Alexa

জাবির শৃঙ্খলা বিধিতে নতুন ধারা: স্বাধীন মত প্রকাশে বাধা

জাবির শৃঙ্খলা বিধিতে নতুন ধারা: স্বাধীন মত প্রকাশে বাধা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ছবি: বার্তা২৪.কম

ছাত্র-ছাত্রীদের শৃঙ্খলা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ হালনাগাদ করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) প্রশাসন। সংশোধিত অধ্যাদেশে যুক্ত হওয়া নতুন দুটি ধারা, যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। নতুন এই ধারা দুটিকে ‘নিবর্তনমূলক’ বলে অ্যাখ্যা দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি শিগগিরই এ ধারা বাতিলের দাবিও জানিয়েছেন তারা।

নতুন দুটি ধারা হলো- অধ্যাদেশের ৫ এর (ঞ) উপধারায় বলা হয়েছে, কোনো ছাত্র/ছাত্রী অসত্য এবং তথ্য বিকৃত করে বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত কোনো সংবাদ বা প্রতিবেদন স্থানীয়/জাতীয়/আন্তর্জাতিক প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক সংবাদ মাধ্যমে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচার বা উক্ত কাজে সহযোগিতা করতে পারবে না।

এছাড়া ৫ এর (থ) উপধারায় বলা হয়েছে, কোনো ছাত্র/ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ছাত্র/ছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীর উদ্দেশ্যে টেলিফোন, মোবাইল ফোন, ই-মেইল, ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোনো অশ্লীল বার্তা বা অসৌজন্যমূলক বার্তা প্রেরণ অথবা উত্যক্ত করবে না।

অধ্যাদেশ মতে, ধারা দুটির ব্যতয় ঘটলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের চোখে ‘অসদাচরণ’ বলে গণ্য হবে। এজন্য লঘু শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা, সতর্কীকরণ এবং গুরুতর শাস্তি হিসেবে আজীবন বহিষ্কার, বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার, সাময়িক বহিষ্কার ও পাঁচ হাজার টাকার বেশি জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের দাবি, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশে হস্তক্ষেপ করতেই ধারা দুটি যুক্ত করা হয়েছে। ধারা দুটিতে উল্লেখিত ‘অসত্য, তথ্য বিকৃত’ এবং `অশ্লীল’ বা ‘অসৌজন্যমূলক’ বার্তা প্রেরণ অথবা উত্যক্ত করার’ সংজ্ঞা নির্ধারণ করবেন কে? ফলে স্বাধীন সাংবাদিকতা বাঁধার মুখে পড়বে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে উচ্চ আদালত এক রায়ের পর্যবেক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শৃঙ্খলা বিধিকে ‘দুর্বল ও সেকেলে’ উল্লেখ করে তা হালনাগাদের পরামর্শ দেয়। শৃঙ্খলা বিধির প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিমার্জন করতে ওই বছরের ১৬ মে তৎকালীন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আবুল হোসেনকে সভাপতি করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়। ওই কমিটির হালনাগাদ করা শৃঙ্খলা বিধি বিশেষ সিন্ডিকেট সভায় অধ্যাদেশ হিসেবে অনুমোদন করা হয়।

এ বিষয়ে জাবি সিনেট সদস্য ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য শৃঙ্খলা সংক্রান্ত অধ্যাদেশের ধারা ৫(ঞ) এবং (থ) উপধারা দুটি বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৯ (চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা) এবং অনুচ্ছেদ ৪০ (পেশা বৃত্তির স্বাধীনতা) এর পরিপন্থী । বিশ্ববিদ্যালয় মুক্ত চিন্তার বিকাশ এবং লালন-পালনের যথাযথ স্থান। এই উপধারা দুটি ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে ভীতি ও শঙ্কার তৈরি করবে, যা শুভকর নয় । এছাড়া ক্যাম্পাসে কর্মরত বিভিন্ন গণমাধ্যম কর্মীদের কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত করবে এবং সাংবাদিকরা নিগ্রহের স্বীকার হতে পারেন।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মাহমুদ বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘সম্পূর্ণ অসৎ উদ্দেশ্যে বিধি দুটি যুক্ত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতি, দুর্বৃত্তপনার বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা সবসময় সোচ্চার। সাংবাদিকদের কণ্ঠ রোধ করতেই এই উদ্যোগ। অবিলম্বে এটি বাতিল করতে হবে।’

অন্যদিকে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন জাবি শাখার দফতর সম্পাদক হাসান জামিল স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি শিক্ষার্থীর স্বার্থ বিরোধী ও নিবর্তনমূলক ধারা বাতিলের আহ্বান জানানো হয়েছে। এছাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো আইন তৈরি করা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যায়ন বিভাগের সাবেক সভাপতি সহকারী অধ্যাপক উজ্জ্বল কুমার মণ্ডল বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ‘যেখানে রাষ্ট্রের বিধিমালা রয়েছে সেখানে আবার নতুন করে আইন তৈরি করার প্রয়োজন হয় না। এটা কারা করেছে জানি না, এটা করা ঠিক হয়নি। তাছাড়া ধারা দুটির কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই, ফলে যে যার মতো করে অপব্যবহার করতে পারে। এমন ধারা তৈরি করার আগে সংশ্লিষ্ঠদের সাথে আলোচনা করা উচিৎ ছিল।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের সাথে যোগাগের চেষ্টা করা হলে তিনি অসুস্থ থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তবে বিশ্ব উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. আমির হোসেন বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘নতুন বছরের প্রবেশিকা অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে তাড়াহুড়া করে শৃঙ্খলা বিধি পাস করা হয়েছে। তবে যদি এ বিষয়ে কারও কোনো বক্তব্য থাকে তবে সেটা অবশ্যই বিবেচনা করা হবে।’

আপনার মতামত লিখুন :