Barta24

রোববার, ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৬

English

সামাজিক পুঁজি ও রাষ্ট্রের সুখ-অসুখ

সামাজিক পুঁজি ও রাষ্ট্রের সুখ-অসুখ
শুভ কিবরিয়া, ছবি: বার্তা২৪
শুভ কিবরিয়া


  • Font increase
  • Font Decrease

একসময় ‘সামাজিক পুঁজি’ কথাটা বেশ শোনা যেতো। আজকাল আর তেমন আলোচিত হয় না। ‘সামাজিক পুঁজি’ নির্ভর করে মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস আর আস্থার ওপর। রাষ্ট্রের সুখও সামাজিক পুঁজির বাড়া-কমার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। সামাজিক পুঁজির ঘাটতি যত বড় হবে রাষ্ট্রের অসুখও তত বাড়বে।

আজকাল ‘উন্নয়ন’ নিয়ে চারপাশে এতো আলোচনা বেড়েছে যে ‘উন্নয়ন’ দিয়েই সব আলোচনা গিলে খাবার ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। উন্নয়ন নিজেও যে সামাজিক পুঁজির ওপর নির্র্ভরশীল সেই কথাটা কর্তাব্যক্তিরা খুব একটা তুলতে চান না। কেননা, সামাজিক পুঁজি না বাড়লে একার বিত্ত দিয়ে সবার সুখ হরণের রাষ্ট্রীয় নীতি চালু হয়। তখন রাষ্ট্র নিজেই সুখ হন্তারক হয়ে ওঠে। আবার টেকসই উন্নয়ন বলতে আমরা যা বুঝি সেটাও নির্ভর করে উন্নয়ন দিয়ে সামাজিক পুঁজির চেহারাটা কতটা মোটা হচ্ছে তার ওপর।

কার জন্য ‘উন্নয়ন’, উন্নয়নের সুফল কার ঘরে যাচ্ছে, উন্নয়ন চেষ্টার ফলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য কমছে কি না-এই প্রশ্নগুলোর গোঁজামিল উত্তর অব্যাহত থাকলে সামাজিক পুঁজি কখনই বাড়বে না। সামাজিক পুঁজি না বাড়লে রাষ্ট্রের অসুখও কমবে না। সামাজিক পুঁজির ঘাটতি থাকলে উন্নয়নের চাপে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণ যারা করেন তাদের কতিপয়ের স্বাস্থ্য হয়তো মোটা-তাজা দেখাবে কিন্তু গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার শীর্ণ চেহারা কোনোদিনই শ্রী ফিরে পাবে না।

এখন সামাজিক পুঁজি নিয়ে যে সংকট তা কি কেবল হাল আমলেরই প্রশ্ন? নাকি, বাংলাদেশের অতীত রাজনৈতিক ইতিহাসেও এরকম প্রশ্ন দেখা গিয়েছিল। এসব নিয়ে একাডেমিক কিংবা গবেষণাগত আলোচনা যে খুব একটা হয়েছে তা বলা যাবে না। তবে সাবেক আমলা ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আকবর আলী খান এ নিয়ে কিছু লেখালেখি করেছেন। সামাজিক পুঁজি সম্পর্কে অধ্যাপক আকবর আলী খান তাঁর ‘আজব ও জবর-আজব অর্থনীতি’ বইয়ে লিখেছেন, ‘‘মানুষ একে অপরকে যত বিশ্বাস করবে সামাজিক পুঁজি তত বাড়বে। গুণগত ঐতিহাসিক তথ্য ও সমকালিন পরিমাণগত উপাত্ত এ ধারণাকে সমর্থন করে। সামাজিক পুঁজির অপ্রতুলতার ফলেই বাংলাদেশ অঞ্চলে বৃহৎ সাম্রাজ্য খুব অল্প ক্ষেত্রেই টেকসই হয়েছে। অধিকাংশ সময়েই খণ্ডরাজ্য ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক নিয়তি। নাথ, রাত, খড়গ, চন্দ্র, বর্মণ, পট্টিকেরা ও ভদ্র বংশের মতো ছোটো রাজ্যগুলিই বারবার বাংলাদেশের মাটিতে বুনোফুলের মতো ফুটেছে ও ঝরে পড়েছে। বাংলায় বারবার মাৎস্যন্যায়ের মতো রাজনৈতিক অস্থিশিীলতা দেখা দিয়েছে। মোগল ঐতিহাসিক আবুল ফজল বাংলাকে‘ বুলঘখানা’ বা দাঙ্গা-হাঙ্গামার ঘর বলে আখ্যায়িত করেছেন। এসবের পেছনে রয়েছে সামাজিক পুঁজির ঘাটতি।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এখনো বাংলাদেশের মানুষের পারস্পরিক আস্থা কম। ১৯৯৯-২০০১ সময়কালে পরিচালিত একটি সমীক্ষা থেকে দেখা যাচ্ছে যে বাংলাদেশের মাত্র ২৩.৫ শতাংশ মানুষ একে অপরকে বিশ্বাস করে। অর্থাৎ ৭৬.৫ শতাংশ মানুষের মধ্যে এ ধরণের আস্থা নেই। বিশ্বের ৮০ টি দেশের গড় হারের চেয়ে প্রায় ১৫ শতাংশ কম।’’

০২.
রাষ্ট্রের সুখ ও অসুখ নিয়ে আলোচনাটা এসে গেলো এই কারণে যে, সম্প্রতি জাতিসংঘের ছোয়া পাওয়া গবেষণা সংস্থা সাসটেইনেবল ডেভলপমেন্ট সলিউশন নেটওয়ার্ক ২০১৮ সালের ‘বিশ্ব সুখি প্রতিবেদন’ প্রকাশ করেছে। সেখানে ১৫৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৫। ভারত ১৩০, মিয়ানমার ১৩৩, শ্রীলঙ্কা ১১৬ নম্বরে রয়েছে। এ অঞ্চলে প্রতিবেশী ভুটান ৯৭ নম্বরে ও পাকিস্তান ৭৫ নম্বরে রয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দেশগুলোর এক নম্বরে রয়েছে ফিনল্যান্ড। এই প্রতিবেদন অনুসারে, সবচেয়ে সুখী প্রথম পাঁচটি দেশ হচ্ছে যথাক্রমে-ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ড।

এই প্রতিবেদনে সুখ পরিমাপের মানদণ্ড হিসাবে ধরা হয়েছে ছয়টি বিষয়কে- উপার্জন, সুস্থ্য আয়ুষ্কাল, সামাজিক নির্ভরশীলতা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, অপরের ওপর আস্থা ও উদারতা। উপার্জন বা অর্থনৈতিক উন্নয়ন সুখী হবার ছয় উপায়ের কেবল একটি। বাকি গুলির প্রায় প্রতিটিই সামাজিক পুঁজির সাথে সম্পর্কিত। রাষ্ট্র জনগণের সামাজিক নিরাপত্তা কতটা সুরক্ষিত করতে পারছে তার ওপরও নির্ভর করছে রাষ্ট্রের সুখের বিষয়টি।

বাংলাদেশের এই ‘সুখী’ হবার প্রবণতার ট্রাক রেকর্ডই বা কী? তথ্য বলছে বাংলাদেশের মানুষের সুখাবস্থা দিন দিনই কমছে। ২০১৩ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০৮ নম্বরে। ২০১৫ সালে তা দাঁড়ায় ১০৯ নম্বরে। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে তা দাঁড়ায় ১১০ নম্বরে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৫ নম্বর। বোঝা যায় ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশের মানুষ অসুখী হয়ে পড়ছে। তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য খারাপের দিকেই চলেছে। তার অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য ভালো হবার কথা দাবি করা হলেও তাঁর সামাজিক সহনশীলতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যক্তিস্বাধীনতার সুযোগ দিনকে দিন কমছে। তার সামাজিক পুঁজির চেহার ক্রমশ মলিন হয়েই উঠছে।

০৩.
এই তথ্য কিছুটা হতাশার জন্ম দেয় বৈকি? কিন্তু আকবর আলি খান ইতিহাসের পাঠ নিয়ে আশাবাদী ভবিষ্যতের দিকে চোখ রাখতে আমাদের প্রলুব্ধ করছেন। আকবর আলী খানের গবেষণা বলছে, ‘‘পারষ্পরিক আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ রাজনীতি ও অর্থনীতিতে একটি শুভচক্রের জন্ম দেয়। আস্থার সুফল আরও আস্থার সৃষ্টি করে। প্রশ্ন হলো, দীর্ঘদিন ধরে সযত্নে লালিত অবিশ্বাস ও অনাস্থা কি সহজে অতিক্রম করা সম্ভব হবে? হয়তো সবটুকু করা যাবে না। তবু আশার আলো যে একেবারে নেই তা বলা যাবে না।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন যে মানুষ বারবার ভুল করতে করতে ঠেকে শেখে। এরকম ঠেকে শেখার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসেও ঘটেছে। পাল রাজবংশের উদ্ভবের আগে প্রায় ৫০ বছর ধরে রাজনৈতিক নৈরাজ্য বিরাজ করে। প্রাচীন ভারতে নৈরাজ্যকে মাৎস্যন্যায় বা মাছের মতো অবস্থা বলে বর্ণনা করা হতো। মাছের ভূবনে বড় মাছ যেমন ছোট মাছ গ্রাস করে, তেমনি অরাজক পরিস্থিতিতে দুর্বল জনগোষ্ঠী বড় লোকদের শিকার হয়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রজারা বা প্রকৃতিপুঞ্জ গোপালকে রাজা নির্বাচন করে। খালিমপুর তার শাসনে তাই লেখা হয়েছে:‘তারপরে ছিলেন গোপাল। তিনি সমস্ত রাজাদের মাথার মণির মতো ছিলেন। মাৎস্যন্যায় অর্থাৎ অরাজকতা দূর করার জন্য প্রজারা তাকে রাজা নির্বাচন করেছিলেন।’

বাংলার ইতিহাসে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঐক্য অনেকদিন টিকেছে। আবার অনেক সময় ঐক্য অতি অল্প সময়ে উবে গেছে। তবে পালরা প্রায় ৪০০ বছর রাজত্ব করেছে। এই রাজনৈতিক ঐক্যই সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। তার কারণ, পালরা ছিল পরমতসহিষ্ণু ও উদার। তাই বৌদ্ধ হয়েও পালদের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের সমর্থন শতাব্দীর পর শতাব্দী অটুট রাখা সম্ভব হয়েছে। পালদের ইতিহাস প্রমাণ করে যে শুধু নির্বাচনই যথেষ্ট নয়; উদারনৈতিক মূল্যবোধ ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা টেকসই হয় না।’’

এখন প্রশ্ন দাঁড়ায় এই ২০১৯ সালে দাঁড়িয়ে, আমরা আমাদের অতীত থেকে কিছু কি শিখছি? ভবিষ্যতেও কি অতীতের ভুলগুলো ঘটাতে থাকবো? দার্শনিক জর্জ সান্তায়ানা বলেছিলেন, ‘ইতিহাস থেকে যারা শেখে না তারা একই ভুল বারবার করতে থাকে।’

০৪.
মানুষের লোভ বাড়ছে। বিবেক কমছে। মনুষ্যত্বকে মানুষ অবজ্ঞা করছে। সামাজিক পুঁজি সেই বিবেচনাতেও মার খাচ্ছে। গুটিকতক মানুষ ক্ষুদ্র ব্যক্তি বা দলগতস্বার্থ বিবেচনায় ক্ষমতান্ধ হয়ে গণতন্ত্রকে মূল্যবোধহীন করে কর্তৃত্ববাদকেও আশীর্বাদ ভাবছে। রাজনীতি ও অর্থনীতিও সেই মানদণ্ডে এগুতে চাইছে দুনিয়াব্যাপীই। তাতে মানুষে মানুষে বৈষম্য বাড়ছে, পারস্পরিক অনাস্থা বাড়ছে। সামাজিক সম্পর্কগুলোও অবিশ্বাস আর কেনাবেচার মাপকাঠিতে বিবেচ্য হয়ে পড়ছে। তাতে সামাজিক পুঁজি ঘনীভূত হবার সকল সম্ভাবনা দূরীভূত হচ্ছে। এই বিপদ রবীন্দ্রনাথকেও ভাবিয়ে তুলেছিল। বহু বছর আগে তিনি লিখেছিলেন, ‘এখন মানুষ আপনার সকল জিনিসেরই মূল্যের পরিমাণ টাকা দিয়ে বিচার করতে লজ্জা করে না। এতে করে মানুষের প্রকৃতির বদল হয়ে আসছে-জীবনের লক্ষ্য এবং গৌরব, অন্তর থেকে বাইরের দিকে, আনন্দ থেকে প্রয়োজনের দিকে অত্যন্ত ঝুঁকে পড়ছে। মানুষ ক্রমাগত নিজেকে বিক্রি করতে কিছুমাত্র সংকোচ বোধ করছে না। ক্রমশই সমাজের এমন একটা বদল হয়ে আসছে যে, টাকাই মানুষের যোগ্যতা রুপে প্রকাশ পাচ্ছে। অথচ, এটা কেবল দায়ে পড়ে ঘটছে, প্রকৃতপক্ষে এটা সত্য নয়। তাই, এক সময়ে যে-মানুষ মনুষ্যত্বের খাতিরে টাকাকে অবজ্ঞা করতে জানত এখন সে টাকার খাতিরে মনুষ্যত্বকে অবজ্ঞা করছে। রাজ্যতন্ত্রে, সমাজতন্ত্রে, ঘরে বাইরে, সর্বত্রই তার পরিচয় কুৎসিত হয়ে উঠছে। কিন্তু, বিভৎসতাকে দেখতে পাচ্ছি নে, কেননা, লোভে দুই চোখ আচ্ছন্ন।’

০৫.
আমরা রাষ্ট্রের সুখ ও অসুখ নিয়ে কথা শুরু করেছিলাম। বলতে চেয়েছিলাম সামাজিক পুঁজির ঘাটতি হলে রাষ্ট্রের সুখ কমে যায় বেড়ে যায় অসুখ। রাষ্ট্রের অসুখ বাড়ুক তা আমাদের কাম্য নয়। আমরা সুখি হতে চাই। সকলে মিলেই সুখি হতে চাই।
নাসিরুদ্দীন হোজ্জার একটা পুরনো গল্প দিয়েই লেখাটা শেষ করতে চাই।

একদিন বাদশাহ হোজ্জাকে জিজ্ঞেস করলেন,-‘হোজ্জা, যদি তোমার সামনে দুটো জিনিস রাখা হয়-একটি হল স্বর্ণমুদ্রা আর একটি হলো ন্যায়। তাহলে তুমি কোনটা বেছে নেবে?’
-‘আমি স্বর্ণমুদ্রা বেছে নেব।’ হোজ্জা উত্তর দিল।

বাদশাহ বললেন,-‘ কেন হোজ্জা? আমি হলে স্বর্ণমুদ্রা না নিয়ে ন্যায় বেছে নিতাম। স্বর্ণমুদ্রাতে এমন কি আছে? ন্যায় খুঁজে পাওয়া সহজসাধ্য নয় জান?’
হোজ্জা বলল,-‘জানি জাঁহাপনা। যার যেটা অভাব সে সেটাই চায়। আপনার যেটা অভাব সেটাই আপনি বেছে নিতে চাইছেন।’

শুভ কিবরিয়া: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক।

আপনার মতামত লিখুন :

‘নয়াকাশ্মীর’: জনভীতি না জনপ্রীতি

‘নয়াকাশ্মীর’: জনভীতি না জনপ্রীতি
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

সংবিধানের বিশেষ মর্যাদা রদ করে কাশ্মীরকে খণ্ডিত করে কেন্দ্রিয় শাসন জারি করে যে নতুন কাশ্মীর বানানোর ঘোষণা দিয়েছে ভারতের বিজেপি সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমিত শাহ জুটি, তা কি জনগণকে আশ্বস্ত করবে? বিনিয়োগ ও উন্নয়নের কথা বলে ভারতের অন্যরাজ্যের সঙ্গে কাশ্মীরের সমতা আনার যে পরিকল্পনার কথা বলছেন ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্ট তা কী কাশ্মীরের জনগণকে তুষ্ট করবে? কাশ্মীরের জনগণের কাছে বিজেপি সরকারের এই সিদ্ধান্ত কি জনপ্রিয় হবে? নাকি তাদেরকে আরও ভীত-সন্ত্রস্ত ও দিশাহীন করে তুলবে? বলা চলে সামরিকীকৃত এলাকা কাশ্মীর এখন অবরুদ্ধ। সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনসমাজের জীবন এখন আইনশৃংখলা বাহিনী আর গোয়েন্দাদের নজরের তলায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত, ভীতি আর হতাশাই এখন তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এসময় হঠাৎ করে বিজেপি এই পদক্ষেপ নিল কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে দেখা দরকার বিজেপির এই কর্মকাণ্ড কি নতুন?

এক.

যে বিপুল ম্যান্ডেট বা জনরায় নিয়ে বিজেপি এবার ক্ষমতায় এসেছে সেখানে ভারতীয় জাতিকে হিন্দুত্ববাদের জাতীয়তাবাদী আকাংখায় বাধার একটা রাজনৈতিক ইচ্ছের পক্ষে জনগণ সম্মতি দিয়েছে। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের কথা ২০১৯ সালের বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার ভারতীয় জনতা পার্টি দীর্ঘসময় ধরে ভারতয়ি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ এর বিরোধিতা করে আসছিলেন। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে কাশ্মীরকে একত্রিত করা, সেইসঙ্গে অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে সমতা আনার জন্য ঐ অনুচ্ছেদের বিলোপ প্রয়োজন বলে যুক্তি দিয়ে আসছিলেন তারা।

নির্বাচনের পরপর বিজেপির ভূমিধস বিজয়ের রেশ এখনো ভারতজুড়ে, যেখানে বিজেপির আকাংখা এমন এক ভারত তৈরি করা যাতে পরিচয়ের পার্থক্য যেন আর না থাকে- হিন্দুত্বের পরিচয় হয়ে ওঠে মুখ্য। সেই রেশ বজায় থাকতে থাকতেই নরেন্দ্র মোদি গং এই সিদ্ধান্ত নিলেন। সিদ্ধান্ত নেয়ার টাইমিং খুবই অনুকূলে থাকায় দ্রুত তা বাস্তবায়নে অগ্রণী হয়েছে বিজেপি সরকার। কেননা এ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক এবং এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে বাধা দেয়ার ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তি এখন খুবই দুর্বল এবং বিচ্ছিন্ন। বিশেষ করে ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস যারা এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধী তারা এখন ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বলতম অবস্থায় আছে। বলা যায় সংসদে আগে বিজেপি তার জোর প্রতিষ্ঠা করেছে, প্রতিপক্ষকে দুর্বলতর করেছে, বিরোধী দলগুলোর অনৈক্যকে নিশ্চিত করেছে, তারপরই তার রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

অন্যদিকে বিজেপির রাজনৈতিক যে আদর্শ হিন্দুত্ববাদ, গোটা ভারতকে একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদের মোড়কে মুড়ে ফেলা, যেখানে রাজনৈতিক দল-গণমাধ্যম-আদালত-সুশীল সমাজের বড় অংশ এই জাতীয়তাবাদী জিকিরে মশগুল থাকবে, সেই লক্ষ্যও ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে বলেই বিজেপি এই সময়ে এরকম সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হয় নাই।

কাশ্মীর নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল কতটা জোরদার ভূমিকা নেবে সেটার একটা জাজমেন্ট ভারতের আছে। কাশ্মীর নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদ দেখানোর কথা পাকিস্তানের। বাস্তবে তা দেখিয়েছেও পাকিস্তান।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, ভারতশাসিত কাশ্মীরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদক্ষেপ একটি ‘কৌশলগত ভুল’। পাকিস্তান নিরাপত্তা পরিষদেও এ বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান নিজে এখন একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। তার আন্তর্জাতিক ক্ষমতাও এখন ক্ষয়িষ্ণু। তার পক্ষে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে একটা যুদ্ধ করা আর সম্ভব নয়।

অন্যদিকে ভারতের প্রতিবেশী এবং শক্তিমান দেশ চীনও এ বিষয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু চীনের বিবেচনা কেবলমাত্র বাণিজ্য। সে ভারতবিরোধিতাকে তার বাণিজ্য স্বার্থ উদ্ধারের কাজেই লাগাতে চায়। আমেরিকা এসময় ভারতের বড় মিত্র। রাশিয়াও ভারতের স্বার্থের সাথে নিজের স্বার্থকে আলাদা করে দেখে না। আন্তর্জাতিক এই পরিস্থিতিও ভারতকে এই সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছে।

কাজেই ভারতের বিজেপি সরকারের পক্ষে হিন্দুত্ববাদের ছাতার নীচে গোটা ভারতকে আনার রাজনৈতিক যে এজেন্ডা তা বাস্তবায়িত করার একটা বড় সুযোগ হিসাবেই জম্মু এবং কাশ্মীর উপত্যকাকে নিয়ে একটি, আর লাদাখকে আলাদা করে দিয়ে আরও একটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল তৈরি করেছে ভারত সরকার। ভারতের মিডিয়া, সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক অংগন, আদালত সর্বত্রই বিজেপির এই সিদ্ধান্ত একটা বড় সমর্থনও পেয়েছে।

দুই.

কাশ্মীরের জনগণ বহুদিন যাবৎ ভারত সরকারের ওপর রুষ্ট।ভারতীয় সরকারের এক ধরনের মিলিটারি শাসনের অধীনেই ছিল অশান্ত কাশ্মীর। কাশ্মীরের জনগণ বহুবার গণভোট চেয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে কাশ্মীরি জনগণের দাবি হালে পানি পায় নাই। অন্যদিকে ভারতীয় জনগণ, মিডিয়া, সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক দলের অনেকেই চেয়েছেন ভারতের আর অন্যসব রাজ্যের মতোই হোক কাশ্মীর। 

এইঅবস্থায় গণতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদ নতুন করে চড়াও হলো কাশ্মীরের ওপর। বিজেপি উন্নয়নের খাঁচায়, বিনিয়োগের মালায় এখন গাঁথতে চায় কাশ্মীরকে। সবার জন্য কাশ্মীরকে উন্মুক্ত করে, কাশ্মীরি জনগণের স্বাধীনতার আকাংখাকে খাঁচাবন্দী করে ফেলেছে মোদি সরকার।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই ঘটনায় আর কোনো রাখটাক রাখেন নাই। একে বলেছেন বিজেপির দর্শনে ‘কাশ্মীরের মুক্তি’ বলে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন সংবিধানে এখন যে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হলো এতকাল এই ‘৩৭০ ধারা কাশ্মীরকে দেশের সঙ্গে এক হতে দেয়নি’।

তিন.

কিন্তু এই পরিস্থিতি কি কাশ্মীরকে শান্ত করবে? বলপ্রয়োগের নীতি, বিভাজনের নীতি, জনসংখ্যার ঘনত্ব বদলে ফেলার নীতি, অন্য ভারতীয়দের জন্য কাশ্মীরকে উম্মুক্ত করার নীতি কি কাশ্মীরের এই বদ্ধদশাকে আলো-বাতাস দেবে? উন্নয়ন আর বিনিয়োগ কি স্বাধীনতার আকাংখাকে দমিয়ে দেবে এই ভূখণ্ডে?

পৃথিবীর অপরাপর রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায় দুনিয়াজুড়ে দমননীতি এখন একটা জয়ী অবস্থায় আছে। সেটা সিরিয়া, রাশিয়া, মিশর, সৌদি আরব থেকে পৃথিবীর অনেক অঞ্চলেই দৃশ্যমান। স্বাধীনতার আকাংখার জয়জয়কার কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে বিজয়ী হবার দৃশ্য এই মুহূর্তে পৃথিবীর বাস্তবতা নয়। কিন্তু তাই বলে লড়াই থেমে থাকে নাই।

কাশ্মীরের জনগণের জন্য চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সেই লড়াইকে তারা কতটুকু সংহত করতে পারবে । এই প্রতিকূল পরিস্থিতিকে তারা কতটা নিজেদের ইচ্ছেমত ব্যবহার করতে পারবে। অন্যদিকে ভারত রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে যে গণতান্ত্রিক বহুমুখিন ভারতকে তারা তৈরি করার সাধনা করে এসেছে, তার বদলে একমুখী হিন্দু ভারত প্রতিষ্ঠার এই নয়াসাধনা কতটা সুখী করে সেখানকার মানুষকে সেটা দেখা। কেননা বিজেপির হিন্দুত্ববাদের এই নয়াজিগিরের একটা প্রাথমিক জোশ এখন খুবই প্রবলবেগে ভারতজুড়ে বিরাজমান। অচিরেই এই জিগির কিছুটা শান্ত হলে, নতুন করে মানুষের মনে ভাবনা আনবে।

ভারতের যে সমস্যা, তার অর্থনীতির যে সমস্যা, বিনিয়োগ-কর্মসংস্থানের যে দশা তার ব্যাপকতর উন্নতি না ঘটিয়ে শুধু ধর্মীয় বাতাসা খাইয়ে জনগণকে কতদিন তুষ্ট রাখা যাবে সেটা একটা বড় বিবেচনার বিষয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভবিষ্যতে ভারতকে কতটা অখন্ড রাখা যাবে সেটা। কেননা বহু ভাষার, বহু ধর্মের, বহু জাতের, বহু চিন্তার, বহু ভীন্নতায় সমৃদ্ধ একক ভারত টিকে আছে যেসব প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধের ওপর সেগুলো এখন প্রলবেগেই ভাঙছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন, ভারতের উচ্চ আদালত, ভারতের মিডিয়া সর্বত্রই একটা একমুখিন হাওয়া বইছে। সেটা যদি ঠেকানো না যায় তবে ভারতের রাষ্ট্রকাঠামোর সবটা জুড়ে একটা সামরিকীকরণ প্রবণতা জোরদার হবে। অস্ত্র, প্রতিরক্ষা, দমন, নির্যাতন জায়গা নেবে গণতন্ত্র, মুক্তচিন্তা, সুশাসন, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার বদলে। দশকের পর দশক ধরে ভারতের গণতন্ত্র চর্চার যে ফল তা দ্রুত মিইয়ে যাবে একমুখিন হিন্দু ভারতের উগ্র নেশায়। ফলে ঐক্যবদ্ধ ভারত হুমকির মুখে পড়তে বাধ্য।

কাশ্মীরের এই কথিত ‘মুক্তিদশা’ কি সেটারই শুরু  কিনা তা বলার সময় এখনও আসেনি। তবে এটা বলা যায় কাশ্মীরের নতুন জেনারেশনের জন্য এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জও বটে। তারা অখন্ড ভারতের এই নতুন চাপ মাথা পেতে নেবে না এই চাপ থেকে মুক্ত হবার জন্য ‘নতুন লড়াই’ শুরু করবে ‘নতুন কৌশলে’ সেটাই ভাবার বিষয়।

শুভ কিবরিয়া: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক।

নীতির রাজার বিদায়

নীতির রাজার বিদায়
প্রয়াত অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ

আমার গ্রামের বাড়ি দাউদকান্দি। দেবীদ্বার আমার পাশের উপজেলা, যেটি ছিল অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের নির্বাচনী এলাকা। তাই ন্যাপ, মোজাফফর, কুঁড়েঘর শব্দগুলোর ঢেউ দেবীদ্বার থেকে দাউদকান্দিতে আমাদের কানে পৌছে যেতো অনায়াসে। ৭৩এর নির্বাচনের স্মৃতি তেমন নেই। শুধু মনে আছে জাসদের বেশ দাপট ছিল। পরে জেনেছি, দাউদকান্দিতে জাসদের রশিদ ইঞ্জিনিয়ারকে হারিয়ে খন্দকার মোশতাককে জেতাতে হেলিকপ্টারে ব্যালট বাক্স ঢাকায় নিতে হয়েছিল। যা বলছিলাম, আমাদের স্মৃতির প্রথম নির্বাচন ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন। ১০ বছর বয়সে অতকিছু বুঝিনি, খালি বুঝেছি, নির্বাচন মানেই স্লোগান, মিছিল, আনন্দ। তো সেই নির্বাচনে নিজের এলাকা ছাপিয়ে পাশের এলাকার কিছু স্লোগান এখনও কানে গেঁথে আছে। হয়তো ছন্দময়তার জন্য, তবে ভুলিনি এখনো- আমার নাম মোজাফফর, মার্কা আমার কুঁড়েঘর; আমার নাম মোজাফফর আহমেদ নুরী, আমি পথে পথে ঘুরি; মোজাফফরের কুঁড়েঘর, ভাইঙ্গা-চুইড়া নৌকাত ভর। এরকম মোজাফফরের পক্ষে-বিপক্ষের নানা স্লোগান কানে আসতো, আসতো নানা গল্পও। ৭৫'র আগ পর্যন্ত আমাদের অঞ্চলে সবচেয়ে বড় জাতীয় নেতা ছিল খন্দকার মোশতাক। এই কুলাঙ্গারের পতনের পর সবচেয়ে কাছের জাতীয় নেতা হলেন মোজাফফর আহমেদ। তখনও দেখিনি, কিন্তু নানান অবিশ্বাস্য গল্প কানে আসে। বিশাল বড় নেতা, কিন্তু একদম মাটির মানুষ। মার্কা যেমন কুঁড়েঘর, মানুষও তেমনি কুঁড়েঘরেরই। মানুষের সাথে মিশে যাচ্ছেন, তাদের মত করে। তাদের ভাষায় কথা বলছেন। লুঙ্গি পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ১৯৭৯ সালের সাজানো একতরফা নির্বাচনে ধানের শীষের জোয়ারও মোজাফফরের কুঁড়েঘরকে ভাসিয়ে নিতে পারেনি। ১৯৮১ সালে ন্যাপ-সিপিবির প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন কুঁড়েঘরের মোজাফফর। জিয়াউর রহমানকে জেতাতে আয়োজিত সে নির্বাচনে অন্য কারো জেতার সুযোগই ছিল না।

আমাদের পাশের বাড়ির নেতা হলেও পরে বুঝেছি তিনি দেবীদ্বার বা কুমিল্লা বা বাংলাদেশের নেতা নন; বিশ্বের বাম আন্দোলনেও তার নাম লেখা আছে। ছেলেবেলা থেকে নাম, স্লোগান, নানান গল্প শুনলেও অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদকে প্রথম দেখি ১৯৯১ সালে। তখন আমরা প্রিয় প্রজন্ম নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করতাম। ফজলুল বারী সম্পাদিত সে পত্রিকার অফিস ছিল ৭৬ সেগুনবাগিচায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দক্ষিণ পাশে। আর অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের বাসা ছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উত্তর পাশে কাকরাইলে। তিনি প্রায়শই সকালে লুঙ্গি পড়ে আমাদের অফিসে চলে আসতেন, একসাথে অনেক পত্রিকা পড়ার আকাঙ্খায়। তিনি পত্রিকা পড়তেন, আর আমরা তাঁর গল্প শুনতাম। ছেলেবেলায় তাঁর সম্পর্কে যা যা শুনেছি, তার একবিন্দুও মিথ্যা নয়। সেই কুঁড়েঘরের মাটির মানুষ। কুমিল্লার আঞ্চলিক টানে কথা বলছেন, বকা দিচ্ছেন। আমরা জানতাম রোদ চড়লে তাঁর মেজাজও চড়ে যায়।

আমাদের কাছে মনে হয় অতি কাছের জন, কিন্তু তিনি অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ; ইতিহাসের সাক্ষি নন, তিনি নিজেই ইতিহাস। শুধু বাংলাদেশ নয়, এই উপমহাদেশের বাম আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, মুজিবনগর সরকারের ৬ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদের একজন, ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন গেরিলা বাহিনীর সংগঠক, একাত্তরে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন দেশ, প্রতিনিধিত্ব করেছেন জাতিসংঘে, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজন, ভিন্ন দলের হলেও বঙ্গবন্ধু যাকে মন্ত্রী করতে চেয়েছিলেন; সেই অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ পত্রিকা পড়তে আমাদের অফিসে আসেন! নিজেদের ভাগ্যকে ঈর্ষা করার মত ম্যাচুরিটি তখনও হয়তো হয়নি আমাদের।

১৯৩৭ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে চান্দিনায় মহাত্মা গান্ধীর জনসভায় যোগ দিতে গিয়ে রাজনীতিতে হাতেখড়ি। তারপর মৃত্যু পর্যন্ত রাজনীতির লাঠি আর ছাড়েননি। বরং রাজনীতি করবেন বলে ছেড়েছেন অনেককিছু, এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার মত নিশ্চিন্তের চাকরিও। বরং বেছে নিয়েছেন মামলা, হুলিয়া, আত্মগোপন আর কারাবরণের ঝুঁকি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ- ২৩ বছরের মুক্তিসংগ্রামেও ছিলেন মোজাফফর।

৫৪এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ৩২ বছরের টগবগে তরুণ মোজাফফর তখনকার মুসলিম লীগের শিক্ষামন্ত্রী মফিজুল ইসলামকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি ছিলেন মাওলানা ভাসানীর অনুসারী। কিন্তু ৬৭ সালে আদর্শের প্রশ্নে দুজনার দুটি পথ দুটি দিকে বেকে যায়। ভাসানীর নেতৃত্বে রয়ে যায় চীনপন্থি বামরা। আর মস্কোপন্থিদের নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ। সেই থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনিই ন্যাপ'এর সভাপতি। আপনি তার অনেক কাজের সমালোচনা করতে পারবেন। কেন তিনি ৫২ বছর ধরে একটি দলের সভাপতি, ধর্ম-কর্ম-সমাজতন্ত্র আসলে এক ধরনের বিভ্রান্তি, সমাজতন্ত্রকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌছাতে পারেননি কেন? স্বাধীনতার পর ন্যাপ-সিপিবি কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা রাখতে পারেনি বলেই উগ্র জাসদ আর প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি সেই জায়গাটা  পূরণ করে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল। এই সব প্রশ্ন-অভিযোগ আপনি তুলতেই পারেন। সাংগঠনিক ভাবে অনেক প্রশ্ন থাকলেও ব্যক্তি অধ্যাপক মোজাফফরের বিরুদ্ধে কেউ কখনো কোনো অভিযোগের আঙ্গুল তুলতে পারেনি। তাঁর সততা, নিষ্ঠা, আদর্শের প্রতি একাগ্রতার কোনো তুলনা নেই। তিনি আদর্শের সাথে একচুলও আপস করেননি। বিশ্বাস থেকে নড়েননি এক ইঞ্চিও। তার অনেক কমরেড যখন নামের আগে আলহাজ্ব বসিয়ে নেন, তখনও তিনি বামপন্থায় অবিচল। আপস না করে, লোভের উর্ধ্বে থেকেও যে এই বাংলাদেশে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাজনীতি করা যায়, তার উদাহরণ হয়ে থাকবেন মোজাফফর আহমেদ। এখনকার রাজনীতিবিদদের দেখলে মনে হয়, রাজনীতি মানে রাজা হওয়ার নীতি। আর অধ্যাপক মোজাফফরদের দেখলে মনে হয়, রাজনীতি আসলে নীতির রাজা। মন্ত্রিত্ব যার সম্মতির অপেক্ষায় ফিরে যায়, সেই তিনি শেষ বয়সে স্বাধীনতা পদকও ফিরিয়ে দেন, কারণ পদকের জন্য বা কিছু পাওয়ার আশায় মুক্তিযুদ্ধ করেননি। মন্ত্রিত্ব ফিরিয়ে দেয়া, পদক ফিরিয়ে এমন সন্তপুরুষ রাজনীতি আর কখনো পাবে?

অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটা যুগের অবসান ঘটলো। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া সর্বশেষ জাতীয় নেতা ছিলেন তিনি। তার স্মৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। আমাদের এখনকার রাজনীতিবিদরা যদি অধ্যাপক মোজাফফরের জীবন থেকে কিছু শেখেন, জাতির বড্ড উপকার হয়।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র