ভালো নেই বগুড়ার বেনারসি পল্লীর কারিগররা

বগুড়া, দেশের খবর

গনেশ দাস, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, বগুড়া | 2023-08-25 10:12:37

ভালো নেই বগুড়ার শেরপুরের বেনারসি পল্লীর শাড়ি তৈরির কারিগররা। এক সময় যাদের হাতে বেনারসি শাড়ি তৈরি হতো, এখন সেই হাতে তারা ভ্যান-রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

আর এখন পর্যন্ত যারা এ পেশা টিকিয়ে রেখেছেন তাদেরও দিন চলছে অতি কষ্টে। ভারত থেকে আসা শাড়ি দখল করে নিয়েছে বেনারসি পল্লীর তাঁতে তৈরি শাড়ির বাজার।

বগুড়া শহর থেকে ২৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে শেরপুর উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নের ঘোলাগাড়ি কলোনি গ্রামে বেনারসি শাড়ি তৈরির কারিগরদের বসবাস। ভারতের বিহার প্রদেশ থেকে আসা এই পরিবারদেরকে স্থানীয়রা বিহারী বলে চিনে।

ঘোলাগাড়ি গ্রামেই আরেক পাড়ার নাম নদীয়া পাড়া। এই পাড়ার বাসিন্দারা ভারতের নদীয়া জেলা থেকে উঠে এসে বসতি গড়ার কারণে নাম হয়েছে নদীয়া পাড়া। এক সময় দুইপাড়ার ৭০টি পরিবারে তৈরি করা হতো বেনারসি শাড়ি। আর এ কারণেই বেনারসি পল্লী হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠে এলাকাটি।



তবে বেনারসি পল্লীতে এখন আর বেনারসি শাড়ি তৈরি হয় না। এ পল্লীতে এখন জামদানি, কাতান, ধুপিয়ানসহ তাঁতে তৈরি বিভিন্ন ডিজাইনের শাড়ি পাওয়া যাচ্ছে। তাও আবার সীমিত আকারে। দিন দিন চাহিদা কমে যাওয়ায় শাড়ি উৎপাদন কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক তাঁত।

এই গ্রামে প্রথম বেনারসি শাড়ি তৈরির কাজ শুরু করেন আব্দুল ওয়াহেদ। ঢাকার মিরপুরে বেনারসি পল্লীতে ১৫ বছর কাজ শিখে ১৯৯৫ সালে নিজের বাড়িতে তাঁত বসিয়ে ঘোলাগাড়ি গ্রামে প্রথম বেনারসি শাড়ি তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি। দিন দিন শাড়ির চাহিদা বাড়তে থাকলে ঘোলাগাড়ি কলোনি ও নদীয়াপাড়ায় নারী-পুরুষ সবাই তাঁতের কাজ শুরু করেন। কয়েক বছরের ব্যবধানে দুইপাড়ায় ৭০টি তাঁত বসানো হয়। শুরু হয় বেনারসি ছাড়াও জামদানি, কাতান, ধুপিয়ানসহ বিভিন্ন ডিজাইনের শাড়ি তৈরির কাজ। আর তখন থেকেই ঘোলাগাড়ি কলোনি ও নদীয়া পাড়া বেনারসি পল্লী হিসেবে এলাকাবাসীর মুখে মুখে পরিচিত হয়ে ওঠে।

আব্দুল ওয়াহেদ বার্তা২৪.কমকে জানান, বেনারসি পল্লীতে তৈরি শাড়ির চাহিদা এতটাই ছিল যে, ঢাকার বিভিন্ন শাড়ির শো-রুম থেকে আগাম টাকা দিয়ে অর্ডার দেয়া হতো। সারা বছরের পাশাপাশি রমজান মাসে চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি। এ কারণে রমজান মাসে দিন রাত কাজ করত কারিগররা। তবে গত কয়েক বছর ধরে ভারত থেকে শাড়ি আসায় তাদের কদর কমে গেছে। দাম কম হওয়ায় সেগুলো বাজারে চলে বেশি।

তিনি জানান, এ কারণে একের পর এক তাঁত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কারিগররা বেকার হয়ে পড়ায় অনেকেই ভ্যান-রিকশা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছে।

বেনারসি পল্লীর নদীয়াপাড়ার তাঁত মালিক খোরশেদ আলম বার্তা২৪.কমকে জানান, আগের মতো কাজ নেই তাদের পল্লীতে। তারপরেও ৬টি তাঁত রয়েছে বাড়িতে। সেখানে কাজ করে ১০ জন কারিগর।

তিনি জানান, ভারতীয় শাড়িতে বাজার সয়লাব হওয়ায় ঢাকার মহাজনরাও নগদ টাকায় তাদের কাছ থেকে শাড়ি কিনতে চান না।

স্থানীয় আহম্মদ আলী বার্তা২৪.কমকে জানান, গত দেড় বছর ধরে কাজ না থাকায় তার তিনটি তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। তিনিও বেকার বসে আছেন। গত ৫ বছরে এখানকার কমপক্ষে ৫০টি তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে।

বেনারসি শাড়ি তৈরির কারিগর রফিক বার্তা২৪.কমকে জানান, তাঁতে একটা শাড়ি তৈরি করতে তাদের সময় লাগে দুই থেকে তিনদিন। আবার যেগুলোতে হাতের কাজ বেশি সেই শাড়ি তৈরি করতে এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যায়।

বেনারসি পল্লী ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। যে কয়েকটি তাঁত চালু আছে সেখানেই তৈরি হচ্ছে ঈদ উপলক্ষে কাতান এবং জামদানি শাড়ি। ১৮ হাজার টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা দামের শাড়ি তৈরি হয় বেনারসি পল্লীতে।

তাঁত মালিকরা জানান, ১৮ হাজার টাকায় পাইকারি দামে যে শাড়ি বিক্রি করেন, ঢাকার শোরুমে তা ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।

এ সম্পর্কিত আরও খবর