Barta24

সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯, ৭ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

মেঘপাহাড়ের ডাক-৭

মেঘালয়-স্কটল্যান্ড অব দ্য ইস্ট

মেঘালয়-স্কটল্যান্ড অব দ্য ইস্ট
লেখক, মাহমুদ হাফিজ
মাহমুদ হাফিজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর


  • Font increase
  • Font Decrease

মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ের সকালটি বড় মনোরম হয়ে ধরা দিলো। সচরাচর মেঘলা দিন আজ ঝলমলে রোদের ঝিলিক। তবে ভ্রাম্যমাণ মেঘের ভেলায় তা আবার মাঝে মাঝে ছায়াময় হয়ে ওঠে। বিগত সন্ধ্যায় শিলং পৌঁছে এর রাত্রির রূপটা দেখেছি মাত্র। আসল চিত্রটি চোখের সামনে এলো সকালে। সাতসকালে শৈলকন্যা শিলংয়ের রাস্তায় রাস্তায় ইউনিফর্ম পরা স্কুলগামী ছেলেমেয়েদের কলতান।

হেঁটে বা গাড়িতে ছুটেছে শিক্ষালয়ে। অফিসগামীরা ছুটছে ব্যক্তিগত গাড়ি, ট্যাক্সি বা পাবলিক বাসে। পাহাড়ি সরু রাস্তার পাশে, আবাসিক পাড়াগুলোতে দোকানের ছড়াছড়ি। নাক বোঁচা, ছোট চোখের খাসি- গারো মেয়েরাই সেগুলো চালাচ্ছে। পথে পথে বাঁধভাঙা মানুষের জোয়ার। রাস্তাঘাট ছেলেদের তুলনায় কর্মমুখর লাস্যময়ী মেয়েদের কলহাস্যে মুখর। দেখেই বোঝা যায় মেঘের মেয়ে মেঘালয় কন্যাশাসিত সমাজের আওতাভূক্ত। মাতৃতান্ত্রিক সমাজের ধারায় চলছে এই শহর। 

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/15/1560596620638.jpg

পাহাড়ি উপত্যকার শহরটিতে এশিয়ার বৃহত্তম গলফ কোর্স, ক্যান্টনমেন্ট, মন্দির, মসজিদ, গির্জার ছড়াছড়ি। আছে স্টেডিয়াম। সিএম হাউজ, গভর্ণর হাউজ, হাইকোর্ট, বিধানসভা, সেক্রেটারিয়েট নানা সরকারি দফতর। শিক্ষার জন্য রয়েছে সেন্ট এডমন্ড, সেন্ট এ্যান্থনি, সেন্ট মেরি স্কুল ও কলেজসহ অসংখ্য স্কুল কলেজ। শিক্ষার পঁচাত্তর শতাংশ। উচ্চশিক্ষার জন্য রয়েছে নর্থ ইস্টার্ণ হিল ইউনিভার্সিটি-নেহুসহ বেশ কয়েকটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও টেকনিক্যাল কলেজ। বিশ্ব পরিব্রাজকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকায় শহরের পাড়ায় পাড়ায় হোটেল-রেস্তোরা। আছে পুলিশ বাজার নামে সিটি সেন্টার। শহরের আনাচে কানাচে বাজার, শপিং মল। পাহাড়ি খাদ, আঁকাবাকা রাস্তা, লেক, গার্ডেন, পাইনগাছের ঘনবন শৈলশহরটিকে দিয়েছে আলাদা বৈচিত্র্য। এর আকাশে সারাক্ষণ মেঘরোদ্রের লুকোচুরি। কখনো মেঘ, কখনো রোদ্দুর, কখনো ঝুমবৃষ্টি এর জলহাওয়ায়। প্রাকৃতিক এসি শহরটিকে প্রকৃতিগত দিক থেকে নাতিশীতোষ্ণ করে রেখেছে। আঁকাবাঁকা রাস্তায় চলতে গিয়ে কখনো ওপর থেকে নিচে শহরের দালানকোঠা দেখা যায়। আবার একই রাস্তা নিচের দিকে নেমে গেলে চোখের তারায় শহরকে দেখা যায় ওপরের পাহাড়ি ঢালে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/15/1560596639582.jpg

মেঘালয় ও শিলংকে স্কটল্যান্ড অব দ্য ইস্ট নামে খাতি দিয়েছে বৃটিশরা। এর দৃষ্টিনন্দন উপত্যকা, পাহাড়ি রাস্তা, নয়নাভিরাম মেঘ, নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া, অগুণতি জলপ্রপাত, ঘন পাইনবন এসব একমাত্র স্কটিশ হাইল্যান্ডের সঙ্গেই তুল্য। এখানে যে ১৮ হোল গল্ফকোর্স আছে, তাও এডিনবরা সংলগ্ন ডালকিত এর গল্ফকোর্স এর সঙ্গে তুলনা করা যায়। গারো, খাসি, জৈন্তিয়া পাহাড়ে পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণে মোট ১১ টি জেলা নিয়ে মেঘালয় রাজ্য। ভারতের লোকসভার দুটি আসন শিলং ও তুরা। গারো, খাসি, জৈন্তিয়া জাতিসত্তাপ্রধান মেঘালয়ের আদিবাসীদের বেশিরভাগ খ্রীষ্ট ধর্মে দীক্ষিত। শিলং শহরসহ দূর্গম পাহাড়ি গ্রাম পর্যন্ত চার্চ রয়েছে। হিন্দু,মুসলিম, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন এবং প্রাচীন ধর্মাবলম্বীও রয়েছে। এখানকার জাতিসত্তা খ্রীষ্ট ধর্মের যে শাখাটিতে ধর্মান্তরিত হয়েছে তাকে প্রেসবাইটেরিয়ান্স বলা হয়। যা বৃটেন বিশেষ করে স্কটিশ হাইল্যান্ডে অনুসরণ করা হয়।

স্কটল্যান্ড অব দ্য ইস্ট-মেঘালয়ের প্রধান প্রধান শহরের মধ্যে রাজধানী শিলং ছাড়াও রয়েছে নংপোহ, তোরা, উইলিয়ামনগর, রসুবেলপাড়া, নংসতৈন, নংকসেহ, আমপাতি, জোয়াই, বাঘমারা, সোহরা (চেরাপুঞ্জি), ডাউকি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/15/1560596786134.jpg

মেঘালয় উত্তরপূর্ব ভারতের পর্যটন আকর্ষণ কেন্দ্র। সব ঋতুতেই প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে লাখ লাখ পর্যটক ছুটে আসছে। ছুটে যাচ্ছে মেঘালয়ের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে। এই রাজ্যের সোহরা বা চেরাপুঞ্জি বৃষ্টির বৃষ্টি রাজধানী। মেঘালয় নামটির হিন্দী অর্থ মেঘের আলয়। বাংলা ভাষায়ও তাই। রাজ্যের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে প্রাকৃতিক জলপ্রপাত, লেক, শেকড় সেতু, পরিচ্ছন্ন গ্রাম, পাথুরে নদী, রোমাঞ্চকর ট্রেক, গ্রান্ড ক্যানিয়ন বা মহাগিরিখাদ, মেঘ-কুয়াশাময় পাহাড়ি ভিউপয়েন্ট এবং দূর্গম আদিবাসী গ্রাম অন্যতম। চেরাপুঞ্জির মেঘদল, বৃষ্টি, সেভেন সিস্টার ফলস, ওয়াই সো ডং ফলস, থাংখারাং পার্ক, মাসমাই কেভ, কোহ রামহাহ বা জায়ান্ট রক, বাংলাদেশ ভিউপয়েন্ট, ডাউকির উমগট নদী, মাওলিন্নং ভিলেজ, সোনংপেডেং, উমক্রেন ফলস, বরহিল ফলস, লিভিং রুট ব্রিজ বা জীবন্ত শেকড়সেতু, ওয়াহ রিম্বেন ফলস পর্যটকদের আকর্ষণ করে। শিলংয়ের ওয়ার্ডস লেক, পাশ্ববর্তী নমপোহ’র উমিয়াম লেক, লাবানের গ্রান্ড মদীনা মসজিদ, ব্রুকসাইডের রবীন্দ্রস্মৃতিবিজড়িত বাংলো, স্মিথ ভিলেজ, লেইটলাম গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন, রাসোং ভিলেজ পর্যটকদের টেনে আনে মেঘালয়ে।

আমরা হাঁটতে থাকি মেঘের বাড়ি মেঘালয়ের রাস্তায়। নাকবোঁচা, ক্ষুদ্রচোখের পাহাড়ি কন্যার ঢল দেখি। দোকানপাটেও তাদের আধিপত্য চোখে পড়ে। ঘোমটা টানা পর্দানশীন, সিঁদুরপরা হিন্দুবধু, টুপিওলা মুসলিম বা পাগিড়ধারি শিখদের দেখে এখানকার ধর্মীয় সম্প্রীতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। গারো, খাসি, জৈন্তিয়া জাতিসত্তার কথা মনে উঠলে যে পাহাড়ি মানুষের চিত্র মনে ভাসে, মেঘালয়ের পাহাড়িরা এর উল্টো। এখানকার পাহাড়ি জাতিসত্তায় শিক্ষিত, আধুনিক ও মার্জিতসম্পন্ন এবং চমৎকার ইংরেজীতে কথা বলে। রাজ্যের সরকারি ভাষাও ইংরেজি। খাসি, গারো ও জৈন্তিয়ারা মাতৃভাষাও ব্যবহার করে। কদাচিৎ শিলংয়ের রাস্তায় পাহাড়ি আদিবাসীর পোশাকে বাঁশের ঝুড়ি পিঠে দুয়েকজন পাহাড়িকে দেখা যায়। তারা হয়তো দূর্গম গ্রাম থেকে রাজধানী শহরে আসা মানুষ। কিন্তু তাদের সংখ্যা নিতান্ত নগণ্য।

আমাদের ছোট্ট পর্যটকদলটি ছোট পাহাড়ি শহরটির এ গলি ও গলি হাঁটি আর প্রতিটি কোণ উপভোগ করি। শহরের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া মেঘমালা, বৃষ্টি, মেঘভেঙে ঠিকরে বের হয়ে আসা রোদ্দুর, এর ঠান্ডা বাতাস আমাদের মন প্রশান্ত করে দেয়।

 

আপনার মতামত লিখুন :

মুনির-খুকু এবং রীমা হত্যা ট্র্যাজেডি

মুনির-খুকু এবং রীমা হত্যা ট্র্যাজেডি
সংবাদপত্রে মুনির-খুকুর ফাঁসির খবর

সময়টা আজ থেকে অনেকদিন আগের। ১৯৮৯ সালের এপ্রিল মাসের শুরুর দিক, প্রকৃতিতে তখনও ফাগুনের আগুন হাওয়া বিদ্যমান। ভোরের আলো মাত্র ফুটে উঠছে, অদূরে মসজিদের মিনার হতে ভেসে আসছে মোয়াজ্জিনের দরদ মাখা গলা। জীবিকার সন্ধানে মানুষ বেরিয়ে যাচ্ছে ঘরের বাইরে। ঠিক তখনই তাদের চোখে পড়ে একটি মর্মান্তিক দৃশ্য। ঢাকা চিটাগাং রোডের মুক্তি সরণির নিকট মিজমিজি গ্রামে যাওয়ার কাঁচা রাস্তার মোড়ে একটি লাশ পড়ে আছে। আরেকটু কাছে গেলে দেখা যায় লাশটা একজন মেয়ে মানুষের। পুরো শরীরে আঘাতের দাগ, চেহারায় আভিজাত্যের রঙ ফুটে আছে তখনও। গায়ে সোনার গহনা দেখে বুঝতে বাকি থাকে না মেয়েটি কোনো অবস্থাসম্পন্ন ঘরের। পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরিস্থিতি দেখে পুলিশ নিশ্চিত হয় এটা কোনো ডাকাতি বা ছিনতাই নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তা না হলে গায়ে গহনা রেখে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। পাশে খালের মধ্যে পাওয়া যায় রক্ত মাখা প্যান্ট, আরেকটু দূরে দেখা যায় পড়ে আছে একটি ধারাল ছুরি। পুলিশ বুঝতে পারে কেউ তাকে হত্যা করেই ফেলে রেখেছে এখানে। কিন্তু কেন? এই মেয়েই বা কে? উপস্থিত জনতাসহ সকলের মুখে তখন এই একটাই প্রশ্ন।

এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে খুবই বেদনা-বিধুর এবং নির্মম এক তথ্য। সেই সময় সারা বাংলাদেশে চায়ের দোকানে, অফিস পাড়ায় কিংবা ট্রেনে বাসে সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে এই ঘটনা। প্রতিদিন পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপা হতে থাকে এই খুনের সংবাদ, বিচারের আপডেট খবর। সব জায়গা থেকে রব ওঠে খুনীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির। যেন আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে সন্ত্রাসী, সেই দাবিতে চলে নানা স্লোগান প্রতিবাদ। মোটকথা সারা বাংলাদেশ জড়িয়ে পড়ে এই ঘটনায়।

পুলিশের সূত্রে পরিচয় মেলে মেয়েটির। নাম শারমিন রীমা। শহিদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন হোসেনের মেয়ে। যে নিজাম উদ্দিন স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় নির্মমভাবে নিহত হন, সেই নিজামুদ্দিনের মেয়েকে স্বাধীন দেশে এমন নির্মমতা বরণ করে নিতে হবে তা হয়তো তিনি ভাবেননি। যাকে বিয়ের মাত্র চার মাসের মাথায় নির্মমভাবে হত্যা করে তারই স্বামী। হাত থেকে তখনও যায়নি মেহেদির দাগ, বিয়ের এলবামগুলোতে তখনও জমেনি একটি ধুলো। কিন্তু তারই আগে সে লাশ হয়ে গেল। তার কবরে উঠে গেল ঘাস। পরিচয় পাওয়া যায় রীমার স্বামীরও। মুনির হোসেন সুরুজ, ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক প্রিন্সিপাল এবং ডাক্তারদের সংগঠন বিএমএ’র প্রাক্তন সভাপতি ডাঃ আবুল কাশেম এবং সে সময়ের খ্যাতনামা গাইনি ডাক্তার মেহেরুন্নেসার ছেলে। নিজেও পড়াশোনা করেছেন আমেরিকায় উইসকনসিন ইউনিভার্সিটিতে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে।

তাদের বিয়ে হয়েছিল ১৯৮৮ সালের ১১ ডিসেম্বর। বিদেশ থেকে পড়াশোনা শেষ করে মুনির দেশে এসে শুরু করেছিলেন বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি বিক্রয়ের ব্যবসা। সবকিছু ভালোই চলছিল। বাবা মা তাই ছেলেকে বিয়ে দিতে চান। মেয়ে খোঁজা হয়। রীমাকে পছন্দ হয় তাদের পরিবারের। মেয়ের পরিবারও ছেলের খোঁজ নেন। সম্ভ্রান্ত ফ্যামিলি, দেখতে শুনতে ভালো, ছেলে নিজেও শিক্ষিত এবং ব্যবসায়ী। ব্যাস, আর কী লাগে। দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন রীমা এবং মুনির।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/22/1563795235721.jpg
পুরনো ছবিতে রীমা ও মুনির ◢

 

ভালোই যাচ্ছিল তাদের দিনকাল। কিন্তু কিছুদিন পরে শুরু হয় অন্য যন্ত্রণা। স্বামীর ঘরে মন টেকে না। বউয়ের সাথে সামান্য বিষয় নিয়ে শুরু হয় ঝগড়া। এরই মাঝে রীমা একদিন দেখতে পান স্বামীর শার্টের মধ্যে লিপস্টিকের দাগ। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে, পায়ের তল থেকে সরে যায় মাটি। এ কোথায় এসে পড়লেন তিনি! ভাবলেন যাই হোক, আজকে জিজ্ঞেস করতেই হবে। স্বামী বাসায় আসলে জিজ্ঞেস করেন রীমা, কিছুক্ষণ চুপ থাকেন মুনির। এরপর এমন পরিস্থিতে পুরুষ যা করে, মিথ্যার পর মিথ্যা বলে এড়িয়ে যেতে চায় ঘটনা থেকে। যখন আর এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না তখন শুরু হয় উচ্চবাচ্য, হাতাহাতি। লাথি মেরে সরিয়ে দেন রীমাকে। রীমা সে রাতে আর ঘুমাতে পারেন না। বালিশ ভেজান কান্নায়। কাকে দুষবেন তিনি, বাবা মাকে, স্বামীকে নাকি তার কপালকে?

বছর খানেক আগের কথা। মুনিরের মা স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ মেহেরুন্নেসার ছিল একটি ক্লিনিক। সেখানে প্যারালাইজড হয়ে ভর্তি হন চট্টগ্রাম পোর্টের ইন্সপেক্টর আবু জাফর। সাথে আসেন তার চল্লিশোর্ধ্ব স্ত্রী খুকু। দেখতে শুনতে খুব একটা মন্দ নয়। এ বয়সের শান্ত সচেতন নারীদের মতো তারও ছিল আকর্ষণীয় দেহাবয়ব। মুনিরের সাথে এখানেই পরিচয় ঘটে খুকুর। এ বয়সের নারীদের প্রতি অনেক তরুণের দুর্বলতা থাকে। অনেকে অনেক রকমের ফ্যান্টাসিতে ভোগেন। দীর্ঘদিন সংসার যাপন করার ফলে একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে নারীরাও ক্ষেত্র বিশেষে এসব পুরুষদের সান্নিধ্যে আসেন। অন্যতম কারণ হয়তো ঘরে থাকা সঙ্গী তার কথা শুনতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। মুনির-খুকুও নিজের দুঃখ শোনানোর, নিজের গল্প ভাগ করার একজন মানুষ পেলে একটু নির্ভার বোধ করেন। কিন্তু কথা বলতে বলতে অনেক ক্ষেত্রেই সেসব সম্পর্ক আর খালি কথার ভেতর আটকে থাকে না। আর তখনই শুরু হয় বিপত্তি। মুনির-খুকুর বেলাতেও ঘটেছিল এমন বিপত্তি।

অসুস্থ স্বামীকে চিকিৎসা করাতে আসা খুকুকে নানা বিষয়ে সাহায্য করেন মুনির। বেশ খানিকটা সময় তারা গল্প গুজব করেন প্রতিদিন। এতে মুনিরের যেমন ভাল্লাগে, খুকুর তেমন সময় কেটে যায়। কিন্তু কথা একটা সময় আর কথা থাকে না। হাসপাতালের বাইরেও তারা দেখা সাক্ষাত শুরু করেন। জড়িয়ে পড়েন সম্পূর্ণ অনৈতিক একটা সম্পর্কে। সহজে যোগাযোগের জন্য মুনির, খুকুকে লাললামটিয়ায় একটা বাসাও ভাড়া করে দেন। চলতে থাকে তাদের এই বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, যেটাকে আমরা পরকিয়া হিসেবে জানি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/22/1563795348682.jpg
পুরনো ছবিতে খুকু ◢

 

এই পরকিয়ায় আসক্ত মুনির বিয়ের প্রথম দিকে তার বউকে নিয়ে সুখে থাকলেও কিছুদিনের মধ্যেই আবার খুকুর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। আর এর ফলেই ধরা পড়েন রীমার কাছে। তাদের আর বনাবনি হয় না একেবারেই। রীমা কাঁদতে থাকেন দিনের পর দিন। স্বামীর অবহেলা তিনি সহ্য করতে পারেন না। পাশাপাশি চলতে থাকে বিভিন্ন শারিরীক নির্যাতন। বেঁচে থাকাকে মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর মনে হতে থাকে তার।

কিন্তু এর কিছুদিন পরে ঘটে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। বদলে যেতে থাকে মুনির। বাসায় এসে আর স্ত্রীকে মারধর করে না। রোজই কিছু না কিছু নিয়ে আসে তার জন্য। কথা বলে, গল্প করে, স্বামীসুলভ আদর সোহাগও করে। রীমাও খুশি হয়। স্বামীর এমন বদলে যাওয়া দেখে সে খুবই খুশি হয়। সেও আর পারতপক্ষে আগের কথা তোলে না। একপাশ থেকে ভালোবাসা আসলে অপর পাশ থেকে মানুষ দায়িত্ববোধ আশা করে। রীমাও তার ব্যত্যয় করে না। সে তার দায়িত্ব পালন করে অক্ষরে অক্ষরে। ভালোবাসার বিনিময়ে সেও আগলে রাখে তার স্বামীকে। মুনির নিজেই রীমাকে বলে খুকুকে সে ছেড়ে দেবে। তার সাথে আর কোনো যোগাযোগ রাখবে না। এর কিছুদিন পরে মুনির খুকুকে তার অফিসে আসতে বলে। রীমাও সেখানে উপস্থিত ছিল। সেখানে রীমা খুকুকে তার স্বামীর সাথে মিশতে বারণ করে। খুকু কাঁদতে কাঁদতে চলে যায়। যাওয়ার সময় সে রীমাকে বলে যায়, আমি তোমাকে দেখে নেব। দেখব কে জেতে আর কে হারে। সেই রাত্রে মুনির রীমার ইস্কাটনের বাড়িতে রাত্রি যাপন করে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/22/1563795290586.jpg

রীমার ইস্কাটনের বাসা ◢

 

একদিন রাতে এমনই পাশাপাশি শুয়ে দুজন। মুনির রীমার পাশ ঘেঁষে শোয়। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে। মুনির রীমাকে বলে, তোমাকে নিয়ে তো আসলে খুব বেশি কোথাও যাওয়া হয়নি আমার। তাই চলো দুজন মিলে চিটাগাং ঘুরে আসি। রীমা খুশি হয়। তার ভেতরের কোনো এক পুকুরে ফোটে ওঠে একশো একটা পদ্মফুল। সেই ফুল দুলতে থাকে বাতাসে, যেই বাতাস এসে শীতল করে দেয় রীমার মনটাকেও।

পরদিন তারা রওয়ানা হয়। সারাদিন এখানে সেখানে ঘুরাঘুরি করে রাতে আশ্রয় নেয় হোটেল সৈকতে। সেখান থেকে ফিরে আসে পরেরদিন রাতে। বসন্ত আর হলুদ যেমন মাখামাখি, তেমনই বসন্তের সাথে বাতাসেরও আছে একটা গভীর সম্পর্ক। ১৯৮৯ সালের এপ্রিলের নয় তারিখ, বাংলা ক্যালেন্ডারে তখন বসন্ত বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এগিয়ে আসছে নতুন আরেকটি বৈশাখ। এমনই এক বাতাস ভরা রাতে খোলা আকাশের নিচে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল মুনির এবং রীমা। গাড়ি যখন নারায়ণগঞ্জের মিজমিজি গ্রামের কাছে এসে পৌঁছল, তখন গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে দিল মুনির। রীমা কারণ জিজ্ঞেস করল। মুনির চুপচাপ নেমে গেল গাড়ি থেকে। চুপচাপ ফিরে এলে রীমা জিজ্ঞেস করল শরীর খারাপ কিনা। মাথা টিপে দিতে চাইল রীমা। কিন্তু মুনির ঝটকা মেরে সরিয়ে দিলেন তার হাত। গাড়িতে থাকা একটি বোতল দিয়ে সজোরে আঘাত করলেন মাথায়। রীমা কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। তার স্বামীর কী হলো হুট করে! সে পড়ে গেল ঘোরের ভেতর। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দ্বিতীয় আঘাত। রীমার পুরো দুনিয়া তখন ঘুরতে থাকে। চোখের সামনে হয়তো ভেসে ওঠে সকল ঘটনা। তার শহিদ বাবার কথা হয়তো ভেসে আসে মনে, কিংবা আদর করে মুখে তুলে মায়ের খাইয়ে দেওয়ার কথা। আটলান্টায় স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে থাকা বোনটার কথাও হয়তো চোখে ভাসে। মৃত্যুর সমইয় নাকি এমনই হয়। প্রিয়জনদের আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চায় সবাই। যে আত্মহত্যা করে মারা যায়, সেও নাকি বেঁচে যাওয়ার চেষ্টা করে। এরই মধ্যে মুনির গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। টেনে হিঁচড়ে নামায় রীমাকে। গাড়িতে রাখা একটা ধারাল চাকু দিয়ে পেটের মধ্যে আঘাত করতে থাকে। রীমা একবার হাতে ধরে, একবার পায়ে। এদিক সেদিক তাকায়, গভীর অন্ধকার ছাড়া তার চোখের সামনে আর কিছু ভাসে না। হাতে পায়ে ধরে রক্ষা হয় না মেয়েটার। খুকুর সাথে পরকিয়ায় আসক্ত মুনিরের আঘাতে জর্জরিত হয়ে একটা সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

মৃত্যু নিশ্চিত হলে মুনির গাড়ি স্টার্ট দেয়। একটু দূরে ডোবায় গিয়ে নিজের পরনের প্যান্ট এবং রক্তাক্ত জামা ছুড়ে ফেলে ডোবায়। হাতে থাকা ছুরিটা ছুড়ে মারে আরেকটু দূরে। গাড়ি নিয়ে আগায় যাত্রাবাড়ির দিকে। নিজের গাড়িটি ফেলে রেখে যায় সায়েদাবাদের বাস টার্মিনালের উল্টো দিকে। গাড়িটি তালাবদ্ধ করে রাখে সে। অপরাধী যতই অপরাধ করুক, সে একটা না একটা চিহ্ন ফেলে যায় সবসময়। মুনিরও সেই কাজ করল। রক্ত মাখা সব জামা ফেলে দিলেও একটি গেঞ্জি রয়ে যায় গাড়ির ভেতর। আর গাড়ির গায়ে রয়ে যায় রক্তের কিছু চিহ্ন। বেলা বাড়ার সাথে সাথে গাড়িটি যখন পুলিশের হাতে আসে তখন পুলিশের কাছে বিষয়টি দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যায়।

মুনির গিয়ে আশ্রয় নেয় হোটেল বদরে। সেখানে সে বিশ্রামের জন্য গেলে হোটেলের দারোয়ান আলী হোসেন তাকে ২০৩ নাম্বার রুমে নিয়ে যায়। ডাঃ মেহেরুন্নেসার ছেলে পরিচয় পাবার পর আলী হোসেন তাকে জিজ্ঞেস করে বাসা ছেড়ে সে হোটেলে কেন এসে উঠল। মুনির তার স্ত্রীকে হত্যার কথা বলায় কিছুটা ভয় পেয়েই হয়তো আলী হোসেন চলে যায়। এরমাঝে হোটেল কক্ষে সে আত্মহত্যা করার জন্য বিছানার চাদর গলায় বেঁধে উপরে ফ্যানের সাথে ফাঁস দেওয়ার চেষ্টা করলে পাশের রুমের লোকেরা তালা ভেঙে ভেতরে এসে তাকে উদ্ধার করে এবং সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে সে তার মায়ের সাথে ফোনে আলাপ করে এবং একজন আইনজীবী নিয়ে হাসপাতালে আসতে বলে। এর মধ্যে পুলিশ তার খোঁজ পেয়ে যায়, তাকে গ্রেফতার করে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/22/1563795440555.jpg
মুনির খুকুকে নিয়ে প্রকাশিত ভিডিও নাটক ◢

 

গ্রেফতার হওয়ার পর মুনির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। যেখানে সে বলে—যেদিন খুকুর সাথে তার অফিসে রীমার দেখা হয় সেদিন রীমা খুকুকে তার সাথে মিশতে মানা করলে খুকু তার কাছে জানতে চায় সে কী করবে। মুনির তখন কোনো জবাব দেয় না। খুকুর চোখ বেয়ে টলটল করে জল নামে। এরপর যখন খুকু রীমাকে হুমকি দিয়ে মুনিরের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে চলে যায় তখন তার খুব মায়া হয়। খুকুর প্রতি তার ভালোবাসা আবার জেগে ওঠে। আর যার ফলে সে তার জীবন থেকে রীমাকে সরিয়ে দিতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

জেরা, শুনানির পর ১৯৯০ সালের ২১ মে আদালত এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় মুনির ও খুকুকে। মোট ৬৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যপ্রদানের মাধ্যমে রায় হয় মামলাটির। কিন্তু পরে মামলাটি আবার হাইকোর্টে ওঠানো হলে আদলত মুনিরের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখলেও খুকুকে বেকসুর খালাস দেন। তখন সারা দেশেই এর প্রতিবাদ হয়েছিল। লোকে মুনিরের সাথে খুকুরও ফাঁসি চেয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞ আদালত সে সব দাবি আমলে নেননি। এরপর মুনিরের প্রাণ রক্ষার জন্য প্রেসিডেন্টের কাছে পুনঃ পুনঃ আবেদন করা হলেও প্রেসিডেন্ট সে আবেদনে সাড়া দেননি। মুনির খুকুর এই ঘটনা এতটাই আলোচিত হয়েছিল যে এটা নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মঞ্চনাটক, যাত্রা পালা এবং অডিও ক্যাসেট প্রকাশিত হয়। ১৯৯৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে মুনিরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সমাপ্ত হয় আলোচিত ওই হত্যার বিচারের।

কেন এগিয়ে যাচ্ছে বাঁহাতি ব্যাটসম্যানরা

কেন এগিয়ে যাচ্ছে বাঁহাতি ব্যাটসম্যানরা
ক্যারিবিয়ান মাস্টার-ব্লাস্টার ব্রায়ান লারা

নান্দনিকতার বিচারে ক্রিকেট ইতিহাসে বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের কদর সবসময়ই যেন একটু বেশি। তবে পরিসংখ্যান বলে, দৃষ্টিনন্দন এই ব্যাটিং স্টাইল বড় স্কোর গড়তে এবং ম্যাচ জয়ের ক্ষেত্রে কার্যকরীও বটে।

বিগত কয়েক দশকে ব্যাট হাতে পাদপ্রদীপের আলো নিজেদের করে নিয়েছেন অসংখ্য কিংবদন্তি। ব্রায়ান লারা, কুমার সাঙ্গাকারারা দেখিয়েছেন স্টাইলিশ ও মার্জিত ব্যাটিং; পরিস্থিতি অনুযায়ী কার্যকরী স্ট্রোক খেলার পারদর্শিতার প্রমাণ রেখেছেন ম্যাথু হেইডেন, গ্রায়েম স্মিথরা। আগ্রাসী মনোভাবে যে ব্যাটকে তরবারীর মতো ছুটিয়েছেন ক্রিস গেইল, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, সনাথ জয়সুরিয়া—সেই একই ব্যাটকে ধৈর্যের সাথে মহাপ্রাচীর বানিয়ে দারুণ সব ইনিংস উপহার দিয়েছেন শিবনারায়ণ চন্দরপল, অ্যালান বোর্ডাররা। কৌশলের এমন ভিন্নতা তাদেরকে দিয়েছে আলাদা পরিচিতি, তবে বর্তমানে বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের দাপুটে রাজত্বের ভিতটা যে তাঁরাই গড়ে দিয়েছেন, তা বলাই বাহুল্য।

ইতিহাস বলছে, বাঁহাতিদের ব্যাটিং তুলনামূলক কার্যকরী এবং রানস্কোরিং—এই দাবিটা মিথ্যে নয়। ১৯৭০ সাল থেকে পরবর্তী প্রায় প্রতিটি দশকে ধারাবাহিকভাবে সফল বাঁহাতিরা গড় হিসাবে এগিয়ে রয়েছেন প্রায় দুই রানের ব্যবধানে, যা ২০০০ সালের পর হয়েছে দ্বিগুণ। চলতি দশকের শুরুতে অবশ্য সব হিসাব পাল্টে এই গড়ের খেলায় শচীন টেন্ডুলকার, বীরেন্দর শেবাগ, কেভিন পিটারসেন, তিলকরত্নে দিলশানদের সৌজন্যে এগিয়ে যাচ্ছিলেন ডানহাতিরা, যাতে ছেদ টানেন হালের ডেভিড ওয়ার্নার, তামিম ইকবাল, শিখর ধাওয়ানদের মতন পাওয়ার হিটাররা।

এখানে যে মজার ব্যাপারটি লক্ষণীয়, তা হলো বিগত দশকগুলোতে ডানহাতি ও বাঁহাতিদের খেলা মোট ইনিংসের অনুপাত। ৭০-এর দশকে বাঁহাতিদের প্রতি ইনিংসের বিপরীতে ডানহাতিদের ইনিংস ছিল প্রায় চারটি, যেটি গত ত্রিশ বছরে হয়ে গেছে প্রায় সমান-সমান। তবে কি বাঁ-হাতের সাফল্যের ভারী পাল্লাই অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে নতুন দিনের ব্যাটসম্যানদেরকে?

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563712391653.jpg
ক্রিস গেইলের ধ্বংসলীলা ◢

 

২০০০ পরবর্তী দলগত পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাঁহাতিদের ভাণ্ডার অন্যান্যদের চেয়ে স্পষ্টতই সমৃদ্ধ করেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এই সময়ের মধ্যে ক্যারিবিয়ান দলের বাঁহাতিদের গড় প্রায় ৪০, যেখানে ত্রিশেরও নিচের গড় নিয়ে দৈন্যদশা তাদের ডানহাতিদের। প্রায় একই ব্যবধান বিরাজমান বাংলাদেশের বাঁহাতি ও ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে। তামিম, ইমরুল, সৌম্য সরকারদের মতো পরীক্ষিতদের স্কোরগুলোর পাশে যোগ করুন বর্তমান বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের চোখধাঁধানো ইনিংসগুলো—হিসাবটা দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার!

স্টিফেন ফ্লেমিং, মার্ক রিচার্ডসন, টম ল্যাথাম, জেসি রাইডারদের সৌজন্যে প্রায় একই চিত্র ব্ল্যাকক্যাপস নিউজিল্যান্ড দলের পরিসংখ্যানেও। ব্যতিক্রম শুধু রস টেলর—চল্লিশোর্ধ্ব গড় নিয়ে পনেরোশোর বেশি রান পাওয়া একমাত্র ডানহাতি কিউই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563712458522.jpg
বাঁ-হাতের জাদুকর সাকিব আল হাসানের আইডল বাঁ-পায়ে সেরাদের সেরা লিওনেল মেসি ◢

 

ঠিক উল্টো চিত্র এশিয়ার দুই পরাশক্তি ভারত ও পাকিস্তান দলে, যেখানে আধিপত্য রয়েছে ডানহাতিদেরই। পাকিস্তান লাইনআপের ত্রিরত্ন—ইনজামাম-উল-হক, ইউনিস খান এবং মোহাম্মদ ইউসুফ সবসময়ই এগিয়ে ছিলেন বাকিদের থেকে। পরবর্তী সময় শহীদ আফ্রিদি, মোহাম্মাদ হাফিজ, আহমেদ শেহজাদদের মতো অভিজ্ঞরা ডানহাতিদের রানের পাল্লা করেছেন আরো ভারী। সাম্প্রতিক সময়ের তারকা ব্যাটসম্যান ফখর জামান, ইমাম-উল-হকদের বাঁ-হাতের জাদু যেন দিনবদলের বিজ্ঞাপন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563712529262.jpg
পাকিস্তানের একমাত্র ওয়ানডে ডবল সেঞ্চুরিয়ান ফখর জামান ◢

 

আর ভারতের ‘ব্যাটিং ঈশ্বর’ টেন্ডুলকার থেকে শুরু করে রাহুল দ্রাবিড়, বীরেন্দর শেবাগ, ভিভিএস লক্ষ্মণ কিংবা বর্তমানের সেরাদের সেরা বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা—সব ডানহাতি জায়ান্টরা বছরের পর বছর গড়েছেন রানের পাহাড়। ৫০+ গড়ের সামনে বাঁহাতিরা বেশ ব্যাকফুটেই রয়েছেন। তবে সৌরভ গাঙ্গুলি, গৌতম গম্ভীর, যুবরাজ সিংদের মতো দুর্ধর্ষ বাঁহাতিদের গৌরবের ঝাণ্ডা উঁচিয়ে ধরে এগিয়ে চলেছেন হালের শিখর ধাওয়ান।

যুক্তরাজ্য এবং নেদারল্যান্ডভিত্তিক সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব ক্রিকেটার ব্যাটিং করেন ‘ভুল’ পদ্ধতিতে—অর্থাৎ যাদের মূলশক্তির হাতটি থাকে হ্যান্ডেলের উপরিভাগে—তাদের সফলতার হার অন্যদের থেকে বহুগুণে বেশি। এ তালিকায় রয়েছে ব্রায়ান লারা, মাইক হাসি, অ্যালিস্টার কুক, ডেভিড ওয়ার্নার, ক্রিস গেইলের মতো তারকাদের নাম, যাদের ডান বাহুটিই মূল শক্তির উৎস হলেও ব্যাটিং স্টাইলে বাঁহাতি। উল্টোটা ঘটেছে বামের শক্তিতে বলিয়ান মাইকেল ক্লার্ক, অ্যারন ফিঞ্চদের ক্ষেত্রে।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাঁহাতিদের এই স্বাচ্ছন্দ্য বিচরণের রহস্য কী? অন্তর্নিহিত কোনো বৈশিষ্ট্যের জন্যই কি সফলতা লুটাচ্ছে তাদের ব্যাটে? ক্রিকেটের বেশিরভাগ নিয়মকানুন কি তাদের অনুকূলেই যাচ্ছে? নাকি ডানহাতিদের বিপক্ষে বোলিংয়ে অভ্যস্ততাই সৃষ্টি করেছে আজকের এই অবস্থা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563712581984.jpg
মারকুটে বাঁহাতি অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ◢

 

রহস্যের উত্তর হতে পারে এই তিন কারণের সংমিশ্রণও। ক্রীড়াবিজ্ঞানীদের ভাষায়, ব্যাটিংয়ের সময় বাঁহাতিদের মস্তিষ্কের বামপাশের প্রবাহে ডান অংশের দখল তাদের স্থানিক সচেতনতা এবং প্রতিক্রিয়া ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এছাড়াও বাঁহাতিদের ক্ষেত্রে লেগ স্ট্যাম্পের বাইরে পিচ হওয়া বলগুলো এলবিডব্লু উইকেটের বিপরীতে অসামঞ্জস্যতার বেনিফিট প্রদান করে। পাশাপাশি বাঁহাতিদের ব্যাটিং স্ট্যান্স ব্যাহত করে ফাস্ট বোলারদের স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্য।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/21/1563712641218.jpg
রিভার্স সুইপ খেলছেন অস্ট্রেলিয়ার গ্লেন ম্যাক্সওয়েল ◢

 

তবে দলীয় সাফল্য অর্জনে ডান-বাম কম্বিনেশনের ব্যাটিং লাইনআপ কিন্তু দারুণ কার্যকরী। এতে বিপক্ষ দলের অধিনায়ক বল বাই বল ফিল্ড সেটিং পরিবর্তনে পড়েন বিপাকে, যার সবটুকু সুবিধা যায় ব্যাটসম্যানদের ঝুলিতে।

পরিশেষে বলা যায় অনুকুল পরিস্থিতির সর্বোচ্চ সুবিধা নিয়ে নান্দনিক ও উদ্ভাবনী শট খেলতে পারার দুর্দান্ত সব সুযোগই বাড়াচ্ছে বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের সংখ্যা এবং সফলতার হার।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র