Barta24

রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

মেঘপাহাড়ের ডাক-২

মাওলিননংয়ের পথে....

মাওলিননংয়ের পথে....
মেঘপাহাড়ের ডাক/ ছবি: বার্তা২৪.কম
মাহমুদ হাফিজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বার্তা২৪.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

উমগট বিধৌত ডাউকি সীমান্ত অতিক্রম করতেই ‘খুবলেই’ ‘খুবলেই’ সমস্বরধ্বণি। প্রথমপ্রহর থেকে এতোক্ষণ ভ্রমণঘোরের মধ্যে ছিলাম। সম্বিত ফিরতে বুঝতে পারি পৌঁছে গেছি খাসি গারো জৈন্তাদের মেঘ-পাহাড়ের রাজ্য মেঘালয়। স্বাগত জানাতে তিনঘন্টা ড্রাইভ করে ছুটে এসেছেন খাসি মেজবান স্ট্রেমলেট ডেখার, বাখিয়া মন, ইভানিশা পাথাও। এই ট্রিপের অন্তত তিনদিন থাকবো স্ট্রিমলেটের বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউসে, তাঁর সরাসরি আতিথ্যে।

এর আগে সাতসকালে বিমানের ফ্লাইট বিজি জিরো সিক্স ফাইভ আমাদের ঠিকঠাক মতোই নামিয়ে দিয়েছে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। বিমানবন্দর থেকে আমাদের গাড়িতে তুলে নিয়ে সিলেটের পাকা ড্রাইভার দীপক দেবনাথ সাতসকালে পৌঁছে দিয়েছে তামাবিল। নানা ঝক্কি করে দু’পারের ইমিগ্রেশন-কাস্টমস অতিক্রম করেই পেয়ে গেছি মেজবান গ্রুপ ডেখার গংকে। খয়েরি রঙের টাটা সুমো ও দক্ষ গারো গাড়ি চালক দামরেন সাংমাকে নিয়ে তারা সময়মতো হাজির। জীবনে প্রথম ভ্রমণযাত্রা শুরু বিমানে, সীমান্ত অতিক্রম হেঁটে, গন্তব্য গাড়িতে। শানে নুযুল হচ্ছে, ভ্রমণ রুট ঢাকা-সিলেট-তামাবিল-ডাউকি-শিলং। মোড অব ট্রান্সপোর্ট উড়োজাহাজ, মাইক্রোবাস, টাটা সুমো।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/09/1560062721306.jpg

মেঘের বাড়ি মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ের পথে আমাদের প্রথম যাওয়ার কথা এশিয়ার সবচে’ পরিচ্ছন্ন গ্রাম ‘মাওলিননংয়ে’। ডাউকিতনয়া উমগট পাড়ি দিয়ে পাহাড়ি পথে যেতে হবে মাউলিননং। যাওয়ার পথে দ্রষ্টব্যটি স্পর্শ করে গেলে ভ্রমণের হাফ পয়সা উসুল। কারণ বাংলাদেশ-ভারতে সোস্যাল মিডিয়াভিত্তিক যতোগুলো ভ্রমণ গ্রুপ আছে ডাউকিতে তাঁদের অন্যতম গন্তব্য এই গ্রাম। গুগলের ভ্রমণ রিভিউয়ে ক্লিক করলেই মাউলিননং আর মাউলিননং। সে মতে, শিলংয়ের পথে এখন ছুটে চলেছি গ্রামটি এক্সপ্লোরে। ভ্রমণসঙ্গীরা রাতের প্রথমপ্রহর থেকে যাত্রার ধকলে এখন অনেকটা ক্লান্ত। পাহাড়ি রাস্তার ঝাঁকুনিতে তাদের চোখ ঘুম ঢুলুঢুলু। গুরুবাক্য শিরোধার্য করে জোর করে হলেও নির্নিমেষ তাকিয়ে আছি। আমার ভ্রমণ ও ভ্রমণগদ্য আইডল সৈয়দ মুজতবা আলী বা হালের বুদ্ধদেব গুহ বলেছেন, ক্যামেরার লেন্সে দুনিয়া না দেখে চোখের ক্যামেরায় দেখতে। চোখের থ্রি পয়েন্ট ফাইভ লেন্সে সব জায়গার ছবি তুলে মস্তিষ্কের ডার্করুমে রেখে দাও। যখন খুশি সেই ছবি ডেভেলপ করে নাও। পাহাড়-মেঘ-ঝর্ণার সৌন্দর্য দু’চোখের ক্যামেরায় ধরে রাখতে আমি আর কবি কামরুল হাসান তাকিয়ে আছি। এটা, ওটা দেখে ওই ওই বলে চেঁচিয়ে উঠছি। হাতের মোবাইল ক্যামেরাও সচল হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে।

মাউলিননং ভিলেজ এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম হিসাবে তকমা পেয়েছে। এ ধরণের তকমার মাপকাঠি বা তকমাদাতা নিয়ে খুব বেশি জানা না গেলেও গ্রামের এই পরিচিতিতে পর্যটকরা ছুটে আসছে, গ্রামের মানুষও সন্তুষ্টচিত্তে এক অভিনব গ্রাম্যসমাজের আওতায় গ্রাম পরিচালনা করছে, পরিচ্ছন্নতাই যার মূল কথা। নিজস্ব উদ্যোগেই এই গ্রামসমাজের সদস্যরা নিয়মিত গ্রাম পরিস্কার করে আবর্জনা নির্দ্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলে। এ গ্রামে কিছু ঘরবাড়ি, হোমস্টে, রিসোর্ট, কিছু দোকানপাট আছে। প্রতিমুহুর্তে পরিব্রাজক-পর্যটকের স্রোত গ্রাম পর্যটনে আসছে। পর্যটনশিল্প গ্রামবাসীর আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে। এর মাঝে গ্রামের জীবনযাত্রা হারিয়ে গিয়ে মাউলিননং হয়ে উঠেছে ব্যবসাবাণিজ্যের কেন্দ্র। গ্রামের আঁকা বাঁকা প্রতিটি রাস্তার পাশে চমৎকার বাহারি ফুলগাছে। বাড়িতে বাড়িতে নানা পসার নিয়ে বসেছে স্থানীয়রা। মাউলিননং এখন গ্রাম কি গ্রাম না, এ নিয়ে ভাবার সময় পরিব্রাজকদের কারও নেই। তারা এই গ্রামটির নানা আঁকাবাঁকা পথে ছবি সেলফি তুলে, বাঁশ দিয়ে বানানো ভিউপয়েন্টে উঠে এবং নানারকম হস্তজাত সামগ্রীতে ব্যাগ পুরে পাহাড়ি দৌড়াচ্ছে আরেক গন্তব্যে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/09/1560062741768.jpg

ডাউকি থেকে ঘন্টাখানেকের মধ্যেই আমরা মাউলিননংয়ে পৌঁছেছি। মেজবানগণ এখানে যাতায়াতে আগে থেকেই অভ্যস্থ। সৌন্দর্যের আঁধারের মধ্যেই তাঁদের বসবাস, তাই পরিচ্ছন্ন গ্রামে পৌঁছে তাঁদের প্রতিক্রিয়া বোঝা গেল না। ভ্রমণসঙ্গী গৃহবন্ধু জলি, সদ্য কিশোরউত্তীর্ণ তুসু গাড়ি থেকে নেমেই ওয়াও, ওয়াও করতে লাগলো। গ্রামের ভেতরের কোন রেস্টুরেন্টে বসে আমরা চা-কফির বিরতি নিতে চাইলাম। লাস্যময়ী কিশোরী জেস্টারওয়েলের পৈত্রিক রেস্টুরেন্ট বসলাম। রেস্টুরেন্টের নাম কিউ শাপরাঙ। স্থানীয় ভ্রমণসঙ্গী কাম গাইড স্ট্রিমলেট ডেখার জেস্টারওয়েলের কাছে জানেত চাইলেন, এখানে বাইরের খাবার এলাউড কি না। হ্যাঁ সূচক জবাব আসতেই আমাদের অবাক করে দিয়ে তারা তাদের ব্যাকপ্যাক থেকে একের পর এক খাবার বের করতে লাগলেন। দেখলাম,তারা পুরো সকালে নাস্তার জোগারজন্তু করে নিয়ে এসেছেন। স্ট্রিমলেট ওয়ানটাইম প্লেট একেক করে সবার হাতে ধরিয়ে দিয়ে একের পর এক বের করলেন রুটি, আলু ভাজি, ডিম সেদ্ধ ও আচার। কিছুক্ষণের মধ্যে অমৃতসম একপেয়ালা করে চা এনে হাজির করলো কিশোরী জেস্টারওয়েল। আমরা খেয়ে রীতিমতো, পরিতৃপ্ত। কিশোরীর নামটি বিশেষভাবে উল্লেখ হচ্ছে এই কারণে যে, সে শুধু দর্শনধারীই নয়। গরীবঘরের মেয়ে হয়েও নিজেকে সুশ্রী রাখতে নিজের প্রয়োজনীয় যত্ন যে নেয় তা তার চেহারা দেখে বোঝা যায়। এই পাহাড়ের দেশে সে কোথায় বিউটিশিয়ান পায় তা ভেবে অবাক হতে হয়।

আমরা নাস্তা করে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে চাইলাম। চারদিকে পর্যটকরা হৈ হৈ করছে। গ্রামের পার্কিংয়ে লটে অনেকগুলো দোকানে বসেছে গারো খাসিদের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের মেলা। সেই সম্ভার থেকে আগ্রহীরা কিনছে পছন্দের জিনিসপত্র। আমাদের কয়েকজন সেদিকে মনোযোগী। কবি কামরুল হাসান আর আমি মনযোগ দিলাম গ্রামের অন্দর-বাহিরের তত্ত্বানুসন্ধানে। ভ্রমণবিদরাই বলেছেন, ভ্রমণে সব ভ্রামণিকের আগ্রহ এক নয়। আমরা যখন নোটবুকে তথ্য লিখতে ব্যস্ত, আমাদের অন্যসঙ্গীরা তখন ব্যস্ত কেনাকাটায়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/09/1560062759057.jpg

মাওলিননং থেকে শিলং যাওয়ার আগে আরও বেশ কয়েকটি পর্যটনস্পট দেখে যাওয়া যায়। অনেকে ট্যাক্সি নিয়ে এগুলো দেখে সন্ধ্যা বা রাতের দিকে শিলংয়ে গিয়ে হোটেলে ওঠে। অনেক ডাউকি হয়ে চেরাপুঞ্জির হোটেল-রিসোর্টকে কেন্দ্র বানিয়ে পরে শিলংয়ে যায়। সরাসরি শিলং পৌঁছালে চেরাপুঞ্জি, ডাউকির স্পটে আসতে উল্টো আসার প্রয়োজন পড়ে। আমরা চেরাপুঞ্জি থাকছি না, আবার ভোররাতে পথে বের হওয়ার ধকলে আগেভাগেই শিলং পৌঁছানোর পরিকল্পনা করেছিলাম। সে পরিকল্পনা কেড়ে নিল মাউলিননংয়ের অদূরেই লিভিং রুট সেতুর নিচ দিয়ে প্রবাহিত নজরকাড়া জলঝর্ণা। হাজার ফুট ওপর থেকে যে ঝর্ণার অবিরাম কলধ্বণি, কাছেই টানে, দূরে যেতে দেয় না।

আপনার মতামত লিখুন :

৫০ বছর আগের এই দিনে চাঁদে পা রেখেছিল মানুষ

৫০ বছর আগের এই দিনে চাঁদে পা রেখেছিল মানুষ
ছবি: সংগৃহীত

আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে চাঁদে পা রেখেছিল মানুষ। আমেরিকার মহাকাশচারী নিল আর্মস্ট্রং ও বুজ অ্যালড্রিন প্রথম মানুষ, যারা এই ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন।

চাঁদের পৃষ্ঠে প্রথম অবতরণ করেন নিল আর্মস্ট্রং। এরপর বুজ অ্যালড্রিল। তাদের সঙ্গী ছিলেন মাইকেল কলিন্স। তবে তিনি চাঁদের পৃষ্ঠে না নেমে নভোযানে অবস্থান করেন।

১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই ‘ঈগল’ নামক এক চন্দ্রতরীতে করে তারা প্রথম চাঁদে অবতরণ করেন। নিল আর্মস্ট্রং চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করে বলেছিলেন, "That's one small step for man, one giant leap for mankind." (মানুষের ক্ষুদ্র এই পদক্ষেপটি মানব সভ্যতাকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গেল।)

Moon

চাঁদে মানুষ পাঠানো নিয়ে আমেরিকা ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ছিল মর্যাদার লড়াই। ১৯৫৭ সালে স্পুটনিক নামক কৃত্রিম উপগ্রহ প্রথম মহাকাশে পাঠায় রাশিয়া। এতে চন্দ্র জয়ের দৌড়ে এগিয়ে যায় দেশটি।

এরপর ১৯৬৬ সালে রাশিয়ার লুনা-৯ নামক উপগ্রহ চাঁদে সফট ল্যান্ডিং করে। এর দুইমাস পর লুনা-১০ নামক আরেকটি উপগ্রহ চাঁদের কক্ষপথে সফলভাবে স্থাপন করে রাশিয়া। তারা চন্দ্রজয়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেলেও মানুষ পাঠানোর মতো প্রযুক্তি তখনও তারা অর্জন করতে পারেনি। এছাড়া অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কারণে তাদের মহাকাশ অভিযান বাধাপ্রাপ্ত হয়।

Moon

এরমধ্যে ১৯৬৮ সালে মহাকাশ গবেষণায় বড় সাফল্য অর্জন করে যুক্তরাষ্ট্র। তারা মহাকাশে অ্যাপোলো-৮ নামে মানুষ বহানকারী একটি যান মহাকাশে পাঠায়। সেটি চাঁদের কক্ষপথে সফলভাবে প্রদক্ষিণ করে নিরাপদে ফিরে আসে।

তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই মহাকাশযান অ্যাপোলো-১১ তে চড়ে চাঁদে প্রথম অবতরণ করেন নিল আর্মস্ট্রংরা।

পাখি ও আলোর জীবনী : প্রাচ্যচিন্তার দুই চিন্তক

পাখি ও আলোর জীবনী : প্রাচ্যচিন্তার দুই চিন্তক
আব্বাস ইবনে ফিরনাস : যিনি প্রথম পাখি হয়েছিলেন

জ্ঞানচর্চার জাত-ধর্ম হয়না।
‘Mankind: The Story Of All Of Us’—বেশ পরিচিত। মানুষের ইতিহাস নিয়ে আমেরিকান সিরিজ। মজার ব্যাপার হলো, স্পেনের এক ভদ্রলোককে নিয়ে আছে লম্বা বয়ান। যেখানে ইসলামের নবী মুহম্মদকে নিয়ে বলা হয়েছে খুবই অল্প। ভদ্রলোকের নামে কর্ডোবাতে ব্রিজেরও নামকরণ করা হয়েছে। আরো বড় কথা, চাঁদে একটা ক্রেটারের নাম তাঁর নামে। বলা বাহুল্য, ক্রেটার হলো গ্রহের পৃষ্ঠতলে বিস্ফোরণ, উল্কাপতন কিংবা মহাকাশীয় বস্তুর আঘাতে সৃষ্ট গহ্বর। ভদ্রলোকের নাম আব্বাস ইবনে ফিরনাস।

নবম শতক। স্পেনে মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগ। কর্ডোবার এক জ্ঞানী ব্যক্তিকে দেখা গেল পাখা বানাতে। পাখির ওড়ার কৌশল তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। প্রস্তুতি শেষ হলো। মানুষকে অবাক করে উঠলেন উঁচু টাওয়ারে। তারপর দিলেন লাফ। মৃত্যু হতে পারত কিন্তু হলো না। বরং সফলভাবেই উড়লেন একরকম। শুধু ল্যান্ড করার সময় পড়ে গিয়ে আহত হলেন। কারণ লেজের ধারণায় ত্রুটি ছিল। বেশকিছু হাড় ভাঙল। ততক্ষণে রচিত হয়েছে প্রথম মানব হিসেবে উড্ডয়নের ইতিহাস। সেই আব্বাস ইবনে ফিরনাস। বুঝলেন, পাখির মতো একটা লেজ না হলে ল্যান্ডিং সমস্যা ঘুচবে না। যতদিন বেঁচে ছিলেন, কাজ করেছেন এ নিয়ে।

ওড়ার জন্য পাখা তৈরিতে ফাঁপা কাঠ ব্যবহার করেছিলেন বলে জানা যায়। ইবনে ফিরনাস সম্পর্কে লিখেছেন ঐতিহাসিক মুহম্মদ আল মাক্কারি। তৎকালীন কর্ডোবার শাসক প্রথম মুহম্মদের (মৃ.-৮৮৬) দরবারি কবি মুমিন ইবনে সাইদ লিখেছিলেন, “ফিরনাস যখন শকুনির পালক পরে, তখন ফিনিক্সের চেয়েও দ্রুতবেগে উড়তে পারে।” আরমেন ফিরম্যান বলে ল্যাটিন যে নামটা মধ্যযুগের ইউরোপেও ছিল, তা ইবনে ফিরনাসেরই বলে ধরা হয়।

তবুও তাঁর কাজ শুধুমাত্র এটাই ছিল না। একটা চেইন রিংয়ের ডিজাইন করেছিলেন, যার দ্বারা গ্রহ-নক্ষত্রের গতি অবিকৃতভাবে উপস্থাপিত হতো। মাকাতা নামে জলঘড়ির আবিষ্কার করেন। ম্যাগনিফাইং গ্লাস বলে যা আজ পরিচিত, তা অনেকটা তাঁর হাত ধরেই আসে। আগে মিশর থেকে কোয়ার্টজ আমদানি করা হতো স্পেনে। ইবনে ফিরনাস ‘রক ক্রিস্টাল’ কাটার পদ্ধতির অগ্রগতি ঘটিয়ে এ থেকে মুক্তি দেন। তাঁর পরিচয়ে বলা হয়—প্রকৌশলী, রসায়নবিদ, চিকিৎসাবিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, দার্শনিক, কবি এবং সংগীতজ্ঞ।

‘Cosmos: A spacetime Odyssey’—পণ্ডিতি ধাঁচের আরেক পশ্চিমা ডকুমেন্টারি সিরিজ। প্রভাবশালী এস্ট্রোফিজিসিস্ট কার্ল সেগানের Cosmos থেকে উদ্ভূত। অনুরূপ জ্যাকব ব্রনস্কির The ascent of man। সেকুলার বয়ান। তবু উভয়ক্ষেত্রেই এসেছে প্রাচ্যের এক আলোকবিজ্ঞানীর নাম। নিউটন, আইনস্টাইন, কোপার্নিকাস কিংবা হাবলের আলোচনা করার সাথে। চাঁদের একটা ক্রেটারের নাম দেওয়া হয়েছে তাঁর নামেও। ভদ্রলোকের নাম ইবনে আল হাইথাম বা আলহাজেন। জন্ম ৯৬৫ আর মৃত্যু ১০৪০ খ্রিস্টাব্দে। বসরায় জন্ম নেওয়া কায়রোয় বসবাসকারী এই পণ্ডিতের সম্পর্কে প্রাচ্যবাসী প্রায় অনেক কিছু জানে না।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/20/1563620749290.jpg

ইবনে আল হাইথাম: আলোকবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক চিন্তক ◢

 

মরুভূমিতে একবার তাবু তৈরি করলেন তিঁনি। এমন আবদ্ধ যে ভেতরটাতে কোনো আলো আসতে না পারে এবং বাতি বন্ধ করলে যেন ঘুটঘুটে অন্ধকার তৈরি হয়। তাবুর দেয়ালের একপাশে রাখা হলো সূক্ষ্ম একটা ফুটো। বাতি বন্ধ করে দিলে দেখা হলো অদ্ভুত কাণ্ড। ফুটো দিয়ে আলো প্রবেশ করছে। প্রবেশ করা আলোর গতিপথ সরল। এবং আলো আপতিত হয়ে উল্টো বিম্ব তৈরি করে। এই একটা পরীক্ষা দিয়ে আল হাইথাম ভুল প্রমাণ করে দিলেন তার পূর্ববর্তী ধারণাকে। প্রতিষ্ঠিত করলেন আলোর গতি, ধর্ম ও ক্যামেরার ধারণা। এইখানেই শেষ না। নিউটনের কয়েকশো বছর আগে হাইথামের লেন্স নিয়ে কাজের পাণ্ডুলিপি আজও ইস্তাম্বুলে বিদ্যমান।

আলো এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান খুব সম্ভবত তার প্রিয় বিষয় ছিল। অধিকন্তু ক্যালকুলাস, সংখ্যাতত্ত্ব, জ্যামিতি ও জ্ঞানের অন্যান্য শাখায় তার অবদান ব্যাপক। বায়হাকি তাকে দ্বিতীয় টলেমি বলে স্বীকৃতি দেন। তার কিতাবুল মানাজির ল্যাটিনে অনুদিত হয়েছে ত্রয়োদশ শতকেই। বইটি সম্পর্কে ভালো ধারণা ছিলো বেকন, গ্যালিলিও, কেপলার, দেকার্তে, লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি এবং রেনেসাঁসের অন্যান্য পণ্ডিতের।

মানুষের চোখের গঠন সংক্রান্ত তার তত্ত্ব ছিল রীতিমতো বৈপ্লবিক। ইস্তাম্বুলে রক্ষিত কিতাবুল মানাজিরের প্রথম খণ্ডে বিধৃত। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিঁনি বলেন—The duty of the man who investigates the writings of scientists, if learning the truth is his goal, is to make himself an enemy of all that he reads, and ... attack it from every side. He should also suspect himself as he performs his critical examination of it, so that he may avoid falling into either prejudice or leniency.৷ — আল হাইথাম।

খুব সম্ভবত একারণেই Matthias Schramm আল হাইথামকে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সত্যিকার স্থপতি বলতে চান।

জ্ঞানচর্চায় প্রাচ্যের পতন ঘটেছে অনেক আগে। ধ্বংসস্তূপ থেকে বের হয়ে এসে ইবনে হাইথাম কিংবা আব্বাস ইবনে ফিরনাসেরা ঠিকই পাশ্চাত্য জ্ঞানচর্চায় আলোচিত হয়। জ্ঞানের কোনো জাত-কাল-ধর্ম নেই। কেবল হয় না প্রাচ্য সমাজে। একসময় যেখানে বায়তুল হিকমা ছিল, আজ সেখানে গৃহযুদ্ধের গন্ধ। একসময় যারা গ্রহ নক্ষত্রের গতিপথ নিয়ে তত্ত্ব কপচিয়েছে। আজ তাদের বংশধর ঘর হারিয়ে ঘুরছে পথে। ইতিহাস খুবই নির্মম। বিশেষ করে তাদের প্রতি, যারা তাদের শিকড় ভুলে যায়।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র