Barta24

মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯, ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

মেঘপাহাড়ের ডাক-৯

কোহ রামহাহ ও কিনরেম ফলস

কোহ রামহাহ ও কিনরেম ফলস
ছবি: বার্তা২৪
মাহমুদ হাফিজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর


  • Font increase
  • Font Decrease

চেরাপুঞ্জিতে গাড়ি থেকে প্রথম যে জায়গাটিতে নামলাম, তাকে অফবিট স্পট বললেই বেশি মানায়। এর নাম কোহরামহাহ বা মোট্রপ। কোহ রামহাহ আসলে দুইশ ফুট উচ্চতার এক দানবীয় গোলা আকৃতির পাথর। ওপরের শীর্ষটা গম্বুজের মতো। তলদেশ থেকে দুইশ ফুট উঁচু গোলাকার পাথর। পাহাড়ের ঢালে এমন একটি জায়গায় তা প্রাকৃতিকভাবে স্থাপিত হয়ে আছে, যার পাশে একই আকৃতির আরও দুটি ছোট পাথর, মধ্য দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ঝর্ণার কলধ্বণি। জঙ্গলময় পাহাড়ি গিরি থেকে অবিরাম নেমে আসছে এই পানি। কোহ রাহমাহ বা পিলার রকের পাশ গড়িয়ে পড়ছে কয়েকহাজার ফুট নিচে। নিচে ঘনজঙ্গলময় দূর্গম প্রাকৃতিক নৈসর্গ। অদূরে চোখের সামনে বাংলাদেশের সমতলে বয়ে যাওয়া নদী।

আমাদের হোস্ট-কাম গাইডগণ বলছেন, ‘বাংলাদেশে এই উচ্চতার সমান্তরালে মেঘ জমে থাকে। এখানে বাংলাদেশ দেখার জন্য যারা আসেন, মেঘ থাকলে তারা পরিষ্কার দেখতে পান না। তোমাদের ভাগ্য ভাল, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ওপর মেঘ নেই।‘ গাড়ি চালক, এককাঠি সরেষ। আগ বাড়িয়ে বলল, ‘ওই যে বাঁয়ের দিকে একটু দূরে তাকান, সাদা সাদা বিল্ডিং, ওইটাই সিলেট।‘ দেখলাম সত্যিই তো সিলেট দিব্যি দেখা যাচ্ছে অদূরে। আর আমাদের নিচে জঙ্গলের ভিতর থেকে বাংলাদেশমুখো স্রোতস্বিনী ছুটে চলেছে সমতল বাংলাদেশের দিকে, তা জাদুকাটা নদী হয়ে ছাতক, কোম্পানিগঞ্জের ভূগোল মাড়িয়ে পৌঁছেছে সুরমায়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/18/1560864337506.jpg

কোহ রামহাহ’র ঝর্ণার ওপর তৈরি করা হয়েছে ছোট্ট কংক্রিটের কালভার্ট। তা সংযুক্ত করেছে একবিঘার মতো আয়তনের একটি উঁচু টিলাকে। এর চারপাশে নিরাপত্তা বেষ্টনি। এটা ভিউপয়েন্ট। ভিউপয়েন্ট বা প্রেক্ষণবিন্দু হলেও তা কেবল বাংলাদেশের সমতল,পাশ থেকে কোহ রামহাহ রক দেখা আর জঙ্গলময় প্রকৃতি ছুঁয়ে সমতল থেকে উড়ে আসা মেঘলা বাতাস উপভোগ। আরও বাড়িয়ে বলতে গেলে ঝর্ণার উৎসের কলধ্বণি শুনে মাতোয়ারা হওয়া। নিচে গড়িয়ে যাওয়া অবিরাম জলধারার উৎসের ভিত্তি করে তৈরি হচ্ছে যে নয়নাভিরাম জলপ্রপাত, তা দেখতে হলে যেতে হবে অন্য ভিউ পয়েন্টে। মানুষের দেখার চোখটি এরকমই। একেকজন যেমন একেকভাবে কোনকিছু দেখে। তেমনি একেক জায়গা থেকে কোন দৃশ্য একেকভাবে দেখা যায়। আমরা কোহ রামহাহ পাথর আর বাংলাদেশ ভিউপয়েন্ট দেখতে এসেছি, জলপ্রপাত নয়। যাহোক আমাদের পর্যটক দল ছোট্ট কালভার্টের ওপর দাঁড়িয়ে নানাভঙ্গিতে ছবি তোলে। ব্রিজের নিচ দিয়ে ছুটে চলা ঝর্ণার পানিকে যতোটা ক্যামেরার ভিউয়ের ভেতর আনা যায় তার কসরত করতে থাকে।  নানা স্পটে দাঁড়িয়ে নানা ভঙ্গিতে ছবি তোলে।  

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/18/1560864406471.jpg

আমি আর ভ্রমণসঙ্গী কামরুল হাসান কবিতা লিখি। প্রকৃতির অপত্যস্নেহের মধ্যে নেমে আমরা কোথাও হারিয়ে গেছি। ছবি তোলার হৈচৈ ছেড়ে আমরা দু’জন দুদিকে মগ্ন। আমি পানির কলতান শুনে টিলার বেষ্টনি পেরিয়ে আরেকটু ঢালুতে নেমে যাই। আবিস্কার করি টিলার নিচে ও আশপাশের খাদ দিয়ে অন্তহীন পানি নেমে যাওয়ার কলকল শব্দ। এটি কোহ রাহমাহ’র কাছ দিয়ে নামা ঝর্ণার চেয়ে আলাদা। এই পানিও কোন স্পটে গিয়ে হয়তো তৈরি করেছে চমৎকার জলপ্রপাত। খ্যাত জলপ্রপাত এর উৎসে অনতিক্রম্য গিরিখাদের ভেতর দিয়ে নেমে আসে যেসব নাম না জানা জলধারা, তার প্রত্যেকটিকে তো আর আলাদা নামে ডাকা যায় না ! আসলে প্রকৃতি অন্তহীন, অধরা, অবারিত। চলছে নিজস্ব ধারায়। নামের ছকে বেঁধে মানুষকে একে করে তুলেছে বাণিজ্যিক।

কোহ রামহাহ ভিউপয়েন্টে বাংলাদেশ দেখতে দেখতে এই প্রাচীন দানবীয়  পাথরটি সম্পর্কে খাসিদের প্রচলিত বিশ্বাস সম্পর্কে বলতে থাকেন আমাদের হোস্ট স্ট্রিমলেট ডেখার। তিনি শিক্ষিত গুণী মানুষ। খাসিদের ইতিহাস-সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান টনটনে। বলেন, ‘এই পাথর ছিল এক লোভী শয়তানের মালিকানাধীন। অতি লোভে সে মানুষের সমস্যা তৈরি করতো। তার থেকে মুক্তির জন্য লোকজন তাকে আয়রন ও ধারালো নখ মিশ্রিত খাবার খেতে দেয়। এই খাবার খাওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। তার ফেলে যাওয়া ঝুড়িটি পরে এই  মহাপাথরের আকৃতি ধারণ করে’। গাড়ির কাছে উঠে আসার সময়ও দেখি, ডেখারের বলা ইতিহাসটি সাক্ষ্য দিচ্ছে  রাস্তার ওপর টানানো একটি সাইনবোর্ডেও।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/18/1560864429525.jpg

জায়ান্ট রকে আমরা কোন পূজার  সামগ্রী দেখলাম না। পাহাড়ের ঢালু, দূর্গম রাস্তা পেরিয়ে এখানে খুব কম পর্যটক আসে। নৈসর্গিক শোভাময় জায়গাটি পর্যন্ত রাস্তা, নিরাপত্তা বেষ্টনি, ঝর্ণার ওপর ছোট কালভার্ট বানিয়ে পর্যটন কেন্দ্রের মধ্যেই সীমিত রেখেছে খ্রীষ্ট ধর্ম অনুসারী খাসিরা। তা দেখতে দেখে ভ্রমণতৃষ্ণা মেটানোর  ক্ষেত্রে ধর্মের ভেদাভেদ নেই।

কোহ রামহাহ পাহাড়-জঙ্গলের যে লোকেশনে, এর খুব কাছেই ভারতের সপ্তম বৃহত্তম জলপ্রপাত কিনরেম। পাহাড়ের ওপর থেকে একহাজার এক ফুট উচ্চতা ধারণ করে জলপ্রপাতটি ঘনঅরণ্যে  হারিয়ে যাচ্ছে।  ঢেউ খেলানো পাথুরে পাহাড়গাত্রে এটি তিনটি স্তুর তৈরি করেছে। ফলে এর সৌন্দর্য প্রলম্বিত। প্রথম স্তর থেকে চোখ সরিয়ে দ্বিতীয়টিতে সবশেষে এর তৃতীয় স্তরটির ঝলধারা গভীর অরণ্যে গিয়ে পড়ছে দেখা যায়। সোহরা-শেলা সড়ক আরও নিচে নেমে আবার ওপরে উঠে এঁকেবেঁকে এই জলপ্রপাতের তৃতীয় স্তরের ওপর দিয়ে চলে গেছে। প্রপাতের জলধারাকে অবাধ করতে রাস্তার ওপর বানানো হয়েছে সেতু। দূর্গম সড়কটি চলে গেছে বাংলাদেশের হালুয়াঘাট সীমান্ত পর্যন্ত। সারাক্ষণই এর ওপর দিয়ে গাড়ি, ট্রাক চলাচল করে। যাওয়ার আসার পথে সেতুর ওপর গাড়ি থামিয়ে বা গতি কমিয়ে যাত্রী ও চালকরা জলঝর্ণাটিকে একনজর দেখে নেয়। ব্রিজের সঙ্গে নিচে নামার সিঁড়ি ।  বড় বড় পাথরের মধ্যে এসে পড়ছে কিনরেমের পানি ফেনিলশুভ্র পানি। যারা এই স্পট ধেকে কিনরেম উপভোগ করতে চান, তারা পানিও ছুঁয়ে দেখতে পারেন। তবে এখান থেকে শেষের স্তরটিই কেবল দৃষ্টিগোচর হয়।

মনে পড়ে, ইউরোপের বৃহত্তম জলপ্রপাত সুইজারল্যান্ডের সাফাউজেনে অবস্থিত রাইনফলের কথা। রাইনফল সংলগ্ন রাজপ্রাসাদের নাম স্কলসি লাউফেন ক্যাসেল। এই নামেই ছোট্ট স্টেশনও। দ্রুতগামী ট্রেন রাইনফল দর্শনাকাঙ্খী যাত্রীদের জন্য একমিনিটের বিরতি দেয় স্কলসি লাউফেনে। প্রাসাদের নিচ দিয়ে নির্মিত সুরঙ্গপথ পার হয়ে ট্রেন রাইন নদীর সেতু অতিক্রম করে যায়। রাইন নদীর পানি পাহাড়ে বাঁক নিয়ে আকস্মিক তৈরি করেছে জলপ্রপাত। নদী অতিক্রম করে ট্রেন মূহুর্তে গিয়ে থামে নৈহাউজেন স্টেশনে। সেতু পার হওয়ার সময় জলপ্রপাতের কলধ্বণি আর ফেনায়িত শুক্র জলরাশি দেখে যাত্রীরা ঘোরের মধ্যে পড়ে। রাইনফল অবশ্য চেরাপুঞ্জির মতো প্রাকৃতিক না। একে কেন্দ্র করে খানাপিনা, রাফটিং, পাটাতনে দাঁড়িয়ে উৎক্ষিপ্ত ফেনিল শুভ্র পানি ছোঁয়া, ছবি তোলার মতো বাণিজ্যিক প্যাকেজের মধ্যে আটকে দেয়া হয়েছে।

আমরা কিনরেম দর্শনে গেল পাশ্ববর্তী থাংখারাং পার্কে। আধ কিলোমিটারের মতো সমতল রাস্তা দিয়ে পাহাড়ের দিকে গেলেই থাংখারাং। বড়সড়ো চত্ত্বরের পাশে গুটিকয়েক হস্তশিল্পের দোকান। পার্কের প্রবেশপথে টিকেট কাউন্টার। দশ টাকা করে এন্ট্রি ফি, ক্যামেরার জন্য বাড়তি টাকা। পাঁচ হেক্টরের বেশি আয়তনের থাংখারাং পার্কের শেষ মাথায় লুকআউট ডেক। বলতে পারি দৃশ্য পাটাতন। এর বেষ্টনিগুলো বাংলাদেশের পতাকা লাল-সবুজ রঙে রঞ্জিত। কিনরেম ফলসকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে যারা ছবি-সেলফি তুলতে চায়, তাদের জন্য জায়গাটি আদর্শ। এখান থেকে বাংলাদেশও দেখা যায়। আমাদের সঙ্গী কন্যা, জায়া, জননীদের আর পায় কে! তাঁরা ছবি সেলফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমরাও তাই।

পার্কে ঢোকার মুখে জলিকে একটি ক্যাপ কিনে দিয়েছিল খাসি হোস্ট বাখিয়া মুন। ইতোমধে তাঁর সঙ্গে বেশি ভাব হয়েছে জলির। ক্যাপের রঙ তাঁর পছন্দ না হলেও দোকানেও ভিন্নরঙা ক্যাপ ছিল না।  প্রসঙ্গ উঠতেই স্ট্রিমলেট ডেখার নিজের মাথার হলুদাভ ক্যাপটি খুলে জলির মাথায় পরিয়ে দিলো। জলি মহাখুশি।

আপনার মতামত লিখুন :

জানুয়ারি কিভাবে বছর আরম্ভের মাস হলো

জানুয়ারি কিভাবে বছর আরম্ভের মাস হলো
অষ্টম গ্রেগরির হাত ধরেই জন্ম নিয়েছে গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা

বেশিরভাগ দেশেই বছরের শুরুটা হয় জানুয়ারির প্রথম দিন। কেউ কেউ অবশ্য ২৫ মার্চ বা ২৫ ডিসেম্বরের মতো অন্যদিনকে গ্রহণ করেছে। তবু জানুয়ারির ১ তারিখের দাবি যেন অন্যরকম। এক অদ্ভুত দ্যোতনা নিয়ে একযোগে পালন করা হয় দিনটাকে। কিন্তু কিভাবে জানুয়ারি হয়ে উঠল বছর আরম্ভের মাস? সেই গল্পই থাকছে আজকের আয়োজনে—

১ জানুয়ারিকে বছরের প্রথম দিন করার ইতিহাস বেশ পুরনো। কিছুটা কৃতিত্ব রোমান সম্রাট নুমা পম্পিলিয়াসকে দেওয়া যেতে পারে। রোমের দ্বিতীয় সম্রাট ছিলেন তিনি। শাসনকাল ৭১৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৬৭৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। রোমের বেশিরভাগ রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তার হাতেই সৃষ্ট। সিংহাসনে আরোহনের পর নুমা আগের রোমান পঞ্জিকা পর্যবেক্ষণ করেন। তখন মার্চ মাসকে গণ্য করা হতো বছরের প্রথম মাস হিসাবে। নুমা জানুয়ারিকে প্রথম মাসের আসন দান করার সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্তটা বুদ্ধিবৃত্তিক বা যুক্তি বিচারে না, পছন্দ আর অপছন্দের ওপর ভর করে জন্ম নিয়েছে। জানুয়ারি মাসের নাম এসেছে রোমান জানুস-এর নাম থেকে। জানুস ছিলেন সকল কিছুর আরম্ভের দেবতা। মার্চ নামের উৎপত্তি মার্স থেকে। রোমান যুদ্ধ দেবতার নাম। শুরুর দেবতাকে শুরুতে না রেখে যুদ্ধের দেবতাকে রাখা হলে কি ভালো দেখায়?

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/22/1563800328025.jpg

নুমা পম্পিলিয়াস ছিলেন রোমান সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শাসক ◢

 

অনেকে অবশ্য দাবি করতে চান, জানুয়ারি মাসটাই নুমার সৃষ্টি। সে যা-ই হোক, ১৫৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে সরকারিভাবে ১ জানুয়ারিকে বছরের আরম্ভ বলে গণ্য করা হয়নি। তারও এক শতাব্দী পরে ৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সম্রাট জুলিয়াস সিজার নতুন করে সংস্কার আনলেন। জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে জানুয়ারির প্রথম দিনকে বছরের প্রথম দিন বলে মর্যাদা দেওয়া হলো। পূর্বে বাইজ্যান্টাইন সম্রাট কনস্টানটাইনের ধর্মান্তরের মধ্য দিয়ে খ্রিস্ট ধর্ম ব্যাপক পৃষ্টপোষকতা লাভ করে। বাড়তে থাকে রোমান সাম্রাজ্যের পরিসর। সেই সাথে ক্যালেন্ডারের ব্যবহারও ছড়িয়ে পড়ল সাম্রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। ৪৭৬ সালে রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে উত্তর ইউরোপের বার্বারদের কাছে। আপাতভাবে কেন্দ্রবিচ্ছিন্ন খ্রিস্টান অঞ্চলগুলো ক্যালেন্ডারে পরিবর্তন আনে এবার। নতুন নববর্ষের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয় মার্চের ২৫ তারিখ (ঘোষণা উৎসবের দিন) এবং ডিসেম্বরের ২৫ তারিখ (ক্রিসমাস)।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/22/1563800203681.jpg

রোমান সাম্রাজ্যের পতন পর্যন্ত জুলিয়ান পঞ্জিকার তাৎপর্য ছিল ব্যাপক ◢

 

পরবর্তীকালে জুলিয়ান পঞ্জিকায় আরো পরিবর্তন আসে। লিপ ইয়ার নির্ণয়ে ঘটে রদবদল। হিসাবে ভুল হবার দরুণ পরের কয়েক শতক ভুল সময়ে পালিত হয়েছে অনেক উৎসব। তারচেয়ে বড় কথা, ‘ইস্টার’-এর তারিখ নির্ধারণে সমস্যা দেখা দেয়। মধ্যযুগের নানা ঘটনায় আমূল বদলে যায় ইউরোপ। বিশেষ করে ক্রুসেড এবং ব্ল্যাক ডেথ-এর ঝড়। সেই সাথে ছিল চার্চের দুর্নীতি এবং সামন্ততন্ত্রের শোষণ। দীর্ঘদিন পর পোপ অষ্টম গ্রেগরি পঞ্জিকার দুরবস্থা উপলব্ধি করে সংস্কার সাধন করেন ১৫৮২ সালে। সেই সাথে সমাধান করেন লিপ ইয়ারের সমস্যাও। এই পঞ্জিকা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার নামে ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করে।

গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকায় জানুয়ারির প্রথম দিনকে নববর্ষ হিসাবে স্থান দেওয়া হয়। ইতালি, ফ্রান্স এবং স্পেনের মতো প্রভাবশালী দেশগুলো দ্রুত এই নতুন পঞ্জিকাকে গ্রহণ করে। ফলাফল ছিল সদূরপ্রসারী। প্রোটেস্ট্যান্ট কিংবা অর্থোডক্স সমাজ এক্ষেত্রে বেশ মন্থর। নতুন পঞ্জিকার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে লেগেছে বহুদিন। ব্রিটেন এবং তার আমেরিকান উপনিবেশগুলো ১৭৫২ সালের আগে গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকাকে অনুসরণ করেনি। তার আগে পর্যন্ত নববর্ষ পালিত হতো ২৫ মার্চ।

সময়ের সাথে সাথে অখ্রিস্টান দেশসমূহও গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা ব্যবহার শুরু করে। অবশ্য ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেন কিংবা পর্তুগালের উপনিবেশের দৌরাত্মকেও বিস্তৃতির পেছনে দায় কিছুটা দেওয়া যায়। তার মধ্যে বড় উদাহরণ চীন। চীনে এই পঞ্জিকার প্রচলন ঘটে ১৯১২ সালে। যদিও তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি অনুসারেই চান্দ্রমাস হিসাবে নববর্ষ পালিত হতো। প্রকৃতপক্ষে অনেক দেশ গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা গ্রহণ করলেও তাদের স্থানীয় এবং ধর্মীয় নিজস্ব ক্যালেন্ডার আছে। এমন দেশও আছে, যারা কখনোই গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা গ্রহণ করেনি। সুতরাং জানুয়ারিতে না হয়ে নববর্ষ অন্যদিন হয়। ইথিওপিয়াকে এইখানে উদাহরণ হিসাবে আনা যেতে পারে। স্থানীয়ভাবে ‘এনকুতাতাশ’ নামে পরিচিত তাদের নববর্ষ পালিত হয় সেপ্টেম্বরে।

মুনীর-খুকু এবং রীমা হত্যা ট্র্যাজেডি

মুনীর-খুকু এবং রীমা হত্যা ট্র্যাজেডি
সংবাদপত্রে মুনীর-খুকুর ফাঁসির খবর

সময়টা আজ থেকে অনেকদিন আগের। ১৯৮৯ সালের এপ্রিল মাসের শুরুর দিক, প্রকৃতিতে তখনও ফাগুনের আগুন হাওয়া বিদ্যমান। ভোরের আলো মাত্র ফুটে উঠছে, অদূরে মসজিদের মিনার হতে ভেসে আসছে মোয়াজ্জিনের দরদমাখা গলা। জীবিকার সন্ধানে মানুষ বেরিয়ে যাচ্ছে ঘরের বাইরে। ঠিক তখনই তাদের চোখে পড়ে একটি মর্মান্তিক দৃশ্য। ঢাকা চিটাগাং রোডের মুক্তি সরণির নিকট মিজমিজি গ্রামে যাওয়ার কাঁচা রাস্তার মোড়ে একটি লাশ পড়ে আছে। আরেকটু কাছে গেলে দেখা যায় লাশটা একজন মেয়ে মানুষের। পুরো শরীরে আঘাতের দাগ, চেহারায় আভিজাত্যের রঙ ফুটে আছে তখনও। গায়ে সোনার গহনা দেখে বুঝতে বাকি থাকে না মেয়েটি কোনো অবস্থাসম্পন্ন ঘরের। পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরিস্থিতি দেখে পুলিশ নিশ্চিত হয় এটা কোনো ডাকাতি বা ছিনতাই নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তা না হলে গায়ে গহনা রেখে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। পাশে খালের মধ্যে পাওয়া যায় রক্ত মাখা প্যান্ট, আরেকটু দূরে দেখা যায় পড়ে আছে একটি ধারাল ছুরি। পুলিশ বুঝতে পারে কেউ তাকে হত্যা করেই ফেলে রেখেছে এখানে। কিন্তু কেন? এই মেয়েই বা কে? উপস্থিত জনতাসহ সকলের মুখে তখন এই একটাই প্রশ্ন।

এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে খুবই বেদনা-বিধুর এবং নির্মম এক তথ্য। সেই সময় সারা বাংলাদেশে চায়ের দোকানে, অফিস পাড়ায় কিংবা ট্রেনে বাসে সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে এই ঘটনা। প্রতিদিন পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপা হতে থাকে এই খুনের সংবাদ, বিচারের আপডেট খবর। সব জায়গা থেকে রব ওঠে খুনীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির। যেন আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে সন্ত্রাসী, সেই দাবিতে চলে নানা স্লোগান প্রতিবাদ। মোটকথা সারা বাংলাদেশ জড়িয়ে পড়ে এই ঘটনায়।

পুলিশের সূত্রে পরিচয় মেলে মেয়েটির। নাম শারমিন রীমা। শহিদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন হোসেনের মেয়ে। যে নিজাম উদ্দিন স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় নির্মমভাবে নিহত হন, সেই নিজামুদ্দিনের মেয়েকে স্বাধীন দেশে এমন নির্মমতা বরণ করে নিতে হবে তা হয়তো তিনি ভাবেননি। যাকে বিয়ের মাত্র চার মাসের মাথায় নির্মমভাবে হত্যা করে তারই স্বামী। হাত থেকে তখনও যায়নি মেহেদির দাগ, বিয়ের এলবামগুলোতে তখনও জমেনি একটি ধুলো। কিন্তু তারই আগে সে লাশ হয়ে গেল। তার কবরে উঠে গেল ঘাস। পরিচয় পাওয়া যায় রীমার স্বামীরও। মুনির হোসেন সুরুজ, ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক প্রিন্সিপাল এবং ডাক্তারদের সংগঠন বিএমএ’র প্রাক্তন সভাপতি ডাঃ আবুল কাশেম এবং সে সময়ের খ্যাতনামা গাইনি ডাক্তার মেহেরুন্নেসার ছেলে। নিজেও পড়াশোনা করেছেন আমেরিকায় উইসকনসিন ইউনিভার্সিটিতে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে।

তাদের বিয়ে হয়েছিল ১৯৮৮ সালের ১১ ডিসেম্বর। বিদেশ থেকে পড়াশোনা শেষ করে মুনির দেশে এসে শুরু করেছিলেন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি বিক্রয়ের ব্যবসা। সবকিছু ভালোই চলছিল। বাবা মা তাই ছেলেকে বিয়ে দিতে চান। মেয়ে খোঁজা হয়। রীমাকে পছন্দ হয় তাদের পরিবারের। মেয়ের পরিবারও ছেলের খোঁজ নেন। সম্ভ্রান্ত ফ্যামিলি, দেখতে শুনতে ভালো, ছেলে নিজেও শিক্ষিত এবং ব্যবসায়ী। ব্যাস, আর কী লাগে। দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন রীমা এবং মুনির।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/22/1563795235721.jpg
পুরনো ছবিতে রীমা ও মুনীর ◢

 

ভালোই যাচ্ছিল তাদের দিনকাল। কিন্তু কিছুদিন পরে শুরু হয় অন্য যন্ত্রণা। স্বামীর ঘরে মন টেকে না। বউয়ের সাথে সামান্য বিষয় নিয়ে শুরু হয় ঝগড়া। এরই মাঝে রীমা একদিন দেখতে পান স্বামীর শার্টের মধ্যে লিপস্টিকের দাগ। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে, পায়ের তল থেকে সরে যায় মাটি। এ কোথায় এসে পড়লেন তিনি! ভাবলেন যাই হোক, আজকে জিজ্ঞেস করতেই হবে। স্বামী বাসায় আসলে জিজ্ঞেস করেন রীমা, কিছুক্ষণ চুপ থাকেন মুনীর। এরপর এমন পরিস্থিতে পুরুষ যা করে, মিথ্যার পর মিথ্যা বলে এড়িয়ে যেতে চায় ঘটনা থেকে। যখন আর এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না তখন শুরু হয় উচ্চবাচ্য, হাতাহাতি। লাথি মেরে সরিয়ে দেন রীমাকে। রীমা সে রাতে আর ঘুমাতে পারেন না। বালিশ ভেজান কান্নায়। কাকে দুষবেন তিনি, বাবা মাকে, স্বামীকে নাকি তার কপালকে?

বছর খানেক আগের কথা। মুনিরের মা স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ মেহেরুন্নেসার ছিল একটি ক্লিনিক। সেখানে প্যারালাইজড হয়ে ভর্তি হন চট্টগ্রাম পোর্টের ইন্সপেক্টর আবু জাফর। সাথে আসেন তার চল্লিশোর্ধ্ব স্ত্রী খুকু। দেখতে শুনতে খুব একটা মন্দ নয়। এ বয়সের শান্ত সচেতন নারীদের মতো তারও ছিল আকর্ষণীয় দেহাবয়ব। মুনীরের সাথে এখানেই পরিচয় ঘটে খুকুর। এ বয়সের নারীদের প্রতি অনেক তরুণের দুর্বলতা থাকে। অনেকে অনেক রকমের ফ্যান্টাসিতে ভোগে। দীর্ঘদিন সংসার যাপন করার ফলে একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে নারীরাও ক্ষেত্র বিশেষে এসব পুরুষদের সান্নিধ্যে আসে। অন্যতম কারণ হয়তো ঘরে থাকা সঙ্গী তার কথা শুনতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। মুনীর-খুকুও নিজের দুঃখ শোনানোর, নিজের গল্প ভাগ করার একজন মানুষ পেলে একটু নির্ভার বোধ করত। কিন্তু কথা বলতে বলতে অনেক ক্ষেত্রেই সেসব সম্পর্ক আর খালি কথার ভেতর আটকে থাকে না। আর তখনই শুরু হয় বিপত্তি। মুনীর-খুকুর বেলাতেও ঘটেছিল এমন বিপত্তি।

অসুস্থ স্বামীকে চিকিৎসা করাতে আসা খুকুকে নানা বিষয়ে সাহায্য করেন মুনির। বেশ খানিকটা সময় তারা গল্প গুজব করেন প্রতিদিন। এতে মুনীরের যেমন ভাল্লাগে, খুকুর তেমন সময় কেটে যায়। কিন্তু কথা একটা সময় আর কথা থাকে না। হাসপাতালের বাইরেও তারা দেখা সাক্ষাত শুরু করেন। জড়িয়ে পড়েন সম্পূর্ণ অনৈতিক একটা সম্পর্কে। সহজে যোগাযোগের জন্য মুনীর, খুকুকে লাললামটিয়ায় একটা বাসাও ভাড়া করে দেন। চলতে থাকে তাদের এই বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, যেটাকে আমরা পরকিয়া হিসেবে জানি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/22/1563795348682.jpg
পুরনো ছবিতে খুকু ◢

 

এই পরকিয়ায় আসক্ত মুনীর বিয়ের প্রথম দিকে তার বউকে নিয়ে সুখে থাকলেও কিছুদিনের মধ্যেই আবার খুকুর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। আর এর ফলেই ধরা পড়েন রীমার কাছে। তাদের আর বনাবনি হয় না একেবারেই। রীমা কাঁদতে থাকেন দিনের পর দিন। স্বামীর অবহেলা তিনি সহ্য করতে পারেন না। পাশাপাশি চলতে থাকে বিভিন্ন শারিরীক নির্যাতন। বেঁচে থাকাকে মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর মনে হতে থাকে তার।

কিন্তু এর কিছুদিন পরে ঘটে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। বদলে যেতে থাকে মুনীর। বাসায় এসে আর স্ত্রীকে মারধর করে না। রোজই কিছু না কিছু নিয়ে আসে তার জন্য। কথা বলে, গল্প করে, স্বামীসুলভ আদর সোহাগও করে। রীমাও খুশি হয়। স্বামীর এমন বদলে যাওয়া দেখে সে খুবই খুশি হয়। সেও আর পারতপক্ষে আগের কথা তোলে না। একপাশ থেকে ভালোবাসা আসলে অপর পাশ থেকে মানুষ দায়িত্ববোধ আশা করে। রীমাও তার ব্যত্যয় করে না। সে তার দায়িত্ব পালন করে অক্ষরে অক্ষরে। ভালোবাসার বিনিময়ে সেও আগলে রাখে তার স্বামীকে। মুনীর নিজেই রীমাকে বলে খুকুকে সে ছেড়ে দেবে। তার সাথে আর কোনো যোগাযোগ রাখবে না। এর কিছুদিন পরে মুনীর খুকুকে তার অফিসে আসতে বলে। রীমাও সেখানে উপস্থিত ছিল। সেখানে রীমা খুকুকে তার স্বামীর সাথে মিশতে বারণ করে। খুকু কাঁদতে কাঁদতে চলে যায়। যাওয়ার সময় সে রীমাকে বলে যায়, আমি তোমাকে দেখে নেব। দেখব কে জেতে আর কে হারে। সেই রাত্রে মুনীর রীমার ইস্কাটনের বাড়িতে রাত্রি যাপন করে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/22/1563795290586.jpg

রীমার ইস্কাটনের বাসা ◢

 

একদিন রাতে এমনই পাশাপাশি শুয়ে দুজন। মুনীর রীমার পাশ ঘেঁষে শোয়। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে। মুনীর রীমাকে বলে, তোমাকে নিয়ে তো আসলে খুব বেশি কোথাও যাওয়া হয়নি আমার। তাই চলো দুজন মিলে চিটাগাং ঘুরে আসি। রীমা খুশি হয়। তার ভেতরের কোনো এক পুকুরে ফোটে ওঠে একশো একটা পদ্মফুল। সেই ফুল দুলতে থাকে বাতাসে, যেই বাতাস এসে শীতল করে দেয় রীমার মনটাকেও।

পরদিন তারা রওয়ানা হয়। সারাদিন এখানে সেখানে ঘোরাঘুরি করে রাতে আশ্রয় নেয় হোটেল সৈকতে। সেখান থেকে ফিরে আসে পরেরদিন রাতে। বসন্ত আর হলুদ যেমন মাখামাখি, তেমনই বসন্তের সাথে বাতাসেরও আছে একটা গভীর সম্পর্ক। ১৯৮৯ সালের এপ্রিলের নয় তারিখ, বাংলা ক্যালেন্ডারে তখন বসন্ত বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এগিয়ে আসছে নতুন আরেকটি বৈশাখ। এমনই এক বাতাস ভরা রাতে খোলা আকাশের নিচে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল মুনীর এবং রীমা। গাড়ি যখন নারায়ণগঞ্জের মিজমিজি গ্রামের কাছে এসে পৌঁছল, তখন গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে দিল মুনীর। রীমা কারণ জিজ্ঞেস করল। মুনীর চুপচাপ নেমে গেল গাড়ি থেকে। চুপচাপ ফিরে এলে রীমা জিজ্ঞেস করল শরীর খারাপ কিনা। মাথা টিপে দিতে চাইল রীমা। কিন্তু মুনীর ঝটকা মেরে সরিয়ে দিলেন তার হাত। গাড়িতে থাকা একটি বোতল দিয়ে সজোরে আঘাত করলেন মাথায়। রীমা কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। তার স্বামীর কী হলো হুট করে! সে পড়ে গেল ঘোরের ভেতর। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দ্বিতীয় আঘাত। রীমার পুরো দুনিয়া তখন ঘুরতে থাকে। চোখের সামনে হয়তো ভেসে ওঠে সকল ঘটনা। তার শহিদ বাবার কথা হয়তো ভেসে আসে মনে, কিংবা আদর করে মুখে তুলে মায়ের খাইয়ে দেওয়ার কথা। আটলান্টায় স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে থাকা বোনটার কথাও হয়তো চোখে ভাসে। মৃত্যুর সমইয় নাকি এমনই হয়। প্রিয়জনদের আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চায় সবাই। যে আত্মহত্যা করে মারা যায়, সেও নাকি বেঁচে যাওয়ার চেষ্টা করে। এরই মধ্যে মুনীর গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। টেনে হিঁচড়ে নামায় রীমাকে। গাড়িতে রাখা একটা ধারাল চাকু দিয়ে পেটের মধ্যে আঘাত করতে থাকে। রীমা একবার হাতে ধরে, একবার পায়ে। এদিক সেদিক তাকায়, গভীর অন্ধকার ছাড়া তার চোখের সামনে আর কিছু ভাসে না। হাতে পায়ে ধরে রক্ষা হয় না মেয়েটার। খুকুর সাথে পরকিয়ায় আসক্ত মুনীরের আঘাতে জর্জরিত হয়ে একটা সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

মৃত্যু নিশ্চিত হলে মুনীর গাড়ি স্টার্ট দেয়। একটু দূরে ডোবায় গিয়ে নিজের পরনের প্যান্ট এবং রক্তাক্ত জামা ছুড়ে ফেলে ডোবায়। হাতে থাকা ছুরিটা ছুড়ে মারে আরেকটু দূরে। গাড়ি নিয়ে আগায় যাত্রাবাড়ির দিকে। নিজের গাড়িটি ফেলে রেখে যায় সায়েদাবাদের বাস টার্মিনালের উল্টো দিকে। গাড়িটি তালাবদ্ধ করে রাখে সে। অপরাধী যতই অপরাধ করুক, সে একটা না একটা চিহ্ন ফেলে যায় সবসময়। মুনীরও সেই কাজ করল। রক্ত মাখা সব জামা ফেলে দিলেও একটি গেঞ্জি রয়ে যায় গাড়ির ভেতর। আর গাড়ির গায়ে রয়ে যায় রক্তের কিছু চিহ্ন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে গাড়িটি যখন পুলিশের হাতে আসে তখন পুলিশের কাছে বিষয়টি দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যায়।

মুনীর গিয়ে আশ্রয় নেয় হোটেল বদরে। সেখানে সে বিশ্রামের জন্য গেলে হোটেলের দারোয়ান আলী হোসেন তাকে ২০৩ নাম্বার রুমে নিয়ে যায়। ডাঃ মেহেরুন্নেসার ছেলে পরিচয় পাবার পর আলী হোসেন তাকে জিজ্ঞেস করে বাসা ছেড়ে সে হোটেলে কেন এসে উঠল। মুনীর তার স্ত্রীকে হত্যার কথা বলায় কিছুটা ভয় পেয়েই হয়তো আলী হোসেন চলে যায়। এরমাঝে হোটেল কক্ষে সে আত্মহত্যা করার জন্য বিছানার চাদর গলায় বেঁধে উপরে ফ্যানের সাথে ফাঁস দেওয়ার চেষ্টা করলে পাশের রুমের লোকেরা তালা ভেঙে ভেতরে এসে তাকে উদ্ধার করে এবং সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে সে তার মায়ের সাথে ফোনে আলাপ করে এবং একজন আইনজীবী নিয়ে হাসপাতালে আসতে বলে। এর মধ্যে পুলিশ তার খোঁজ পেয়ে যায়, তাকে গ্রেফতার করে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/22/1563795440555.jpg
মুনীর খুকুকে নিয়ে প্রকাশিত ভিডিও নাটক ◢

 

গ্রেফতার হওয়ার পর মুনির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। যেখানে সে বলে—যেদিন খুকুর সাথে তার অফিসে রীমার দেখা হয় সেদিন রীমা খুকুকে তার সাথে মিশতে মানা করলে খুকু তার কাছে জানতে চায় সে কী করবে। মুনীর তখন কোনো জবাব দেয় না। খুকুর চোখ বেয়ে টলটল করে জল নামে। এরপর যখন খুকু রীমাকে হুমকি দিয়ে মুনীরের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে চলে যায় তখন তার খুব মায়া হয়। খুকুর প্রতি তার ভালোবাসা আবার জেগে ওঠে। আর যার ফলে সে তার জীবন থেকে রীমাকে সরিয়ে দিতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

জেরা, শুনানির পর ১৯৯০ সালের ২১ মে আদালত এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় মুনীর ও খুকুকে। মোট ৬৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যপ্রদানের মাধ্যমে রায় হয় মামলাটির। কিন্তু পরে মামলাটি আবার হাইকোর্টে ওঠানো হলে আদলত মুনীরের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখলেও খুকুকে বেকসুর খালাস দেন। তখন সারা দেশেই এর প্রতিবাদ হয়েছিল। লোকে মুনীরের সাথে খুকুরও ফাঁসি চেয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞ আদালত সে সব দাবি আমলে নেননি। এরপর মুনীরের প্রাণ রক্ষার জন্য প্রেসিডেন্টের কাছে পুনঃ পুনঃ আবেদন করা হলেও প্রেসিডেন্ট সে আবেদনে সাড়া দেননি। মুনীর খুকুর এই ঘটনা এতটাই আলোচিত হয়েছিল যে এটা নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মঞ্চনাটক, যাত্রা পালা এবং অডিও ক্যাসেট প্রকাশিত হয়। ১৯৯৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে মুনিরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সমাপ্ত হয় আলোচিত ওই হত্যার বিচারের।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র