Barta24

বুধবার, ২৪ জুলাই ২০১৯, ৯ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

'নিরুদ্দেশ যাত্রা' শেষে অলৌকিক বৃষ্টিস্নাত বর্ষা

'নিরুদ্দেশ যাত্রা' শেষে অলৌকিক বৃষ্টিস্নাত বর্ষা
ড. মাহফুজ পারভেজ/ ছবি: বার্তা২৪.কম
ড. মাহফুজ পারভেজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বার্তা২৪.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

'এই মনোরম মনোটোনাস শহরে অনেকদিন পর আজ সুন্দর বৃষ্টি হলো।' 'নিরুদ্দেশ যাত্রা' গল্পটি এভাবেই শুরু করেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের তুলনারহিত কথাকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।

সত্যি সত্যিই আজ বৃষ্টি হয়েছে অঝোর ধারায়। শনিবার ১৫ জুন মোতাবেক পহেলা আষাঢ় বর্ষা ঋতুর শুরুর দিনটি বৃষ্টিবহুল অবয়বে চিহ্নিত হয়ে হলো।

এবার অস্বাভাবিক গরমের পর বৃষ্টি ছিল বড়ই কাঙ্ক্ষিত। গ্রীষ্মের দহনবায়ুর আক্রোশ যখন প্রকৃতি আর মানুষকে পুড়িয়ে দিচ্ছিল, তখন বর্ষা নিয়ে এসেছে শীতল আরাম।

বসন্তকাল ঋতুরাজ নামে অভিহিত হলেও বর্ষা চিরায়ত বাংলার অনন্য ঋতু। বর্ষায় বাংলার রূপ বিকশিত হয় চরম শিহরণে। ফুলে, ফলে, গন্ধে আমোদিত বর্ষার জল ছলছল বিভা ঐতিহাসিক সৌন্দর্য্যের প্রতীক। পৃথিবীর অন্য কোনও দেশ বাংলার বর্ষার মতো বর্ণবৈভবে উদ্ভাসিত হয় না।

গ্রামীণ বর্ষার আদি ও অকৃত্রিম গৌরব যদিও বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে। নদী, ঝিল, বিল, খাল, নালা কমে গেছে। জলের কল্লোলিত দাপট দেখাও এখন আর সম্ভব হয় না। বন্যা ও দুর্ভোগের নামান্তর হয়ে বর্ষা আসে ক্রম-সঙ্কুচিত বাংলার গ্রামে।

নগরে-শহরে বর্ষা হয়ে গেছে বিভীষিকা। ড্রেন নেই, জলাধার দখল, পানি প্রবাহের পথ রুদ্ধ, অপরিকল্পিত উন্নয়নের তুঘলকি কাণ্ড ইত্যাদি বিরূপতা পেরিয়ে বর্ষার জল নিজস্ব গতিপথ ধরে চলতে পারছে না। পানি জমে যায় রাস্তায়। ঘরে ঘরে সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতা। নাগরিক জীবন বর্ষার নান্দনিক সুধা পান করার বদলে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয় দুর্ভোগের জলে।

শুরুতে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের যে বর্ষামথিত নাগরিক অনুভূতির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা কোনো সুদূর অতীতের ভাষাচিত্র নয়। শত শতাব্দী প্রাচীন কালিদাসের 'মেঘদূত' বা রবীন্দ্র-নজরুলের শতবর্ষ প্রাচীন বর্ষা-বন্দনাও নয়। ইলিয়াস অতি সাম্প্রতিক বর্ণনায় যে বর্ষার কথা বলেছেন, তা-ও আমাদের আটপৌরে জীবন থেকে অন্তর্হিত হতে চলেছে:

'... রাত এগারোটা পার হয় হয়, এখনো রাস্তার রিকশা চলছে ছল করে যেনো গোটিয়ার বিলে কেউ নৌকা বইছে, 'তাড়াতাড়ি করো বাহে, ঢাকার গাড়ি বুঝি ছাড়ি যায়।' আমার জানলায় রোদন-রূপসী বৃষ্টির মাতাল মিউজিক, পাতাবাহারেরর ভিজে গন্ধভরা সারি, বিষাদবর্ণ দেওয়াল; অনেকদিন পর আজ আমার ভারি ভালো লাগছে।
ছমছম করা এই রাত্রি, আমারি জন্যে তৈরি এরকম লোনলী-লগ্ন আমি কতোদিন পাইনি, কতোকাল, কোনোদিন নয়। বৃষ্টি-বুনোট এইসব রাতে আমার ঘুম আস না, বৃষ্টিকে ভারি অন্যরকম মনে হয়, বৃষ্টি একজন অচিন দীর্ঘশ্বাস।'

আমাদের জীবন থেকে এইসব বর্ষণমুখর মায়ারী রাত কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে, কে জানে! বৃষ্টিকাতর স্বপ্নঘোর আনা দিন আর রাত্রিগুলো চলমান জীবনের দুর্যোগ ও অস্বস্তিতে ভেসে যাচ্ছে। এখন খুব কম মানুষ আছেন, বর্ষার সামাজিক-নাগরিক বিড়ম্বনা তুচ্ছ করে বলতে পারেন: 'এইসব রাতে কিছু পড়তে পারি না আমি, সামনে বই খোলা থাকে, অক্ষরগুলো উদাস বয়ে যায়, যেনো অনন্ত-কাল কুমারী থাকবার জন্যে একজন রিক্ত রক্তাক্ত জন্মদান করলো এদের। চায়ের পেয়ালায় তিনটে ভাঙা পাতা ঘড়ির কাঁটা হয়ে সময়কে মন্থর কাঁপায়। ষাট পাওয়ারের বাল্বে জ্বলছে ভিজে আলো, আর চিনচিন করে ওঠে হঠাৎ, কতোদিন আগে ভরা বাদলে আশিকের সঙ্গে আজিমপুর থেকে ফিরলাম সাতটা রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনে, 'তুই ফেলে এসেছিস কারে', সেই সোনার শৈশবে ভুল করে দ্যাখা একটি স্বপ্ন, স্বপ্নের মতো টলটল করে। আমার ঘুম আসে না, আলোর মধ্যে একলা জেগে রই।'

জানি না, কার জীবনচক্রে আজকাল বর্ষার সঙ্গে ফিরে আসে সেইসব অলৌকিক শৈশব: 'সন্ধেবেলা আম্মার ঘরে যখন যাচ্ছি, আকাশ কালো, রাস্তার মানুষজন নেই, চারটে জানালায় আমাদের পাতাবাহারের ছায়া লুফে নিয়ে পালিয়ে গেলো দুটো ফক্সওয়াগন, কাক আর বাদুড়েরা চিৎকার করে উঠলো; আমার মনে হলো আজ আমি একটুও ঘুমোতে পারবো না। আধ ঘন্টা একা কাটিয়ে আম্মার ঘর থেকে যখন ফিরছি তখন ভরা স্বরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমার খারাপ লাগলো, আজ আমার একটুও ঘুম হবে না। আম্মার ঘরে কি যেনো ফেলে এসেছি।'

বর্ষা এলেই রবীন্দ্রনাথ যেমন আমাদেরকে ডেকে বলেন, 'তুই ফেলে এসেছিস কারে, মন মনরে আমার', তেমন করেই বর্ষা আরও মনে করিয়ে দেয় সেই মেঘ-বৃষ্টি-ছোঁয়া অতীতের আলো-ছায়াময় স্মৃতি 'আম্মার ঘরে কি যেনো ফেলে এসেছি।'

মানুষের জীবনে প্রতিদিনের অজানা, অচেনা, নিরুদ্দেশ যাত্রা শেষে বর্ষা আসে ঋতুচক্রের মেঘে মেঘে। সঙ্গে নিয়ে আসে অতীত স্মৃতির জলকণা মাখা অবিরল বৃষ্টিপাত। বর্ষা আর বৃষ্টি যতই নাগরিক-সামাজিক দুর্ভোগ নিয়ে আসুক, আরও আনে স্মৃতি-সত্ত্বার অবিস্মরণীয় রূপান্তর। আমরা যেন বৃষ্টির হাত ধরে চলে যেতে থাকি ফেলে আসা মানুষ, জনপদ, স্মৃতির কাছে।

এইসব হৃদয়স্পর্শী দিনে ইলিয়াসের গল্পের চরিত্র মনে হয় বৃষ্টির সঙ্গে মিতালি করে আমাদেরকেও ঘিরে ধরে এমনই এক বন্ধনে: 'বৃষ্টি ধীরে ধীরে কমে আসছিলো, রঞ্জু জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখলো এখন একেবারে নেই। বকুল পাতার নিঃশ্বাস বড়ো শূন্য মনে হয়। ল্যাম্পোস্টে ভিজে আলোয় ইলেক্ট্রিক তারের ওপর সার বেঁধে জ্বলছে বৃষ্টির শিশির, জলের ফোঁটাগুলো একপলক পর পর গানের টুকরোর নিচে ঝড়ে পড়ছে। কাজলা দিদি এই তারের মধ্যে দিয়ে কোথায়, কার বাল্বে জ্বলে উঠছে? কোথায়? 'ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না একলা জেগে রই, মাগো আমার শোলোক বলা কাজলা দিদি কই?'

বৃষ্টির এমনই ভাবালু আবেশে অতীতের মাটি ও মানুষের মুখ কিংবা কাজলা দিদির জন্যে রঞ্জুর মতো আমাদেরও ভারি খারাপ লাগবে। রঞ্জু যেমন ব্যাকুল ও দ্রুত হাতে ধাক্কা দিতে দিতে রুদ্ধ কণ্ঠে চিৎকার করতে থাকে, 'আম্মা দরজা খোলো, দরজা খোলো, আম্মা দরজা খুলে দাও, খোলো না তাড়াতাড়ি, খোলো।'

আমরাও তেমনি অতীতের কোনও জানালা বা দরজা খোলার জন্য আকুপাকু করি। ঘোরতর বর্ষার অমল ধবল বৃষ্টির টোকায় ফিরে আসি অতীতের দরজা-জানালা পেরিয়ে বর্তমানের চৌকাঠে। হয়ত তখন আশেপাশে, অতি কাছেই, কোথাও বৃষ্টির সমান্তরাকে শোনা যাবে মন উচাটন ডাক: 'যদি মন কাঁদে, তুমি চলে এসো, চলে এসো, এক বর্ষায়...।

বর্ষা শুধু বৃষ্টিই নয়, হৃদয়ের মর্মমূলে টুপটাপ ডাকও! 'নিরুদ্দেশ যাত্রা' শেষে অলৌকিক বৃষ্টিস্নাত বর্ষায় যে জলছোঁয়া ডাক আসে প্রকৃতিতে, পরিবেশে, অতিক্রান্ত জীবনে এবং মানুষের তাপিত অন্তরে।

আপনার মতামত লিখুন :

মীরা নায়ার সিনেমা যার কাছে একটি রাজনৈতিক বিষয়

মীরা নায়ার সিনেমা যার কাছে একটি রাজনৈতিক বিষয়
মীরা নায়ার

মীরা নায়ারকে নানান কারণে আমরা জাকজমকভাবে চিনি না। এগুলোর মধ্যে প্রধান কারণটি হলো, তিনি ভারতীয় মূলধারার ফিল্মমেকার নন। এবং একই সঙ্গে বলিউডের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা এই ফিল্মমেকারের হাত দিয়েই তৈরি হয়েছে। যেগুলোর মধ্যে আছে, ‘কামা সূত্র : আ টেল অব লাভ’, ‘সালাম বোম্বে’ এবং ‘মনসুন ওয়েডিং’।

মীরা নায়ারের জন্ম ১৯৫৭ সালে, ভারতে ওড়িশা প্রদেশে। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কে বসবাস করছেন। এবং সেখানে তিনি স্কুল অব আর্টসের চলচ্চিত্র বিভাগের একজন শিক্ষক হিসেব কর্মরত আছেন।

তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো, তিনি যোগব্যায়ামকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখে থাকেন। গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই চর্চার সঙ্গে যুক্ত আছেন। তার ফিল্মমেকিংয়ের ক্ষেত্রেও তিনি যোগব্যায়ামের সংশ্লিষ্টতা তৈরি করেছেন। শুটিংয়ের দিনগুলোতে তিনি সকাল আরম্ভ করেন অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে যোগব্যায়াম করার মধ্য দিয়ে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/24/1563956081290.jpg
◤ মিসিসিপি মাসালা সিনেমার সেটে মীরা নায়ার ◢

 

মীরা নায়ারের কাছে ফিল্মমেকিং একটি এক্টিভিটিও। ‘ইয়ুথ কি আওয়াজ’ নামক একটি ম্যাগাজিনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারকালে তিনি বলেছেন, ‘আমি মনে করি সিনেমা বানানো একটা পলিটিক্যাল ব্যাপার। এমন না যে এটা পলিটিক্যাল হয়ে ওঠে। বরং এর সূচনাটাই পলিটিক্যাল, অর্থাৎ আপনার সিনেমায় আপনি পৃথিবী সম্পর্কে কী বলতে যাচ্ছেন? আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী? আপনি ঠিক কোন জায়গা থেকে পৃথিবীকে দেখছেন? আপনার সিনেমায় দেখাবার জন্য আপনি কোন জিনিসকে বেছে নিচ্ছেন? আমার খুব দৃঢ়ভাবে মনে হয়, যদি আমরা আমাদের গল্পগুলো না বলি, তাহলে কেউ এসে আমাদের গল্পগুলো বলে দিবে না।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/24/1563956642571.jpg
◤ মীরা নায়ার পরিচালিত ‘কামা সূত্র : আ টল অব লাভ’ ◢

 

এরপরেই নায়ার আরো নির্দিষ্টভাবে বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করেন—‘নিউইয়র্কে, আমেরিকাতে, উগান্ডাতে, এমনকি ইন্ডিয়াতেও আমি এই স্বাভাবিক চলমান পৃথিবীটাকে নিয়ে প্রচুর পরিমাণে সিনেমা বানানোর অফার পেয়েছি, কিন্তু সিনেমা বানাবার বিষয় হিসেবে আমি সেগুলোকে গ্রহণ করিনি। কেননা আরো অনেকেই ওইসব গল্পগুলো বলে দিচ্ছেন।

আমি খুব গভীরভাবে অনুভব করি, আমার সত্তা, আমার ক্যামেরা, আমার চোখ, আমার হৃদয়, এইসব কিছুই তাদের সহযোগে থাকা উচিত যারা খুব বেশিভাবে আমার, এবং বেশিরভাগ সময় যাদেরকে আমরা শুনতে বা দেখতে পাই না।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/24/1563956756042.jpg
◤ মীরা নায়ার পরিচালিত ‘সালাম বোম্বে’ ◢

 

মীরা নায়ারের সিনেমা ‘কামা সূত্র : আ টেল অব লাভ’ ভারতে নিষিদ্ধি করা হয়েছিল সিনেমাটির যৌনদৃশ্যের বাহুল্যের কারণে। ‘ইয়ুথ কি আওয়াজ’ ম্যাগাজিনের সাক্ষাৎকারগ্রাহক এই প্রসঙ্গ টেনে এনে বলেছিলেন, ‘বর্তমানে ভারতে যৌনতা বা প্রেম, অথবা অন্তরঙ্গতা তার সংজ্ঞাকে মেলে ধরতে পারে কিনা। এমন প্রশ্নের উত্তরে নায়ার বলেছিলেন, ‘এরকম দেখতে পাওয়া আনন্দদায়ক যে, এখন প্রেমের বহুমুখী বৈচিত্রগুলোকে গ্রহণ করা হচ্ছে এমন এক পন্থায়, যেটা অতিশয় আরোপিত বা ছিনালিপূর্ণ না। এই কাজটাই আমি কামা সূত্রে করতে চেয়েছি। আমরা এমন একটা দেশে জন্মেছি, যার প্রেম ও কামসা-বাসনা প্রসঙ্গে নিজস্ব প্রথা বা আচার-ভঙ্গিমা আছে। সংক্ষিপ্তভঙ্গিতে এই ব্যাপারটাকে যেভাবে বিবেচনা করা হয় যে, এটা মানুষের সেক্সুয়াল পজিশনগুলোর একটা পপ-আপ, আদতে এটা তা নয়। এটা এর চাইতে আরো গভীর বিষয়। এটা বিষয় হিসেবে যৌনতার এক বৃহৎ বিশ্লেষণ, এমনকি আমাদের সামাজিকতারও।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/24/1563956804540.jpg
◤ মীরা নায়ার পরিচালিত ‘মিসিসিপি মাসালা’ ◢

 

‘মিরাবাই ফিল্মস’ নামে মীরা নায়ারের একটি প্রযোজনা সংস্থা আছে। ১৯৮৮ সালে তার পরিচালিত ‘সালাম বোম্বে’ সিনেমাটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন ক্যামেরা পুরস্কার পেয়েছিল। এছাড়াও তিনি নানা ধরনের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছেন। এর মধ্যে আছে একাডেমি পুরস্কার এবং গোল্ডেন ক্লাব পুরস্কার। ২০১২ সালে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাটিল তাকে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’ প্রদান করেন। তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের মিরান্ডা হাউজে লেখাপড়া করেছেন। এবং পরবর্তীতে হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করেছিলেন। 

নিচে মীরা নায়ারের বেশ কিছু উক্তি উল্লেখ করা হচ্ছে, যেগুলোর মধ্য দিয়ে তাকে আমাদের আরো ভালোভাবে বোঝা সম্ভব হবে—

১. কোনো জিনিসকেই এরকমভাবে ভাববেন না, যেন আপনি পথ থেকে পাথর সরাচ্ছেন। যাই করেন, সম্পূর্ণভাবে করুন, কাজটা শেষ হওয়া পর্যন্ত সেটার সঙ্গে থাকুন।

২. যদি আমরা আমাদের গল্পগুলো না বলি, অন্য কেউ এসে বলে দেবে না।

৩. সিনেমা বানানোর ব্যাপারটা হলো, পুরদস্তুরভাবে এটার সঙ্গে মিশে যাওয়া আর একটা বিচারবুদ্ধিহীন আত্মবিশ্বাস নিজের মধ্যে বদ্ধমূল করে নেওয়া। এটা আমাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ বটে, এখানে আমাদের ধারণ করতে হয় কবির মতো মন, আর হাতির মতো শক্ত চামড়া।

৪. আমরা সবাই সিনেমার শক্তি সম্পর্কে জানি। আপনি যেভাবে তাকান বা যেভাবে কথা বলেন, তারই প্রতিরূপ যখন আপনি সিনেমার চরিত্রদের মধ্য দিয়ে দেখতে পান, তখন আপনার এই দেখার চাইতে শক্তিশালী কিছু আর এখানে থাকতে পারে না।

৫. রসিকতা অথবা জীবন নিয়ে দুষ্টামি করা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ, অন্যথায় জীবন খুব একঘেয়েমি হয়ে যেত।

৬. আমি আজও সেইসব লোকেদের গল্পগুলোতেই সবচেয়ে বেশি আকর্ষণবোধ করি, যাদেরকে সমাজের বাইরের লোক মনে করা হয়।

৭. প্রত্যেকটা সিনেমাই একটা রাজনৈতিক আখ্যান। এই অর্থে যে, আপনি আসলে কিভাবে পৃথিবীটাকে দেখছেন।

৮. আমার কাছে, সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা একটি বাধ্যতামূলক বিষয়। কিন্তু হলিউডের চিন্তাচেতনায় এই বিষয়ের অস্তিত্ব নেই।

৯. প্রত্যেকটা ফ্রেম এবং প্রত্যেকটা দৃশ্যেরই একটা উদ্দেশ্য থাকা জরুরি।

১০. আমি যেই ফিল্মস্কুল থেকে উঠে এসেছি, সেটা একটা ডকুমেন্টারি ফিল্মের স্কুল। স্কুলেটির দর্শন এমন ছিল যে, যে বাস্তবতা ঘটে যাবার পরে সেই বাস্তবতার ওপরে তুমি নতুন কিছু আরোপ করতে পারো না, তবে এডিটিং রুমে বসে তুমি সেটার একটা আখ্যানরূপ তৈরি করতে পারো।

১১. নাইন ইলিভেনের দুর্ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করিনি। সেই অন্যায় অবিশ্বাস আর জাতিঘৃণা আজ চলমান, যেটা আমাকে ভালোভাবেই দেখতে হচ্ছে।

জানুয়ারি কিভাবে বছর আরম্ভের মাস হলো

জানুয়ারি কিভাবে বছর আরম্ভের মাস হলো
অষ্টম গ্রেগরির হাত ধরেই জন্ম নিয়েছে গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা

বেশিরভাগ দেশেই বছরের শুরুটা হয় জানুয়ারির প্রথম দিন। কেউ কেউ অবশ্য ২৫ মার্চ বা ২৫ ডিসেম্বরের মতো অন্যদিনকে গ্রহণ করেছে। তবু জানুয়ারির ১ তারিখের দাবি যেন অন্যরকম। এক অদ্ভুত দ্যোতনা নিয়ে একযোগে পালন করা হয় দিনটাকে। কিন্তু কিভাবে জানুয়ারি হয়ে উঠল বছর আরম্ভের মাস? সেই গল্পই থাকছে আজকের আয়োজনে—

১ জানুয়ারিকে বছরের প্রথম দিন করার ইতিহাস বেশ পুরনো। কিছুটা কৃতিত্ব রোমান সম্রাট নুমা পম্পিলিয়াসকে দেওয়া যেতে পারে। রোমের দ্বিতীয় সম্রাট ছিলেন তিনি। শাসনকাল ৭১৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৬৭৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। রোমের বেশিরভাগ রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তার হাতেই সৃষ্ট। সিংহাসনে আরোহনের পর নুমা আগের রোমান পঞ্জিকা পর্যবেক্ষণ করেন। তখন মার্চ মাসকে গণ্য করা হতো বছরের প্রথম মাস হিসাবে। নুমা জানুয়ারিকে প্রথম মাসের আসন দান করার সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্তটা বুদ্ধিবৃত্তিক বা যুক্তি বিচারে না, পছন্দ আর অপছন্দের ওপর ভর করে জন্ম নিয়েছে। জানুয়ারি মাসের নাম এসেছে রোমান জানুস-এর নাম থেকে। জানুস ছিলেন সকল কিছুর আরম্ভের দেবতা। মার্চ নামের উৎপত্তি মার্স থেকে। রোমান যুদ্ধ দেবতার নাম। শুরুর দেবতাকে শুরুতে না রেখে যুদ্ধের দেবতাকে রাখা হলে কি ভালো দেখায়?

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/22/1563800328025.jpg

নুমা পম্পিলিয়াস ছিলেন রোমান সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শাসক ◢

 

অনেকে অবশ্য দাবি করতে চান, জানুয়ারি মাসটাই নুমার সৃষ্টি। সে যা-ই হোক, ১৫৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে সরকারিভাবে ১ জানুয়ারিকে বছরের আরম্ভ বলে গণ্য করা হয়নি। তারও এক শতাব্দী পরে ৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সম্রাট জুলিয়াস সিজার নতুন করে সংস্কার আনলেন। জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে জানুয়ারির প্রথম দিনকে বছরের প্রথম দিন বলে মর্যাদা দেওয়া হলো। পূর্বে বাইজ্যান্টাইন সম্রাট কনস্টানটাইনের ধর্মান্তরের মধ্য দিয়ে খ্রিস্ট ধর্ম ব্যাপক পৃষ্টপোষকতা লাভ করে। বাড়তে থাকে রোমান সাম্রাজ্যের পরিসর। সেই সাথে ক্যালেন্ডারের ব্যবহারও ছড়িয়ে পড়ল সাম্রাজ্যের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। ৪৭৬ সালে রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে উত্তর ইউরোপের বার্বারদের কাছে। আপাতভাবে কেন্দ্রবিচ্ছিন্ন খ্রিস্টান অঞ্চলগুলো ক্যালেন্ডারে পরিবর্তন আনে এবার। নতুন নববর্ষের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয় মার্চের ২৫ তারিখ (ঘোষণা উৎসবের দিন) এবং ডিসেম্বরের ২৫ তারিখ (ক্রিসমাস)।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/22/1563800203681.jpg

রোমান সাম্রাজ্যের পতন পর্যন্ত জুলিয়ান পঞ্জিকার তাৎপর্য ছিল ব্যাপক ◢

 

পরবর্তীকালে জুলিয়ান পঞ্জিকায় আরো পরিবর্তন আসে। লিপ ইয়ার নির্ণয়ে ঘটে রদবদল। হিসাবে ভুল হবার দরুণ পরের কয়েক শতক ভুল সময়ে পালিত হয়েছে অনেক উৎসব। তারচেয়ে বড় কথা, ‘ইস্টার’-এর তারিখ নির্ধারণে সমস্যা দেখা দেয়। মধ্যযুগের নানা ঘটনায় আমূল বদলে যায় ইউরোপ। বিশেষ করে ক্রুসেড এবং ব্ল্যাক ডেথ-এর ঝড়। সেই সাথে ছিল চার্চের দুর্নীতি এবং সামন্ততন্ত্রের শোষণ। দীর্ঘদিন পর পোপ অষ্টম গ্রেগরি পঞ্জিকার দুরবস্থা উপলব্ধি করে সংস্কার সাধন করেন ১৫৮২ সালে। সেই সাথে সমাধান করেন লিপ ইয়ারের সমস্যাও। এই পঞ্জিকা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার নামে ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করে।

গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকায় জানুয়ারির প্রথম দিনকে নববর্ষ হিসাবে স্থান দেওয়া হয়। ইতালি, ফ্রান্স এবং স্পেনের মতো প্রভাবশালী দেশগুলো দ্রুত এই নতুন পঞ্জিকাকে গ্রহণ করে। ফলাফল ছিল সদূরপ্রসারী। প্রোটেস্ট্যান্ট কিংবা অর্থোডক্স সমাজ এক্ষেত্রে বেশ মন্থর। নতুন পঞ্জিকার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে লেগেছে বহুদিন। ব্রিটেন এবং তার আমেরিকান উপনিবেশগুলো ১৭৫২ সালের আগে গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকাকে অনুসরণ করেনি। তার আগে পর্যন্ত নববর্ষ পালিত হতো ২৫ মার্চ।

সময়ের সাথে সাথে অখ্রিস্টান দেশসমূহও গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা ব্যবহার শুরু করে। অবশ্য ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেন কিংবা পর্তুগালের উপনিবেশের দৌরাত্মকেও বিস্তৃতির পেছনে দায় কিছুটা দেওয়া যায়। তার মধ্যে বড় উদাহরণ চীন। চীনে এই পঞ্জিকার প্রচলন ঘটে ১৯১২ সালে। যদিও তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি অনুসারেই চান্দ্রমাস হিসাবে নববর্ষ পালিত হতো। প্রকৃতপক্ষে অনেক দেশ গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা গ্রহণ করলেও তাদের স্থানীয় এবং ধর্মীয় নিজস্ব ক্যালেন্ডার আছে। এমন দেশও আছে, যারা কখনোই গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা গ্রহণ করেনি। সুতরাং জানুয়ারিতে না হয়ে নববর্ষ অন্যদিন হয়। ইথিওপিয়াকে এইখানে উদাহরণ হিসাবে আনা যেতে পারে। স্থানীয়ভাবে ‘এনকুতাতাশ’ নামে পরিচিত তাদের নববর্ষ পালিত হয় সেপ্টেম্বরে।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র