Alexa

‘শব্দে জব্দ নারী’

‘শব্দে জব্দ নারী’

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে একশনএইড বাংলাদেশ আয়োজিত ‘শব্দে জব্দ নারী’ অনুষ্ঠান

ঘরে-বাইরে অবমাননাকর শব্দের ব্যবহার নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করছে। এতে নারীর মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি এখনও প্রশ্নের মুখে। ভাষার ব্যবহারে সংবেদনশীলতা না আসলে নারীর ক্ষমতায়ন আসবে না।

বুধবার (৬ মার্চ) বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে একশনএইড বাংলাদেশ আয়োজিত ‘শব্দে জব্দ নারী’ অনুষ্ঠানে এমন কথা উঠে আসে।

আলোচনা অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘শব্দে জব্দ নারী’ বিষয়ে একটি ধারণাপত্র তুলে ধরেন একশনএইড বাংলাদেশ-এর ম্যানেজার কাশফিয়া ফিরোজ। যেখানে একশনএইড বাংলাদেশ-এর ‘সেইফ সিটিজ ফর উইমেন’ ক্যাম্পেইনের একটি গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়।

গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের শতকরা ৮৮জন নারী রাস্তায় চলার পথে অপমানজনক মন্তব্যের মুখোমুখি হন। এদের মধ্যে ৮৬ শতাংশ চালক ও চালকের সহকারীর দ্বারা এবং শতকরা ৬৯জন দোকানদার এবং বিক্রেতার মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের শিকার হন।

এমন পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করে একশনএইড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, ‘ঘরে-বাইরে প্রথমেই একজন নারীকে ভাষার মাধ্যমে হেয় করা হয়, যাতে সে মানসিক ও সামাজিকভাবে আগাতে না পারে। শব্দ, বাক্য এবং উক্তি-তে কোন লিঙ্গ থাকার কথা না। কিন্তু সেই ভাষাকেই লিঙ্গ অনুযায়ী ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন- অনেক সময় মেয়েদের পরিচয় করিয়ে দিতে মেয়ে মানুষ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। মানুষ হিসেবে পরিচয় করানো হয় না। আমরা বুঝে না বুঝে সবাই-ই ভাষার মাধ্যমে নারীকে হেয় করি।'

নারী নেত্রী খুশি কবির বলেন, ‘কর্মক্ষেত্রে নারীদের সব সময় প্রমাণ করতে হয় যে তারাও পারে। আমাদের সমাজে সামাজিকীকরণের মাধ্যমে নারীদের একটা গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে রাখা হয়। শব্দকে তৈরি করা হয় নারীর বিরুদ্ধে। শব্দকে লিঙ্গভিত্তিক করা হয়। শব্দকে নারী-পুরুষে বিভেদ করা যাবে না। কোন শব্দের আলাদাভাবে মূল্যায়ন বন্ধ করতে হবে।

দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেন বলেন, ‘আমাদের সমাজ ব্যবস্থা অধিকাংশ নারীকে শব্দজটের মধ্যে আটকে রেখেছে। আমরা হয়তো অনেক কিছুই গুরুত্ব দেই না। এজন্য সংবাদ মাধ্যমেও নারীর প্রতি অসংবেদনশীল শব্দ ব্যবহার করা হয়। যদি এই বিষয়ক কোন নীতিমালা থাকতো তাহলে বিষয়টি এতো হালকা হিসেবে দেখা হতো না।’

ঢাবির সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার বলেন, ‘জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নারী শব্দজটে আটকানো হয়। যেমন মেয়েরা বিদ্রোহী হবে, এটা আমাদের ভাষার অভিধানেই নেই। আর এটা হলো পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার ফল। একজন নারীও পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার হতে পারে। গালাগালির ক্ষেত্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীকেন্দ্রিক গালি দেয়া হয়। আর সমাজে এই বিষয়টি বিদ্যমান থাকে গণমাধ্যমের মাধ্যমে। বিভিন্ন ধরণের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে নারীকে দুর্বল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

চিত্র নির্মাতা শামীম আক্তার বলেন, ‘প্রথমেই নাম নিয়ে নারীকে আলাদা করা হয়। যেমন আমার নাম শামীম। কিন্তু সবাই আমাকে শামীমা বানিয়ে ফেলে। এরপর নারীর সাথে এমন কিছু বিশ্লেষণ যুক্ত করা হয় যাতে তাদের আলাদা জগতের প্রাণী হিসেবে ভাবা হয়। নারীকে সুন্দর হতে হবে, নাচ জানতে হবে এবং গান জানতে হবে এমনভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা যতদিন না এই বিষয়গুলো ভালভাবে বুঝব, প্রতিবাদ করব ততদিন এর সমাধান আসবে না।

নারীরা যাতে শব্দের মাধ্যমে জব্দ না হন সেজন্য কিছু সুপারিশ উঠে আসে অনুষ্ঠানে। যার মধ্যে রয়েছে, শিশুদের ভাষার ইতিবাচক ব্যবহারের সচেতন করা, পাঠ্যপুস্তকে নারীকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিকীকরণের মধ্যেই পরিবর্তন আনা, নিয়ম-নীতি, আচার-আচরণ, সংস্কৃতি, পোশাক, সবকিছুতে পরিবর্তন এনে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা, সকলের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে ভাষার ব্যবহার বিষয়ক সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন :