Barta24

বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

গাইড বাণিজ্য: দেখার কেউ নেই

গাইড বাণিজ্য: দেখার কেউ নেই
আলম শাইন, ছবি: বার্তা২৪
আলম শাইন


  • Font increase
  • Font Decrease

সত্যি কথা বলতে কি, গাইড বই হচ্ছে এখন এক আতঙ্কের নাম। যার নাম শুনলেই অভিভাবকরা চরম অস্বস্তিতে পড়েন। অনেকেই সন্তানের লেখাপড়া নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

গাইড বাণিজ্যের আর্তি তৃণমূল পর্যায় থেকেই এসেছে। বলা যায় দরিদ্র অভিভাবকের এই আর্তি। যা প্রতি বছরই শুনতে হচ্ছে আমাদেরকে। এবার যেন একটু বেশি শোনা যাচ্ছে শিক্ষামন্ত্রী রদবদলের কারণে। অভিভাবকদের বিশ্বাস, লেখকরা বিষয়টি তুলে ধরতে পারলেই শিক্ষামন্ত্রী নেক নজরে নিবেন গাইড বাণিজ্যের দিকটি।

জানা যায়, দেশের প্রতিটি স্কুলেই গাইড বই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের তা কিনতে বাধ্যও করা হচ্ছে। এমনকি কোনো কোনো বিদ্যালয়ের শ্রেণি শিক্ষকদের গাইড বই কিনে দেখাতে হচ্ছে পর্যন্ত। শুধু এখানেই শেষ নয়; একেক স্কুলে একেক প্রকাশনীর গাইড বই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শ্রেণি শিক্ষকদের নির্দিষ্ট প্রকাশনীর গাইড বই দেখাতে না পারলে শিক্ষার্থীদের তিরস্কার করা হচ্ছে। অথচ আমরা জানি গাইড বই নিষিদ্ধ! যা আগে নোট বই নামে পরিচিত ছিল, তা-ই এখন গাইড বই হয়ে বাজারে আসছে।

সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে পরিচিত এ গাইড বইয়ের সঙ্গে নোট বইয়ের পার্থক্যটা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আগের নোট বই ছিল হালকা পাতলা চটি ধরনের আর এখনকার গাইড বই খানিকটা মোটা-তাজা। তাই এটি দামেও চড়া। যে চড়া দামের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হচ্ছে দরিদ্র অভিভাবকরা। চরমভাবে নিষ্পেষিত হচ্ছে সেই দরিদ্র লোকটি যার একাধিক সন্তান স্কুল-কলেজে পড়ছে।

আমরা জানি এবং নি:সন্দেহে বলতে পারি বর্তমান সরকার শিক্ষাবান্ধব সরকার। শিক্ষার্থীদের যেমন উপবৃত্তি দিচ্ছে সরকার তেমনি প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদেরকে বিনামূল্যে বই বিতরণ করছে। যেই বইগুলো আমাদের কাছে বোর্ড বই নামে পরিচিত। আমরা যারা একসময় বোর্ড বই কিনে পড়ালেখা করেছি, তারা এ সম্পর্কে খুব ভালোই করেই জানি। তখন আমাদের বোর্ড বইয়ের পাশাপাশি নোট বইও কিনে পড়তে হতো। সমস্যা খুব বেশি হতো না তখন। কারণ মোটামুটি সাধ্যের মধ্যেই ছিল নোট বইয়ের দাম। শিক্ষার্থীরা এই বইগুলো সেকেন্ডহ্যান্ড কেনার সুযোগ পেত। সুযোগ পেত সেকেন্ডহ্যান্ড বোর্ড বই কেনারও। তাতে করে একজন দরিদ্র শিক্ষার্থীর কোনমতে চলে যেত। হালে সে সুযোগ নেই।

বোর্ড বই ফ্রি হলেও গাইড বইয়ের যন্ত্রণায় অস্থির থাকে শিক্ষার্থীরা, যা কিনতে হচ্ছে বাধ্যতামূলকভাবে। সবচেয়ে হতবাক করা বিষয়টি হচ্ছে এই গাইড বই সেকেন্ডহ্যান্ড কেনার কোনো ধরনের সুযোগ নেই। কারণ প্রতি বছরই বিদ্যালয় থেকে প্রকাশনী সংস্থার পরিবর্তন করা হচ্ছে। অর্থাৎ এটাও এক ধরনের কৌশল। যাতে করে পুরনো গাইড বই বেচাকেনার সুযোগ না থাকে।

সূত্রমতে জানা যায়, গাইড বইয়ের ব্যাপক বাণিজ্যের পেছনে রয়েছে কৌশলী অবৈধ লেনদেন। বলা যায়, শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কবলে রয়েছে গাইড বাণিজ্য। প্রকাশনী সংস্থাগুলো বিভিন্ন বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রথমে ডোনেশনের নামে লগ্নি করে থাকে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের ম্যানেজ করেই তারা এ কাজটি করে। শুধু প্রধান শিক্ষকই নয়, বিদ্যালয়ের যৎসামান্য উন্নয়ন কিংবা খেলাধুলার জন্য কিছু বরাদ্দ দেন তারা। কিংবা মেধা তালিকার ভিত্তিতে অর্থাৎ ভালো ছাত্রদেরকে কিছু উপহার সামগ্রী প্রদান করে। যা সর্ব সাধারণের কাছে তখন বৈধ হিসেবে ধরা হয়। গণমাধ্যমে তখন আর বিষয়টি আসার সুযোগ থাকে না। কারণ বিদ্যালয়ের উন্নয়ন বলে কথা! ফলে সেই বিষয়ে সাধারণত আর কেউ মুখ খোলে না, বা খোলার প্রয়োজন বোধ করে না। এভাবেই প্রকাশনী সংস্থাগুলো বছর বছর ধরেই এমন সুশৃঙ্খল নিয়মের মধ্যে অসাধু বাণিজ্যের বিস্তার ঘটাচ্ছে।

সোজা কথা, বিপুল অংকের ডোনেশন নিয়ে পরিশেষে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্দিষ্ট প্রকাশনীর গাইড বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দেয় বিদ্যালয়। প্রকাশনী সংস্থাগুলো শুধু বিদ্যালয়েই নয় ছোট-বড় লাইব্রেরিগুলোকেও ম্যানেজ করে। সেক্ষেত্রে প্রচুর সৌজন্য কপিও সরবরাহ করে। এতে করে লাইব্রেরির মালিকদের সন্তান কিংবা আত্মীয়স্বজনের সন্তানদের গাইড বইয়ের চাহিদাও পূরণ হয়ে যায়। তখন লাইব্রেরির মালিকরা উক্ত প্রকাশনীর পক্ষে সাফাই গেয়ে অভিভাবকদের নিন্মমানের গাইড বই গছিয়ে দেয়। অথবা অন্যসব প্রকাশনীর বই বিক্রয় করা থেকে বিরত থাকেন।

এভাবে একটা সমন্বিত নিয়মের মাধ্যমে গাইড বাণিজ্য দেশব্যাপী প্রসারিত হচ্ছে। এটি অনেকটাই অঘোষিত নিয়ম নীতিতে পরিণত হয়েছে। এতে করে অভিভাবকদের যেমন গাইড বই কিনতে নাভিশ্বাস ওঠে, তেমনি শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান হয় নিন্মগামী। গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তারা মূল পাঠ্যবইটি হাতে নিতে চায় না।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবে কোনো রকম পাঠ চুকিয়ে দিতে পারলেও শিক্ষাদীক্ষায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে, যা পরবর্তীতে বিষফোঁড়ায় পরিণত হচ্ছে। ভূরি ভূরি শিক্ষার্থী পাশ করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে গিয়ে কিংবা চাকরি-বাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে ব্যর্থ হচ্ছে। তার প্রমাণ আমরা বহুবার বিভিন্নভাবে পেয়েছি।

আরেকটি বিষয় আমরা লক্ষ করছি। সেটি হচ্ছে গাইড বইগুলোর কাগজও খুব একটা মানসম্মত নয়। কাগজের এপিঠের লেখা ওপিঠে দেখা যায় অনায়াসেই। পড়তে ভীষণ বিরক্তি লাগে; আঙ্গুলের ডগায় কালিতে মাখামাখি হয়ে যায়। বারবার আঙ্গুল মুছে শিক্ষার্থীদের কষ্টেসৃষ্টে পড়তে হচ্ছে তা। অথচ এসব নিন্মমানের বইয়ের দাম বেশ চড়া। ভুলভ্রান্তির কথা আর নাই বা বললাম। যার প্রমাণ মিলে যাবে গাইড বইয়ের পাতা উল্টালেই। এতসব অনিয়মের ফলেও গাইডের বিস্তার রোধ করা যাচ্ছে না। জানি না আর কী কী অনিয়ম হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নড়েচড়ে বসবে, তা আমাদের কারোই জানা নেই। সহায়ক বইয়ের নামে গাইড বইয়ের অবাধ বাণিজ্যের ব্যাপারে কেন কারও সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না, তা-ও আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। তবে কি আমরা ধরে নিতে পারি কর্তৃপক্ষের যোগসাজশেই দেশে গাইড বইয়ের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে, যা থেকে পরিত্রাণের আর কোনো উপায় নেই? বিষয়টি নিয়ে কি আমাদের ভাবার সময় আসেনি এখনও?

বিগত দিনের কথা বাদ দিলাম আমরা। নতুন করে সবকিছু ভাবতে চাই এখন। নতুন শিক্ষামন্ত্রীর কাছে আমাদের ভাবনা নতুনভাবে পৌঁছাতে চাই। তিনি যেন শিক্ষা সহায়ক বইয়ের মান ও দাম যাচাই-বাছাই করে এবং গাইড বাণিজ্যের অবসান ঘটিয়ে দ্রুত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ান, সেই আর্জি রাখলাম তাই। তিনি যদি বিষয়টায় হস্তক্ষেপ করেন তবে সফলতা বয়ে আসবে বোধকরি। কারণ তার মেধা-দক্ষাতয় মোহিত হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তার ওপরে আরোপ করেছেন। তিনি একটু সোচ্চার হলেই দরিদ্র অভিভাবক স্বস্তি পাবেন; শিক্ষার্থীরাও মেধা বিকাশের সুযোগ পাবেন। তাতে করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মুখ যেমন উজ্জ্বল হবেন তেমনি অভিভাবকদেরও অর্থ সাশ্রয় হবে।

আলম শাইন: কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ।

আপনার মতামত লিখুন :

উচ্চমাধ্যমিকের ফল ও কিছু কথা

উচ্চমাধ্যমিকের ফল ও কিছু কথা
মাছুম বিল্লাহ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

১৭ জুলাই প্রকাশিত হলো ২০১৯ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল। গতবারের চেয়ে এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা বেশি এবং মেয়ে শিক্ষার্থীদের পাসের হার ছেলেদের চেয়ে বেশি। এই তিনটি বৈশিষ্ট্যই এবারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলে লক্ষণীয়।

এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পরীক্ষার্থী ছিল ১৩ লাখ ৫৮ হাজার ৫০৫ জন। এর মধ্যে আটটি সাধারণ শিক্ষাবোর্ডের অধীনে এইচএসসিতে পরীক্ষার্থী ছিল ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৫৫০ জন ও মাদরাসা থেকে আলিমের শিক্ষার্থী ছিল ৮৮ হাজার ৪৫১ জন ও কারিগরিতে ছিল ১ লাখ ২৪ হাজার ২৬৪ জন পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে ৬ লাখ ৬৪ হাজার ৪৯৬ জন ছাত্র ও ৬ লাখ ৮৭ হাজার ৯ জন ছাত্রী। মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৯ হাজার ৮১ শিক্ষা।

এবারের এইচএসসির ফল প্রকাশিত হলো ৫৫ দিনের মধ্যে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশিত হয়েছে বলে এটিকে পজিটিভ বলা যায়। এখন পাবলিক পরীক্ষার ফল দু’মাসে দেওয়া হয়, যা আগে তিনমাসে দেওয়া হতো। এবার দ্রুততম সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশের কারণে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান এবং তিনি এতে খুশিও হয়েছেন। তবে, পরীক্ষার ফল তাড়াহুড়ো করে দেওয়া মানে প্রচুর ভুল-ত্রুটি থেকে যেতে পারে।

আর একটি বিষয় তো আমরা খেয়ালই করছি না। সেটি হচ্ছে, একজন শিক্ষার্থীর সারাজীবনের বিচার করছেন একজন শিক্ষক। তিনি অভিজ্ঞ হোক, অনভিজ্ঞ হোক, নতুন হোক, পুরান হোক, খাতা মূল্যায়ন করতে জানুক আর না জানুক, একজন শিক্ষকের কয়েক মিনিটের বিচার এবং রায় হচ্ছে একজন শিক্ষার্থীর ১২ বছরের সাধনার ফল এবং ভবিষ্যতের পথচলার নির্দেশক। এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

একটি উত্তরপত্র বিশেষ করে এই ধরনের পাবলিক পরীক্ষার খাতা কমপক্ষে দু’জন পরীক্ষকের পরীক্ষণ করা উচিৎ, তা না হলে সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হয় না। এরপর হাজার হাজার ভুল ত্রুটি ধরা পড়বে, সেখানে বোর্ড কিছু অর্থ উপার্জন করবে কিন্তু কাজের কাজ খুব একটা কিছু হবে না কারণ খাতা তো পুনর্মূল্যায়ন হয় না। শুধু ওপরের নম্বর দ্বিতীয়বার গণনা করা হয়। আমরা একটি পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে এর ধরনের খেলা খেলতে পারি না।

এবার ৪১টি প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করেনি। এদের মধ্যে ৩৩টি কলেজ ও আটটি মাদরাসা রয়েছে। কিছু কিছু কলেজ দেখলাম মাত্র একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছিল, ওই একজনই অকৃতকার্য হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান নিয়ে শিক্ষা প্রশাসন তথা সরকারের সিদ্ধান্ত কী? কেনইবা একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারে না আবার একটি প্রতিষ্ঠান থেকে মাত্র একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেয়, এটিই বা কেমন প্রতিষ্ঠান?

কুমিল্লা বোর্ডে এবার এইচএসসিতে পাসের হার সবচেয়ে বেশি ৭৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ অথচ এই শিক্ষার্থীরা ২০১৭ সালে যখন এসএসসি পাস করে তখন তাদের পাসের হার ছিল সর্বনিম্ন ৪৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। হঠাৎ করে এই পরিবর্তন কীভাবে হলো? শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, তারা হয়তো বিশেষ কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন, তাই এরকম হয়েছে।

আমরা জানি শিক্ষাবোর্ড একমাত্র পরীক্ষা গ্রহণ করা ছাড়া কীভাবে শিক্ষকরা পড়াবেন, কীভাবে শিক্ষার মান উন্নয়ন ঘটানো যায় ইত্যাদি নিয়ে তাদের তৎপরতা খুব একটা কখনও দেখা যায় না। একটি বোর্ডের অধীনে কয়েকটি জেলায় কয়েক হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকে। সেগুলোর শিক্ষাদান, শিক্ষক উন্নয়ন ও শিক্ষার্থী উন্নয়ন নিয়ে বোর্ডের কোনো তৎপরতা বা কাজ আমরা দেখি না। কিন্তু পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর বোর্ডগুলোর মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। কোন বোর্ডে কত বেশি শিক্ষার্থী পাস করেছে; বোর্ড যেন এক ধরনের কৃতিত্ব দেখাতে চায়।

আসলে আমাদের দেশে শিক্ষাবোর্ডগুলো একমাত্র শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন আর খাতা মূল্যায়ন ছাড়া তেমন কোনো কাজ করে না। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা একটি জেলার কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরীক্ষায় ভালো করলে তা ওই প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারীদের এবং একই জেলার কিছু প্রতিষ্ঠান ভালো করলে শিক্ষা প্রশাসন কিছুটা কৃতিত্ব নিতে পারে। বোর্ড কেন? বোর্ড কি শিক্ষকদের কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়? বোর্ড কি শিক্ষকদের ক্লাস পর্যবেক্ষণ করে? বোর্ড কি শিক্ষার্থীদের মানসম্মত পড়ালেখা করার জন্য কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে? এর কোনোটিই করে না। তাহলে তারা কৃতিত্ব দেখাতে চায় কেন, বিষয়টি আমার কাছে বোধগম্য নয়।

পত্রিকায় দেখলাম যশোর বোর্ডে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে আছে। বোর্ডের ১৮টি কলেজের পাসের হার শতভাগ। এ বোর্ডে সামগ্রিক পাসের হার ৭৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ, আর মেয়েদের পাসের হার ৭৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ছেলেদের পাসের হার ৭২ দশমিক ৭৪ শতাংশ। দিনাজপুর বোর্ডেও ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এগিয়ে আছে। এ দু’টো বোর্ডে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা কি বেশি পড়াশোনা করেছে? নাকি অন্য কোনো কারণ আছে যেটি গবেষণার মাধ্যমে জানা প্রয়োজন।

ফলাফলের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ২০১৫ সাল থেকে পাঁচ বছর যাবত ছাত্রীরা ধারাবাহিকভাবে ছাত্রদের চেয়ে বেশি পাস করে আসছে। এ বছর ছাত্রীদের পাসের হার ৭৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ আর ছাত্রদের ৭১ দশমিক ৬৭ শতাংশ অর্থাৎ ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের পাসের হার ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেশি। এটি যদিও আনন্দের সংবাদ কিন্তু এর সঠিক কারণ জানা প্রয়োজন।

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক। বর্তমানে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিকে কর্মরত সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক।

শিক্ষায় শিশুশিক্ষা ও মনোবিজ্ঞান

শিক্ষায় শিশুশিক্ষা ও মনোবিজ্ঞান
মুত্তাকিন হাসান/ ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

সাধারণ অর্থে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা। ব্যাপক অর্থে ব্যক্তির গুণাবলীর পূর্ণ বিকাশের লক্ষ্যে পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞান লাভের প্রক্রিয়াকে শিক্ষা বলে। বাংলায় শিক্ষা শব্দটি এসেছে ‘শাস’ ধাতু থেকে যার অর্থ শাসন করা বা উপদেশ দেওয়া। শিক্ষার ইংরেজি প্রতিশব্দ education; যা এসেছে ল্যাটিন শব্দ educare বা educatum যার অর্থ হলো to lead out অর্থাৎ ভেতরের সম্ভাবনাকে বাহিরে বের করে আনা বা বিকশিত করা।

শিক্ষা মানুষের মনকে আলোকিত করে, উম্মোচিত করে নতুন নতুন জানালা। আর তাই শিক্ষার কোনো শেষ নেই। শিক্ষা শুরুর পথটা শিশুশিক্ষা দিয়েই, আর তাই বলা হয় আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এই ভবিষৎকে শুরু থেকেই সঠিকভাবে লালন-পালন না করলে কোনো কিছুই প্রত্যাশা করা যায় না।

শিশুশিক্ষার হাতেখড়ি পারিবারিকভাবে পিতামাতার মাধ্যমে হলেও প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাপ্তবয়স্কদের যে পদ্ধতিতে শিক্ষা দেওয়া হয়, তা শিশুদের বেলায় বাঞ্ছনীয় নয়। শিশুদের জন্য দরকার শিশুবান্ধব মানসম্মত শিক্ষা।

মানসম্মত শিশুশিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন শিশুর মনোজগত বোঝা। একটি বেসরকারি জরিপে দেখা গেছে, আমাদের দেশের শতকরা ৭০ ভাগের বেশি বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের শিশুমনোবিজ্ঞান সম্পর্কে কোনো ধারণা বা জ্ঞান নেই। শিশুর মন না বুঝে ভয়ভীতি দিয়ে শিক্ষাদান করা শুধু তোতা পাখি বানানো ছাড়া আর কিছু নয়। শিশুশিক্ষা বা প্রাথমিক শিক্ষার শিক্ষকদের অবশ্যই শিক্ষকদের মনোজগত সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমাদের বর্তমান বেশিরভাগ শিক্ষকরা শিক্ষার্থীর প্রতি আন্তরিক না হয়ে, নিজেরা শিক্ষা বাণিজ্যে মত্ত থাকেন। ক্ষণে ক্ষণে শিক্ষার্থীর বাবা-মার সাথে শিক্ষকদের পরম আলাপচারিতা মানেই মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা নয়। শিশুশিক্ষায় শিশুদের মনের বিকাশে মনোবিজ্ঞানের ক্ষীণ প্রভাবের কারণেই শিশুরা জীবনের শুরুতেই শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

বিদ্যমান শিক্ষার পরিবেশ তাদের মেধা বিকাশের অন্তরায়। শিক্ষক আর অভিভাবকের কড়া নিয়মশাসনে ভালো পড়তে বা লিখতে পারছে ঠিকই তবে চিন্তাশীল বা উদ্ভাবনী হয়ে উঠতে ব্যর্থ হচ্ছে। আসলে তাদের এ শিক্ষা মানব বিকাশে সহায়ক নয়। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো- পরিপূর্ণ মানবিক গুণে মানুষ হয়ে উঠা। পিতামাতা তার সন্তানকে দিয়ে ভালো রেজাল্ট করাচ্ছে ঠিকই কিন্তু সত্যিকারের শিক্ষিত হয়ে উঠছে না। শিশুর সৃজনশীলতা বিকাশের যথোপযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় তারা বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এতে করে টালমাটাল হচ্ছে পুরো সমাজ।

বিখ্যাত কবি মিল্টন বলেছেন- Education is the harmonious development of body, mind and soul…শিক্ষকরা যেহেতু প্রকৃত অভিভাবক এবং শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান প্রদান করে থাকেন, তাই শিক্ষকদের হতে হবে প্রকৃত মানুষ। শিক্ষদের নিজেদের মধ্যেই যদি মানবিক গুণাবলীর ঘাটতি থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীর মনে কখনোই মানবিক গুণাবলী জাগ্রত হবে না।

শিক্ষাদানের জন্য বিদ্যালয়ের বাহ্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও যত উপকরণই ব্যবহার করা হোক না কেন শিক্ষকরা নিজেরাই সবচেয়ে বড় উপকরণ। শিক্ষাকে পেশার পাশাপাশি সেবা হিসেবে গ্রহণ করতে পারলেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে গড়ে উঠবে নিবিড়, সৌহার্দ ও স্নেহপূর্ণ সম্পর্ক। কোমলমতি শিশুদের বকাঝকা না করে সকল শিক্ষকদের উচিত সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি করা। হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা যেন প্রত্যেক শিক্ষার্থীই প্রথম স্থান অর্জন করবে। শিশুদের পাশাপাশি যেন পিতামাতারাও এমন প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। অথচ প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে জ্ঞান বিকাশের প্রথম স্তর মাত্র। তাদের জন্য আরও বহু পথ বাকি।

শিক্ষক আর পিতামাতার চাপে শিশুরা যেন দিশেহারা। ভোরবেলায় চোখ কচলাতে কচলাতে ঘুম থেকে উঠা, বিদ্যালয় থেকে ফিরে যতটুকু সময় তাতে তাদের ব্যস্ত থাকতে হয় শ্রেণীতে দেওয়া পড়ালেখা নিয়ে। শিশুরা তাদের চিন্তা চেতনা প্রকাশ করার কোন সুযোগই পাচ্ছে না। গ্রামের শিশুদের চেয়ে শহরের শিশুদের বেলায় এ অবস্থা বেশি পরিলক্ষিত হয়। কারণ শহরের বিদ্যালয়ে নেই খেলার উন্মুক্ত মাঠ। অথচ খোলামেলা মাঠ শিশুদের মনোবিকাশের অন্যতম উপাদান। শিশুরা দুরন্ত হরিণের মতো খেলাধুলা করবে এটাই স্বাভাবিক।

বিখ্যাত সাহিত্যিক আবুল ফজল বলেছেন ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতির প্রাণশক্তি তৈরির কারখানা আর রাষ্ট্র ও সমাজ সব চাহিদার সরবরাহ কেন্দ্র। এখানে ত্রুটি ঘটলে দুর্বল আর পঙ্গু না করে ছাড়বে না।’ যে স্থানেই হোক না কেন আমাদের উচিত শিক্ষার সঠিক সংজ্ঞার প্রতি খেয়াল রাখা। নচেৎ পুরো সমাজকে ভোগান্তিতে পড়তে হবে এবং যার প্রভাব সুদূরপ্রসারি। শিশুশিক্ষার বর্তমান ধারা সংশোধন করে মনোবিজ্ঞান ভিত্তিক পড়ালেখা অত্যন্ত জরুরি।

প্রত্যেক শিক্ষকের জন্য শিশু-মনোবিজ্ঞান বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষকদের পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। যেহেতু ভালো পড়ালেখার আশায় পিতামাতারা তাদের শিশু সন্তানদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে ইচ্ছুক বেশি, তাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে শিক্ষকদের বড় একটি অংশ উচ্চ-মাধ্যমিকের বেশি পড়ালেখা করেননি এবং তাদের বেশিরভাগের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। যাদের প্রশিক্ষণ আছে তা আবার স্বল্পকালীন। সঠিক প্রশিক্ষণের অভাবে শিক্ষকদের মনেও নেই কোনো আনন্দ, তারা যেন কোনোমতে নিজেদেরকে ঠেলা দিয়ে চালাচ্ছে। শিক্ষকরা নিজেরাই নিজেদের মনোবিকাশে ব্যর্থ। শিশু শিক্ষার্থীর মনোবিকাশ এখানে বাতুলতা ছাড়া আর কিছু নয়।

মুত্তাকিন হাসান: কবি, প্রাবন্ধিক ও মানব সম্পদ পেশাজীবী

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র