Alexa

বিশ্বকাপে গাভাস্কারের ১৭৪ বলে অপরাজিত ৩৬ রানের, ‘অদ্ভুত কৃতিত্ব’!

বিশ্বকাপে গাভাস্কারের ১৭৪ বলে অপরাজিত ৩৬ রানের, ‘অদ্ভুত কৃতিত্ব’!

৬০ ওভার খেলে গাভাস্কারের ব্যাটে মাত্র ৩৬। বিস্ময় হয়ে আছে এই ইনিংস -ফাইল ছবি

ওয়ানডে ম্যাচ। এক দল করলো ৩৩৫ রান। সেই রান তাড়া করতে নামা প্রতিপক্ষ দলের একজন ওপেনার পুরো ইনিংস জুড়ে ব্যাট করলেন, তাতে তার রান অপরাজিত ৩৬। বল খেললেন ১৭৪টি। বাউন্ডারি হাঁকালেন মাত্র ১টি! সেই ম্যাচে তার দল হারালো ২০২ রানে।

জ্বি এটা গল্প নয়! সত্যি ঘটনা। তাও আবার বিশ্বকাপের মাঠেই ঘটেছিলো এই ঘটনা। এই ব্যাটসম্যান আমাদের খুব পরিচিত। অনেক নামীদামী ব্যাটসম্যান। প্রচুর রান ও রেকর্ডের মালিকও হয়েছিলেন পরে।

ঘটনাটা ঘটে ১৯৭৫ সালে। প্রথম বিশ্বকাপের আসরে। আর এক ম্যাচে ১৭৪ বলে অপরাজিত ৩৬ রানে থাকার ‘অদ্ভুত কৃতিত্ব’ গড়া ব্যাটসম্যানের নাম সুনীল মনোহর গাভাস্কার!

সেসময় ওয়ানডে ম্যাচ হতো ৬০ ওভারের। লর্ডসের মাঠে বিশ্বকাপের ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ভারত লড়ছে। মাত্রই ওয়ানডে ক্রিকেটের প্রচলন তখন শুরু হয়েছে। রেকর্ড জানাচ্ছে সেটা ছিলো ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসের ১৯ নম্বর ম্যাচ।

লর্ডসে টসে জিতে ইংল্যান্ড ৬০ ওভারে ৪ উইকেটে ৩৩৪ রান করে। ওপেনার ডেনিস অ্যামিস ১৪৭ বলে ১৩৭ রান করেন। জবাব দিতে নেমে ভারতীয় ওপেনার সুনীল গাভাস্কার যে ধীরগতির ব্যাটিং করলেন সেটা আজো ক্রিকেট বিশ্বের বড়ো বিস্ময়!

৬০ ওভার শেষে ভারত ৩ উইকেটে ১৩২ রান তোলে। গাভাস্কার একপ্রান্ত আঁকড়ে রেখে শেষপর্যন্ত ব্যাট করেন। রান করলেন অপরাজিত ৩৬। বল খেললেন ১৭৪। ওপেনার গাভাস্কারের এই ব্যাটিং দেখে তার দল অবাক! প্রতিপক্ষও বিস্মিত! মাঠের আম্পায়ারও অবাক! লর্ডসের গ্যালারির দর্শকরাও কৌতুহলী প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন।

-সারাক্ষণ ব্যাটিং করলেন গাভাস্কার, অথচ ম্যাচ জেতার চেষ্টা কেন করলেন না?

দ্য ক্রিকেটার রিপোর্টে লিখলো-‘এতো বিশাল টার্গেট দেখে লড়াইয়ের আশাই ছেড়ে দিয়েছিলো ভারত তাহলে!’

অনেক কৌতুহলের ছড়াছড়ি ছিলো গাভাস্কারের কচ্ছপগতির সেই ইনিংস নিয়ে। কেউ কেউ বলেন-সেই বিশ্বকাপের দল নির্বাচন নিয়েই গাভাস্কার মোটেও সন্তুষ্ঠ ছিলেন না।  তাছাড়া অধিনায়ক পদে শ্রীনিবাসন ভেঙ্কটারাঘবনের নাম দেখেও গাভাস্কার বিরক্ত হয়েছিলেন!

বিসিবিতে সেই ম্যাচের ধারাভাষ্য দেয়ার সময় টেড ডেক্সটার চরম বিরক্তি নিয়ে বলেন-‘অধিনায়কের উচিত ছিলো ব্যাটসম্যান গাভাস্কারকে মাঠ থেকে তুলে নেয়া!’

-তো গাভাস্কারের কাছে এই ইনিংসের ব্যাখা কি? 

সেই সময় গাভাস্কার কিছুই বলেননি। পরে স্বীকার করেন-‘আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাজে ইনিংস ছিলো ওটা। ওভাবে খেলাটা আসলে ব্যাখাতীত। সেই ইনিংসের শুরুতে আমি ক্রস ব্যাটও চালিয়েছিলাম। যাকে বলে নন ক্রিকেটিং শট খেলা- সেটাও খেলেছিলাম। আমি আসলে জানি না কি করতে চেয়েছিলাম! কয়েকবার তো স্ট্যাম্প ছেড়ে সরেও দাড়িয়েছিলাম যাতে অন্তত বোল্ড হয়ে যাই। কিন্তু তাতেও কাজ হলো না। রানও নিতে পারছিলাম না। আউটও হচ্ছিলাম না!’

সেই ম্যাচের অনেকদিন পরে গাভাস্কার জানিয়েছিলেন-‘আসলে ম্যাচের খেলা দ্বিতীয় বলেই আমি ক্যাচ দিয়েছিলাম। কিন্তু উইকেটকিপার বা বোলার কেউ কোনো আপিল করেনি। আমি একবার ভেবেছিলাম ড্রেসিংরুমের দিকে ওয়াক করা শুরু করবো কিনা। কিন্তু কেউ কোনো আপিল না করায় আমিও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যাই।’

সেই ম্যাচে গাভাস্কারের টিমমেটরা কি ব্যাখা দিচ্ছেন?

সুনীলের সতীর্থ কারসন ঘৌরি বলেন-‘ইংল্যান্ডের রান টপকে যাওয়াটা প্রায় অসম্ভব ছিলো তাই ড্রেসিংরুম থেকে ম্যাসেজ পাঠানো হয়, সবকিছু ভুলে যাও, নিজের খেলার দিকে মনোযোগ দাও।’

সেই ম্যাচে গাভাস্কারের সঙ্গে ব্যাট করা অংশুমান গায়কোয়াড় ৪৬ বলে ২২ রান করেন। তিনি জানান-‘আমি তো তখন তার জুনিয়র। তাকে আমি কি পরামর্শ দেবো। ব্যাটিংয়ের সময় কোনো কথাবার্তাই বলিনি আমরা। আমি তখন শুধু নিজের খেলা এবং যোগ্যতা প্রমানের চিন্তায় ছিলাম।’

অপরাজিত ৩৬ রান নিয়ে গাভাস্কার যখন ড্রেসিংরুমে ফিরেন তখন পিনপতন নিরবতা। কেউ তার সঙ্গে কোনো কথাই বলেননি।

ম্যাচ শেষে দলের ম্যানেজার রামচান্দের ব্যাখাটা ছিলো এমন-‘ইংল্যান্ডের রান টপকে যাওয়াটা অর্জনযোগ্য ছিলো না দেখে গাভাস্কার বাকিটা সময়টা ব্যাটিং অনুশীলনে কাটিয়ে দেয়!’

মজার বিষয় হলো এমন হাস্যকর ইনিংস খেলার পরও গাভাস্কার পরের দুই ম্যাচের একাদশে ঠিকই জায়গা পান। সেখানে তার রান ৮৬ বলে অপরাজিত ৬৫ এবং ১৪ বলে ১২।

বিশ্বকাপ থেকে দেশে ফেরার পর ম্যানেজারের কড়া রিপোর্টের ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড সুনীল গাভাস্কারকে বেশ তিরস্কার করে। গাভাস্কার নীরবেই সেই কটুকথা গলঃধরণ করেন!

এর ঠিক আট বছর পর ১৯৮৩ সালে ইংল্যান্ডের মাটি থেকে ভারত প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতে। গাভাস্কার ছিলেন সেই দলের গর্বিত এক সদস্য।

আপনার মতামত লিখুন :