Barta24

শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯, ৪ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

তুমলিং-সান্দাকফু-ফালুট অংশ

মেঘের ভেলায় ভেসে সান্দাকফু-ফালুট: পর্ব ২

মেঘের ভেলায় ভেসে সান্দাকফু-ফালুট: পর্ব ২
ছবি: লেখক তৌফিক হাসান
তৌফিক হাসান


  • Font increase
  • Font Decrease

ভোরের আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘা  দেখার আশাবাদ দিয়ে নিয়ে বিছানায় গিয়েছিলাম। গাইড সুভাষকে বলে রেখেছিলাম ভোরে জাগিয়ে দিতে। সুভাষ জাগাবার আগেই আমারা জেগে উঠলাম ভোরের প্রথম আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখবো বলে। সময় নষ্ট না করে বিছানা ছেড়ে চটজলদি ভারী শীতের কাপড় গায়ে জড়িয়ে বাহিরে বের হলাম।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558853429917.jpg

** তুমলিং এর পূব আকাশে সূর্যোদয়ের আগের মুহূর্ত

ভোর পৌনে ৫টা, আস্তে আস্তে পুব আকাশে আলো ফুটছে আর কনকনে শীতে বাহিরে দাঁড়িয়ে আমরা আশায় বুক বেঁধে আছি যে একটা উজ্জ্বলতম মেঘমুক্ত সূর্যোদয় দেখবো বলে। আগে থেকেই ওয়েদার ফোরকাস্ট দেখে গিয়েছিলাম, তাতে মেঘ এবং বৃষ্টির আভাস ছিলো আমাদের ট্রেকের সময়। উপরন্তু যাবার সময় সাইক্লোন ফনীর খবর সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলাম। তারপরও ভাগ্য ভালো বলতে হতে মেঘমুক্ত আকাশেই আলো ছড়িয়ে পরতে শুরু করলো, আস্তে আস্তে হিমালয় হাসতে শুরু করলো। এমন সময় সেই ফ্রেঞ্চ-স্প্যানিশ জুটিও যোগদান করলো আমাদের সাথে। ভাগ্য বেশিক্ষণ সুপ্রসন্ন থাকলো না, দেখতে লাগলাম দুপাশ হতে দুটো মেঘের ফালি আসতে আসতে স্লিপিং বুদ্ধকে গ্রাস করছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558855126441.jpg

হিমালয়ের কয়েকটি পিক মিলে একটি শায়িত মানুষের অবয়বের মতো দেখায় বলে এই অংশটুকুকে স্লিপিং বুদ্ধ বলা হয়ে থাকে। পুরোপুরি আলো ফোটার আগেই স্লিপিং বুদ্ধ ঢেকে গেল মেঘের চাদরে। হিমালয়ন রেঞ্জের ভাল ভিউ পাওয়া যায় অক্টোবর-নভেম্বরে, মার্চ-এপ্রিলেও পাওয়া তা কালেভদ্রে। হিমালয় আগেও দেখেছি, তাই এটা নিয়ে তেমন মনে কষ্ট রইলো না, তাছাড়া হিমালয়ান শৃঙ্গ খুব ভালোভাবে দেখা যাবেনা এটা ধরে নিয়েই আমরা রওনা দিয়েছিলাম।

সকাল সাড়ে ৫টা নাগাদ তুমলিং পর্ব শেষ করে ঝকঝকে পাকা সড়ক ধরে আমরা যাত্রা শুরু করলাম সান্দাকফুর পথে। পথে গইরিবাসে নাস্তা করবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। তুমলিং ছাড়াতেই সামান্য চড়াই, খালি পেটে সকাল সকাল উপড়ে উঠতেই হাফ ধরে গেল! সামান্য যেতেই সিঙ্গালিলা উদ্যানের প্রবেশদ্বার, আমরা সিঙ্গালিলা উদ্যানের মধ্যে প্রবেশ না করে বা দিকের রাফ রোড ধরলাম। রাস্তাটা নেপালের মধ্য দিয়ে চলে গেছে, আসলে সান্দাকফু পর্যন্ত ট্রেকের অনেকটা অংশ নেপালের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558853557574.jpg
*** ছোট্ট ছিমছাম নেপালী গ্রাম যোবাড়ী

কিছুদুর যাবার পর নেপালের একটা চেকপোস্ট পড়লো সেখানে এন্ট্রি করে এগিয়ে যেতেই নেপালের ছোট্ট গ্রাম যোবাড়ী পড়লো। সেখানে ফটাফট কয়েকটা ছবি তুলে আবার পা চালালাম। গ্রাম পেরোতেই রাস্তা নিচের দিকে যেতে থাকলো, বেশ খারাপ রাস্তা হলেও ল্যান্ডস্কেপ কিন্তু অসাধারণ। চোখ জুড়ানো ল্যান্ডস্কেপ দেখতে দেখতে আমরা চললাম গইরিবাসের উদ্দেশ্যে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558853639624.jpg
** গইরিবাসের পথে

 তুমলিং থেকে গইরিবাসের এর দুরত্ব ৭ কিমি। গইরিবাসের উচ্চতা ৮৬০০ ফিট এবং এখানেও রাস্তাটাই ভারত-নেপাল সীমান্ত। আমরা সেখানে পৌঁছে রাস্তার বা পাশের ম্যাগ্নোলিয়া লজে বসে নাস্তার অর্ডার করে দিলাম। এতটা পথ হাঁটার কারনে আর সূর্যতাপ এর কারনে গরম অনুভূত হল। তাই গায়ে জড়ানো কমানো শুরু করলাম। গায়ে দুটো জ্যাকেট ছিলো, খুলতেই দেখি ভিতরের টিশার্ট টি ভিজে একাকার। সেকেন্ড জ্যাকেটটাও খানিকটা ভিজে উঠেছে। জ্যাকেটটি রোদে শুকাতে দিয়ে নিজেও দাঁড়িয়ে গেলাম টি শার্ট শুকাতে। সিনথেটিক টিশার্ট হওয়াতে খুব অল্প সময়েই শুকিয়ে গেল। এধরনের ট্রেকে সিনথেটিকের পোশাক নেয়াই ভালো কারন সুতি পোশাক শুকাতে সময় বেশী নেয় এবং ঘামের গন্ধও বেশী হয়। গাইড আমাদের পাসপোর্ট গুলো রাস্তার অপর পার্শ্বের ভারতীয় এসএসবি ক্যাম্পে দেখিয়ে নিয়ে আসলো। সময় বাঁচানোর জন্য আমরা ভেজিটেবল মম আর সিন্ধ ডিম অর্ডার করেছিলাম, নেপালী দিদি ঝটপট অর্ডার সার্ভ করলো। খেতে খেতেই কোলকাতার একটা গ্রুপ এসে পৌঁছল, ওরা ল্যান্ড রোভার গাড়িতে করে এসেছে আর এসেই হল্লা শুরু করলো। আমরাও তাড়াতাড়ি শেষ কালিপোখরীর পথ ধরলাম। গইরিবাসের পরেই রাস্তাটা বেশ খাঁড়াভাবে উঠে গেছে, কিছুদূর উঠার পর দেখলাম ট্রাফিক জ্যাম! এই পাহাড়ে আবার জ্যাম কথা থেকে আসলো ভাবতে ভাবতে পরের বাক ঘুরতেই দেখি একটা ল্যান্ড রোভারের চাকার এক্সেল ভেঙ্গে গেছে এবং সেটার মেরামত চলছে। তাই দুইপারেই বেশ কয়েকটা গাড়ি আটকে গেছে। আসলে যেইরকম রাস্তা এতে এইসব বৃটিশ আমলের গাড়ীগুলো কেমনে চলে সেটাই একটা বিস্ময়। চড়াই শেষ হতেই একটা ভিউ পয়েন্ট আসলো সেখানে পাথরের উপরে দারিয়ে-বসে ত্যারাব্যাকা হয়ে নানা স্টাইলে ফটোসেশন করে আবার পা বারালাম। পথে পরিচিত হলাম এক অস্ট্রেলিয়ান দম্পতির সাথে, লাগেজগুলো ঘোড়ায় চাপিয়ে তারা চলেছে পদব্রজে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558853676177.jpg
** অস্ট্রেলিয়ান দম্পতির সাথে আমরা

আরেকটু উপরে উঠতেই মেঘের কোলে রোদ হারিয়ে যেতে থাকলো, মাঝে মাঝে এত ঘন মেঘের মধ্য দিয়ে আমরা হেটে যেতে থাকলাম যে সামান্য দূরেই দেখতে পাচ্ছিলাম না। এভাবে কখনও মেঘ কখনও রোদ, কখনও রুক্ষ পথ আবার কখনও রড্ডেন্ড্রন ফুলের শোভা দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম কালিপোখরী।  নেপালী ভাষায় পোখরী অর্থ লেক আর কালী অর্থ কালো, কালিপোখরী নামটা এসেছে ওখানকার কালচে পানির লেকের থেকে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558853709360.jpg
*** কালিপোখরী লেক

কালিপোখরীর উচ্চতা ১০৪০০ ফিট, এই সিজনে সেখানে প্রায় সময়ই জোর হাওয়া বয়। লেকটাকে ভাল করে দেখে কয়েকটা ছবি তুলে রওনা হয়ে গেলাম সান্দাকফুর উদ্দেশ্য, পরবর্তী বিরতি চৌরি বাজারে লাঞ্চ করার জন্য। চৌরি নামটা আসলে এসেছে চমড়ি বা ইয়াক থেকে, বাজার বলা হলেও ছোট্ট একটা গ্রাম মাত্র কয়েকটা ঘর। গাইড কে আগেই পাঠিয়ে দিলাম কারণ এই পথে আপনি যেখানেই খাবার অর্ডার করুন না কেন সবাই ফ্রেশ রান্না করে দিবে। আগে কেউ রান্না করে রাখে না। আমরা হেলতে দুলতে ছবি তুলতে তুলতে সেই খাবার রেস্তোরায় গিয়ে পৌঁছলাম। যেতেই সুভাষ জিজ্ঞাসা করলো আমরা ইয়াকের মাংস খাবো কিনা, উত্তেজনায় সবাই হ্যাঁ বলে উঠলাম। যে পথে আন্ডাকারিই সবচেয়ে দামী খাবার সেখানে ইয়াকের মাংস!!! আমি বললাম, কই মাংস আগে দেখাও, আমাকে নিয়ে গেল দেখাতে। মাংস দেখে তো আমার চক্ষু চড়কগাছ, রান্নাঘরের এক কর্নারে ছাদের বাঁশের সাথে কয়েকটি ইয়াকের হাড্ডী দাঁত কেলিয়ে হাসছে আর তার শেষ মাথায় খুবই সামান্য কালচে রঙের মাংস তার অবস্থান জানান দিচ্ছে। মাংস না বলে মাংসের শুঁটকি বলাই আসলে যুক্তিযুক্ত। ট্রাভেলার মনির ভাইকে ডাকলাম, তার চেহারা দেখে যা বোঝার বুঝে নিয়ে সুভাষকে বললাম আমাদের মাফ করো। ধোঁয়াওঠা গরম ভাত, সবজি আর আন্ডাকারি দিয়ে পেটপুজা করে রওনা হলাম কাঙ্ক্ষিত সান্দাকফুর পথে। কালিপোখরী  থেকে সান্দাকফুর দুরত্ব ৬ কিমি যার শেষ ৩ কিমি বেশ খাঁড়া। সান্দাকফু যতই কাছে যেতে লাগলাম ততই রোমাঞ্চিত হতে থাকলাম। মাঝে মাঝে ঘন মেঘ আমাদের ঢেকে দিচ্ছিল। পুরোটা পথেই সোঁ সোঁ শব্দ করে বেশ জোর হাওয়া বইছিলো। একটা আশ্চর্য বিষয় লক্ষ্য করলাম, মেঘগুলো পাইন গাছে আটকে যাচ্ছে আর পানি হয়ে গাছ বেয়ে নিচে নেমে আসছে। কোথাও কোথাও রাস্তা বেশ কর্দমাক্ত হয়েছে  পাইন গাছে আটকে বেয়ে গলে পরা এই সব পানির কারনে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558853760121.jpg
*** মেঘের আহ্বানে পাইনবনের পথে

আমাদের দেশের বান্দরবনেও অনেক মেঘ দেখেছি আমরা কিন্তু মেঘ যত ঘনই হোক না কেন এভাবে কোন গাছের পাতাও আটকে পানি হয়ে ঝরতে দেখিনি। আরেকটা পার্থক্য লক্ষ্য করলাম আমাদের দেশের মেঘের গতি খুব বেশ না হলেও হিমালয়ান রেঞ্জে মেঘ যেন চঞ্চলা হরিণ। সান্দাকফু দূরে থাকতেই গাইডকে ছেড়ে দিলাম জিটিএ ট্রেকার্স হাটে আমাদের রুম ঠিক করার জন্য। ট্রেকের সময় আমাদের ক্রস করে অনেকগুলো ল্যান্ড রোভার গাড়ি গিয়েছে সান্দাকফুর দিকে সেই হিসেবে টুরিস্টদের একটু চাপ থাকার কথা। যাইহোক সন্ধ্যার সামান্য আগে আমরা সান্দাকফু পৌঁছে গেলাম, সুভাষ আমাদের মনোনীত জিটিএ-তেই রুম পেয়েছে। একটাই রুম খালি ছিলো, বাকীগুলো বুক হয়ে আছে বেশ কয়েকদিন থেকেই। কোলকাতার কয়েকটি পরিবার ২/৩ দিন থেকে অবস্থান করছেন সান্দাকফু থেকে সূর্যোদয় দেখবে বলে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558853814384.jpg
 *** জিটিএ হাট, সান্দাকফুতে আমাদের থাকার স্থান

সান্দাকফুর উচ্চতা ১১৯২৯ ফুট এবং উপরের দিকে সানরাইজ নামের একটা প্রাইভেট হোটেল আছে যেটা থেকে বেশ ভাল ভিউ পাওয়া যায় বিধায় এখন টুরিস্টরা সেখানেই বেশি থাকে। যাইহোক, রুমে ঢুকে কাপড় ছাড়তে ছাড়তেই হাওয়ার বেগ এমন বেড়ে গেলো যে শব্দ শুনে মনেহল আমরা কক্সবাজার বীচে বসে আছি। সেই সাথে ঠান্ডাটাও বেড়ে গেল, তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে এলাম। কনকনে ঠান্ডা পানি লাগাতেই আমাদের কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে গেলো, গায়ে একটা গেঞ্জি আর একটা জ্যাকেট ছিলো  তার উপর আরও একটা জ্যাকেট চড়াতে হলো। তাও কাঁপাকাঁপি কমছিল না অগত্যা ১ কম্বল ২ লেপের নিচে সাথে কান টুপি, হাত এবং পা মোজা। সামান্য পরেই কেয়ারটেকার নক করলো খাবার রেডি, কোন উপায় নাই খেতেই হবে কারণ এসব পাহাড়ে সন্ধ্যা ৭টাই ডিনার টাইম। ছোটবেলায় বার্ষিক পরীক্ষার পর যখন নানাবাড়ি যেতাম তখন এরকম সন্ধ্যা হলেই ডিনার দিয়ে দিত আর সন্ধ্যা ৭-৮টা নাগাদ মোটামুটি পুরো গ্রাম নিস্তব্ধ হয়ে যেত। আমার নানা বাড়ির কথা মনে পড়ছিলো খুব করে। যাইহোক কাঁপতে কাঁপতে খেয়ে নিয়ে বিছানায় গেলাম, বাতাসের কারনে রুমের বড় বড় কাঁচের জানালাগুলো যেভাবে কাঁপছিল আর সোঁ সোঁ শব্দ হচ্ছিল তাতে তো মনে হচ্ছিল যেন ভেঙ্গে না যায়। অনেক কষ্টে হাত পা গরম হলো এবং এক সময় ঘুমিয়ে পরলাম। এলার্ম ছাড়াই ভোর সাড়ে ৪টার দিকে জেগে গেলাম, ঢাকায় অফিসে যাবার জন্য মোবাইলের এলার্ম ৩ বার চেঞ্জ করতে হয় আর এখানে কিছুই লাগলো না। বিছানা ছেড়ে কটেজ থেকে বেরতেই মন টা খারাপ হয়ে গেলো, ঘন মেঘ ছেয়ে আছে পুরো উপত্যাকা। যদিও জোর হাওয়া বইছে তবুও মন বলল কোনো চান্স নেই। মনির ভাইয়ের মন মানছিল না বললও চলেন ভিউ পয়েন্টে গিয়ে আরেকটু অপেক্ষা করি দেখি মেঘ সরে যেতেও পারে। আমি বল্লাল চলেন, গিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বললাম ফেরত যাই উনিও সায় দিল। ভোর সাড়ে ৬টাও ব্রেড-বাটার খেয়ে যাত্রা শুরু করলাম ফালুটের পথে, আজ আমরা হাটবো ২১ কিমি পথ। কোলকাতার সেই গ্রুপটিও বেরিয়ে পরলো আমাদের সাথে। ওরা গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে আর বাকি পথটুকু পায়ে হেঁটেই যাবে। পথটা খুব ভালো করে চিনেনা বলে আমাদের সঙ্গী হতে চাইল, আমরা বললাম সমস্যা নেই ফলো করুন আমাদের। এই রুটে রাস্তার অনেকগুলো শাখা রাস্তা রয়েছে, ভুল করলে বেশ কয়েক ঘণ্টা বারতি হাঁটতে হবে। সন্ধ্যা নামার আগে ফালুট পৌঁছায় জরুরী। রাস্তায় অনেক যায়গায় রেড মার্ক দেয়া আছে ফালুট কে নির্দেশ করে, একটু দেখে চললে ভুল হবার সম্ভবনা নেই।

আমাদের ট্রেকের সবথেকে সুন্দর অংশ হলো এই ২১ কিমি পথ। ঘন পাইন বন, সবুজ ভ্যালী, নানান রঙয়ের বাহারি ফুল আর ভেসে বেড়ানো মেঘের দল আপনাকে শারীরিক কষ্ট অনুভব করতেই দিবেনা। আপনি ফুল ভালবাসলে মার্চ-এপ্রিল সিজনে এই ট্রেকে আসুন, কথা দিচ্ছি আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে আর হারিয়ে যাবেন দূর পাহাড় থেকে ভেসে আসা ইয়াকের গলার ঘণ্টার শব্দের ছন্দে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558855442349.jpg

 *** মনকাড়া এমন ফুল আপনার ভাল লাগবেই

এই পথে অনেকে গাড়িতেও যায় তবে আমি বলবো প্রান হাতে নিয়ে যেধরনের কষ্ট সয়ে যেতে হবে তাতে করে না যাওয়াই ভাল। রাস্তা মাঝে মাঝে অসম্ভব ভাঙ্গাচুরা, জীপের সিট ধরে বসে থাকতে থাকতে আর ঝাকি খেতে খেতে আপনার হাড্ডি মাংস এক হয়ে যাবে।

সান্দাকফু ছাড়াতেই পথ চলে যাবে পাইন বনের মধ্য দিয়ে, আর পথে পথে রডডেন্ড্রন, ম্যাগ্নোলিয়া আরও নাম না জানা ফুল আপনাকে স্বাগত জানাবে। এমন পাগল করা রাস্তা দিয়ে আমরা হেঁটে যেতে থাকলাম।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558854383378.jpg
*** ফ্রেঞ্চ-স্প্যানিশ জুটি পল-নেভিসের সাথে

পাইনবন শেষ হতেই সেই ফ্রেঞ্চ-স্প্যানিশ জুটি আমাদের ধরে ফেলল। হাল্কা কথাবার্তা ফটোশেসন শেষে ওরা এগিয়ে গেল। আমাদের অত তারা নেই, আমরা পুরো প্রকৃতি কে উপভোগ করার চেষ্টা করি আমারে ট্রেকে। খানিকটা এগোতেই আমাদের রুট লালে লাল হয়ে গেল, যেদিকে চোখ যায় শুধু রডডেন্ড্রন ফুল আর ফুল। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম, নয়ন ভরে দেখে মাথায় গেঁথে নিলাম এই সৌন্দর্য কে। ফুলেল শুভেচ্ছার পর শুরু হলো সবুজ গালিচা, যতদুর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। চিত্রের পর এমন সবুজ আর চোখে পড়েনি। প্রতিটা পাহাড় চুড়াই সবুজ ঘাসে ঢাকা, দেখলেই নয়ন জুড়িয়ে যায়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558855391425.jpg
*** এরকম অনেক পথ সবুজ গালিচায় ঢাকা

কয়েকটা চূড়া পেরোতেই একটা যায়গায় কিছু অস্থায়ী স্থাপনা দেখে গাইড কে জিজ্ঞাসা করলাম সেখানে কি, এমন জনমানবহীন যায়গায় কি হতে পারে? গাইড বল্লো ইয়াক ফেস্টিভ্যাল, প্রতি বছর নেপালী নববর্ষে অনুষ্ঠিত। আমাদের মতো নেপালেও ১৪ এপ্রিল বছরের প্রথম দিন। দূর দূরান্ত থেকে সবাই ইয়াক নিয়ে সেখানে হাজির হয় বছরের প্রথম দিনে। ভারত, নেপাল, ভুটান ছাড়াও বেশ কিছু ইউরোপিয়ান বা আমেরিকান টুরিস্টও নাকি আসে এই ফেস্টিভ্যাল দেখতে। আরও কিছুদুর যেতে এক পাহাড়ের চূড়ায় একটা বাড়ি তৈরি হতে দেখে গাইড কে জিজ্ঞাসা করলাম মানুষ এখানে থাকে কি কিরে, বাজার কোথায় করে, জীবন চলে কিভাবে? আমরা নেপালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম, গাইড বললো এখান থেকে ৫-৬ ঘণ্টা হাঁটলে একটা বাজার আছে ওরা ওখানে থেকে রসদ কিনে আনে আর বেঁচে থাকার জন্য ওরা ইয়াক পালন করে। একেকটা ইয়াকের দাম নাকি আড়াই তিন লাখ রুপি আর ইয়াকের দুধের পনির আর ঘী এর দাম এবং চাহিদা নাকি অনেক চড়া। আরও খানিকটা পথ যেতেই একটা ভারতীয় এসএসবি চেক পোষ্ট চোখে পড়লো, সেখানে পৌঁছে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম আর বিস্কিট, খেজুর ও পানি খেলাম। এর মাঝেই সেখানে অস্ট্রেলিয়ান দম্পতি এসে উপস্থিত হলো, আড্ডা চলল আরও কিছুক্ষণ। তারপর আবার পা বাড়ালাম, অস্ট্রেলিয়ান দম্পতি আমাদের ছেড়ে ক্রমশ এগিয়ে গেলো। ওনাদের স্ট্যামিনা অনেক, এই বয়সে আমাদের দেশের কোনো মানুষের এরকম এক্সপিডিশন করতে পারে আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558854786812.jpg
*** সাবারগ্রাম থেকে যাত্রা শুরুর পর

দুচোখ দিয়ে অপার সৌন্দর্য  গিলতে গিলতে আমরা সাবারগ্রাম পৌঁছে গেলাম, সেখানের সরকারি ট্রেকার্স হাটে নুডুলস আর বয়েল্ড আন্ডা অর্ডার করলাম। খানিকক্ষণ অপেক্ষার পর আমাদের লাঞ্চ সার্ভ করা হলো, গোগ্রাসে গিলে ফেললাম সব। খাবার শেষে জিজ্ঞাসা করলাম চা পাওয়া যাবে কি, বলল যাবে একটু অপেক্ষা করুন। হাটের বাহিরে চেয়ারে বসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে চা চলে এলো। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ১১৮০০ ফিট উচ্চতাইয় ইয়াকের দুধে তৈরি চা সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

চা খেয়েই পা চালালাম, আকাশটাও বুজে আসতে শুরু করলো। কপালে মনেহয় খারাপি আছে তাই পায়ে জোর লাগালাম। আগের রাতে রেডিওতে নাকি বলেছে আজ ভারী বর্ষণ হবে, সাইক্লোন ফনীর কারনে নাকি পশ্চিমবঙ্গে হাই এলার্ট জারি করা হয়েছে, বেশ কয়েকটি রুটে নাকি ট্রেন চলাচল বাতিল করা হয়েছে। বেশি দূর এগোতে পারলাম না, বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। হাঁটা বন্ধ হলোনা, পঞ্চো গায়ে চড়িয়ে হাঁটা অব্যাহত রাখলাম।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/26/1558855344457.jpg
*** ফালুটের সামান্য আগে, পিছনে দূর পাহাড়ের চূড়ায় ফালুট ট্রেকার্স হাট

সন্ধ্যার বেশ খানিকক্ষণ আগে ফালুট পৌঁছে গেলাম। ফালুটে একটা মাত্র ট্রেকার্স হাট তাই আগে থেকে বুকিং দিয়ে না গেলে এখানে যায়গা পাওয়া বেশ কঠিন। যথারীতি গাইডকে আগেই ছেড়ে দিয়েছিলাম রুম ঠিক করার জন্য তাই রক্ষে। রুমে ঢুকে লাগেজ রেখে ফ্রেশ হলাম। রাতে ডিনার টেবিলে অস্ট্রেলিয়ান, ফ্রেঞ্চ-স্প্যানিশ জুটির সাথে দীর্ঘক্ষণ আড্ডা হলো। অস্ট্রেলিয়ার সার্বিক অবস্থা, ফ্রান্সের ইয়েলো শার্টের তান্ডব, বাংলাদেশ এবং ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা কিছুই বাদ থাকলো না। রাত যত বাড়তে থাকলো বৃষ্টি তত বাড়তে থাকলো। দেশে থাকতেই প্লান করে গিয়েছিলাম ফালুট ভিউ পয়েন্টে বাংলাদেশের পতাকা হাতে নিয়ে এবং ফ্ল্যাগ ব্র্যান্ডেড টিশার্ট গায়ে দিয়ে কাঞ্চনজঙ্গাকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে একটা ছবি তুলবো। সেই ইচ্ছে কে পাথর চাপা দিয়ে আন্ডা কারি দিয়ে ভাত খেয়ে ১ কম্বল ২ লেপের নিচে চলে গেলাম। শুয়ে শুয়ে হাটের টিনের চালে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ শুনতে থাকলাম, আর মনে মনে দোয়া করতে থাকলাম সকালে উঠে যেন ঝকঝকে আকাশ পাই। ফালুটের উচ্চতা ১১৮১১ ফিট আর এখান থেকেই হিমালয়ের সবচেয়ে ভাল ভিউ পাওয়া যায়। রাতে ঘুমুতে যাবার আগে ধারনাও করতে পারলাম না পরদিন আমাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে বা পরের দিনের সিঙ্গালিলা ফরেস্ট ট্রেকই হতে যাচ্ছে আমাদের ট্রেকের সবচেয়ে অ্যাডভেঞ্চারাস অংশ।

আরও পড়ুন: মেঘের ভেলায় ভেসে সান্দাকফু-ফালুট

 

****আগামী পর্বে সমাপ্য

আপনার মতামত লিখুন :

বৌদ্ধ আর হিন্দু দেবতাদের নিষিদ্ধ মিশ্রণ

বৌদ্ধ আর হিন্দু দেবতাদের নিষিদ্ধ মিশ্রণ
সালা কাও খু: ভাস্কর্যের বাগান

থাইল্যান্ডের উত্তরের ছোট প্রাদেশিক শহর নং খাই। প্রতিবেশী দেশ লাওসের সঙ্গে সীমান্ত এই শহরের। যাদের ভাগ করেছে মেকং নদী।

শনিবার সকালে ঘুম ভাঙলো দেরিতে। লাওস থেকে আমাদের বন্ধু পাতিতিন এসেছেন আমাদের সঙ্গে দেখা করতে। নদীর ওপারেই লাওসের রাজধানী ভিয়েনতিয়েন। নিজের সাইকেল নিয়েই চলে এসেছে এখানে৷ নং খাই কানালায়ায়েউই ওয়াক্লেহংয়ের চেয়েও ভালো চেনেন পাতিতিন। ও হ্যা, পাতিতিনের ডাক নাম কং আর কানালায়ায়েউইয়ের ডাক নাম পে।

আগের সন্ধ্যায় মেকংয়ের তীরের সান্ধ্যকালীন বাজার দেখা হয়েছে আর নদী তীরে রাতভর আড্ডা। তাই শনিবারে ঠিক করলাম সাইক্লিং করব আর দেখতে যাবো সালা কাও খু।
https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/14/1563121703721.jpg
এই শহর খুব ছিমছাম। মানুষের তুলনায় প্যাগোডার সংখ্যা অনেক অনেক বেশি। আর ড্রাগনের যে প্রভাব রয়েছে, সেটা রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট থেকে শুরু করে যেকোন স্থাপনার দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। প্রায় ৫ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে পৌছালাম সালা কাও খু'তে। সূর্য যেন আজ সকাল থেকেই আগুন ঢেলে যাচ্ছে। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল বুদ্ধের দাঁড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ মূর্তি৷ আর সাপের সাতটি ফনা৷

সালা কাও খু'তে ঢুকতে গুণতে হলো ১০০ টাকার টিকিট। এরপর যেন অভিভূত হওয়ার পালা৷ এখানকার ভাস্কর্যগুলো রহস্য ছড়ানো। কারণ এর নির্মাণেই যেন ছড়িয়ে আছে রহস্য। এই সালা কাও খু নির্মাণে সময় লেগেছে ২০ বছরের বেশি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রহস্যে ঘেরা এক সাধু লুয়াং পু বৌন লিউয়া সৌরিরাত এই ভাস্কর্যের বাগান নির্মাণ করেছিলেন গত শতাব্দীর সত্তরের দশকে৷ ১৯৯৬ সালে পরলোকগমন করেন লুয়াং পু। কিন্তু তার সাধনায় নির্মিত বুদ্ধ, শিব, ভিষ্ণু এবং আরো দেব-দেবীর মূর্তিগুলো যেমন অস্বাভাবিক, তেমনি চোখে পড়ার মতও।

শুধু হিন্দু বা বৌদ্ধ ধর্ম নয়, লু পাং অন্যান্য ধর্ম-সংস্কৃতি থেকেও নিয়েছেন উপাদান। যেমন তার শবদেহ চিতায় না দিয়ে তার ইচ্ছেনুযায়ী কবর দিয়ে মাজার বানানো হয়েছে। আর এই মাজারের গঠন একেবারেই প্যাগোডার সঙ্গে যায় না।
https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/14/1563121727097.jpg
এই লুয়াং পু এবং কাও খু নিয়ে বেশ জ্ঞান রয়েছে কংয়ের। সে বললো, লুয়াং পু নিজের জীবনিতে বলেছেন, তিনি শৈশবে একটি গর্তে নিমজ্জিত হয়েছিলেন। যেখানে তার সঙ্গে কাও খু নামে একজন সন্নাসী ভূ-গর্ভের এক রহস্যময় জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাকেও একজন পুরোহিতে রূপান্তরিত করেন। পরে ভিয়েতনামে এক যোগীর কাছে হিন্দু ধর্মের দীক্ষাও নেন তিনি। বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের মিশ্রণ করে নতুন এক মৌলিক ধর্মীয় ধারণার উদ্ভব ঘটান লুয়াং পু। মেকং নদীর তীরের আশপাশে তার অনুসারি বাড়তে থাকে হু হু করে। এমনকি এই কাও খু’র ভাস্কর্যের বাগান প্রকল্পও করার কথা ছিল লাওসে। তবে ১৯৭৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টি লাওস নিয়ন্ত্রণে নিলে সেখান থেকে সরে থাইল্যান্ডের নং খাইতে চলে আসেন তিনি।

এখানে ভাস্কর্যগুলোর পাশ দিয়ে হাঁটলে ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় আবেশ পাওয়া যাবে না। বরং কিছুটা অদ্ভুত আর রহস্যঘেরা যেন সব কিছু। এখানে প্রথমে ঢুকলেই একজন সর্পদেবী রয়েছেন। তার পেছনেই এক ঝাঁক কুকুরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে হাতি। ভাস্কর্যগুলো নিখুঁত৷ গড়নে রয়েছে শিল্পের ছোঁয়া৷

এখানে আরেকটি বড় ভাস্কর্য আমাদের মতো অনেককেই ভাবাচ্ছে। একটি কুকুর মাঝখানে। তার পেছনে একটি সাপ ফনা তুলে রয়েছে। আর অপর পার্শ্বে ধনুক হাতে তরুণ। এই ভাস্কর্যে তিনটি চরিত্র কে কাকে রক্ষা করছে বা মারতে চাচ্ছে সেটি বোঝার উপায় নেই। থাই ভাষায় লেখা রয়েছে বর্ণনা। পে সেটি পড়ে আমাদের জানালো, এটাই হচ্ছে দৃস্টিভঙ্গি। আসলে তুমি যেটা বিশ্বাস করতে চাও সেটাই দেখতে পাবে৷
https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/14/1563121750262.jpg
এখানে দুটি মাঝারি ধরনের পুকুর রয়েছে। পুকুরে মাগুর মাছের ঝাঁক। দেখে মনে হয় এক-একটি মাছের ওজন ৫ থেকে ১০ কেজির কম হবে না। দর্শনার্থীরা অনেকেই পাউরুটি ছুড়ে দিচ্ছেন আর এক গালেই পুরে নিচ্ছে মাছগুলো। এই মাছ এবং এখানকার কবুতরগুলোকেও পবিত্র আর রহস্যঘেরা বলে বিশ্বাস করেন অনুসারীরা।

সেখানে কিছুক্ষণ বসে থেকে আমরা হেঁটে হেঁটে ভাস্কর্যগুলোর রহস্য উন্মোচনের ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। এখানে সবচেয়ে উঁচু ভাস্করর্যটি ২৫ মিটার। যেটাতে একটি কালসাপের বুক বরাবর বসে আছেন বুদ্ধ আর সাপটির মাথা ৭টি।

এখানকার ভাস্কর্য আর মূর্তিগুলো দেখে সহজেই অনুমান করা যায়, সাপ ভালোবাসতেন লুয়াং পু। কং বলেন, তিনি বিশ্বাস করতেন, ভবিষ্যত সময় সাপের। সাপের কোন হাত পা নেই পৃথিবী ধ্বংস করার মতো। তাই এটি এক পবিত্র প্রাণী। তিনি নিজেকেও অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক সাপ বলে ভাবতেন।
https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/14/1563121778711.jpg
লুয়াং পু'র অনুসারীরা এই ভাস্কর্যের বাগানটি তৈরি করেছেন তার সন্ন্যাসী কাও খু'র স্মরণে। লুয়াং পু তার জীবনীতে বলেছেন, তার অনুসারীরা কেউ ভাস্কর নয়, তবে সবাই হৃদয়ের ভালোবাসা দিয়ে এই ভাস্কর্যগুলো বানিয়েছেন৷

১৯৯৬ সালে লুয়াং পু'র মৃত্যু হলে তার অনুসারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। কিন্তু পরের বছরই লুয়াং পু'র এই সর্পকেন্দ্রিক দেবতা প্রার্থনা নিষিদ্ধ করে নং খাইয়ের স্থানীয় সরকার।

এখানে হাঁটার সময় হঠাৎ করেই যেন হিম হয়ে আসে শরীর। মনে হয় যেন কোন অশরীরি আত্মা ঘোরাফেরা করছে৷ লুয়াং পু'র সাপের ভাস্কর্যগুলো কেমন যেন রহস্যময় হাসি দিয়ে রেখেছে।

দুপুরের রোদে আমাদের যেন কাহিল দশা। মেকংয়ের তীর ধরে হোটেলে ফিরতে আবার ৫ কিলোমিটার সাইক্লিংয়ের কথা ভাবতেই লুয়াং পু'র রহস্য মাথা থেকে উবে গেল!

নিকলী হাওর নৌভ্রমণ

নিকলী হাওর নৌভ্রমণ
নিকলী হাওরের মাঝ থেকে দূরনদীতে নৌকা চলাচল

নাস্তা সেরে ইকো রিসোর্ট থেকে আমাদের বের হওয়ার কথা সকাল আটটায়। আগেভাগেই উঠে পড়লাম। কারণ আজ হাওর দর্শনে যাওয়ার কথা। হাওর এক দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি। নদীবাহিত বিস্তীর্ণ চরাচর ভরবর্ষায় পাহাড়ি ঢলের পানিতে ফুলফেঁপে এক অপরূপ রূপ ধারণ করে। যাদের সমুদ্র দেখার ফুরসত মেলেনি, তাদের জন্য হাওরে যাওয়া এক আকর্ষণ। আমাদের ভ্রমণদলের সবাই সমুদ্রদর্শনের সৌভাগ্য অর্জন করলেও হাওর দেখেনি। আমাদের কাছেও হাওরের আকর্ষণ কম নয়। কিন্তু, একি! জানালার পর্দা সরিয়ে দেখি গাছগাছালির ওপর বৃষ্টি পড়ছে। গাছের ফাঁক দিয়ে দিগন্তবিস্তৃত মাঠে যতদূর চোখ যায়, টিপটিপ বৃষ্টির ধোঁয়াশা। বাতাসও আছে। আজ হাওরে নৌভ্রমণ হবে কিনা তা নিয়ে দ্বন্দ্বের মধ্যেই নিচে নেমে নাস্তা সেরে নিলাম। ভ্রমণ তালিকা থেকে হাওরে নৌকায় ঘোরাঘুরি যদি বাদ হয়, তাহলে ঢিলেঢালাভাবে বের হলেও ক্ষতি নেই। তবে সবাই অনড়—হাওরে নামা হোক বা না হোক অবশ্যই যেতে নিকলীর হাওরপাড়ে। নয়টায় সবাইকে নিয়ে আমাদের রিজার্ভ মাইক্রোবাসের ড্রাইভার কটিয়াদী-কিশোরগঞ্জ সড়কে উঠে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল।

হাওর ও গ্রামপর্যটন বিস্তারে জালালপুর ইকো রিসোর্ট

সময় এলো গুগল চাচার সহায়তা নেওয়ার। এই এক আশ্চর্য পদ্ধতি, যাকে বারবার জিজ্ঞেস করে জেনে নিতে হয় নিজের হদিস—আমি এখন পৃথিবী নামের এই গ্রহটির ঠিক কোন জায়গায় আছি, গন্তব্যেই বা যাব কিভাবে? গুগল কটিয়াদী থেকে নিকলী যাওয়ার দুটি অপশন দেখাল। একটিতে পৌনে একঘণ্টা, আরেকটিতে একঘণ্টা। কোন রাস্তার অবস্থা ভালো তা কিন্তু গুগল দেখাতে পারল না, রাস্তায় জট আছে কিনা তা ভালোই দেখাল। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, সড়ক ধরে কিশোরগঞ্জের দিকে এগিয়ে কালিয়াচাপড়া চিনিকল পার হয়ে ডানের পথ ধরব। এই বৃষ্টি বাদলার মধ্যে গ্রামের সরু রাস্তায় বড় গাড়ি ঢোকানো ঠিক হবে না।

কটিয়াদি-কিশোরগঞ্জ সড়কের পুলের ঘাট থেকে ডান দিকে নিকলীর রাস্তা। এই সড়ক গচিয়াহাটা হয়ে চলে গেছে নিকলী। যাওয়ার পথে বনগ্রাম ও গচিয়াহাটায় মাছের পোনার বাজার দেখে উল্লসিত হলাম। গাড়ি ছুটে চলল নিকলী। এরই মধ্যে একটি দৈনিকে কর্মরত এক সিনিয়র সাংবাদিক, আমার সাবেক সহকর্মীর ফোন। ফেসবুকের কল্যাণে তাঁর কাছে খবর পৌঁছেছে আমরা নিকলীতে হাওর ভ্রমণে যাচ্ছি। অনুজপ্রতিম সাংবাদিক ফোনে বলল, ‘ভাই, নিকলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার আমার স্ত্রী। কোনো সমস্যা হলে ফোন দিয়েন’। জিজ্ঞেস করলাম, নিকলী হাওর ভ্রমণে প্রশাসনের সহযোগিতার কোনো প্রয়োজন আছে কিনা। জবাব এলো, ‘তা নেই, তবে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশাসনের সহায়তা যদি লাগে’। নম্বরগুলো টুকে রেখে দিলাম।

আঁকাবাঁকা রাস্তা গ্রামের পর গ্রাম পেরিয়ে চলে গেছে। নিকলী পৌঁছার বেশ কয়েক কিলোমিটার আগে থেকেই হাওরের আমেজ চোখ জুড়িয়ে দিল। রাস্তার দু’পাশেই জলরাশির দিগন্তবিস্তার। পানির মধ্যে ছোপ ছোপ গ্রাম। আমরা বিশাল জলরাশি দেখে বারবারই উল্লসিত হয়ে পড়ছি ‘নিকলী হাওরে এসে গেছি, এসে গেছি’ বলে। গাইড ডালিয়া হোসেন অভিজ্ঞ। আমাদের শান্ত করছেন নিকলী আরো সামনে। রাস্তার দু’পাশের জলরাশির সঙ্গে মিতালী করতে করতেই একসময় একটি বেড়িবাঁধের ওপর দিয়ে গাড়ি চলতে শুরু করল। বাঁয়ে সমতল আর ডানে তুমুল জলরাশি। কিছুক্ষণ পর নিকলী হাসপাতালসহ নানা স্থাপনার সাইনবোর্ড দৃষ্টিগোচর হলো। বাঁধের নিচে হাওরের পানিতে গ্রামের মেয়েরা সারবেঁধে পাটের আঁশ ছড়াতে বসেছে। পুরুষরা হাওরে মাছ ধরে তীরে এসে নৌকা ভিড়িয়েছে। আমরা একই পথে হাসপাতাল মোড়ের দোকানপাট-হোটেল পেরিয়ে বাঁধের মাথায় পৌঁছালাম। সারি সারি পর্যটন নৌকা বাঁধা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/12/1562920693628.jpg
পর্যটকদের জন্য অপেক্ষমাণ ট্যুরিস্ট বোট

 

হাওরের ঘাটে গাড়ি থেকে নেমেই আমাদের সবার চক্ষু ছানাবড়া। সামনে দিগন্তছোঁয়া পানি। বিশাল জলরাশির মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সবুজ গ্রাম চোখে পড়ে। দূরে আষাঢ়ের মেঘের পেছনে নীল আকাশ পানির সঙ্গে মিতালী করেছে। নিরন্তর বাতাস বইছে। হাওরের পানি ছুঁয়ে আসা শীতল বাতাস প্রাণমন জুড়িয়ে দেয়। বাতাসের তোড় খুব বেশি নয় আর হাওরেরও পানি বেশি নয় বলে পানিতে ঢেউয়ে খুব উত্তাল নয়। যতটুকু আছে তা এক কুল কুল শব্দ করে আছড়ে পড়ে বাঁধের কিনারে।

ঘাটে ইকো রিসোর্টের নিয়মিত মাঝি ফারুক হাজির। আমাদের আসার পথে বৃষ্টি থেমে যাওয়ায় ফারুক মাঝিকে আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাই সে নৌকাঘাটে উপস্থিত। গাড়িতে নামতেই হাত বাড়িয়ে পরিচিত হয়ে তার নৌকায় নিয়ে গেল। মাঝি না বলে ফারুককে নৌকার মালিক বলা যেতে পারে। আরো দুজন মাঝি আছে নৌকায়। আমি মাঝির পাশের দোকানে লাইফ জ্যাকেট খোঁজ করে পেলাম না। মাঝিরা জানাল, পর্যটকরাই নিয়ে আসে এই জীবনতরী। তবে হাওরে নৌকাডুবির ভয় তেমন নেই বলেও অভয় দিল।

শহুরের গ্রাম দরশন

বিলম্ব না করে আমাদের ভ্রমণ দলের সবাই নৌকার ছাদে উঠে গেল। ইঞ্জিনচালিত নৌকার ছাদেই বেশিরভাগ মানুষ বসে। রোদ-বৃষ্টির সময় নিচের পাটাতনেও বসে, সেখানে ঢুকতে হলে হামাগুড়ি দিয়ে মাথা নিচু করে যেতে হয়। নৌকা হাওরের পানি পেরিয়ে ঘোরাউত্রা নদীর দিকে চলতে শুরু করল। নিকলীর ওপারপাড়ে ছাতিয়ার চর। আমরা নদী পেরিয়ে চরে যেতে চাইলেও মাঝিরা সেদিকে যেতে অনীহা প্রকাশ করল। কারণ অজানা। তারা বলল, ওই চরে সমস্যা আছে, ঘাট নেই, নৌকা চরে আটকে যাবে, যেতে আসতে অনেক সময় চলে যাবে ইত্যাদি। আমরা মূল নদীর তীর দিয়ে নিকলী হাওরের মাঝখানে একটি কাশবনের দ্বীপে গিয়ে পৌঁছালাম। মাঝিরা নেমে বেড়ানোর পীড়াপীড়ি করলেও আমরা নামলাম না। বেশিরভাগ পর্যটকের নাকি কাশবন এক আকর্ষণ বলেও তারা জানাল। দলের কামরুল ভাই, মাঝিরা সময়ক্ষেপণ করার বাহানায় আমাদের কাশবন দ্বীপে নিয়ে এসে নৌকা ভিড়িয়েছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/12/1562920602805.jpg
নৌকার অভ্যন্তর

 

আমরা নদীর পাশ দিয়ে ঘুরে আবার হাওরের ঘাটের দিকে যেতে বললাম। হাওরের চারদিকে যতদূর চোখ যায় পানি আর পানি। মাঝিরা বলল, বর্ষার সময় নদীর পানি ফুলে ফেঁপে হাওর তৈরি হয়। অন্যসময় নদীতেই শুধু পানি থাকে, মাঠে ধানভুট্টার চাষ হয়। তারা বর্ষা মৌসুমে নৌকা চালায়, অন্যসময়ে চাষাবাদ করে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/12/1562920667172.jpg
নৌকার ছাদে বসে হাওর পর্যটন

 

নৌকা চলছে। তবে ইঞ্জিনের শব্দে আনন্দে কিছুটা ভাটা পড়ে। মনে পড়ে ছোটবেলায় পালতোলা নৌকায় কত চড়েছি। কালের বিবর্তনে নৌকার সেই পাল হারিয়ে স্থান নিয়েছে ইঞ্জিন। আমরা কখনো নৌকার নিচের পাটাতনে কখনো টিন দিয়ে তৈরি ছাদে উঠে আড্ডা আলোচনা আর হাওর সৌন্দর্য দেখে সময় পার করছি। ছবি, ভিডিও, সেলফি তোলা সমানে চলছে। আষাঢ়ের ঘনঘটার মধ্যে মেঘের ফাঁকে সূর্য উঁকি দিচ্ছে কখনো কখনো। নিরন্তর গা জুড়িয়ে যাওয়া বাতাসে রোদের মধ্যেও প্রশান্ত দিচ্ছে বলে কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। চারদিকে যতদূর চোখ যায়, জলরাশির বিস্তার। কবি কামরুল হাসান বললেন, পৃথিবী যে গোল এখান থেকেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

ক্ষেতসমুদ্রে সান্ধ্য ভ্রমণআড্ডা

হাওর ভ্রমণের অন্যতম মজা, হাওরতীরের হোটেল থেকে হাওরের তাজা মাছের তরকারি দিয়ে উদরপূর্তি। স্থানীয় মানুষ পর্যটকদের এই আকর্ষণ বুঝতে পেরে হোটেল ব্যবসা খুলেছে। নিকলী হাওরের হাসপাতাল মোড়ে অনেকগুলো খাওয়ার হোটেল। আশি টাকায় যে কোনো একটা মাছের তরকারি আর ভাত, ডাল, সবজি খাওয়া যায়। আমরা সেখানকার সেতু হোটেলটি পছন্দ করলাম। আইড়, পাঁচমিশালী, হুতুম, হাওরের কই মাছের তরকারি লাচ্চু মাছ ভাজা দিয়ে উদরপূর্তি করলাম। আমাদের সঙ্গীরা একেকজন একেক ধরনের মাছের তরকারি পছন্দ করে উদরপূর্তি করে মহাখুশি। দিনের পরবর্তী গন্তব্য কিশোরগঞ্জ শহর। গাড়ি সেদিকে ছুটে চলল।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র