয়ে রাখি, গ্রামের মানুষের সব হিসাব কিন্তু বাংলা সনে। তাদের ক্যালেন্ডার লাগে না, আকাশ আর প্রকৃতি দেখেই মাস-ঋতুর হিসাব মেলায়। বাংলা মাসগুলোকে গ্রামের মানুষ ডাকেও নিজেদের মত করে। জ্যৈষ্ঠ মাস তাদের ভাষায় জষ্ঠি, কাতি মানে কার্তিক, অগ্রহায়নকে ডাকে আগুন, ফাল্গুনকে ফাগুন, আর চৈত্র হলো চইত মাস।

বৃষ্টি-বাদলা, ঝড়-বন্যা-খড়ার হিসাব তাদের মুখস্ত। প্রকৃতির দিকে তাকালেই বোঝা যায় কোন ঋতু চলছে। কৃষ্ণচূড়ার মত কড়া রঙের ফুল মানেই গ্রীষ্মকাল, গন্ধরাজের মত সুগন্ধী মানেই বর্ষা, কাশ মানেই শরত, পলাশ মানেই ফাল্গুন।

আগেই বলেছি বাংলা বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ আমাদের জীবনে আসে উৎসবের ডালি সাজিয়ে- গানে, মেলায়, উৎসবে, রঙে অনন্য হয়ে। কিন্তু এবার নতুন বছরটি আসছে বিষাদের চাদর বিছিয়ে। ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাতের নিষ্ঠুর মৃত্যু বিষন্নতায় ঢেকে দিয়েছে বর্ষবরণের সব আয়োজন।

আসলে বর্ষবরণের নানা আয়োজনের প্রস্তুতি চলে দীর্ঘ সময় ধরে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আয়োজন চলছে, তবে তাতে প্রাণ নেই, রঙ নেই। অনেকেই রঙিন পোশাক ফেলে কালো পোশাকে বর্ষবরণ করছেন। আসলেই জীবন থেমে থাকে না। নুসরাত মরে গেছে। তবুও আমাদের জীবনে উৎসব আসবে, নতুন বছর আসবে।

কেঁদে কেটে আমরা নুসরাতকে ফেরাতে পারবো না। তবে জারি রাখতে পারবো প্রতিবাদ। চেষ্টা করতে পারবো নুসরাত হত্যার সুষ্ঠু বিচার, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা নিশ্চিত করার। নুসরাতদের জন্য একটা নিরাপদ দেশ গড়ার দায়িত্ব আমাদের সবার। এমন বিষন্ন বৈশাখ যেন আর কখনো না আসে।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

আপনার মতামত লিখুন :