Barta24

রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

'নিরুদ্দেশ যাত্রা' শেষে অলৌকিক বৃষ্টিস্নাত বর্ষা

'নিরুদ্দেশ যাত্রা' শেষে অলৌকিক বৃষ্টিস্নাত বর্ষা
ড. মাহফুজ পারভেজ/ ছবি: বার্তা২৪.কম
ড. মাহফুজ পারভেজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বার্তা২৪.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

'এই মনোরম মনোটোনাস শহরে অনেকদিন পর আজ সুন্দর বৃষ্টি হলো।' 'নিরুদ্দেশ যাত্রা' গল্পটি এভাবেই শুরু করেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের তুলনারহিত কথাকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।

সত্যি সত্যিই আজ বৃষ্টি হয়েছে অঝোর ধারায়। শনিবার ১৫ জুন মোতাবেক পহেলা আষাঢ় বর্ষা ঋতুর শুরুর দিনটি বৃষ্টিবহুল অবয়বে চিহ্নিত হয়ে হলো।

এবার অস্বাভাবিক গরমের পর বৃষ্টি ছিল বড়ই কাঙ্ক্ষিত। গ্রীষ্মের দহনবায়ুর আক্রোশ যখন প্রকৃতি আর মানুষকে পুড়িয়ে দিচ্ছিল, তখন বর্ষা নিয়ে এসেছে শীতল আরাম।

বসন্তকাল ঋতুরাজ নামে অভিহিত হলেও বর্ষা চিরায়ত বাংলার অনন্য ঋতু। বর্ষায় বাংলার রূপ বিকশিত হয় চরম শিহরণে। ফুলে, ফলে, গন্ধে আমোদিত বর্ষার জল ছলছল বিভা ঐতিহাসিক সৌন্দর্য্যের প্রতীক। পৃথিবীর অন্য কোনও দেশ বাংলার বর্ষার মতো বর্ণবৈভবে উদ্ভাসিত হয় না।

গ্রামীণ বর্ষার আদি ও অকৃত্রিম গৌরব যদিও বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে। নদী, ঝিল, বিল, খাল, নালা কমে গেছে। জলের কল্লোলিত দাপট দেখাও এখন আর সম্ভব হয় না। বন্যা ও দুর্ভোগের নামান্তর হয়ে বর্ষা আসে ক্রম-সঙ্কুচিত বাংলার গ্রামে।

নগরে-শহরে বর্ষা হয়ে গেছে বিভীষিকা। ড্রেন নেই, জলাধার দখল, পানি প্রবাহের পথ রুদ্ধ, অপরিকল্পিত উন্নয়নের তুঘলকি কাণ্ড ইত্যাদি বিরূপতা পেরিয়ে বর্ষার জল নিজস্ব গতিপথ ধরে চলতে পারছে না। পানি জমে যায় রাস্তায়। ঘরে ঘরে সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতা। নাগরিক জীবন বর্ষার নান্দনিক সুধা পান করার বদলে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয় দুর্ভোগের জলে।

শুরুতে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের যে বর্ষামথিত নাগরিক অনুভূতির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা কোনো সুদূর অতীতের ভাষাচিত্র নয়। শত শতাব্দী প্রাচীন কালিদাসের 'মেঘদূত' বা রবীন্দ্র-নজরুলের শতবর্ষ প্রাচীন বর্ষা-বন্দনাও নয়। ইলিয়াস অতি সাম্প্রতিক বর্ণনায় যে বর্ষার কথা বলেছেন, তা-ও আমাদের আটপৌরে জীবন থেকে অন্তর্হিত হতে চলেছে:

'... রাত এগারোটা পার হয় হয়, এখনো রাস্তার রিকশা চলছে ছল করে যেনো গোটিয়ার বিলে কেউ নৌকা বইছে, 'তাড়াতাড়ি করো বাহে, ঢাকার গাড়ি বুঝি ছাড়ি যায়।' আমার জানলায় রোদন-রূপসী বৃষ্টির মাতাল মিউজিক, পাতাবাহারেরর ভিজে গন্ধভরা সারি, বিষাদবর্ণ দেওয়াল; অনেকদিন পর আজ আমার ভারি ভালো লাগছে।
ছমছম করা এই রাত্রি, আমারি জন্যে তৈরি এরকম লোনলী-লগ্ন আমি কতোদিন পাইনি, কতোকাল, কোনোদিন নয়। বৃষ্টি-বুনোট এইসব রাতে আমার ঘুম আস না, বৃষ্টিকে ভারি অন্যরকম মনে হয়, বৃষ্টি একজন অচিন দীর্ঘশ্বাস।'

আমাদের জীবন থেকে এইসব বর্ষণমুখর মায়ারী রাত কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে, কে জানে! বৃষ্টিকাতর স্বপ্নঘোর আনা দিন আর রাত্রিগুলো চলমান জীবনের দুর্যোগ ও অস্বস্তিতে ভেসে যাচ্ছে। এখন খুব কম মানুষ আছেন, বর্ষার সামাজিক-নাগরিক বিড়ম্বনা তুচ্ছ করে বলতে পারেন: 'এইসব রাতে কিছু পড়তে পারি না আমি, সামনে বই খোলা থাকে, অক্ষরগুলো উদাস বয়ে যায়, যেনো অনন্ত-কাল কুমারী থাকবার জন্যে একজন রিক্ত রক্তাক্ত জন্মদান করলো এদের। চায়ের পেয়ালায় তিনটে ভাঙা পাতা ঘড়ির কাঁটা হয়ে সময়কে মন্থর কাঁপায়। ষাট পাওয়ারের বাল্বে জ্বলছে ভিজে আলো, আর চিনচিন করে ওঠে হঠাৎ, কতোদিন আগে ভরা বাদলে আশিকের সঙ্গে আজিমপুর থেকে ফিরলাম সাতটা রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনে, 'তুই ফেলে এসেছিস কারে', সেই সোনার শৈশবে ভুল করে দ্যাখা একটি স্বপ্ন, স্বপ্নের মতো টলটল করে। আমার ঘুম আসে না, আলোর মধ্যে একলা জেগে রই।'

জানি না, কার জীবনচক্রে আজকাল বর্ষার সঙ্গে ফিরে আসে সেইসব অলৌকিক শৈশব: 'সন্ধেবেলা আম্মার ঘরে যখন যাচ্ছি, আকাশ কালো, রাস্তার মানুষজন নেই, চারটে জানালায় আমাদের পাতাবাহারের ছায়া লুফে নিয়ে পালিয়ে গেলো দুটো ফক্সওয়াগন, কাক আর বাদুড়েরা চিৎকার করে উঠলো; আমার মনে হলো আজ আমি একটুও ঘুমোতে পারবো না। আধ ঘন্টা একা কাটিয়ে আম্মার ঘর থেকে যখন ফিরছি তখন ভরা স্বরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমার খারাপ লাগলো, আজ আমার একটুও ঘুম হবে না। আম্মার ঘরে কি যেনো ফেলে এসেছি।'

বর্ষা এলেই রবীন্দ্রনাথ যেমন আমাদেরকে ডেকে বলেন, 'তুই ফেলে এসেছিস কারে, মন মনরে আমার', তেমন করেই বর্ষা আরও মনে করিয়ে দেয় সেই মেঘ-বৃষ্টি-ছোঁয়া অতীতের আলো-ছায়াময় স্মৃতি 'আম্মার ঘরে কি যেনো ফেলে এসেছি।'

মানুষের জীবনে প্রতিদিনের অজানা, অচেনা, নিরুদ্দেশ যাত্রা শেষে বর্ষা আসে ঋতুচক্রের মেঘে মেঘে। সঙ্গে নিয়ে আসে অতীত স্মৃতির জলকণা মাখা অবিরল বৃষ্টিপাত। বর্ষা আর বৃষ্টি যতই নাগরিক-সামাজিক দুর্ভোগ নিয়ে আসুক, আরও আনে স্মৃতি-সত্ত্বার অবিস্মরণীয় রূপান্তর। আমরা যেন বৃষ্টির হাত ধরে চলে যেতে থাকি ফেলে আসা মানুষ, জনপদ, স্মৃতির কাছে।

এইসব হৃদয়স্পর্শী দিনে ইলিয়াসের গল্পের চরিত্র মনে হয় বৃষ্টির সঙ্গে মিতালি করে আমাদেরকেও ঘিরে ধরে এমনই এক বন্ধনে: 'বৃষ্টি ধীরে ধীরে কমে আসছিলো, রঞ্জু জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখলো এখন একেবারে নেই। বকুল পাতার নিঃশ্বাস বড়ো শূন্য মনে হয়। ল্যাম্পোস্টে ভিজে আলোয় ইলেক্ট্রিক তারের ওপর সার বেঁধে জ্বলছে বৃষ্টির শিশির, জলের ফোঁটাগুলো একপলক পর পর গানের টুকরোর নিচে ঝড়ে পড়ছে। কাজলা দিদি এই তারের মধ্যে দিয়ে কোথায়, কার বাল্বে জ্বলে উঠছে? কোথায়? 'ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না একলা জেগে রই, মাগো আমার শোলোক বলা কাজলা দিদি কই?'

বৃষ্টির এমনই ভাবালু আবেশে অতীতের মাটি ও মানুষের মুখ কিংবা কাজলা দিদির জন্যে রঞ্জুর মতো আমাদেরও ভারি খারাপ লাগবে। রঞ্জু যেমন ব্যাকুল ও দ্রুত হাতে ধাক্কা দিতে দিতে রুদ্ধ কণ্ঠে চিৎকার করতে থাকে, 'আম্মা দরজা খোলো, দরজা খোলো, আম্মা দরজা খুলে দাও, খোলো না তাড়াতাড়ি, খোলো।'

আমরাও তেমনি অতীতের কোনও জানালা বা দরজা খোলার জন্য আকুপাকু করি। ঘোরতর বর্ষার অমল ধবল বৃষ্টির টোকায় ফিরে আসি অতীতের দরজা-জানালা পেরিয়ে বর্তমানের চৌকাঠে। হয়ত তখন আশেপাশে, অতি কাছেই, কোথাও বৃষ্টির সমান্তরাকে শোনা যাবে মন উচাটন ডাক: 'যদি মন কাঁদে, তুমি চলে এসো, চলে এসো, এক বর্ষায়...।

বর্ষা শুধু বৃষ্টিই নয়, হৃদয়ের মর্মমূলে টুপটাপ ডাকও! 'নিরুদ্দেশ যাত্রা' শেষে অলৌকিক বৃষ্টিস্নাত বর্ষায় যে জলছোঁয়া ডাক আসে প্রকৃতিতে, পরিবেশে, অতিক্রান্ত জীবনে এবং মানুষের তাপিত অন্তরে।

আপনার মতামত লিখুন :

৫০ বছর আগের এই দিনে চাঁদে পা রেখেছিল মানুষ

৫০ বছর আগের এই দিনে চাঁদে পা রেখেছিল মানুষ
ছবি: সংগৃহীত

আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে চাঁদে পা রেখেছিল মানুষ। আমেরিকার মহাকাশচারী নিল আর্মস্ট্রং ও বুজ অ্যালড্রিন প্রথম মানুষ, যারা এই ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন।

চাঁদের পৃষ্ঠে প্রথম অবতরণ করেন নিল আর্মস্ট্রং। এরপর বুজ অ্যালড্রিল। তাদের সঙ্গী ছিলেন মাইকেল কলিন্স। তবে তিনি চাঁদের পৃষ্ঠে না নেমে নভোযানে অবস্থান করেন।

১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই ‘ঈগল’ নামক এক চন্দ্রতরীতে করে তারা প্রথম চাঁদে অবতরণ করেন। নিল আর্মস্ট্রং চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করে বলেছিলেন, "That's one small step for man, one giant leap for mankind." (মানুষের ক্ষুদ্র এই পদক্ষেপটি মানব সভ্যতাকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গেল।)

Moon

চাঁদে মানুষ পাঠানো নিয়ে আমেরিকা ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ছিল মর্যাদার লড়াই। ১৯৫৭ সালে স্পুটনিক নামক কৃত্রিম উপগ্রহ প্রথম মহাকাশে পাঠায় রাশিয়া। এতে চন্দ্র জয়ের দৌড়ে এগিয়ে যায় দেশটি।

এরপর ১৯৬৬ সালে রাশিয়ার লুনা-৯ নামক উপগ্রহ চাঁদে সফট ল্যান্ডিং করে। এর দুইমাস পর লুনা-১০ নামক আরেকটি উপগ্রহ চাঁদের কক্ষপথে সফলভাবে স্থাপন করে রাশিয়া। তারা চন্দ্রজয়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেলেও মানুষ পাঠানোর মতো প্রযুক্তি তখনও তারা অর্জন করতে পারেনি। এছাড়া অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কারণে তাদের মহাকাশ অভিযান বাধাপ্রাপ্ত হয়।

Moon

এরমধ্যে ১৯৬৮ সালে মহাকাশ গবেষণায় বড় সাফল্য অর্জন করে যুক্তরাষ্ট্র। তারা মহাকাশে অ্যাপোলো-৮ নামে মানুষ বহানকারী একটি যান মহাকাশে পাঠায়। সেটি চাঁদের কক্ষপথে সফলভাবে প্রদক্ষিণ করে নিরাপদে ফিরে আসে।

তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই মহাকাশযান অ্যাপোলো-১১ তে চড়ে চাঁদে প্রথম অবতরণ করেন নিল আর্মস্ট্রংরা।

পাখি ও আলোর জীবনী : প্রাচ্যচিন্তার দুই চিন্তক

পাখি ও আলোর জীবনী : প্রাচ্যচিন্তার দুই চিন্তক
আব্বাস ইবনে ফিরনাস : যিনি প্রথম পাখি হয়েছিলেন

জ্ঞানচর্চার জাত-ধর্ম হয়না।
‘Mankind: The Story Of All Of Us’—বেশ পরিচিত। মানুষের ইতিহাস নিয়ে আমেরিকান সিরিজ। মজার ব্যাপার হলো, স্পেনের এক ভদ্রলোককে নিয়ে আছে লম্বা বয়ান। যেখানে ইসলামের নবী মুহম্মদকে নিয়ে বলা হয়েছে খুবই অল্প। ভদ্রলোকের নামে কর্ডোবাতে ব্রিজেরও নামকরণ করা হয়েছে। আরো বড় কথা, চাঁদে একটা ক্রেটারের নাম তাঁর নামে। বলা বাহুল্য, ক্রেটার হলো গ্রহের পৃষ্ঠতলে বিস্ফোরণ, উল্কাপতন কিংবা মহাকাশীয় বস্তুর আঘাতে সৃষ্ট গহ্বর। ভদ্রলোকের নাম আব্বাস ইবনে ফিরনাস।

নবম শতক। স্পেনে মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগ। কর্ডোবার এক জ্ঞানী ব্যক্তিকে দেখা গেল পাখা বানাতে। পাখির ওড়ার কৌশল তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। প্রস্তুতি শেষ হলো। মানুষকে অবাক করে উঠলেন উঁচু টাওয়ারে। তারপর দিলেন লাফ। মৃত্যু হতে পারত কিন্তু হলো না। বরং সফলভাবেই উড়লেন একরকম। শুধু ল্যান্ড করার সময় পড়ে গিয়ে আহত হলেন। কারণ লেজের ধারণায় ত্রুটি ছিল। বেশকিছু হাড় ভাঙল। ততক্ষণে রচিত হয়েছে প্রথম মানব হিসেবে উড্ডয়নের ইতিহাস। সেই আব্বাস ইবনে ফিরনাস। বুঝলেন, পাখির মতো একটা লেজ না হলে ল্যান্ডিং সমস্যা ঘুচবে না। যতদিন বেঁচে ছিলেন, কাজ করেছেন এ নিয়ে।

ওড়ার জন্য পাখা তৈরিতে ফাঁপা কাঠ ব্যবহার করেছিলেন বলে জানা যায়। ইবনে ফিরনাস সম্পর্কে লিখেছেন ঐতিহাসিক মুহম্মদ আল মাক্কারি। তৎকালীন কর্ডোবার শাসক প্রথম মুহম্মদের (মৃ.-৮৮৬) দরবারি কবি মুমিন ইবনে সাইদ লিখেছিলেন, “ফিরনাস যখন শকুনির পালক পরে, তখন ফিনিক্সের চেয়েও দ্রুতবেগে উড়তে পারে।” আরমেন ফিরম্যান বলে ল্যাটিন যে নামটা মধ্যযুগের ইউরোপেও ছিল, তা ইবনে ফিরনাসেরই বলে ধরা হয়।

তবুও তাঁর কাজ শুধুমাত্র এটাই ছিল না। একটা চেইন রিংয়ের ডিজাইন করেছিলেন, যার দ্বারা গ্রহ-নক্ষত্রের গতি অবিকৃতভাবে উপস্থাপিত হতো। মাকাতা নামে জলঘড়ির আবিষ্কার করেন। ম্যাগনিফাইং গ্লাস বলে যা আজ পরিচিত, তা অনেকটা তাঁর হাত ধরেই আসে। আগে মিশর থেকে কোয়ার্টজ আমদানি করা হতো স্পেনে। ইবনে ফিরনাস ‘রক ক্রিস্টাল’ কাটার পদ্ধতির অগ্রগতি ঘটিয়ে এ থেকে মুক্তি দেন। তাঁর পরিচয়ে বলা হয়—প্রকৌশলী, রসায়নবিদ, চিকিৎসাবিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, দার্শনিক, কবি এবং সংগীতজ্ঞ।

‘Cosmos: A spacetime Odyssey’—পণ্ডিতি ধাঁচের আরেক পশ্চিমা ডকুমেন্টারি সিরিজ। প্রভাবশালী এস্ট্রোফিজিসিস্ট কার্ল সেগানের Cosmos থেকে উদ্ভূত। অনুরূপ জ্যাকব ব্রনস্কির The ascent of man। সেকুলার বয়ান। তবু উভয়ক্ষেত্রেই এসেছে প্রাচ্যের এক আলোকবিজ্ঞানীর নাম। নিউটন, আইনস্টাইন, কোপার্নিকাস কিংবা হাবলের আলোচনা করার সাথে। চাঁদের একটা ক্রেটারের নাম দেওয়া হয়েছে তাঁর নামেও। ভদ্রলোকের নাম ইবনে আল হাইথাম বা আলহাজেন। জন্ম ৯৬৫ আর মৃত্যু ১০৪০ খ্রিস্টাব্দে। বসরায় জন্ম নেওয়া কায়রোয় বসবাসকারী এই পণ্ডিতের সম্পর্কে প্রাচ্যবাসী প্রায় অনেক কিছু জানে না।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/20/1563620749290.jpg

ইবনে আল হাইথাম: আলোকবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক চিন্তক ◢

 

মরুভূমিতে একবার তাবু তৈরি করলেন তিঁনি। এমন আবদ্ধ যে ভেতরটাতে কোনো আলো আসতে না পারে এবং বাতি বন্ধ করলে যেন ঘুটঘুটে অন্ধকার তৈরি হয়। তাবুর দেয়ালের একপাশে রাখা হলো সূক্ষ্ম একটা ফুটো। বাতি বন্ধ করে দিলে দেখা হলো অদ্ভুত কাণ্ড। ফুটো দিয়ে আলো প্রবেশ করছে। প্রবেশ করা আলোর গতিপথ সরল। এবং আলো আপতিত হয়ে উল্টো বিম্ব তৈরি করে। এই একটা পরীক্ষা দিয়ে আল হাইথাম ভুল প্রমাণ করে দিলেন তার পূর্ববর্তী ধারণাকে। প্রতিষ্ঠিত করলেন আলোর গতি, ধর্ম ও ক্যামেরার ধারণা। এইখানেই শেষ না। নিউটনের কয়েকশো বছর আগে হাইথামের লেন্স নিয়ে কাজের পাণ্ডুলিপি আজও ইস্তাম্বুলে বিদ্যমান।

আলো এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান খুব সম্ভবত তার প্রিয় বিষয় ছিল। অধিকন্তু ক্যালকুলাস, সংখ্যাতত্ত্ব, জ্যামিতি ও জ্ঞানের অন্যান্য শাখায় তার অবদান ব্যাপক। বায়হাকি তাকে দ্বিতীয় টলেমি বলে স্বীকৃতি দেন। তার কিতাবুল মানাজির ল্যাটিনে অনুদিত হয়েছে ত্রয়োদশ শতকেই। বইটি সম্পর্কে ভালো ধারণা ছিলো বেকন, গ্যালিলিও, কেপলার, দেকার্তে, লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি এবং রেনেসাঁসের অন্যান্য পণ্ডিতের।

মানুষের চোখের গঠন সংক্রান্ত তার তত্ত্ব ছিল রীতিমতো বৈপ্লবিক। ইস্তাম্বুলে রক্ষিত কিতাবুল মানাজিরের প্রথম খণ্ডে বিধৃত। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিঁনি বলেন—The duty of the man who investigates the writings of scientists, if learning the truth is his goal, is to make himself an enemy of all that he reads, and ... attack it from every side. He should also suspect himself as he performs his critical examination of it, so that he may avoid falling into either prejudice or leniency.৷ — আল হাইথাম।

খুব সম্ভবত একারণেই Matthias Schramm আল হাইথামকে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সত্যিকার স্থপতি বলতে চান।

জ্ঞানচর্চায় প্রাচ্যের পতন ঘটেছে অনেক আগে। ধ্বংসস্তূপ থেকে বের হয়ে এসে ইবনে হাইথাম কিংবা আব্বাস ইবনে ফিরনাসেরা ঠিকই পাশ্চাত্য জ্ঞানচর্চায় আলোচিত হয়। জ্ঞানের কোনো জাত-কাল-ধর্ম নেই। কেবল হয় না প্রাচ্য সমাজে। একসময় যেখানে বায়তুল হিকমা ছিল, আজ সেখানে গৃহযুদ্ধের গন্ধ। একসময় যারা গ্রহ নক্ষত্রের গতিপথ নিয়ে তত্ত্ব কপচিয়েছে। আজ তাদের বংশধর ঘর হারিয়ে ঘুরছে পথে। ইতিহাস খুবই নির্মম। বিশেষ করে তাদের প্রতি, যারা তাদের শিকড় ভুলে যায়।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র