Barta24

শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

‘আয়রনের ছ্যাঁকার ভয়ে আম্মারে কিছু কই নাই’

‘আয়রনের ছ্যাঁকার ভয়ে আম্মারে কিছু কই নাই’
হাসপাতালের বিছানায় গৃহকর্মী লিমা খাতুন/ ছবি: বার্তা২৪.কম
উবায়দুল হক
স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
ময়মনসিংহ


  • Font increase
  • Font Decrease

‘আন্টির বাসায় যাওয়ার পর মাস দুয়েক ভালাই আছিলাম। গত রমজানে বাড়ি আসার কথা কওয়ার পর থেইকাই নির্যাতন শুরু অয় আমার উপরে। বাড়ির নাম নিলেই সমানে পিটাইতো।’

‘আন্টিরে কইছিলাম, আমার বেতন দিয়া দেন আমি বাড়ি যামু গা। এই কথা শোনার পর আমারে আয়রন গরম কইরা ছ্যাঁকা দিছে। আন্টি কইতো, বাড়ির নাম নিবি না আর তর মা’রে বলবি না। আয়রনের ছ্যাঁকার ভয়ে আম্মারে কিছুই কই নাই।’

বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) বিকালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাঁপা-কাঁপা গলায় এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন গৃহকর্ত্রীর অমানুুষিক নির্যাতনের শিকার হওয়া গৃহকর্মী লিমা খাতুন (১৫)।

এ সময় দেখা যায়, তার শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়া, মুখের সামনের পাটির দুটি দাত ভাঙ্গাসহ বেশকিছু ক্ষত চিহ্ন।

লিমার অভিযোগ, রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট কচুক্ষেত এলাকার চৈতালী ১/ডি ব্লকে সাবেক এক সেনা কর্মকর্তার বাসায় গত দুই মাস ধরে চলে এমন নির্যাতন।

লিমা বলেন, ‘তালা দিয়া মাইরা দাঁতও ফালাইয়া দিছে। আন্টি মারার পর তার ছেলে রড দিয়া মারতো। এরপর আরেক কাজের মেয়েরে দিয়া পিটানো হইতো। এমন মাইর কোনো মানুষরে কেউ মারে না। ব্যাথার চুটে যহন বড়ি (ট্যাবলেট) চাইতাম তখন তাও আইন্না দিছে না।’

অভিযুক্ত গৃহকর্ত্রী মীম নিহত সেনা কর্মকর্তা তানভীরের স্ত্রী বলে জানা গেছে। আর নির্যাতিতা লীমা হালুয়াঘাট উপজেলার কৈচাপুর ইউনিয়নের দর্শারপাড় গ্রামের হাবিবুর রহমানের মেয়ে।

লীমার মা লিপি বেগম বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম-কে বলেন, ‘চার মাস আগে মাসিক পাঁচ হাজার টাকা বেতনে কাজের কথা বলে আমাদের পাশের গ্রামের আছিয়া আক্তার ওই বাসায় নিয়ে যায়। গত রমজানে সে বাড়িতে আসতে চাইছিলো কিন্তু পরে আবার না করছে। সে তো আর এইসব মারধরের আমারে বলতো না ভয়ে। আর আমি যেহেতু চিনি না তাই দেখতে যাইতেও পারি নাই। যারা আমার মেয়েরে এই অবস্থা করছে আমি তাগর কঠিন বিচার চাই।’

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/11/1562862943155.jpg

লিপি বেগম জানান, নির্যাতনের পর মেয়ের অবস্থা যখন খুব খারাপ তখন কাউকে কিছু না জানিয়ে মঙ্গলবার (৯ জুলাই) হালুয়াঘাটের একটি বাসে করে মেয়েকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয় তারা। বাড়িতে আসার পর মেয়েকে এই অবস্থা দেখে বুধবার (১০ জুলাই) প্রথমে হালুয়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে রাতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২০ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হয়।

প্রতিবেশী আছিয়া আক্তার বলেন, ‘আমি ঢাকায় বিভিন্ন বাসায় কাজের মেয়ে দেই। মীম ম্যাডামের মাকেও আমি কয়েকবার কাজের মেয়ে দিছি। এর বিনিময়ে আমি টাকা পাই। মীম ম্যাডামের মা বলার কারণে তার মেয়ের বাসার জন্য আমি লিমারে ওই বাসায় দিয়া আইছি। এরপর তাকে আমি কয়েকবার দেখতে চাইলেও ম্যাডাম বলতো আমি কুমিল্লা আছি, এইখানে-সেইখানে আছি। এইসব বলায় যাওয়া হয় নাই। এখন এই অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি শুইনা তারে দেখবার আইছি।’

মমেক হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক শামীম ফয়সাল কল্লোল জানান, রোগীর মাথায়, মুখে, বুকে, পায়ে আঘাত রয়েছে। কিছু আঘাত নতুন আবার কিছু পুরনো। সে মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত। তাকে সব ধরণের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

নির্যাতনের বিষয়ে জানতে গৃহকর্ত্রী মীমের সাথে বেশ কয়েকবার মোবাইলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

হালুয়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিপ্লব কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর নির্যাতিতা কিশোরীর পরিবারের সাথে কথা বলেছি। তারা এখনো কোন অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ দিলে পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আপনার মতামত লিখুন :

বন্যায় ঢিলেঢালা মেজাজে টাঙ্গাইলের কর্মকর্তারা

বন্যায় ঢিলেঢালা মেজাজে টাঙ্গাইলের কর্মকর্তারা
টাঙ্গাইলে বন্যা মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণী সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান/ ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

টাঙ্গাইল থেকে: কর্মকর্তাদের নিজেদের মধ্যে নেই কোনো সমন্বয়। এমনকি জেলায় থেকেও অনেক কর্মকর্তা পরিদর্শনে পর্যন্ত যাননি উপজেলা সদরে। অব্যাহত ভাঙনে কমিউনিটি ক্লিনিক বিলীন হয়ে গেছে নদীগর্ভে। সেই তথ্যও জানা নেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

এমন চিত্রই উঠে এসেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ জেলা টাঙ্গাইলের বন্যা মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণী সভায়।

জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে শনিবার দুপুরে বৈঠকে বসেছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান। তার সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম।

ভূঞাপুরে বন্যার পানির তোড়ে বাঁধ ভেঙে গেছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/20/1563608641746.jpg

সভার সূচনা বক্তব্যে প্রথমেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের কাছে উপমন্ত্রী জানতে চান, ‘বাঁধ ভাঙল কেন?’

তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তা দায়সারা জবাব দিলে তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি উপমন্ত্রী।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. শরিফুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হয়, উপজেলার সবচেয়ে দুর্গত এলাকায় তিনি গিয়েছিলেন কিনা?

কাচুমাচু করে জবাব আসে- ‘না’। জেলা সিভিল সার্জন জানান, বন্যায় জেলার ভূঞাপুরের একটি  কমিউনিটি ক্লিনিক নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

সিভিল সার্জেনের বক্তব্য শুনে উপমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি আগে থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড কিংবা জেলা প্রশাসনকে জানিয়েছিলেন কিনা?’

পানিসম্পদ উপমন্ত্রীর এমন প্রশ্নে বিব্রত সিভিল সার্জনের উত্তর আসে- ‘না’।

আলোচনায় উঠে আসে স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দফতর আর সিভিল সার্জনের দফতরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা।

জেলা কর্মকর্তাদের নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে রশি টানাটানি আর সমন্বয়হীনতার বিষয়টি খোলাসা করেন টাঙ্গাইল-৬ (দেলদুয়ার নাগরপুর) আসনের সংসদ সদস্য আহসানুল ইসলাম টিটু।

তিনি জানান, কর্মকর্তাদের নিজেদের কাজে কোনো সমন্বয় নেই। যার কারণে বন্যার্ত মানুষেরা যেভাবে প্রশাসনের সহযোগিতা পাওয়া দরকার তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র জামিলুর রহমান মিরণ একহাত নেন কর্মকর্তাদের গাফলতি আর সমন্বয়হীনতার প্রতি।

তিনি জানান, প্রতি মাসেই জেলার উন্নয়ন ও সমন্বয় কমিটির সভা হয়। সেখানে সমস্যাগুলো আগাম তুলে ধরা হয়। তবে কর্মকর্তারা তাতে কর্ণপাত করেন না। আজ টাঙ্গাইলবাসী বন্যা আক্রান্ত হয়ে যে দুর্ভোগের কবলে পড়েছে এটাই তার বড় প্রমাণ।

টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভুয়াপুর) আসনের সংসদ সদস্য তানভীর হাসান, টাঙ্গাইল সদর আসনের সংসদ সানোয়ার হোসেন, ঘাটাইলের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান খানসহ সকলের বক্তব্যে উঠে আসে প্রশাসনের সমন্বয়হীনতার কথা।

সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব শাহ কামাল জানান, সবাইকেই নিজ নিজ দায়িত্বের প্রতি সচেতন হতে হবে। একটি বিভাগ আরেকটি বিভাগের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ যদি দুর্গত এলাকায় সময়মতো সুপেয় পানির ব্যবস্থা না করে, নলকূপ স্থাপন না করে-তাহলে ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়বে চাপ বাড়বে হাসপাতালগুলোতে। এতে মরার উপর খাড়ার ঘা তৈরির মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে।

আবার বাঁধ নির্মাণের সঙ্গে গভীর যোগসূত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণের। সময় মতো বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের কাজ হলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে এবং মানুষের আগের মত দুর্ভোগের শিকার হতে হবে না বলে জানান তিনি।

বাঁধ রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে

বাঁধ রক্ষায় স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে
ড. আইনুন নিশাত, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ড. আইনুন নিশাত পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ। তিনি ২০০৯ সালে জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনসহ একাধিক আন্তর্জাতিক জলবায়ু বিষয়ক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

২০১৭ সালে বাংলা একাডেমি তাকে সম্মানসূচক ফেলোশিপ প্রদান করে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সাবেক অধ্যাপক বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ ছাড়াও বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থা ও প্রকল্পে কাজ করেছেন। ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ এর ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োজিত আছেন।

সম্প্রতি দেশের বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম তার মুখোমুখি হয়। আলাপচারিতায় তিনি বন্যা পরিস্থিতির নানা দিক নিয়ে কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন শিমুল সুলতানা।


দেশের বেশকিছু এলাকা এখন পানির নিচে। অন্য এলাকা প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা

আইনুন নিশাত: আমরা কথা বলছি জুলাই মাসের মাঝামাঝির পর অর্থাৎ শ্রাবণ মাসের শুরুর দিকে। এ সময় বৃষ্টিপাত হওয়া, নদ-নদীর পানি বাড়া ও নদীর পানি বেড়ে দুই কূল উপচে প্লাবনভূমিতে পানি ঢোকাও খুব স্বাভাবিক। আজ থেকে ৩০, ৪০, ৫০ বছর আগে দেশের এক ভাগ এলাকা এই সময় পানির তলায়ই থাকত।

একটা এলাকা কতটা পানির তলায় থাকবে তার একটা স্বাভাবিক মাত্রা আছে। যেমন সুনামগঞ্জের তাহিরপুর বা জামালগঞ্জে হাওরাঞ্চলে এখন ১৫/২০ ফুট পানি থাকা খুবই স্বাভাবিক। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেখলে দেখা যাবে, এখন ওই এলাকা পুরো পানিতে ডুবে আছে।

বলা হলো, লোকজন পানিবন্দী, কথাটা একেবারে বেঠিক। কারণ ওই এলাকায় কী উচ্চতায় পানি আসবে, সেটা জেনেই জমির ব্যবহার করা হয়, অর্থাৎ হাওরে বর্ষাকালে কোনো ধান লাগানো হয় না এবং একটা উঁচু ঢিবির উপরে গ্রামটা বানানো হয়। গ্রামে কি পানি উঠেছে? উঠানে কি পানি উঠেছে? উত্তর হচ্ছে না। কাজেই মাঠে ধান নেই, বাড়ির উঠানে পানি ওঠেনি, তাহলে তো ওই এলাকার লোকজন এটাকে স্বাভাবিক বলেই জানে।

ফরিদপুর বা গোপালগঞ্জ এলাকা আরো ৫০/৬০ বছর আগে বর্ষায় ডুবে যেত। যে জমিতে পাট আছে, আউশ ধান আছে, তা তিন/চার দিন পানিতে ডুবে থাকলেও তেমন ক্ষতি হতো না। গ্রামগুলো ঢিবির উপরে ছিল। কিন্তু পরে আমরা কৃষিতে উৎপাদন বাড়াতে দেশীয় প্রজাতির ধানের পরিবর্তে উচ্চ ফলনশীল ধান লাগানোর জন্য নদীগুলোতে বাঁধ দিলাম। যাতে নদীর পানি ভেতরে ঢুকতে না পারে। এটা করে আমরা প্লাবনভূমিগুলো শুকনা বানিয়ে ফেললাম। এ কাজটি হয়েছে ৬০, ৭০, ৮০’র দশকে এবং এখন্ও হচ্ছে।

বিপদসীমার ওপরে পানি। বন্যা প্রতিরোধে বাঁধগুলোর ভূমিকা 

আইনুন নিশাত: দেশের শতকরা ৭০-৮০ ভাগ এলাকাতে বন্যা নিয়ন্ত্রণকারী বাঁধ হয়েছে অথবা রাস্তা তৈরি হয়েছে, যেটার কারণে পানি নদী থেকে আর ভেতরে ঢোকে না, প্লাবনভূমিগুলো আর ডোবে না। এভাবে আস্তে আস্বে আমরা প্লাবনভূমিতে পানি আসার কথা ভুলে গেলাম। উঁচুতে বাড়ি না করে সমতলেই বাড়ি করা শুরু করলাম। অর্থাৎ আমরা মানুষকে একটা নিরাপত্তা দিলাম। যে লোকগুলো ওই নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে আছে, যেমন চরাঞ্চলের বাড়ি ডুববে, উঠান ডুববে এটাই স্বাভাবিক।

বিপদসীমা এটাতো একটা আরবিটরারি টার্ম। নদীর পাড় উপচে যেখানে বাঁধ আছে সেখানে বাঁধের ওপর থেকে তিন চার ফুট নিচ পর্যন্ত বলা হয় বিপদসীমা। অর্থাৎ বাঁধটি না থাকলে জমিতে কিন্তু তিন-পাঁচ ফুট পানি থাকত, আর স্বাভাবিকভাবেই বিপদসীমা ছুঁইছুঁই হলেই চরটা ডুবে যাওয়ার কথা। চরে উঁচু করে যারা বাড়ি বানিয়েছে, তারা নিরাপদ। আর বাঁধের ভেতরে যারা আছে তাদের নিরাপত্তা নির্ভর করছে বাঁধের স্থায়ীত্বের ওপর। এখন নির্মাণের ত্রুটির কারণে, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে যদি বাঁধের ক্ষতি হয়, তবে তো বন্যা হবেই। তাই এটাকে আমি প্রাকৃতিক বন্যা বলব না, বলব মানবসৃষ্ট বন্যা। কারণ, নদীতে যে পরিমাণ পানি থাকার কথা সেটা স্বাভাবিকভাবেই আছে। যেমন যমুনার আরিচায় পানি এখন বিপদসীমার সামান্য ওপরে। এটা এ সময়ে খুবই স্বাভাবিক। এখানে সেপ্টেম্বরে তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত পানি বিপদসীমার ওপরে থাকতে পারে। কাজেই কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া নদী খুব স্বাভাবিক আচরণই করছে। এ বছর খুব খারাপ অবস্থা গেছে ডালিয়া জুড়ে।

জুন মাসের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত যে কোনো সময় পানি বাড়তে পারে। কিন্তু বাড়লে আবার খুব দ্রুত নেমেও যায়। এখন আরিচার পানি জুলাইয়ের ৫/৬ তারিখ বিপদসীমার নিচে ছিল। আস্তে আস্তে এটা বাড়ছে। আরো ৫/৬ দিন বাড়বে। কারণ যমুনা দিয়ে ভারত থেকে যে পানিটা আসছে সেটা নেমে যাচ্ছে। কয়েকদিন পর চাঁদপুরে পানি বাড়বে।
বন্যা পূর্বাভাস বুঝতে হবে। কৃষির জন্য পূর্বাভাস কাজে আসবে না। কারণ ধান লাগিয়ে ফেললে তো ডুবে যাবে। কিন্ত যেখানে বাঁধ আছে, বাঁধের ভেতরে লোকদের নিরাপদ থাকার কথা।

https:
তিস্তার রুদ্র মূর্তি দেখছেন স্থানীয় জনগণ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

 

চট্টগ্রামে পানি বেড়েছে, ঢাকায়ও বন্যা হতে পারে

আইনুন নিশাত: এখন টট্টগ্রাম শহরের অবস্থা খুব খারাপ। ঢাকাতে কয়েকদিনের মধ্যেই পানি চলে আসতে পারে। এখন ডেমরা এলাকায় পানি বিপদসীমার নিচে থাকলেও আস্তে আস্তে বাড়ছে। আগামী ১০ দিন পানি বাড়বে। আগামী ২৫/২৬ তারিখ নাগাদ পানি বিপদসীমা অতিক্রম করবে। পানি বাড়লেও শহরের পশ্চিমাংশ (আশুলিয়া হয়ে মিরপুর, কল্যাণপুর, মিডফোর্ড, বুড়িগঙ্গা ১ নম্বর সেতু, মেয়র হানিফ সেতু, সায়দাবাদ, বিশ্বরোড, মালিবাগ, এয়ারপোর্ট) সুরক্ষিত থাকার কথা। বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের থেকে ঢাকা সুরক্ষিত। এ বাঁধটি না থাকলে হয়ত পল্লবী, আদাবার আজ পানির নিচে থাকত। ঢাকার পূর্ব দিকে কোনো প্রকেটশন নেই। দক্ষিণের বালু নদীর আশপাশের এলাকা প্লাবিত হবে এবং এর জন্য গ্রামের লোকও প্রস্তুত। ওই এলাকায় আর সাতদিন পরে স্বাভাবিকভাবেই অনেক পানি আসবে।

1
ড. আইনুন নিশাত, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

 

দক্ষিণ ডিএনডি এলাকা সংরক্ষিত। সেখানে বাইরে থেকে পানি আসে না। সমস্যা হচ্ছে সংরক্ষিত এলাকার ভেতরের পানি বের করার ব্যবস্থা নেই। ভেতরের বৃষ্টির পানি বের করে দেওয়ার পাম্প (গোড়ান, কল্যাণপুর, নারিন্দা, কমলাপুর, হাতিরঝিলের পাম্প) স্টেশনগুলো কাজ করছে না।
৪/৫ দিন আগে আষাঢ়ে পূর্ণিমা ছিল। সে সময় সমুদ্রের ভরা কটাল অনেক উঁচুতে ছিল। সেই সঙ্গে নিম্নচাপ থাকায় পানি ফুলে উঠেছিল। ওদিকে চট্টগ্রামের পাহাড় অঞ্চলেও প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পানি নামতে পারেনি কারণ নদীও ভরাট। সমাধান হচ্ছে কর্ণফূলী ঘেঁষে নদীর বাঁধ বানাতে হবে, খালগুলোর মুখে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। অর্থাৎ ভেতরের পানি বের করার জন্য রেগুলেটর লাগবে আর বাইরের পানি যাতে না ঢুকতে পারে সেজন্য বাঁধ বানাতে হবে।

1
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফোরকাস্টে তিস্তার কাউনিয়া পয়েন্টে পানির উচ্চতার গ্রাফ

 

নদীগুলোর নাব্যতা কমার কারণ

আইনুন নিশাত: বাংলাদেশ বন্যার দেশ। হাজার বছর ধরে বন্যার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা নদীর দিকে গত ৫০/৬০ বছরে কোনো নজর দেইনি, যত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণ করিনি। ফলে নদীগুলো অনেক প্রশস্ত হয়ে গেছে। যেমন হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এলাকায় নদী ১.৮ কিলোমিটার প্রশস্ত। কিন্তু আরেকটু ভাটিতে এলে ৬ কি.মি.। কাজেই নদীগুলোর দিকে নজর দিতে হবে যাতে তার গভীরতা বাড়ে। ড্রেজিং করে গভীরতা বাড়বে না। কারণ উজান থেকে পলি আসবে। ড্রেজিং করলে দুই বছরের মধ্যে ভরাট হয়ে যাবে। আমার ধারণা ইতোমধ্যেই সরকার কয়েক হাজার কোটি টাকা ড্রেজিংয়ের পেছনে ঢেলেছে। কারিগরি বিশেষজ্ঞরা সেডিমেন্ট মুভমেন্টের বিষয়টি মাথায় না রেখেই ড্রেজিংয়ের পরামর্শ দিচ্ছেন। ড্রেজিংয়ের সঙ্গে যদি নদী শাসনকে সম্পৃক্ত করে নদীর পলি পরিবহন ক্ষমতা বিবেচনায় না আনা হয়, তবে ড্রেজিংয়ের পেছনে হাজার কোটি টাকা প্রতি বছর খরচ করেও কোনো লাভ হবে না।

https:
ছবিতে দেখা যাচ্ছে, কেমন ঘর হলে বন্যায় সমস্যা হবে না



বাঁধগুলো রক্ষণাবেক্ষণ

আইনুন নিশাত: এ কাজে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাজে লাগাতে হবে। বড় সংস্কার লাগলে পানি উন্নয়ন বোর্ড করবে। আর বন্যা পূর্বাভাসটা ঠিক মতো বুঝতে হবে।

বাঁধকে যদি রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করতে পারলে ভালো। টঙ্গী-আশুলিয়া-মিরপুর বাঁধ রাস্তা হিসেবে চমৎকার কাজ করছে। তারপরও চরম অবস্থা আসতেই পারে, যেমন তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে এবার কয়েক ঘণ্টার জন্য পানির স্তর সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়েছে, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জের নদীগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। সেখানকার পানির সীমারেখা বারবার আগের সীমা অতিক্রম করছে, কারণ অববাহিকাগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। অববাহিকার পানি ধারণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে।

1
কুড়িগ্রামে বন্যা কবলিত এলাকা, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

 

জনগণের করণীয়

আইনুন নিশাত: আমাদের এখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অত্যন্ত আপডেটেড বন্যা পূর্বাভাস আছে। সে অনুযায়ী প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা নিলেই হবে। বাঁধের বাইরে যারা আছেন, যাদের জন্য কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই, তাদের এলাকা পানিতে ডুববেই। সেজন্য সেভাবে তাদের ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থাৎ জুলাই মাসে তাদের ধান লাগানো উচিত না। বর্ষার পানি নেমে গেলে ধান লাগাবেন। পাট লাগানোর কথা চিন্তা করতে পারেন ওই সময়।

এ ক্ষেত্রে সরকারের করণীয়

আইনুন নিশাত: বন্যা ব্যবস্থাপনা থেকে আমাদের নজর সরে গেছে। আর এখন একটা হুজুগ হচ্ছে, কোনো জায়গায় পানি উঠলেই সরকারকে দোষারোপ করা যে ত্রাণ দিচ্ছে না। আমি আবারও বলছি, কোন জায়গায় কী ধরনের পানি হতে পারে এটা আমরা জানি, তাহলে সে অনুযায়ী আমাদের প্রস্তুতি থাকবে না কেন? সরকার, মন্ত্রী-এমপি ও আমলারা ত্রাণ দিতে পছন্দ করেন। আমি মনে করি, তাদেরই ত্রাণ দেওয়া উচিত, যারা প্রকৃত দাবিদার, বৃদ্ধ, অনাথ, বিধবাদের দেওয়া উচিত। বন্যার সময় একটা অসুবিধা হয়, ওই এলাকায় স্বাভাবিক আয়ের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, শ্রমের চাহিদা কমে যায়, কাজকর্ম থাকে না। কাজেই আমাদের যে অতি উন্নত মানের ব্যবস্থাপনা যেটা ৬০ বা ৭০’র দশক থেকে আস্তে আস্তে গড়ে তোলা হয়েছে, সেটা কার্যকর করার জন্য কোথায় কী অবস্থা হতে পারে স্থানীয়দের সেটা জানিয়ে আগে থেকেই তাদের প্রস্তুতিটা বাড়ানো যেতে পারে।

ঢাকা শহরে ৩০-৪০ মিলি মিটার বৃষ্টি হলেই অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতেও যাতে সমস্যা না হয় সেভাবে ঢাকা শহরের নকশা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

1
পানি বেড়েছে আরিচা পয়েন্টে, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম



প্লাবনভূমিতে জনবসতি

আইনুন নিশাত: আসলে জনসংখ্যা বেড়েছে। আগে প্লাবনভূমিতে কেউ বসবাস করত না, স্বাভাবিক বন্যার পানি থাকত এবং এ পানি তো প্রকৃতির জন্য ভালো, মাছের জন্য ভালো, পাখির জন্য ভালো, জলজ উদ্ভিদের জন্য ভালো। ইকোসিস্টেমের জন্য তো এটা প্রয়োজন।

বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

আইনুন নিশাত: আপনাকেও ধন্যবাদ।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র