Alexa

নিঃশব্দ আততায়ী ও আমাদের ভঙ্গুর 'নিরাপদ খাদ্য'

নিঃশব্দ আততায়ী ও আমাদের ভঙ্গুর 'নিরাপদ খাদ্য'

ড. মাহফুজ পারভেজ/ ছবি: বার্তা২৪.কম

অফিস শেষে কামাল সাহেব প্রচণ্ড গরমে ঢাকার কুখ্যাত যানজট পেরিয়ে ঘামতে ঘামতে বাসায় পৌঁছান। 'বাবা', 'বাবা' বলে ছোট দুটি ছেলে মেয়ে ড্রয়িংরুমে তার কাছ ঘেঁষে বসে। কামাল সাহেব ব্যাগ থেকে দু'টি চিপসের প্যাকেট বাচ্চাদের হাতে তুলে দেন।

কাড়াকাড়ি করে প্রিয় সন্তানদের চিপস খাওয়া দেখতে দেখতে কামাল সাহেবের সারাদিনের ক্লান্তি উবে যায়। শান্তিতে তার পরিশ্রান্ত মুখে দেখা দেয় তৃপ্তির হাসি।

কামাল সাহেব জানেন না, তার হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে কান্না। যে চিপস তিনি তুলে দিয়েছেন সন্তানের মুখে, তা ভেজাল ও মানহীন। স্বাস্থ্যের জন্য হানিকর বিপজ্জনক উপাদান রয়েছে এসব খাদ্যে। তিনি আনন্দ ও তৃপ্তি নয়, বাসায় ডেকে এনেছেন নিঃশব্দ এক আততায়ীকে!

শুধু কামাল সাহেব নন, আপনি, আমি, সবাই প্রতিদিন বাজার থেকে যে খাদ্য সামগ্রী কিনে খাচ্ছি, সেসবের অধিকাংশই ভেজাল ও মানহীন। নামীদামি কোম্পানির উৎপাদিত বহু সামগ্রী রয়েছে বিপজ্জনক খাবারের তালিকায়। অন্যদিকে, অনামা প্রতিষ্ঠানের পণ্য মানের তো কোনও বালাই নেই!

আরও পড়ুন: ৭ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল, ১৮ পণ্যের উৎপাদন স্থগিত

কী নেই বিপজ্জনক তালিকায়? প্রতিদিনের নিত্য ব্যবহার্য লবণ, চিনি, তেল, মশলা থেকে শুরু করে সেমাই, লাচ্ছা, দুধ, দই, বিস্কুট, চানাচুর পর্যন্ত কিছুই রেহাই পাচ্ছে না ভেজাল, মানহীন, বিপজ্জনক তালিকা থেকে। নিঃশব্দ-নীরব ঘাতকের মতো এসব খাবার নামের বিষ আমাদেরকে গোপনে হনন করছে।

নিরাপদ খাদ্য বলে যে একটি বিষয় আছে, বাংলাদেশে তা গ্রাহ্যই করা হচ্ছে না। নোংরা পা দিয়ে মাড়িয়ে বানানো হচ্ছে চানাচুর, বিস্কুট, পাউরুটি। কেমিকেল মিশেয়ে দেওয়া হচ্ছে চিনি ও লবণে। হলুদ, মরিচ, জিরায় ভেজাল দেওয়া হচ্ছে। আটা, ময়দা, দুধে বিপজ্জনক উপাদান মেশানো হচ্ছে। মাছ, মাংস, সবজিতে ক্ষতিকর কেমিকেল ও মারাত্মক কীটনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে।

শুধুমাত্র দেশে উৎপাদিত পণ্যগুলো ভেজাল, মানহীন, বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত হচ্ছে না। বিদেশ থেকে যা আনা হচ্ছে, সেসবও মেয়াদোত্তীর্ণ। কখনও পশু খাদ্য হিসাবে অতি কম দামে অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী আমদানি করে বাহারী মোড়কে ভরে বিক্রি করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ বেশি দাম দিয়ে নামী কোম্পানী ও রঙিন প্যাকেট দেখে সেসব কিনছেও।

ঘূণাক্ষরেও কেউ টের পাচ্ছেন না যে টাকা খরচ করে নিজেরই অজ্ঞাতে নিঃশব্দ আততায়ীকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন তিনি। স্ত্রী, সন্তানের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে ঠেলে দিচ্ছেন চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও বিপদের গহ্বরে। দীর্ঘ মেয়াদে যা ক্রমে ক্রমে লিভার, কিডনি, হার্ট নষ্ট করে তাকে ও তার পরিবার-পরিজনকে মৃত্যু মুখে নিয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: খাদ্য নিরাপত্তা: নামীদামি কোম্পানিও আস্থাহীন! 

এইসব মানহীন, ভেজাল ও বিপজ্জনক খাদ্য সামগ্রীর কারণে বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত কিডনি রোগী বাড়ছে। লিভারজনিত রোগের সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে। বাজে তেলের কারণে অল্প বয়সেই হার্টে ব্লক ধরা পড়ছে। দেশ-বিদেশের বড় বড় ডাক্তাররা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও দেখেশুনে খাওয়ার ব্যাপারে বার বার তাগিদ দিচ্ছেন বাংলাদেশের মানুষজনকে।

তারপরও আমরা সচেতন হচ্ছি না। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের ব্যাপারে সরকার শতভাগ সাফল্য দেখাতে পারছে না। খাদ্যের উৎপাদন ও বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এক মহাশক্তিশালী সিন্ডিকেট গ্রাস করে রেখেছে বাজার ও পণ্য-সামগ্রীর উৎপাদন-সরবরাহ-বিপণন ব্যবস্থাকে।

ব্যক্তিগত ও সামাজিক দিক দিয়েও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছি আমরা। কী খাচ্ছি, তা খেয়াল করছি না। খাদ্যের মান, গুণ ও মেয়াদ দেখছি না। সরকার, বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও মান নিরীক্ষণ প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর হতে চাপ দিচ্ছি না। মানুষের সম্মিলিত সচেতন শক্তি দিয়ে অসাধু ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারীদের চিহ্নিত ও ভীত করতে পারছি না।

বরং আমরা বিশাল জনতা জিম্মি হয়ে আছি মানহীন, ভেজাল, বিপজ্জনক খাদ্যের চক্করে। প্রতিদিন কষ্টার্জিত অর্থে বিষ ও বিপদ কিনছি। প্রতিমুহূর্তে খাদ্যের নামে ঘরে আনছি নিঃশব্দ আততায়ীকে।

কেউ জানে না, কবে অবসান হবে ভঙ্গুর ও অনিরাপদ খাদ্যজনিত এই বিপদ ও বিড়ম্বনা।

ড. মাহফুজ পারভেজ: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম

আপনার মতামত লিখুন :