Alexa

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রাষ্ট্রপতির সম্মতি

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রাষ্ট্রপতির সম্মতি

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ

বহুল অলোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সম্মতি জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো: আব্দুল হামিদ। সোমবার (০৮ অক্টোবর) এ সংক্রান্ত ফাইলে স্বাক্ষর করেছেন।

রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব জয়নাল আবেদীন সাংবাদিকদের  এ তথ্য জানিয়েছেন। 

গত ২৬ সেপ্টেম্বর সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করা হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটির খসড়া তৈরির সময়ই এর বিভিন্ন ধারার বিরোধিতা করে আসছিলেন সাংবাদিকরা।

আইনের ৩২ ধারায় অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্ট প্রয়োগ করে সরকারি কোন কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনও ইলেকট্রনিক্স মাধ্যমে সংগ্রহীত তথ্যকে (‘তথ্য পাচারের’) অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই অপরাধ সংঘটন ও সংঘটনে সহায়তা দায়ে ১৪ বছর কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। যদি কেউ একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার সংঘটিত করেন, তাহলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আইনে পুলিশকে বিনা ওয়ারেন্টে তল্লাশি ও গ্রেফতারের পাশাপাশি ক্ষতিকর তথ্য-উপাত্ত ব্লক বা অপসারনের বিধানও রাখা হয়েছে। এছাড়া এই আইনের অধীনে কৃত সব কাজকে দায় মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এমনকি জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিলের মহাপরিচালককে প্রয়োজনবোধে নিজ ক্ষমতা এজেন্সির কোন কর্মচারী এবং অন্যকোন ব্যক্তি বা পুলিশ অফিসারকে অর্পণ করারও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

বিলের ৮ ধারায় বলা হয়েছে, জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিলের মহাপরিচালকের নিজ অধিক্ষেত্রভুক্ত কোন বিষয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোন তথ্য-উপাত্ত ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি সৃষ্টি করলে তিনি উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ, ক্ষেত্রমত ব্লক করার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বা বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারবেন। একইধারায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জন শৃঙ্খলা রক্ষায় মহাপরিচালকের মাধ্যমে একইভাবে তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আইনের এ ধারায় সরকারকে অবহিত করে বিটিআরসিকে তাৎক্ষনিকভাবে প্রাপ্ত অনুরোধ কার্যকরার সক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

বিলে ২১ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোন ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সঙ্গীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনও প্রকার প্রপাগাণ্ডা ও প্রচারণা চালান বা তাতে মদদ দেন, তাহলে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। উক্ত একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার সংঘটিত করেন, তাহলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা তিন কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

২৫ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোন ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোন ডিজিটাল মাধ্যমে (ক) ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে এমন কোন তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক অথবা মিথ্যা বলে জানা থাকা সত্বেও কোন ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্ত বা হেয় প্রতিপন্ন করার অভিপ্রায়ে কোন তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন বা (খ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ন করার বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর বা তদুদ্দেশ্যে অপপ্রচার বা মিথ্যা বলে জানা থাকা সত্ত্বেও কোন তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ বা প্রচার করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে তিনি ৩ বছরের কারাদণ্ডে বা অনধিক ৩ লাখ টাকা অর্থ দণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। উক্ত একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার সংঘটিত করেন, তাহলে ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ২৮ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করার বা উসকানি প্রদানের অভিপ্রায়ে ওয়েবসাইট বা অন্যকোন ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু কিছু প্রকাশ বা প্রচার করেন, যা ধর্মীয় অনুভ’তি বা মূল্যবোধে আঘাত করে তাহলে তিনি ৫ বছরের কারাদন্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার সংঘটিত করেন, তাহলে ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

২৯ ধারায় বলা হয়, যদি কোন ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্যকোন ইলেকট্রনিক বিন্যাসে প্যানাল কোডের ৪৯৯ ধারায় বর্ণিত মানহানিকর কোনও তথ্য প্রচার বা প্রকাশ করেন, তাহলে তিনি ৩ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। তবে একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার সংঘটিত করেন, তাহলে ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

৩১ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যা বিভিন্ন শ্রেণী বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা  সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট বা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বা আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা ঘটানোর উপক্রম হয়, তাহলে তিনি ৭ বছরের কারাদন্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। তবে একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার সংঘটিত করেন, তাহলে ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

৩২ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোন ব্যক্তি (অফিসিয়াল সিক্রেট এ্যাক্ট ১৯২৩-এর আওতাভুক্ত) কোন অপরাধ কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনও ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটন করেন বা করতে সহায়তা করেন তাহলে তিনি ১৪ বছর কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। যদি একই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার সংঘটিত করেন, তাহলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ৪৩ ধারায় বলা পুলিশকে গ্রেফতারী পরোয়ানা ব্যতিরেকে তল্লাশী, মালামাল জব্দ ও গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এক্ষত্রে জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিলের মহাপরিচালকের অনুমোদন ছাড়াই পুলিশ যে কোন স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি করতে পারবে এবং বাধাপ্রাপ্ত হলে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে। কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম ও নেটওয়ার্কসহ অন্যান্য সরঞ্জাম ও দলিলাদি জব্দ ও উক্ত ব্যক্তি গ্রেফতার করতে পারবে। তবে তল্লাশি সম্পন্ন করার পর এ বিষয়ে ট্রাইবুনালকে প্রতিবেদন দিতে হবে।

বিলের ৫৪ ধারায় ট্রাইবুনালের আদেশানুসারে এই আইনের অধীনে কোন অপরাধ সংঘটনে জড়িত কম্পিটার, কম্পিউটার সিস্টেম, ফল্পি ডিস্ক, কম্প্যাক্ট ডিস্ক, টেপ-ড্রাইভ বা অন্য আনুষঙ্গিক উপকরণ বাজেয়াপ্ত হবে। বিলের ৫৫ ধারায় এই আইনের অধীনে সংঘটিত কোন অপরাধের তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে আ লিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিধান রাখা হয়েছে।

আইনে বলা হয়েছে, প্রয়োজন হলে ‘অপরাধ সম্পর্কিত বিষয়ে পারস্পারিক সহায়তা আইন ২০১২-এর বিধানাবলি প্রযোজ্য হবে। আইনের ৫৬ ধারায় জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিলের মহাপরিচালক প্রয়োজনবোধে এই আইনের বলে তার ওপর অর্পিত যে কোন ক্ষমতা বা দায়িত্ব লিখিতভাবে এজেন্সির কোন কর্মচারী এবং অন্যকোন ব্যক্তি বা পুলিশ অফিসারকে অর্পণ করতে পারবেন। এই আইনের অধীনে কৃত সব কাজকে দায় মুক্তি দেওয়া হয়েছে। সরল বিশ্বাসেকৃত কাজকর্ম শিরোনামে বিলের ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, এই আইনের অধীনে দায়িত্ব পালনকালে সরল বিশ্বসে কৃত কোন কাজের ফলে কোন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্থ হলে বা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে, তজ্জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন কর্মচারী বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোন দেওয়ানী বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোন আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ‘রূপকল্প ২০২১: ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনিমার্ণেও লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বোচ্চ নিরাপদ ব্যবহার আবশ্যক। বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে এর সুফলের পাশাপাশি অপপ্রয়োগও বৃদ্ধি পেয়েছে। সাইবার অপরাধের মাত্রাও বাড়ছে। তাই জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ডিজিটাল অপরাধসমুহের প্রতিকার, প্রতিরোধ, দমন, সনাক্তকরাণ, তদন্ত এবং বিচারের উদ্দেশ্য আইন প্রনয়ণ আবশ্যক।

আপনার মতামত লিখুন :