Alexa

অজু এবং গোসলের বিকল্প বিধান তায়াম্মুম

অজু এবং গোসলের বিকল্প বিধান তায়াম্মুম

অজু এবং গোসলের বিকল্প বিধান তায়াম্মুম, ছবি: সংগৃহীত

আল্লাহতায়ালা মানবজাতিকে তার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। ইবাদত অপবিত্র অবস্থায় আদায় করা যায় না। পাক-পবিত্র অবস্থায় ইবাদত-বন্দেগি করতে হয়। আর পবিত্রতা অর্জনের জন্য অজু ও গোসলের কোনো বিকল্প নেই। অজু-গোসলের প্রধান মাধ্যম হলো- পানি। আল্লাহতায়ালা তার বিশেষ মেহেরবানীতে বান্দাদের জন্যে প্রচুর পরিমাণে পানির সরবরাহ করে রেখেছেন। তারপরও প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। হতে পারে কোনো স্থানে পানি পাওয়া যাচ্ছে না অথবা গেলেও তা সংগ্রহ করা দুষ্কর বা পেলেও তা ব্যবহার করা দুঃসাধ্য অথবা জীবনের ওপর আঘাত আসতে পারে। এরূপ পরিস্থিতে আল্লাহতায়ালা মেহেরবানী করে মাটি বা মাটি জাতীয় পদার্থ দিয়ে পবিত্রতা অর্জনের অনুমতি প্রদান করেছেন।

সাময়িক পানির অপ্রতুলতার পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন স্বয়ং হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার প্রিয় সাহাবারা। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমরা কোনো এক সফরে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে বের হলাম। আমরা বাইদা কিংবা যাতুল জাইশ নামক স্থানে পৌঁছলে আমার গলার হারটি হারিয়ে যায়। তাই হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) তা অনুসন্ধান করার জন্য সেখানে অবস্থান করলেন। আর লোকেরাও তার সঙ্গে রয়ে গেলো। কিন্তু সেখানে পানি ছিলো না এবং তাদের সাথে আনা পানিও অবশিষ্ট ছিলো না। হজরত আবু বকর (রা.) আমার কাছে এসে বললেন, তুমি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং অন্যসব লোককে এমন এক জায়গায় আটকে ফেলেছো যেখানে পানি নেই এবং তাদের সঙ্গেও পানি নেই। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, হজরত আবু বকর (রা.) আমাকে তিরস্কার করার পর আমার পার্শ্বদেশে হাত দ্বারা সজোরে আঘাত করলেন। কিন্তু হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ঘুমের ব্যঘাত ঘটার ভয়ে আমি ধৈর্য ধরে স্থির থাকলাম। এ অবস্থায় হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ভোর পর্যন্ত পানি ছাড়াই ঘুমালেন। ঠিক এই সময় মহামহিম আল্লাহ তায়াম্মুমের আয়াত নাজিল করলেন। লোকেরা সবাই তায়াম্মুম করলো। আক্বাবা রাতের প্রতিনিধিদের একজন উসাঈদ ইবনে হুদাঈর বলে উঠলেন, হে আবু বকরের পরিবার তোমাদের কারণে কেবলমাত্র এটিই প্রথম বরকত নয়। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, অতঃপর আমি যে উটের ওপর ছিলাম সেটিকে উঠালে তার নিচে আমার হারটি পাওয়া গেলো। -সহিহ মুসলিম শরিফ

তায়াম্মুম প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ! যখন তোমরা নামাজের জন্য ওঠো, তখন স্বীয় মুখমণ্ডল ও হস্তসমূহ কনুই পর্যন্ত এবং পদযুগল গিটসহ ধৌত করো। যদি তোমরা অপবিত্র হও, তবে সারাদেহ পবিত্র করে নাও এবং যদি তোমরা রুগ্ন হও, অথবা প্রবাসে থাকো অথবা তোমাদের কেউ প্রস্রাব-পায়খানা সেরে আসে অথবা তোমরা স্ত্রীদের সঙ্গে সহবাস করো, অতঃপর পানি না পাও, তবে তোমরা পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও অর্থাৎ স্বীয় মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় মাটি দ্বারা মুছে ফেলো। আল্লাহ তোমাদেরকে অসুবিধায় ফেলতে চান না; কিন্তু তোমাদেরকে পবিত্র রাখতে চান এবং তোমাদের প্রতি স্বীয় নিয়ামত পূর্ণ করতে চান- যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’ -সূরা মায়িদা: ৬

তায়াম্মুমের ফরজ
তায়াম্মুমের ফরজ তিনটি যথা- ১. তায়াম্মুমের নিয়ত করা, ২. তায়াম্মুমের বস্তুর ওপর উভয় হাত ঘর্ষণ শেষে সমস্ত মুখমণ্ডল একবার মাসেহ করা এবং ৩. কনুইসহ উভয় হাত মাসেহ করা।
 
তায়াম্মুমের সুন্নত
তায়াম্মুমের সুন্নত ৬টি যথা- ১. বিসমিল্লাহ বলে তায়াম্মুম আরম্ভ করা, ২. মাটি বা মাটি জাতীয় বস্তুর ওপর দু’হাত চাপড় মারা, ৩. হাত ঝেড়ে নেওয়া, ৪. প্রথমে মুখমণ্ডল মাসেহ করা, ৫. তারপর ডান হাত, পরে বাম হাত তারতিবের সঙ্গে মাসেহ করা এবং ৬. পরপর ধারাবাহিকভাবে মাসেহ করা।

তায়াম্মুম করার পদ্ধতি
পাক মাটি, চুন, সুরকি, পাথর, ঘরের দেয়াল জাতীয় পদার্থে ওপর আঙ্গুলগুলো ফাঁক রেখে দুই হাতের তালু এমনভাবে মারতে হবে যেন ধুলা উড়ে আঙ্গুলগুলোর ফাঁকেও প্রবেশ করে। এ সময়ে পবিত্র হওয়ার নিয়ত করতে হবে। এরপর দু’হাত সমস্ত মুখমণ্ডলের ওপর মাসেহ করতে হবে। চুল ও লোমকূপের মধ্যে ধুলি পৌঁছার জন্য অতিরিক্ত চেষ্টা করার প্রয়োজন নেই। আঙ্গুলে আংটি থাকলে খুলে নিতে হবে।
 
এরপর আঙ্গুল ফাঁক রেখে পুনরায় পূর্বের মতো মাটির ওপর হাতের তালু আঘাত করতে হবে। এবার হাত তুলে বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলী ব্যতীত অন্যান্য আঙ্গুলগুলোর ওপর ডান হাতের আঙ্গুলগুলোর পৃষ্ঠে স্থাপনপূর্বক বাম হাতের আঙ্গুলগুলোর পেট দ্বারা ডান হাতের আঙ্গুলগুলোর পৃষ্ঠদেশে অগ্রভাগ হতে আরম্ভ করে ধীরে ধীরে মাসেহ করতে করতে কনুইর ওপর পর্যন্ত আনতে হবে। পরে সেখান থেকে বাম হাতের তালু ডান হাতের ভেতরের দিকে কনুইর ওপর হতে আঙ্গুলের দিকে আস্তে আস্তে মাসেহ করে শেষভাগে বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলোর পেট দ্বারা ডান হাতের আঙ্গুলগুলোর পিঠ মুছে ফেলতে হবে। এভাবে ডান হাত দ্বারা বাম হাত মুছতে হবে।
 
এরপর উভয় হাতের তালু পরস্পর ঘর্ষণ করতে হবে এবং এক হাতের আঙ্গুলগুলো অপর হাতের আঙ্গুলগুলোর ফাঁকে ফাঁকে প্রবেশ করে ঘর্ষণ করতে হবে। এ পদ্ধতিতে তায়াম্মুম সম্পন্ন করে তা দ্বারা এক ওয়াক্তের ফরজ নামাজ এবং সুন্নত ও নফল নামাজ যতো ইচ্ছা পড়া যাবে। তবে অন্য ওয়াক্তের ফরজ নামাজের জন্য পুনরায় তায়াম্মুম করতে হবে।
 
তায়াম্মুম ভঙ্গের কারণসমূহ
যে সব কারণে অজু ভঙ্গ হয়, সে সমস্ত কারণে তায়াম্মুমও ভঙ্গ হয়ে যায়। যে সমস্ত কারণে গোসল ফরজ হয়, সেসব কারণে তায়াম্মুম নষ্ট হয়। এ ছাড়া পানি পাওয়া গেলে, তায়াম্মুম করার পর নামাজ শুরু করার পরে পানি পাওয়া গেলে কিংবা কূপ হতে পানি ওঠানোর পাত্র পাওয়া গেলে তখন তায়াম্মুম ও নামাজ উভয়ই ভঙ্গ হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় অজু করে পুনরায় নামাজ পড়তে হবে। তবে নামাজ শেষ হওয়ার পরে পানি পাওয়া গেলে নামাজ পুনরায় আদায় করতে হবে না।

আপনার মতামত লিখুন :