Barta24

শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

পাসপোর্ট হয়রানি রেমিট্যান্সে বাধা

পাসপোর্ট হয়রানি রেমিট্যান্সে বাধা
আলম শাইন, ছবি: বার্তা২৪
আলম শাইন


  • Font increase
  • Font Decrease

পাসপোর্ট হচ্ছে এক ধরনের ভ্রমণ নথি। এটি আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাহকের জাতীয়তা ও পরিচয় বহন করে। পাসপোর্ট যে কোনো দেশের সরকার কর্তৃক জারি করা হয়। যুগ যুগ ধরেই পাসপোর্টের প্রচলন বিশ্বব্যাপী। জানা যায়, ৪৫০ খ্রিস্টাব্দে হিব্রু বাইবেলে পাসপোর্টের অনুরূপ কাগজের নথির উল্লেখ পাওয়া যায়। যদিও সেই তথ্যটি পাসপোর্টের প্রচলনের সন-তারিখ প্রমাণ করেনি। কিন্তু ইঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছে এ ধরনের কিছু একটা ছিল তখনও।

আবার মধ্যযুগীয় ইসলামিক খেলাফতের সময়, শুল্ক প্রদানের রসিদ ছিল এক ধরনের পাসপোর্ট। যেই মুসলিম ব্যক্তি যাকাত ও জিজিয়া কর প্রদান করত, শুধু সেই মানুষগুলো খেলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করার সুযোগ পেত। এইভাবে শুল্ক প্রদানের রসিদটাই ভ্রমণকারীদের জন্য পাসপোর্ট হিসেবে পরিণত হয়। যা এখন বিশ্ব ভ্রমণের অনুমতির দলিল দস্তাবেজ বা পাসপোর্ট নামে পরিচিত।

বাংলাদেশের পাসপোর্ট সাধারণত তিন ধরনের মলাটে বন্দী । যথাক্রমে-লাল, নীল ও সবুজ মলাটের। লাল মলাট হচ্ছে, কূটনৈতিক পাসপোর্ট। নীল মলাট হচ্ছে, সরকারি কর্মজীবিদের পাসপোর্ট। অপরদিকে সবুজ মলাটের পাসপোর্ট হচ্ছে সর্ব সাধারণের জন্য-যা সংগ্রহ করতেই পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে আমাদের। শরীরের ঘাম ঝরিয়ে সেই পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হয়- যা কোনো মতেই কাম্য নয়। কারণ সমগ্র বিশ্বের মানুষের জন্যই পাসপোর্ট প্রাপ্তি হচ্ছে নাগরিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি অধিকার। যেই অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে অনিয়মের শিকার হচ্ছেন আমাদের দেশের অনেকে। পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রতিনিয়তই এ ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা। বিষয়টাকে উন্নীত করার প্রয়াসে সরকার সচেষ্ট হলেও কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর অপকৌশলের গ্যাঁড়াকলে পড়ে মানুষ হয়রানির কবলে পড়ছেন নিয়মিত।

সূত্রমতে জানা যায়, এ পর্যন্ত দেশের ২ কোটির বেশি নাগরিককে পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও বিদেশে অবস্থানরত ৬ লাখ বাংলাদেশিকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে। তুলনামূলক বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা দ্রুত পাসপোর্ট হাতে পাচ্ছেন দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে। সেই তুলনায় দেশে অবস্থানরত মানুষ বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন খানিকটা বেশি। বিবিধ কারণও রয়েছে এর। তন্মধ্যে প্রথম কারণটি হচ্ছে আর্থিক লেনদেন। প্রবাসীদের তুলনায় দেশের মানুষ দালালের হাতে ঝটপট অর্থ-কড়ি সঁপে দিতে পারেন না। ফলে যথাসময়ে পাসপোর্টও হস্তগত হয় না তাদের।

এখানে বলতে হয় পাসপোর্ট আর দালাল দু’টি একই সূত্রে গাঁথা; সমার্থক শব্দের মতোই যেন। ভূক্তভোগী মাত্র জানেন ব্যাপারটা কত কঠিনতর। কত কষ্টেসৃষ্টে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হচ্ছে একেকজনকে। এ ক্ষেত্রে আরেকটি প্রধান বাধা হচ্ছে পুলিশ ভেরিফিকেশন। ভেরিফিকেশেনের কারণে কিছুটা জটিলতা তৈরি হতে দেখেছি আমরা। আর এটি হচ্ছে প্রকৃত বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রেই। পাসপোর্ট গ্রহণ দু:সাধ্য না হলেও খুব সহজেও মিলছে না কিন্তু এটি। পদে পদে বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে পাসপোর্ট গ্রহণ করতে হচ্ছে দেশের প্রকৃত নাগরিকদেরকে। দালাল না ধরলে যথাসময়ে পাসপোর্ট হস্তগত হয় না। কর্মরত অফিসার ফিরে তাকান না। কথা বলেন অনত্র্য তাকিয়ে। নানান অজুহাত দেখিয়ে কষে প্যাঁচ মারেন। এই কাগজ সেকাগজ জমা দেওয়ার ফিরিস্তি দেন। কোনোমতে সেসব কাগজপত্র জমা দিতে পারলেও ডেলিভারির তারিখ পেছাতে থাকে ক্রমান্বয়ে। ফলে যথাসময়ে পাসপোর্ট না পেয়ে অনেকেই বিপাকে পড়ে যান। ভুরিভুরি প্রমাণ রয়েছে এ ধরনের ঘটনার। সেসব ফিরিস্তি টানা সম্ভব নয় এখানে।

আগেই বলেছি, পাসপোর্ট প্রাপ্তি হচ্ছে নাগরিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি অধিকার। সেই অধিকার বাস্তবায়নে সরকার ইচ্ছে করলে জোরাল পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন বোধকরি। প্রয়োজনে জাতীয় পরিচয় পত্রের মতো পাসপোর্ট ঘরে ঘরে পৌঁছানোর উদ্যোগ নিতে পারেন। নিতে পারেন পাসপোর্ট ফি-ও। তবে সেটি যেন হয় সহনীয় মাত্রার ফি (প্রয়োজনে ভতুর্কি দিয়ে হলেও পাসপোর্ট ফি কমিয়ে নেওয়া উচিত)। উল্লেখ্য বর্তমানে বিভিন্ন রকম খরচাদি মিলিয়ে এক একটি পাসপোর্ট গ্রহণ করতে প্রায় হাজার পাঁচেক টাকার মতো পড়ে যায়। অবশ্য এটি নর্মাল ডেলিভারির ক্ষেত্রে। আর যদি একটু আর্জেন্ট প্রয়োজন পড়ে তাহলে তো কথাই নেই। সংস্থার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন জনকে খুশি করিয়ে তবে পাসপোর্ট গ্রহণ করতে হয়। এতদসব ঝক্কি ঝামেলা পোহানোর কারণে সর্ব সাধারণ বিরক্ত হন যেমনি, তেমনি ভড়কেও যান। ফলে দেশের বাহিরে যাওয়ার পরিকল্পনা অঙ্কুরে বিনষ্ঠ হয়ে যায় অনেকেরই। আর চিকিৎসা নিতে দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজনে পাসপোর্ট গ্রহণ করেন যারা তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টা কেমন হতে পারে তা অনুমেয়।

অপরদিকে ভিনদেশিদের এত ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয় না। ভূয়া কাগজপত্র সংগ্রহ করে কিংবা কেউ কেউ বৈবাহিকসূত্রে আবদ্ধ হয়ে নাগরিকত্ব সংগ্রহ করে খুব সহজে পাসপোর্ট হাতিয়ে নিচ্ছেন। সেক্ষেত্রে তিনি বাড়তি কিছু খরচাদিও করে থাকেন। পরবর্তীতে সেই লোভটি থেকে যায় পাসপোর্ট প্রদানকারীদের। যা দেশের সর্বসাধারণের ওপর গিয়ে বর্তায়। এবং বাধ্য করানো হয় বাড়তি খরচাদি করিয়ে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে।

এ বিষয়ে আমাদের আরো সজাগ হতে হবে। পাসপোর্ট গ্রহণের সহজিকরণের পদক্ষেপ নিতে হবে যেমনি, তেমনি ভিনদেশিরা বাংলাদেশের পাসপোর্ট যেন কোনো মতেই গ্রহণ করতে না পারেন সেই বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। এ অজুহাতে যেন আবার দেশের প্রকৃত নাগরিক পাসপোর্ট গ্রহণে হয়রানির শিকার না হন সেটিকে সবার আগে বিবেচনায়ও রাখতে হবে। ভিসা সংগ্রহের ব্যাপারেও নজর দিতে হবে। মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা যাতে অধিক মুনাফার বিনিময়ে ভিসা হস্তান্তর না করতে পারেন সেবিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

এখানে আরেকটি কথা না বললেই নয়, সেটি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আমাদের প্রবাসীদের ছোটখাটো ভুলভ্রান্তিগুলোকে অনেক বড় করে দেখছেন সম্প্রতি। এর প্রধান কারণই হচ্ছে ভিনদেশিদের উপদ্রব। তারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট হাতিয়ে ওমরা ভিসা নিয়ে সৌদি আরবে পালিয়ে থেকে যাচ্ছেন। চুরি-চামারিসহ নানা অপকর্ম করে ধরা পড়লে বাংলদেশী বলে পরিচয় দিচ্ছেন। কাগজে কলমেও প্রমাণ মিলছে বাংলাদেশি, ফলে এখানে আর সাফাই গাওয়ার মতো সুযোগ থাকছে না। এসব বেশি করছে রোহিঙ্গারা। তারা পাসপোর্ট সংগ্রহ করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, মধ্যপ্রাচ্যে গমন করে অধিক কাজ প্রাপ্তির লোভে নিজেদের শ্রমের মূল্যও কমিয়ে নিচ্ছেন। যাতে করে বাংলাদেশিরাও বাধ্য হচ্ছেন তাদের শ্রমের মূল্য আরো কমিয়ে দিতে। এতে করে বিপাকে পড়ে গেছেন বাংলাদেশি শ্রমিকেরা। অধিক পরিশ্রম করেও পর্যাপ্ত অর্থকড়ি নিজ দেশে প্রেরণ করতে পারছেন না। অন্যদিকে আগের মতো বুকটান করে বিদেশের মাটিতে চলাফেরাও করতে পারছেন না। বাংলাদেশি পরিচয় জানলে সন্দেহের চোখে দেখছেন, অথচ আদতেই বাংলাদেশিরা অমন ধাঁচের নয়, সেটি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন রোহিঙ্গাদের কারণেই।

রোহিঙ্গারা সত্যমিথ্যা বলে বিদেশিদের কানভারি করছেন, সে রকম তথ্যও আমরা খবরের কাগজ মরাফত ইতিপূর্বে জানতে পেরেছি। অথচ রোহিঙ্গারা যুগ যুগ ধরেই বাংলাদেশে লালিত-পালিত হচ্ছেন; তদুপরি দেশের পাসপোর্টও হাতিয়ে নিচ্ছেন, বিদেশ গিয়ে বদনামও দিচ্ছেন।

বিষয়টা নিয়ে ভাবতে হবে আমাদের খুব দ্রুত। বিশেষ করে মাথায় রাখতে হবে পাসপোর্টের সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহের যোগসূত্রটা। রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রে এ বিষয়টা নজর দিতে হবে সর্বাগ্রে। গত বছর দেশে রেমিট্যান্স ভাটা দেখা দিয়েছে। যদিও সে ভাটায় এখন জোয়ার এসেছে, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহ আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে রেমিট্যান্স প্রবাহ নিম্নমুখীর কারণ অনুসন্ধান করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। তারা প্রথমত, দায়ী করেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দীর্ঘ অস্থিরতার কারণে তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের চাকুরিচ্যুতিসহ আয় কমে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্য কম থাকায় প্রবাসীরা অর্থ পাঠাতে গড়িমসি করছেন। তৃতীয়ত, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারের ফলে হুন্ডিওয়ালারা অবৈধভাবে প্রবাসীদের নিকটজনের কাছে টাকা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। এছাড়াও পাসপোর্ট গ্রহণের হয়রানির কারণেও দ্রুত শ্রমিকরা ভিসা সংগ্রহ করতে পারছেন না। ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে বিঘ্ন হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

পাসপোর্ট প্রাপ্তির জটিলতা দীর্ঘদিনের হলেও বিষয়টি আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। যদি আমরা মনে রাখতে পারি যে, একটি পাসপোর্ট বিতরণ মানে একজন বাংলাদেশির বহির্গমনের সুযোগ লাভ করা এবং পরে তার মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স পৌঁছানো- বিষয়টি এভাবে ভাবলে বোধকরি অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যাবে অতি সহজে।

আলম শাইন: কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ।

আপনার মতামত লিখুন :

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!

সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি!
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের একটি মন্তব্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বলেছেন 'সরকারি কর্মকর্তারা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না'। এ কথাটি মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকতাদের দুর্নীতি আজ নতুন নয়। তবে সব কর্মকর্তাও এক নয়। সংখ্যায় সীমিত হলেও  অনেক অফিসার আছেন যারা সততার সাথে অনেক কষ্টে  জীবনযাপন করেন। তাই সকলকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না।

বাংলাদেশে দুদক নিরপেক্ষতা হারিয়েছে অনেক আগে, তবে কিছু দিন পূর্বে ছোটখাটো দুর্নীতি ধরতে সোচ্চার দেখে আমরা কিছুটা হলেও খুশি হয়েছি। এ জন্য যে এবার অন্তত দুদক চেয়ারম্যান নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঠিক সময়ে ক্লাস শুরু হয় কিনা বা সকল শিক্ষক সময়মত স্কুলে আসছেন কিনা তা যাচাই করতে। 

আমরা মনে করেছি, তিনি একবার যেহেতু ঘর থেকে বেরিয়েছেন, বাংলাদেশের সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আর ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু কোনও অদৃশ্য কারণে, বোধহয় তিনি বুঝতে পেরেছেন, সরকারি কর্মকতা, রাজনীতিবিদের দুর্নীতি থামানো অসম্ভব। তার কাছে তো অনেক উদাহরণ আছে।

যাক সেসব কথা। এবার আলোচনা করা যাক, তিনি কেন বলেছেন যে সরকারি কর্মকরা সরল বিশ্বাসে দুর্নীতিতে জড়ালে অপরাধ হবে না। তিনি কি আসলে সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় পেয়েছেন?  নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।

কারণ ব্যাখ্যার আগে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা সম্পর্কে দুই-চার কথা না বললেই নয়। ওনারা সরকারিভাবে সে বৃটিশ আমল থেকে সুরক্ষিত। ওনারা সমাজের উপরে থাকেন। ওনাদের পল্লীর নাম ভদ্রপল্লী। ওনাদের সাথে ঈশ্বরের যোগাযোগ। সব কিছুই ওনারা নির্মাণ ও পরিচালনা করেন। সকল সুযোগ-সুবিধা ওনাদের জন্য। এ কারণে ওনাদের আচরণে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ জন্য তাদের সঙ্গে জনগণের একটা দুরত্ব কাজ করে। ফলে তাদের সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যানের মন্তব্যের পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, তা জানার আগেই পত্র-পত্রিকা,  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। আসলে দুদক চেয়ারম্যান কী বোঝাতে চেয়েছেন বা জনগণ কী বুঝেছে তা পরিষ্কার নয়।

আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি, এখানে দুদক চেয়ারম্যান অর্থনৈতিক দুর্নীতিকে বুঝাননি। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, অনেক সরকারি কর্মকর্তা নিজের অনিচ্ছায় বা ভালো  উদ্দেশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে কারো ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য ঐ কর্মকতাকে দুর্নীতি পরায়ণ বলা যাবে না। এটাকে দুদক চেয়ারম্যান 'সরল বিশ্বাস' বলেছেন। যদি ঐ কর্মকর্তা  ইচ্ছাকৃত ভুল করেন বা টাকার বিনিময়ে করেন বা কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য করেন, তা সরল বিশ্বাস নয়। এখানে অসততা আছে। এটাই দুর্নীতি।

আমার  হয়তো বুঝতে ভুল হতে পারে আর যদি হয়ও তা কিন্তু সরল বিশ্বাসে। আমি এ বিষয়টি এ জন্যই উপস্থাপন করলাম, কারণ দুদক চেয়ারম্যানের কথার অর্থ যদি সরকারি কর্মকর্তারা ভুল বোঝেন, তাহলে তো সর্বনাশ! তারা তো সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা শুরু করবেন। অবস্থা তখন হবে, ‘একদিকে নাচুনি বুড়ি অন্য দিকে ঢোলের বাড়ি’-র মতো। আমার এ লেখা শুধু ওইসব দুর্নীতি পরায়ণ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য।

অতএব, দয়া করে সরল বিশ্বাসে সরলভাবে গতিবেগ বাড়িয়ে দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকুন।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন: সরল বিশ্বাসে দুর্নীতি অপরাধ নয়: দুদক চেয়ারম্যান

জিএম কাদের কি পারবেন?

জিএম কাদের কি পারবেন?
এরশাদুল আলম প্রিন্স, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান থেকে দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেলেন এরশাদের ছোট ভাই জিএম কাদের। দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা জিএম কাদেরের উপস্থিতিতেই বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) এ ঘোষণা দেন। এখন অপেক্ষা, জাপা জিএম কাদেরের নেতৃত্বকে কতটা সহজভাবে মেনে নেয়, সেটি দেখার।

জিএম কাদের প্রাথমিক ধাক্কাটি সামলাতে পারলে সেটা তার নিজের ও দলের পক্ষে একটি ইতিবাচক ফল বয়ে নিয়ে আসবে বলেই মনে হয়। তবে জিএম কাদের আপাতত সফল হোন বা না হোন, জাপার জন্য আগামী দিনের রাজনীতিতে একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বহাল থাকার লড়াইটা খুব সহজ হবে না। নিশ্চিতভাবেই দলের ভেতর ও বাইরে থেকে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব আসবেই। তবে, সামগ্রীকভাবে দেশের রাজনীতির চালচিত্র কেমন যাবে, তার ওপর এটি অনেকটাই নির্ভর করে।

জাপায় নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। বিভিন্ন সময়েই দলের নেতাদের মধ্যে ক্ষমতার টানাপোড়েন দেখা গেছে। এমন টানাপোড়েন শুধু জাপায় নয়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতেও ছিল, এখনও আছে। যেকোনো বড় দলেই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ‘পন্থী’রা শক্তিশালী থাকে। শক্তিহীনরা হয় টিকে থাকার চেষ্টা করেন, ধৈর্য ধরেন, না হয় এক সময় ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে ধীরে ধীরে ঝড়ে পড়েন। আওয়ামী লীগের অনেক বড় বড় নেতা আজ দলে নেই। অনেকে ফিরে আসার চেষ্টা করেছেন। কেউ পেরেছেন, কেউ পারেননি। বের হয়ে নতুন দল বা জোটে যোগ দিয়েছেন। বিএনপিতেও এমন নজিরের অভাব নেই। বড় দলে নেতৃত্ব ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে দলের ঐক্য ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। এতে দল ও নেতা উভয়ই লাভবান হয়। তা না হলে দলতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ই, দলের নেতারাও একসময় হারিয়ে যান। ১/১১ এর বিরাজনীতিকরণের রাজনীতিতে অনেকেই তথাকথিত সংস্কারপন্থী হয়েছেন। এতে না দলের, না নিজের লাভ হয়েছে। দুঃসময়ে লড়াইটা চালিয়ে যাওয়াই রাজনীতিকের আসল পরীক্ষা। সুসময়ে সবাই মিছিলের সামনেই থাকে।

স্বাধীনতার পরে দেশের বড় তিনটি দলের ভাঙা-গড়াই আমরা দেখেছি। এর মধ্যে বিএনপি, ও জাপার জন্মই স্বাধীনতার পরে। তবে স্বাধীনতার পরে দলের ভাঙা-গড়ার সবচেয়ে বড় নজির জাসদের। এক সময় দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের একটি শ্রেণী বিশেষ করে ছাত্র সমাজের একটি অংশের কাছে কয়েকটি শব্দ খুব পরিচিত ছিল-পুঁজিবাদ, বিপ্লব, সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, সর্বহারা, বিচ্যুতি, বুর্জোয়া, পেটি বুর্জোয়া, হঠকারিতা, বস্তুবাদ, লুটেরা, দ্বন্দ্ব, ধনিক-শ্রেণি, কায়েমী-স্বার্থবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলেতো কথাই নেই। মুখে মুখে এসব বুলি। বিশেষ করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এ শব্দগুলো জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই দেশের মেধাবী ছাত্রদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বামপন্থী হয়ে যায়। এরা রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদের ছাতার নীচে আশ্রয় নেয়। এদের মধ্যে আবার মস্কো, পিকিং আরো নানা পন্থী ছিল। জাসদ শুরুর সে ইতিহাসও অর্ন্তদ্বন্দ্বেরই ইতিহাস, ছাত্রলীগের মধ্যে মেরুকরণের ইতিহাস। এরই মধ্যে নতুন আরেকটি শব্দ চালু হলো রাজনীতিতে। সেটি হলো বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। এই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্বপ্নেই ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ জাসদ গঠন করে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর নানা ঘটনার পরম্পরায় জাসদ উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যায়। এরপর জিয়া ও এরশাদ আমলে জাসদের ভাঙ্গনের খতিয়ান আরও দীর্ঘ। মেজর জলীল, কাজী আরেফ আহমদ, মনিরুল ইসলাম, শরীফ নূরুল আম্বিয়া, ইনু, রব হয়ে জাসদ এখন বর্তমান সুরতে বহাল আছে। বর্তমানে এক দল এক নেতার দল জাসদ। এর মাঝে আছে একাধিক পন্থী। দলের মাঝে ঐক্য ধরে রাখার জন্য জাসদ নেতারা কম চেষ্টা করেননি। কিন্তু পারেননি। কারণ তারা নিজেরাই স্বার্থের দ্বন্দ্বে মরিয়া ছিলেন।

ছোট দলের জন্য দলের ঐক্য ধরে রাখা সব সময়ই কঠিন। সেটা জাসদ হোক বা জাপা। কারণ, রাজনীতিতে ঐক্যের মূল শক্তি ক্ষমতা অথবা আদর্শ। কিন্তু আমাদের এখানে আদর্শের ভীত বড় নড়বড়ে। আর নিজ শক্তিবলে এসব দলের ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপটও রচনা হয়নি। ফলে, দলের নেতারা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য ক্ষমতায় দৌড়ে অধিকতর কাছাকাকাছি থাকা দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য করেছেন। এখানেই ছোট দলের ভাঙনের মূল কারণ নিহিত। এছাড়া অপরের নেতৃত্ব মেনে না নেয়ার সহজাত প্রবণতা মানুষের থাকেই। সেই সাথে আরেকটি বিষয় হলো এসব দলের বড় নেতা ও পরবর্তী ধাপের নেতাদের পলিটিক্যাল ক্যারিয়ারের মাঝে দৃশ্যমান তেমন বড় কোনো পার্থক্য নেই। ফলের ঐক্যের মূল ভিত্তি খুবই দূর্বল থাকে। রাজনৈতিক আদর্শ বাদ দিলেও, আওয়ামীর লীগের ঐক্যের ভিত্তি বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার একথা অস্বীকার করা যাবে না। এখানে ঐক্যের একটি ‘পারিবারিক’ ভিত্তিও আছে।

জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের
জাতীয় পার্টির নতুন চেয়ারম্যান জিএম কাদের

 

বিএনপির ক্ষেত্রেও নেতাদের ঐক্যের মূল ভিত্তি কখনো ক্ষমতায়া যাওয়ার আশা, সেই সাথে জিয়া পরিবার। এর বাইরে একটি রাজনৈতিক আদর্শতো কাজ করেই। এটি শুধু আওয়ামী লীগ, বিএনপির ক্ষেত্রে নয়, নয় শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। ভারতের কংগ্রেসের বর্তমান হাল হকিকত দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। রাহুল গান্ধী পদত্যাগ করেছেন দুই সপ্তাহ, কিন্তু দল এখনও নতুন নেতা নির্ধারণ করতে পারেনি। ব্যক্তি ও পারিবারিক গণ্ডির বাইরে গিয়ে দলে পরবর্তী নেতৃত্বের পথ রচনা করার কাজটি এখনও শুরু হয়নি।

জাতীয় পার্টিতে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে যারা বের হয়ে গেছেন তারা নিজেরাই নেতা হয়ে একনেতা নির্ভর দল গঠন করেছেন। জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) (জেপি) ইত্যাদি নানা উপদলে ভাগ হয়েছে। আসলে এসব বিভক্তি ও ভাঙনের পেছনে কোনো আদর্শ কাজ করেনি। কাজ করেছে ক্ষমতা ও নগদ প্রাপ্তি।

গত এক দশকে জাপা বহুবার ভাঙনের মুখে পড়েছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে জাপায় কোন্দল চরমে পৌঁছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে বিরাজ করে তীব্র ক্ষোভ ও দ্বন্দ্ব। একপক্ষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছে আরেক পক্ষ চায়নি। এ নিয়ে তুলকালাম কাণ্ডও হয়ে গেছে বহুবার। এর পেছনে শুধু দলের অর্ন্তকোন্দলই ছিল নাকি এর পেছনে আরও কারণ ছিল তা নিয়ে কথা হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের ভেতরের দ্বন্দ্ব বাইরে আসেনি, মানে দলে ভাঙন হয়নি।

তারপরও দলে আপাতত দুইটি গ্রুপ আছে। রওশন ও জিএম কাদেরপন্থী এ দু’টো গ্রুপ দলে বহুদিন ধরেই দৃশ্যমান। এনিয়ে এরশাদ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নির্দেশনা ও আদেশ জারি করেছেন। পরে আবার সেই আদেশ প্রত্যাখ্যানও করেছেন, করতে বাধ্য হয়েছেন।

গত নির্বাচনের আগে থেকেই এরশাদ অসুস্থ। বিদেশে চিকিৎসার জন্য গিয়েছেন। দলের ঐক্য বজায় রাখতে বা তার অবর্তমানে দল টিকিয়ে রাখতে কে হবেন জাপার পরবর্তী কর্ণধার, তা নিয়েও তার শঙ্কা ছিল। দলের একটি পক্ষ চেয়েছে রওশনকে সামনে নিয়ে আসতে, আরেক পক্ষ চেয়েছে জিএম কাদেরকে। এছাড়া আগে পরে অন্য পক্ষও সক্রিয় ছিল। তবে সর্বশেষ এই দুটি গ্রপই দৃশ্যমান ছিল। এরশাদ জানতেন হয়তো এ বিরোধ সহজে মিটবে না। তাই তিনি নিজের সম্পত্তি ওসিয়ত করে যাওয়ার পাশাপাশি দলের নেতৃত্বের বিষয়টিও ওসিয়তও করে গেছেন। এরশাদ জাপার গঠনতন্ত্রের ক্ষমতাবলে তার অবর্তমানে বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিদেশে থাকাকালে ছোট ভাই দলের কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।

এর আগে তিনি কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান করেছেন আবার সে আদেশ বাতিলও করেছেন। গত ১৪ জুন তার মৃত্যুর পাঁচদিনের মাথায় তার সেই ওসিয়তই পুরণ হলো। কারণ এরশাদ আজ অবর্তমান। তার অবর্তমানে আপাতত জিএম কাদের বর্তমান। দেখা যাক, এই বর্তমানকে জিএম কাদের ভবিষ্যতের কাছে নিয়ে যেতে পারেন কি-না। এই দিনকে তিনি সেই দিনের কাছে তিনি নিয়ে যেতে পারেন কিনা এটাই তার জন্য বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় তিনি পাস করলে ফেল করার হাত থেকে হয়তো বেঁচে যেতে পারে জাপা।

এরশাদুল আলম প্রিন্স: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম।

আরও পড়ুন: রাজনীতির ‘দুষ্টু বালক’ ও আমাদের ‘এরশাদ সিনড্রোম’

আরও পড়ুন: জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র