Barta24

বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯, ৭ ভাদ্র ১৪২৬

English

প্রসঙ্গ রাজনীতি: সংবিধান, সংসদ ও আসন্ন নির্বাচন

প্রসঙ্গ রাজনীতি: সংবিধান, সংসদ ও আসন্ন নির্বাচন
ইকতেদার আহমেদ, ছবি: বার্তা২৪
ইকতেদার আহমেদ


  • Font increase
  • Font Decrease

জাতীয় সংসদের মেয়াদ হলো সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ থেকে ৫ বছর। যেদিন ৫ বছর অতিবাহিত হয় সেদিন আপনাআপনিই সংসদ ভেঙ্গে যায়, অবশ্য রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে মেয়াদ অতিক্রান্তের পূর্বেই সংসদ ভেঙ্গে দিতে পারেন। একজন সংসদ সদস্যকে তার নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে শপথ গ্রহণ করতে হয় যদিও উক্ত মেয়াদ অতিবাহিত হওয়ার পূর্বে স্পীকার যথার্থ কারণে তা বৃদ্ধি করতে পারেন।

সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী প্রবর্তন পরবর্তী মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙ্গে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে এবং মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙ্গে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান করা হয়েছে।

সংসদের সাধারণ নির্বাচন বিষয়ে পঞ্চদশ সংশোধনী পূর্ববর্তী যে বিধান ছিল তাতে মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান ছিল।

পঞ্চদশ সংশোধনী পূর্ববর্তী বিধান অনুযায়ী মেয়াদ অবসান বা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো বিধায় নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন সংসদ সদস্যরা পদে বহাল থাকতেন না।
পঞ্চদশ সংশোধনীর দ্বারা নব প্রবর্তিত বিধান অনুযায়ী সংসদ মেয়াদ পূরণের ক্ষেত্রে তা ভেঙ্গে না দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কারণে বিদ্যমান সংসদ সদস্যরা নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হতে ইচ্ছুক হলে তাদেরকে পদে বহাল থাকাবস্থায় নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হতে হয়।

পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা প্রবর্তিত বিধানের ফলশ্রুতিতে সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ সংসদের মেয়াদ প্রথম বৈঠকের তারিখ হতে ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে সংসদ সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করতে পারেন না। একজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া পরবর্তী সংবিধানে উল্লিখিত শপথ পাঠ ব্যতিরেকে সংসদ সদসরূপে কার্যভার গ্রহণের জন্য আইনানুগভাবে সিদ্ধ নন।

সংসদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের বৈঠক আহবান করতে হয়। সংসদের এক অধিবেশনের সমাপ্তি ও পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের মধ্যে ৬০ দিনের অতিরিক্ত বিরতি থাকার বিধান না থাকলেও মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে নির্বাচন অনুষ্ঠান পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদের বৈঠক অনুষ্ঠানের বিধান নেই। এ কারণে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা পদে বহাল থাকাবস্থায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও তারা সংসদের কোনো কার্যে অংশগ্রহণ করতে পারেন না।

সংসদ সদস্যদের বেতন, ভাতা ও সুযোগসুবিধাদি রাষ্ট্রীয় তহবিলে রক্ষিত জনগণ প্রদত্ত কর হতে নির্বাহ করা হয়। সংসদ সদস্যদের কাজ হলো দেশ ও জনগণের কল্যাণে আইন প্রণয়ন এবং নিজ সংসদীয় এলাকা ও দেশের সার্বিক উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করা। পঞ্চদশ সংশোধনী পরবর্তী একজন সংসদ সদস্যের বেতন, ভাতা ও সুযোগসুবিধাদি বহুলাংশে বৃদ্ধির ফলশ্রুতিতে তাঁরা পূর্বের তুলনায় বর্তমানে যে বর্ধিত বেতন, ভাতা ও সুযোগসুবিধাদি পাচ্ছেন তা হলো- বেতন ৩০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৫৫ হাজার টাকা, ব্যয় নিয়ামক ভাতা ৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৫ হাজার টাকা, বিমান দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের ক্ষেত্রে বীমার পরিমান ১০ লাখ টাকা, দৈনিক ভাতা ৩শ টাকা থেকে বেড়ে ১৭৫০ টাকা, স্বেচ্ছাধীন তহবিল ৩ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৫ লাখ টাকা, নির্বাচনী এলাকার অফিস খরচ মাসিক ৭ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১২ হাজার টাকা এবং মাসিক পরিবহন ভাতা ৪০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৭০ হাজার টাকা।

নবম সংসদ বহাল থাকাকালীন পঞ্চদশ সংশোধনী প্রবর্তিত হয়। পঞ্চদশ সংশোধনী প্রবর্তন পরবর্তী দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নবম সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি। নবম সংসদের মেয়াদ ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি ৫ বছর পূর্ণ হয়। সে নিরীখে দশম সংসদ নির্বাচনটি ২০১৩ সালের ২৭ অক্টোবর হতে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনটি অনুষ্ঠানকালীন নবম সংসদে নির্বাচিত যে সকল সদস্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন তারা সকলে পদে বহাল থাকাবস্থায় নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন। নবম সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি দশম সংসদ নির্বাচন বজর্ন করায় দলটির নবম সংসদে নির্বাচিত কোনো সদস্য দশম সংসদ নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হননি। সে সময়কার প্রধান বিরোধী দল বিএনপির বর্জনের মুখে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের জন্য উন্মুক্ত ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫৪টি আসনের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাসমূহ হতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আইনানুযায়ী নির্বাচিত তিনশত সদস্য সমন্বয়ে এবং তাদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ভিত্তিতে একক হস্তান্তরযোগ্য ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত ৫০ জন মহিলা সদস্যসহ সর্বমোট ৩৫০ সদস্য সমন্বয়ে সংসদ গঠিত হয়। কাজেই ২০১৪ সালে একটি প্রত্যক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন থেকে জাতি বঞ্চিত হয়েছে। সে বিবেচনায় সরকারও এবার একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দিকেই হাঁটছে বলেই মনে হয়।

দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন ৯০ দিন সময়ের মধ্যে নবম সংসদের কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। নবম সংসদে নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন সময়ে সংসদ সদস্য পদে বহাল থাকলেও সে সময় নবম সংসদের অধিবেশন অনুষ্ঠান সাংবিধানিকভাবে বারিত থাকায় নির্বাচনটি অনুষ্ঠানকালীন কোনো অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়নি যদিও সে সময় সংসদ সদস্য পদে বহাল থাকাবস্থায় যে সব সদস্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন তারা সবাই পূর্বের ন্যায় বেতন, ভাতা ও সুযোগসুবিধাদি নিয়েছেন।

দশম সংসদের ন্যায় একাদশ সংসদ নির্বাচন সংবিধানের বিদ্যমান বিধানাবলির আলোকে অনুষ্ঠিত হলে দশম সংসদে নির্বাচিত যে সকল সদস্য একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হবেন তারা সকলে নবম সংসদের অনুরূপ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ সদস্যদের ন্যায় পদে বহাল থাকাকালীন অবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হবেন। যে বিধানাবলির আলোকে নবম সংসদের যে সকল সদস্য দশম সংসদ নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হওয়াকালীন বেতন, ভাতা ও সুযোগসুবিধাদি আহরণ করেছিলেন দশম সংসদে নির্বাচিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ সদস্যগণও একই বিধানাবলির আলোকে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশগ্রহণকালীন নির্ধারিত ৯০ দিন সময়কালে বেতন, ভাতা ও সুযোগসুবিধাদি আহরণ করবেন। প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার, ডেপুটি স্পীকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী এরা সকলেই সংসদ সদস্য। এরা প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত হলেও পদে বহাল থাকাবস্থায় নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হওয়ার উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তাঁরা প্রজাতন্ত্রের কর্মে লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত মর্মে গণ্য হন না। উপরোক্ত পদধারীদের ন্যায় সংসদ সদস্যদের এরূপ ছাড় দেয়া হয়নি।

সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ সকল প্রার্থীর জন্য সমসুযোগ সম্বলিত মাঠ অপরিহার্য। কিন্তু সংসদ সদস্য ও সংসদ সদস্য নন (যেকোনো দলেরই হতে পারে) এমন দু’ধরণের ব্যক্তি নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হলে সে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন করতে পারে। সরকার এ সুযোগ কেন দেবে?

বাংলাদেশ বা এর যে কোনো অংশের নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক জীবন যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণে বিপদের সম্মুখীন হলে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে জরুরি অবস্থান জারি করতে পারেন। রাষ্ট্রপতির নিকট যদি সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয় যুদ্ধাবস্থার বিদ্যমানতার জন্য ভেঙ্গে যাওয়া সংসদ পুনরাহবান করা প্রয়োজন সেক্ষেত্রে যে সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিল রাষ্ট্রপতি তা আহবান করতে পারেন। এ ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শানুযায়ী কার্যটি সমাধা করতে হয়। সংবিধানের বিদ্যমান বিধানাবলি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী স্বীয় পদে বহাল থাকেন।

দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন প্রধানমন্ত্রী ও স্বল্প সংখ্যক মন্ত্রী সমন্বয়ে গঠিত সরকারের মন্ত্রীসভার সদস্যগণ সংসদ সদস্যদের ন্যায় পদে বহাল ছিল। সে সময় প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্যদের এক-দশমাংশ ব্যতীত অপর সবাই সংসদ সদস্য হিসেবে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।

বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীসহ তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্যগণ পদে বহাল থাকা অবস্থায় একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূল নির্বাচনের সম্ভাব্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায় সরকারের। সবদলের আস্থা অর্জন করতে হবে। এটি নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচনকালীন সরকার ও সংসদের আকার-প্রকার নিয়ে ভাবনার অবকাশ আছে। সরকার হয়তো এটি ভাবছেও। তাই সরকার সংবিধান তথা রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে এটাই কাম্য।


লেখক: সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

আপনার মতামত লিখুন :

২১ আগস্ট: বাংলাদেশের রাজনীতির স্থায়ী বিভক্তি রেখা

২১ আগস্ট: বাংলাদেশের রাজনীতির স্থায়ী বিভক্তি রেখা
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

বাংলাদেশের রাজনীতির দুটি ধারা- আওয়ামী লীগ এবং এন্টি আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতার আগে এন্টি আওয়ামী লীগ ধারার নেতৃত্ব ছিল মুসলিম লীগের হাতে, স্বাধীনতার পর এন্টি আওয়ামী লীগ ধারার নেতৃত্ব হাতে তুলে নেয় জাসদ। আর ৭৫এর পর থেকে এই ধারাটির নেতৃত্ব বিএনপির হাতে। রাজনীতিতে দুটি ধারা থাকা অস্বাভাবিক বা অভূতপূর্ব নয়। বরং এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই রাজনীতির একাধিক ধারা রয়েছে। তবে আদর্শিক ভিন্নতা থাকলেও সব দেশেই দুই ধারার রাজনীতির মধ্যে আলাপ-আলোচনা, স্বাভাবিক সৌজন্য, ক্ষমতার পালাবদল ইত্যাদি থাকে। আমাদের দেশেও ছিল, এখন আর নেই। নেই কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর খুজতেই আজকের লেখা।

বাংলাদেশের রাজনীতির সকল বিভক্তি আগস্টে। বিভক্তি রেখা দুটি- ১৫ আগস্ট আর ২১ আগস্ট। আগস্ট মানেই যেন শোক আর বেদনা। ৭৫এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছিল ঘাতকরা। বেঁচে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঘাতকরা তাদের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার মিশনে নেমেছিল। নেতারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানবঢাল হয়ে শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে পেরেছেন। তবে আইভি রহমানসহ ২৪ জন মারা গেছেন নির্মম এই গ্রেনেড হামলায়। আগস্টের এই দুই নির্মম তারিখ আমাদের রাজনীতিতে স্থায়ী বিভক্তি রেখা টেনে দিয়েছে। যদিও ১৫ আগস্টের দায় চাইলে বিএনপি এড়াতে পারতো। কারণ ৭৫এর ১৫ আগস্ট বিএনপির জন্ম হয়নি। শেষ পর্যন্ত ১৫ আগস্টের মূল বেনিফিশিয়ারি জিয়াউর রহমানই বটে, তবুও বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি। কর্নেল ফারুক ৭৫এ একবার উপসেনা প্রধান জিয়াউর রহমানের সাথে দেখা করে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষের কথা বলেছিলেন। জিয়া তাকে, তোমরা জুনিয়র অফিসাররা কিছু করো, জাতীয় হালকা উস্তানি দিয়ে বিদায় করেছিলেন এবং সতর্ক জিয়া পরে আর ফারুক গংকে অ্যালাউ করেননি। জিয়াউর রহমান চাইলে জুনিয়র অফিসারদের অসন্তোষের কথা সিনিয়রদের জানাতে পারতেন। তা না করে তিনি সুযোগের অপেক্ষায় থাকলেন। সুযোগটা তিনি পেয়েও গেলেন। নানা ঘটনার পর ৭৫এর ৭ নভেম্বর ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন জিয়াউর রহমান।

১৫ আগস্ট সকালে রাষ্ট্রপতি হত্যার খবর শুনে শেভ করতে করতে নির্বিকার কণ্ঠে জিয়া বলোছিলেন, 'সো হোয়াট। ভাইস প্রেসিডেন্ট ইজ দেয়ার। আপহোল্ড দ্যা কনস্টিটিউশন।' জিয়ার প্রতিপক্ষের লোকজন বলেন, রাষ্ট্রপতির হত্যার খবর শুনে উপসেনা প্রধান হিসেবে তার যা দায়িত্ব ছিল তা পালন করেননি। অন্য সবাই যখন খবর শুনে রাতের পোশাকে সেনা সদরে গেছেন। জিয়াউর রহমান তখন শেভ করে, চালক নিয়ে ইউনিফর্ম পড়ে গেছেন। তার মানে তিনি ঘটনা জানতেন এবং অপেক্ষা করছিলেন। আর জিয়ার পক্ষের লোকজনের যুক্তি হলো, তিনি তো সংবিধান সমুন্নত রাখার কথা বলেছিলেন; ক্যু বা বিশৃঙ্খলা নয়। আর সেনা প্রধান থেকে শুরু করে সবাই যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়, তখন উপসেনা প্রধান কী করবেন। আর পেশাদার সৈনিক হিসেবে দ্রুত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিজেকে তৈরি করে ফেলাটা তো কৃতিত্বের। ১৫ আগস্টে জিয়াউর রহমানের যেটুকু ভূমিকা বা অবস্থান; চাইলে তিনি সেটা এড়াতে পারতেন। কিন্তু ১৫ আগস্টের খুনীদের পুনর্বাসন করে, চাকরি দিয়ে, খন্দকার মোশতাকের করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বহাল রেখে জিয়াউর রহমান বুঝিয়ে দিলেন; পরিস্থিতি যাই হোক, ১৫ আগস্টই বিএনপির রাজনৈতিক জন্ম। জিয়াউর রহমান যাই হোক, চাইলে বেগম খালেদা জিয়া ১৫ আগস্টের দায় এড়াতে পারতেন, রাজনীতিকে রাজনীতির জায়গা ফিরিয়ে আনতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা তো করেনইনি, উল্টো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ১৫ আগস্ট জন্মদিন আবিষ্কার ও ঘটা করে পালন করে বুঝিয়ে দিলেন ১৫ আগস্টই তার এবং তার দলের রাজনৈতিক জন্ম। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরু করেছিল। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে আবার পুরো বিচার প্রক্রিয়া ডিপ ফ্রিজে পাঠিয়ে দেয়। ১৫ আগস্টের দায় এড়ানোর সুযোগ থাকলেও জিয়া, খালেদা, বিএনপি বারবার নানাভাবে সে দায় নিজেদের কাঁধে টেনে নিয়েছে, যা আওয়ামী লীগের সাথে বিএনপির রাজনৈতিক দূরত্ব আরো বাড়িয়েছে শুধু। তারপরও ১৫ আগস্টের বিভক্তি রেখাটা অলঙ্ঘনীয় ছিল না।

তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে স্থায়ী ও অলঙ্ঘনীয় বিভক্তি রেখা টেনে দিয়েছে ২১ আগস্ট, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। সবকিছুরই একটা নিয়ম থাকে। কিন্তু ২১ আগস্ট রাজনীতির সকল নিয়ম কানুন ভুলুণ্ঠিত করে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। দেশের বাইরে থাকায় ১৫ আগস্টের নির্মমতা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর থেকে বারবার তাঁর ওপর হামলা হয়েছে। ১৯টি হত্যাচেষ্টা থেকে তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন। তবে অন্য সব হত্যাচেষ্টার সাথে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার একটা পার্থক্য রয়েছে। ২১ আগস্টের চেষ্টাটি ছিল বেপরোয়া, মরিয়া, নিষ্ঠুর ও সুপরিকল্পিত। রাষ্ট্রযন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় বিরোধী দলীয় হত্যার চেষ্টা নজিরবিহীন। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো হত্যা পরিকল্পনায় সম্পৃক্ত থাকতে পারেন, এটা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। তারচেয়ে বড় কথা হলো, ২১ আগস্ট হত্যা পরিকল্পনা হয়েছিল তখনকার বিকল্প ক্ষমতা কেন্দ্র হাওয়া ভবনে এবং মূল পরিকল্পনাটা ছিল তখনকার প্রধানমন্ত্রীপুত্র তারেক রহমানের। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও, এসব এখন আদালতে প্রমাণিত সত্য।

আমরা রাজনীতিতে সমঝোতার কথা বলি, আলোচনার কথা বলি। কিন্তু যখন জানি, শেখ হাসিনাকে মারতে গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনায় ছিলেন তারেক রহমানও, তখন বুঝি কাজটা কত কঠিন। ১৫ আগস্ট যে বিভক্তির শুরু, ২১ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতির সেই বিভক্তিকে যেন স্থায়ী রূপ দিয়েছে। এই গত ১১ বছর ধরে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে মুছে ফেলার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে, তার উৎসও কিন্তু ২১ আগস্ট। আপনি যথন রাজনীতির নিয়ম ভাঙবেন, তখন আপনিও প্রতিপক্ষের কাছ থেকে নিয়ম আশা করতে পারবেন না। জানি প্রায় অসম্ভব, তবু চাই রাজনীতিটা আবার নিয়মে ফিরুক। প্রতিহিংসার জবাব প্রতিহিংসায় না হোক। রাজনীতির লড়াইটা, বিভেদটা হোক আদর্শের।

ঐতিহাসিক ভুলের খণ্ডন নাকি অন্য কিছু?

ঐতিহাসিক ভুলের খণ্ডন নাকি অন্য কিছু?
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

কাশ্মীর নিয়ে ভারতের পদক্ষেপের পর পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে না বললেও ভারতের সঙ্গে সকল প্রকার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছে। ৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের নেতৃত্বে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের এক সভায় তারা ইসলামাবাদে নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনারকে বহিষ্কার করার পাশাপাশি নয়াদিল্লীতে নিযুক্ত তাদের সকল কূটনীতিককে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। এর বাইরে তারা ভারতের সঙ্গে সকল প্রকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলোকে স্থগিত করেছে।

আগামী মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় তারা বিষয়টিকে আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে ভারতের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এখানে সঙ্গত কারণেই বলে রাখা ভাল যে, পাকিস্তানের তরফ থেকে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া আসবে জেনেই কিন্তু ভারত অনেক ভেবেচিন্তে কাশ্মীরকে দ্বিখণ্ডিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয়টি এখন একদিকে যেমন ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়, অন্যদিকে মুক্তিকামী মানুষের আত্মমর্যাদার প্রশ্নে বড় বাধা বিবেচনায় একটি আন্তর্জাতিক সংকটেও রূপ নিয়েছে। তবে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতার বিবেচনায় এমনটা আশা করার সুযোগ নেই যে ভারতের ওপর কোনো প্রকার আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান হতে পারে।

আইনগতভাবে কাশ্মীর এখন আর রাজ্য নয়, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে জম্মু কাশ্মীর এবং লাদাখ নামে দুটি বিশেষ অঞ্চল। ১৯৫০ সালে প্রণীত ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা অনুযায়ী যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্র- এই তিনটি বিষয় বাদে বাদবাকি সকল বিষয়ে কাশ্মীরের সরকারকে দেওয়া সকল ক্ষমতা বাতিল হয়ে গেল গত ৫ জুলাই রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের এক স্বাক্ষরে। প্রশ্ন হচ্ছে সংবিধানের একটি বিশেষ ধারা কীভাবে কেবল রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরে বাতিল হয়ে গেল। এর উত্তর হচ্ছে যখন এই বিশেষ ধারাটি সংযোজন করা হয় তখনই এর সঙ্গে এটিকে একটি অস্থায়ী প্রভিশন হিসেবে বর্ণনা করে রাষ্ট্রপতি যখনই চাইবেন তখনই তা বিলুপ্ত করতে পারবেন বলে শর্ত দেয়া হয়েছিল। এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ৬৯ বছর পর রাষ্ট্রপতি তা বাতিল করলেন মাত্র। তবে বিষয়টিকে যেভাবে সরল অংকের মতো করে বর্ণনা করা হল, বাস্তবে এটি এমন সরল ছিল না কখনো। বিগত প্রায় ৭০ বছর এমনকি স্বাধীনতা উত্তর সময়ে ভারতের কোনো সরকার কখনো কাশ্মীরকে একীভূত করাতো দূরে থাক সেখানকার স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল জনদাবি সামাল দিতেই সবসময় ব্যস্ত সময় অতিক্রম করেছে।

বিজেপি তথা ভারত সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ এবং এর পরবর্তী দেশের রাজনীতিবিদদের প্রতিক্রিয়া থেকে বিষয়টি অনুমান করা কঠিন নয় যে তাদের বহু প্রতীক্ষিত একটি চাওয়ার প্রতিফলন ঘটেছে নরেন্দ্র মোদির হাত ধরে। সেই সঙ্গে বিগত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির আগের চাইতেও ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভের বিষয়টি এখন অনেকটা স্পষ্ট। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে তারা স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিল যে জয়লাভ করে আবার সরকার গঠন করতে পারলে তারা বিতর্কিত ৩৭০ ধারা অবলুপ্তি করবে। এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে যে এই ৩৭০ ধারাটি এখানে ভারতে রাজনীতিবিদদের অনেকের কাছেই ‘বিতর্কিত’ হিসেবে চিহ্নিত। এর সঙ্গে ৩৫ উপধারার সন্নিবেশের মধ্য দিয়ে অপরাপর রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রে যা নেই কাশ্মীরের ক্ষেত্রে এসবের সন্নিবেশন, যেমন আলাদা পতাকা, নিজস্ব আইন, অপরাপর অঞ্চলের অধিবাসীদের সেখানে স্থায়ী বাসিন্দা হবার ক্ষেত্রে বাধা, চাকরির ক্ষেত্রে অন্যান্যদের প্রবেশাধিকারে প্রতিবন্ধকতা ইত্যাকার সকল বিষয় আসলে কাশ্মীরকে সকলের কাছেই চক্ষুশূল করে রেখেছিল। তবে দিন দিন ধরে বিষয়টি এভাবে চলতে থাকা এবং কাশ্মীর নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সিদ্ধান্তহীনতা বিষয়টিকে এমন এক জটিলতার আবর্তে বন্দি করে রেখেছে যে এটা নিয়ে সহজে কোন যুক্তিগ্রাহ্য সমাধান পাওয়া দুরূহ।

এ কথা ঠিক যে ভারত সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ কাশ্মীরের মুক্তিকামী মানুষের জন্য বুমেরাং হবে এবং তাদের মুক্তির সংগ্রামকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে, একই সঙ্গে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে যে যুক্তি প্রদর্শন করা হচ্ছে অর্থাৎ এই বিশেষ মর্যাদার সঠিক ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছে কাশ্মীর, সেটাকেও কি একেবারে অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেয়া যায়। আবার এই প্রশ্নও এসে যায়, এই ব্যর্থতার আসল কারণগুলো কি? এসব কিছুর মূলে ভারত সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণ, মহারাজা হরি সিং এর সাথে সম্পাদিত চুক্তির প্রতিশ্রুতির যথাযথ বাস্তবায়ন না করা ইত্যাকার বিষয় এবং পরবর্তীতে এসবের মধ্যে পাকিস্তানের ঢুকে পড়া, কাশ্মীর নিয়ে ভরত এবং পাকিস্তানের মধ্যে দুবার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া, এর বাইরেও বিভিন্ন সময় ছোটখাট সংঘাত- এই সব কিছু মিলে জল এতটা ঘোলা হয়েছে যে দিন যতই গেছে, পরিস্থিতি ততই জটিল আকার ধারণ করেছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে তবে কি হতে পারত সর্বজনগ্রাহ্য সমাধান? এক্ষেত্রে এতসব ঘটনার ব্যাপকতায় এমন কোন গ্রহণযোগ্য সমাধান কেউ দিতে পারেননি।

ইতিহাসবিদ ড: কিংশুক চ্যাটার্জি বলছেন, 'ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাক্সেশনের মাধ্যমে কাশ্মীর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ঠিকই,কিন্তু যে শর্তে হয়েছিল কালক্রমে ভারত তা থেকে অনেকটা সরে এসেছে। পাকিস্তানও কতকটা জোর করেই এই অ্যারেঞ্জমেন্টের মধ্যে প্রবেশ করেছে। ফলে সাতচল্লিশে এই সমস্যার শুরু হলেও এখন সেই সমস্যা অনেক বেশি জটিল আকার নিয়েছে।'

তিনি আরও বলেন, 'এখন কাশ্মীর সমস্যার এমন কোনো পর্ব নেই যেখানে ফিরে গিয়ে আমরা বলতে পারি এখান থেকে সমস্যাটা আবার 'রিসেট' করা যাক! আজ যদি কাশ্মীরে গণভোট হয় কিংবা পাকিস্তান তাদের দিকের কাশ্মীর থেকে সরে যায় - তাতে কোনও সমস্যার আদৌ সমাধান হবে বলে মনে হয় না।'

দীর্ঘদিনের এই সমস্যার জন্য কাশ্মীরের শেষ যুবরাজ করণ সিং অনেকটাই দোষ চাপিয়েছেন ভারত সরকারের ওপর। তার মতে, 'যেদিন আমার বাবা সেই চুক্তিতে সই করেন সেদিন থেকেই জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ২৭ অক্টোবর তারিখে সেদিন আমি নিজেও ওই ঘরে উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু মনে রাখতে হবে, মহারাজা হরি সিং কিন্তু প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ও বৈদেশিক সম্পর্ক - শুধু এই তিনটি ক্ষেত্রে ভারতভুক্তি স্বীকার করেছিলেন,নিজের রাজ্যকে ভারতের সঙ্গে পুরোপুরি মিশিয়ে দেননি। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা অনুযায়ী জম্মু ও কাশ্মীরকে যে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।'

সঙ্গত কারণেই ভারতের এই হঠাৎ আচরণ শান্তিপ্রিয় মানুষকে হতাশ করলেও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং কাশ্মীরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহের দিকে লক্ষ্য করলে ভারতের এই সিদ্ধান্তকে কি খুব একটা অপ্রাসঙ্গিক বলার সুযোগ রয়েছে? বিশেষ মর্যাদার নামে কাশ্মীরে যে ধরণের অচলাবস্থা বিরাজ করছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে যেভাবে প্রতিনিয়ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে এবং এর থেকে প্রতিবেশী পাকিস্তান এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় যেভাবে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো কাশ্মীরের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে জড়িয়ে পড়ছে এই সবকিছুই কিন্তু দিনে দিনে ভারতের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল। কাশ্মীরের এই অচলাবস্থার পথ ধরে ভারতের অপরাপর অঞ্চলগুলোতেও অস্থিরতার বিস্তার যেন রোধ করা যায় সেসব বিবেচনায় নরেন্দ্র মোদির এই পদক্ষেপ। এখানে এটাও সত্য হিসেবে মানতে হবে যে এই পদক্ষেপ নিয়ে নরেন্দ্র মোদি নিজেকে সত্যিকার অর্থে এক কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি যদি জম্মু কাশ্মীর এবং লাদাখকে কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে যথার্থভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম হন তবে যেমন ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করবেন, আবার অন্যদিকে কাশ্মীরের জনরোষ এবং সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া এবং সন্ত্রাসবাদের হুমকি যদি নতুন মাত্রায় আবির্ভূত হয় তবে তা একপর্যায়ে বড় ধরণের সংঘাত এমনকি পাক ভারত উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। শুরু হয়ে যেতে পারে আরেকটি বড় যুদ্ধ, যার ভয়াবহতা অতীতের যে কোন সময়কে অতিক্রম করে যেতে পারে। আর এমনটা হলে এর সকল দায়ভারও কিন্তু মোদির ঘাড়েই পড়বে।

লেখক: ফরিদুল ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র